আমাদের দেশে জোটের রাজনীতি একেবারে নতুন নয়। ২৭ জুলাই ১৯৫৩ সালে যুক্তফ্রন্ট গঠনের মাধ্যমে জোটের রাজনীতি শুরু বলা যায়। ২৬ জুলাই ১৯৬৪ সালে আওয়ামী লীগ, জামায়াতে ইসলামী, ন্যাপ, নেজামে ইসলাম পার্টি, এনডিএফ এবং মুসলিম লীগ নিয়ে ‘সম্মিলিত বিরোধী দল’ কপ গঠন করা হয়েছিল। ৮ জানুয়ারি ১৯৬৯ সালে আওয়ামী লীগ, জামায়াত, ন্যাপ, নেজামে ইসলাম, এনডিএফ আর মুসলিম লীগ মিলে ‘ডেমোক্র্যাটিক অ্যাকশন কমিটি’ বা ডাক গঠন করা হয়। সব সময়ই বড় দলগুলো ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য এবং ছোট দলগুলো তাদের প্রতিপক্ষকে এককভাবে মোকাবেলা করতে ব্যর্থ হয়ে জোটের রাজনীতিতে শামিল হয়ে থাকে। ষাটের দশকে একনায়ক জেনারেল আইয়ুববিরোধী আন্দোলনের শক্তি বৃদ্ধির জন্যও জোটের রাজনীতি সচল ছিল। সাত দল এবং ১৯৮৩-৮৪ এরশাদবিরোধী আন্দোলনকে বেগবান করতে ১৫ দল, আট দল ও সাত দলের জোটবদ্ধ তৎপরতা দেখা যায়। এই জোট এবং জামায়াতের আন্দোলনে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর জেনারেল এরশাদ বিদায় নিতে বাধ্য হন।
অনুরূপভাবে, ২০০১ সালে ১ অক্টোবর চারদলীয় জোটের আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনার সরকার বিদায় নেয়। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট গঠন করা হয়। ২৮ ডিসেম্বর ২০০৮ সালে মহাজোট ও চারদলীয় জোটের তোপের মুখে মইনউদ্দিন-ফখরুদ্দীনের সেনাসমর্থিত অসাংবিধানিক সরকারের বিদায় ঘটে। ১৮ এপ্রিল ২০১২ সালে চারদলীয় জোট কলেবর বৃদ্ধি করে ১৮ দলীয় জোটে উন্নীত হয়। ২০১৪ সালে এই জোট পুনরায় কলেবর বৃদ্ধি করে ২০ দলীয় জোটে পরিণত হয়। আগেই বলা হয়েছে, জোটে কেউ ক্ষমতায় যেতে এবং কেউ প্রতিপক্ষকে একা মোকাবেলা করতে ব্যর্থ হয়ে জোটে শামিল হয়। এ হিসাবে বিএনপি ক্ষমতায় যেতে জোটে শামিল হলেও অন্য দলগুলো রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে জোটে শামিল হয়েছে। ২০ দলীয় জোটের মধ্যে বিএনপি-জামায়াত ছাড়া বাকি রাজনৈতিক দলগুলো শক্তির দিক দিয়ে নগণ্য।
জামায়াতকে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক নীলনকশা মোকাবেলায়, অর্থাৎ তাদের প্রতিপক্ষকে সামাল দিতে জোটের কৌশলে শামিল হতে হয়েছে। বর্তমান শক্তি দিয়ে জামায়াতকে এককভাবে চলতে অনেকটা হিমশিম খেতে হচ্ছে। হয়তো এ কারণে জামায়াত ২০ দলীয় জোটে। এমন অনেক ছোট দল আছে যারা জোটের বড় অনুষ্ঠানে একটি চেয়ার ও দুটো কথা বলার সুযোগ পাওয়াকেই অনেক প্রাপ্তি বলে মনে করে। তবে জোটের বড় দলকে অবশ্যই বিবেচনা করা উচিত, ‘দশের লাঠি একের বোঝা’। দল ছোট হলেও অব: জেনারেল ইবরাহিম, ড. অলি, ব্যারিস্টার পার্থ ও রেহানা প্রধান প্রমুখ ব্যক্তি হিসেবে ছোট নয়। দেখলাম না যে, কোনো জেলা-উপজেলা বা শহরপর্যায়ে জোটের অনুষ্ঠানে বিএনপি ছাড়া অন্য কোনো দলের নেতা প্রধান অতিথি কিংবা সভাপতিত্ব করেছেন অথবা অনুষ্ঠানটি পরিচালনা বা সঞ্চালনা করেছেন। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সাম্যবাদী দল, ওয়ার্কার্স পার্টি ও খণ্ডিত জাসদকে (ইনু) পর্যন্ত মন্ত্রিত্ব দিয়েছে। ছোটখাটো দলগুলোকে সংসদে দু-চারটি হলেও আসন দিয়েছে। উপজেলা-ইউনিয়নেও তাদের পদ দেয়া হয়েছে। মানুষ দেখে শিখে, শুনে শিখে অথবা ঘা খেয়ে শিখে। জামায়াত দেখিয়ে দিলো এ দিকে, তাদের নেতাদের এক এক করে ফাঁসি হচ্ছে আর তারা জোটের সভায় অনেক জুনিয়র নেতাদের দিয়ে প্রতিনিধিত্ব করাচ্ছে, অথচ দলের কোথাও কোনো শব্দ পর্যন্ত উচ্চারণ হচ্ছে না।
দেশে মোট ১১টি সিটি করপোরেশন রয়েছে, সেখানে মেয়র ও কাউন্সিলরসহ ৫৫১টি রাজনৈতিক পদ। জাতীয় রাজনীতিতে সংসদে ৩০০ সাধারণ আসন এবং ৪৫টি সংরক্ষিত মহিলা আসন, ৬৪টি জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও সদস্য নারী-পুরুষ মিলে ১১৫২টি পদ, ৪৯২টি উপজেলা চেয়ারম্যান এবং অনুরূপ সংখ্যক ভাইস চেয়ারম্যান নারী ও পুরুষ, সদস্য নারী-পুরুষ মিলিয়ে সাত হাজার ৫১২টি পদ, ৩১৫টি পৌরসভার মেয়র ও আনুপাতিক হারে নারী-পুরুষ ওয়ার্ড কমিশনার নিয়ে আট হাজার ৭১৫টি পদ এবং চার হাজার ৫২৭টি ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আর সদস্য নারী-পুরুষ মিলে ৪৬ হাজার ৭৭৯টি পদসহ প্রায় ৬৫ হাজার ৫৪টি রাজনৈতিক পদ আছে। জোটের রাজনীতিতে দল যতই ছোট হোক, ৬৫ হাজার ৫৪টি পদের মধ্যে দু-চার পদ যেকোনো ছোট দলেরও প্রত্যাশা থাকাই স্বাভাবিক।
তা ছাড়া জোটের বড় দলের উদারতার মনোভাবও আনুপাতিকভাবে বড় হওয়াটাই কাম্য। বড় দল হিসেবে একটি মাত্র দল যদি সবই নিয়ে নেয় তবে ওই ছোট দলগুলো তাদের সংগঠন ও কর্মীদের কী দিয়ে বোঝাবে যে, জোটে তাদের মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান আছে? সামনের দিনগুলো আরো কঠিন হবে।
জোটের শক্তিশালী দল হয়েও কেউ একটি কাউন্সিলর পদও পাবে না এটা কি রাজনৈতিক সঙ্কীর্ণতার নজির নয়? ক্ষমতার রাজনীতি ধারক, তাদের রাজনৈতিক অঙ্কে জামায়াতকে জোট থেকে পৃথক করতে ব্যর্থ হয়ে তাদের প্রতি খড়গহস্ত হওয়ার ফলে জামায়াতকে এর চরম মূল্য দিতে হয়।
সিলেট সিটি করপোরেশনে মেয়র, ২৭টি সাধারণ কাউন্সিলর ও ৯টি সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলরসহ ৩৭টি কাউন্সিলর পদ রয়েছে। এখানে জামায়াত ১৩টি আসনে কাউন্সিলর প্রার্থী দিয়েছে। বিএনপি এখানে কাউন্সিলর নিয়ে দর কষাকষি করতে পারত। সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে বড় দল হিসেবে বিএনপি ২০০টি নিন, বাকি সিট জোট এবং জোটের সিদ্ধান্তে বিশিষ্ট ব্যক্তি এবং দলকে দিয়ে সরকারকে বিদায় করার চেষ্টা করুন। পলিটিক্যাল এই হায়ার ডোজের অ্যান্টিবায়োটিক বা স্টেরয়েড দেয়া ছাড়া কোনো গত্যন্তর নেই।
