সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে কার্যকর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বৃহত্তর ঐক্য গঠনের ঘোষণা দিয়েছে যুক্তফ্রন্ট ও জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়ার সাথে তারা দেশের সব গণতান্ত্রিক সংগঠন ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের অংশগ্রহণের আহ্বান জানান। একটা বৃহত্তর ঐক্য গড়ার লক্ষ্যে যুক্তফ্রন্ট ও জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া যৌথ ঘোষণা করে। এটাতে সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে এ ঐক্য করতে চায়। পাড়ায় পাড়ায় গ্রামে গ্রামে এ ঐক্য গড়ে উঠুক যাতে জনগণ তাদের মালিকানা ফিরে পায়।
এ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য শুরু হলো। এর মাধ্যমে বাংলাদেশে একটা কার্যকর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে। ড. কামালের নেতৃত্বে গঠিত এই জাতীয় ঐক্যের চরম বিরোধিতা করে আসছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। দলটির সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্প্রতি নেপাল সফর শেষে গণভবনে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় ঐক্যের সাথে জড়িত ড. কামাল হোসেন, আ স ম আবদুর রব ও মাহমুদুর রহমান মান্নার কড়া সমালোচনা করেন। ড. কামালের নেতৃত্বে গঠিত ও তাদের কার্যক্রম নিয়ে টেনশনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ যেভাবে দেশের সর্বস্তরে উত্তাপ ছড়াচ্ছে, তাতে শেষ পর্যন্ত কী হয় সেটি নিয়ে দলটি আতঙ্কিত। এ জন্যই তারা পাল্টা জোট গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে। তারই ধারাবাহিকতায় সরকারের প্রত্যক্ষ মদদে নতুন জোট ইসলামিক ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়েন্সের আত্মপ্রকাশ ঘটেছে। এই জোটের নেতৃত্বে রয়েছেন বাংলাদেশ ইসলামি ঐক্যজোটের (একাংশ) চেয়ারম্যান মেজবাহুর রহমান চৌধুরী ও তরিকত ফেডারেশনের মহাসচিব এম এ আউয়াল। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সরকারপন্থী বলে পরিচিতি নামসর্বস্ব ১৫টি রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের সমন্বয়ে ইসলামি ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়েন্স গঠিত হয়েছে। এই দলগুলো জোটের মাধ্যমে ক্ষমতাশীন আওয়ামী লীগের অধীনে আগামী নির্বাচনে অংশ নেবে।
এরই মধ্যে কেউ কেউ নির্বাচনী জয় পাওয়ার আশায় সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টিকে বেছে নিয়েছে। ইসলামি ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়েন্স প্রসঙ্গে আউয়াল বলেন, নির্বাচন সামনে রেখে জোটটি আত্মপ্রকাশ করেছে। নির্বাচন সামনে রেখে জোট হলেও সামনের দিকে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে কর্মকাণ্ড নির্ধারিত হবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, প্রথম দিকে অনেক দ্বিধাদ্বন্দ্ব থাকলেও এখন সবাই বুঝতে পারছেন একটা সাফল্যজনক প্রক্রিয়ার দিকে এগোচ্ছে জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া।
তারা যে পাঁচ দফা ও ভবিষ্যৎ করণীয় ঘোষণা করেছেন তা সর্বমহলে প্রশংসিত হয়েছে। জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার সাথে বিএনপিসহ ২০ দল থাকায় সরকার আতঙ্ক বোধ করছে। ঢাকাসহ সব বিভাগীয় শহরে সমাবেশ করবে তারা। বিভাগীয় শহরে সমাবেশের উদ্যোগ নিলেও সরকারের অনুমতি নিয়ে সঙ্কিত তারা। রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করেন ড. কামাল হোসেন, আ স ম রব, বি. চৌধুরী, মাহমুদুর রহমান মান্নাদের মতো বড় সমাবেশ করার জনসমর্থন নেই ঠিক, এই সমাবেশ সফল করার দায়িত্ব নিয়েছে বিএনপি। সরকারের জন্য এটা বড় চিন্তার কারণ। সরকার মনে করে, গত দুই বছরে বিরোধী জোট বিএনপি-জামায়াত ঢাকা নগরের আশপাশে লাখ লাখ মানুষের ঘাঁটি করেছে। কয়েক ঘণ্টার ঘোষণায় তারা লাখো মানুষের সমাগম ঘটাতে পারে। এর সাথে যুক্ত হবে কোটা সংস্কার ও নিরাপদ সড়ক আন্দোলন ইস্যুতে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা। ফলে সমাবেশে ডাক দেয়ার পর কী অবস্থা হবে তা নিয়ে শংসয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ।
১ সেপ্টেম্বর বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পূর্বপ্রস্তুতি ছাড়াই মাত্র কয়েক ঘণ্টার ঘোষণায় এত বিপুলসংখ্যক লোকের সমাবেশ দেখে হতাশ হয়ে পড়েছে সরকারি দল। তার পর থেকেই ধর-পাকড় শুরু হয়েছে সারা দেশে। কিন্তু এতে খুব একটা সফলতা পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। সরকার যেসব ক্ষেত্রে সফল হতে পারছে না এবং অনেক কিছুই প্রকৃত তথ্য সরকারের হাতে নেই তার বড় প্রমাণ হলো গত ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়া জেলে যাওয়ার দিনে অপ্রতিরোধ্য শো-ডাউন, এপ্রিলের কোটা আন্দোলন এবং তারপর আগস্ট সড়ক নিরাপদ আন্দোলনের অভাবিত পরিস্থিতি।
বিরোধীদের দাবি এর পর যা ঘটবে সেটি নিয়ন্ত্রণ সরকারের থাকবে না। এর সাথে যদি জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া যোগ দেয় তাহলে পরিস্থিতি সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। এদিকে সরকারের আতঙ্ক বাড়াচ্ছে বিদেশীরা। নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানিয়েছে, ড. কামালের নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যের প্রতি বিদেশীদের প্রায় সবার সমর্থন রয়েছে। এই ঐক্য সফল করার প্রচেষ্টায় কূটনীতিকেরা নিজেরা ছাড়াও রাজনীতিবিদ সুশীলসমাজসহ বিভিন্নজনের সাথে আলাদা আলাদা বৈঠক করেছেন। সরকার অভিযোগ করেছে বিদেশী কূটনীতিকেরা তাদের বিরুদ্ধে সুগভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। বলা হচ্ছে, আওয়ামী লীগের ভেতর থেকে সরকার পতনের ষড়যন্ত্র হচ্ছে। এর সাথে বিদেশীরাও জড়িত। বিএনপির জুনিয়র সিনিয়র নেতারা সবাই এখন জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার সর্বাধিক গুরুত্ব দিচ্ছে। তারা ছাড় দিয়ে হলেও জাতীয় ঐক্য চাচ্ছেন।
জাতীয় ঐক্যের পাশাপাশি বর্তমান সময় নিজেদের মধ্যে অবিশ্বাস নিয়ে বড় টেনশনে সরকারি দল। তারা আশঙ্কা করছে আওয়ামী লীগের একটা অংশ ড. কামালের প্রক্রিয়ার সাথে জড়িত রয়েছে। বিশেষ করে যেসব আওয়মী লীগ নেতা বিগত সময় ক্ষুব্ধ এবং বঞ্চিত হয়েছেন অথবা আশানুরূপ সুযোগ সুবিধা পাননি; আবার যারা এবার প্রার্থী তালিকার নাম লেখানো থেকে বাদ পড়তে পারেন তাদেরও একটি অংশ ড. কামালের সাথে যোগাযোগ করছেন বলে জানা গেছে। এ ছাড়া পুনরায় আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় না এলে কী হতে পারে এই আতঙ্কে অনেক নেতা ড. কামালের ঐক্য প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত হতে পারেন বলে মনে করা হচ্ছে। ড. কামাল একসময় আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের নেতা ছিলেন। ১৯৮১ সালে ১৫ নভেম্বর দেশে যে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় তাতে বিএনপির প্রার্থী বিচারপ্রতি আবদুর সাত্তারের বিপরীতে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন ড. কামাল হোসেন।
লেখক : রাজনৈতিক কর্মী
আরো পড়ুন :
পরিচ্ছন্ন রাজনীতি, পরিশীলিত নেতৃত্ব
জাহাঙ্গীর আলম
‘রাজনীতি’ শব্দটি বহুল আলোচিত এবং সর্বমহলে পরিচিত। এটি সমাস সাধিত শব্দ। এর অর্থ হলো- ‘নীতির রাজা’। রাজারনীতি নয়। সুতরাং সেদিক থেকে বলা যায়, রাজনীতিবিদ তিনিই হবেন অথবা রাজনীতি করার অধিকার কেবল তারই রয়েছে, যিনি ‘নীতির রাজা’ হতে পারবেন। রাজনীতি মানুষের জন্য। মানুষের মৌলিক চাহিদা (অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা, নিরাপত্তা) নিশ্চিত করা, সমাজে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা রাজনীতির অন্যতম শিক্ষা। রাজনীতির উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য হতে হবে সমাজ, দেশ ও রাষ্ট্রের কল্যাণ সাধন। মানবিক ও নৈতিক গুণাবলিসম্পন্ন, সৎ, যোগ্য, শিক্ষিত, আধুনিক তথা যুগোপযোগী, বিজ্ঞানমনস্ক ব্যক্তিরাই রাজনীতির অঙ্গনে থাকা উচিত। অসাধু, চোর, বাটপার, দুর্নীতিবাজদের রাজনীতিতে শোভা পায় না। কারণ, রাজনীতির উদ্দেশ্যই হলো- দুষ্টের দমন, শিষ্টের লালন। আর অসৎ লোকেরা রাজনৈতিক ক্ষমতা বজায় রাখলে এর বিপরীত অবস্থা দেখা যাবে। তখন সমাজে নৈরাজ্য দেখা দেবে। পদে পদে মানুষের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘিত হবে। অপরাধ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে বাড়বে। আইনের শাসন থমকে যাবে। অপরাধীর বুক ফুলিয়ে চলার সুযোগ সৃষ্টি হবে। পশুর সাম্রাজ্য কায়েম হবে। নেতৃত্ব নিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে। গোটা সমাজব্যবস্থা এক ধরনের বিবদমান অবস্থার মধ্য দিয়ে যেতে থাকবে।
পৃথিবীব্যাপী সুশৃঙ্খল সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে রাজনৈতিক ধারণা সৃষ্টি হয়েছে।
রাজনীতির আদি সূতিকাগার হলো পরিবার। মানুষ পরিবার থেকে রাষ্ট্রের ধারণা পেয়েছে। তাই পরিবারকে বলা হয় ংসধষষ ংঃধঃব. ব্যক্তি থেকে পরিবার, পরিবার থেকে সমাজ, সমাজ থেকে রাষ্ট্রের উৎপত্তি হয়েছে। পরিবারে স্বামী-স্ত্রী, মা-বাবা, ভাই-বোনসহ বিভিন্ন সদস্য। একটি গঠনমূলক, আদর্শ পরিবার পরিচালনার লক্ষ্যে একজনকে কর্তা হিসেবে বিবেচনা করা হতো।
তার নির্দেশে পারিবারিক কার্যক্রম পরিচালিত হতো। পরিবারের সবাই কর্তা হলে অথবা কর্তা না থাকলে কারো কথা কেউ শুনবে না। এমন চিন্তা থেকেই নেতা নির্বাচনে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। মানুষ সঙ্ঘবদ্ধ জীব। প্রাত্যহিক জীবনের নানামুখী কার্যক্রম সহজ ও গতিশীল করার লক্ষ্যে একাধিক পরিবার নিয়ে মানুষ গড়ে তুলেছে সামাজিক জীবনব্যবস্থা। আর সমাজে শান্তি ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত করার জন্য যোগ্যতাভিত্তিক নেতা নির্বাচন করা হতো। অনুরূপ, গ্রামভিত্তিক সঙ্ঘবদ্ধ সমাজব্যবস্থা পরিচালনার বৃহত্তর লক্ষ্যে গঠিত হয়েছে রাষ্ট্র নামক সংগঠন। রাষ্ট্র তার অভ্যন্তরীণ (ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে) সমগ্র জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তার প্রতীক। রাষ্ট্র পরিচালিত হবে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায়, নির্বাচিত যোগ্য জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে। যারা হবেন নীতিবান, সত্য ও আদর্শের ধারক-বাহক। তাদের মাধ্যমেই জাতির আশা, আকাক্সক্ষার সামগ্রিক প্রতিফলন ঘটবে।
এতগুলো কথা বললাম, রাজনীতি ও রাজনীতিবিদ প্রসঙ্গে। কারণ, রাজনীতিবিদেরা দেশ ও জনগণের ভাগ্য উন্নয়নে কাজ করেন। আর রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় এ কাজগুলো সম্পন্ন হয়। অনেক রাজনীতিবিদ আছেন যারা সাধারণ মানুষের ভাগ্য উন্নয়নের কথা বলে রাতারাতি নিজেদের ভাগ্যের উন্নয়ন ঘটিয়ে থাকেন। নির্বাচনী ওয়াদা ও রাষ্ট্রীয় শপথ ভঙ্গ করে তারা মুখ বাঁচানোর জন্য কথায় কথায় বলে থাকেন রাজনীতিতে শেষ কথা বলতে কিছু নেই। তা সত্য, রাজনীতির শেষ কথা নেই।
কারণ, রাজনীতি একটি পরিবর্তন ও গতিশীল বিজ্ঞানের নাম। কিন্তু মিথ্যা কথার শেষ আছে। মিথ্যা বা প্রতারণামূলক আচরণের স্থান রাজনীতির অভিধানে নেই। নির্লজ্জ মিথ্যাচার রাজনীতির বৈশিষ্ট্যের সাথে যায় না। রাজনীতিবিদ সম্মানীয় ব্যক্তিত্ব। তারা হবেন জাতির অভিভাবক, সংবিধান প্রণেতা। রাষ্ট্রের স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতার অতন্দ্র প্রহরী। রাজনীতিবিদ জাতি-রাষ্ট্রের পরিচালক। রাষ্ট্রের শিক্ষানীতি, অর্থনীতি, স্বরাষ্ট্রনীতি, পররাষ্ট্রনীতি তথা সর্বোপরি পরিপূর্ণ রাষ্ট্রনীতি পরিচালনার দায়িত্ব রাজনীতিবিদের হাতেই ন্যস্ত। সুতরাং এ কথা সহজে অনুমেয়, দেশ পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োজিত রাজনীতিবিদের চরিত্র কেমন হওয়া উচিত।
ইলেকট্রনিকস ও প্রিন্টমিডিয়ার বদৌলতে প্রায়ই দেখা যায়, একশ্রেণীর রাজনীতিকের হাতে দেশের জাতি গড়ার কারিগর নামে খ্যাত শিক্ষক সমাজ এবং পদস্থ প্রশাসনিক কর্মকর্তাদেরও লাঞ্ছিত। দেখা যায় চপেটাঘাতের শিকার হয়ে কান ধরে উঠবস করতে। নিছক ব্যক্তিগত স্বার্থে আঘাত লাগলে এ জাতীয় নগ্ন আক্রমণ করেন কোনো কোনো রাজনীতিবিদ। জাতির জন্য এর চেয়ে লজ্জার আর কী থাকতে পারে।
