বহুল প্রতীক্ষার একাদশ সংসদ নির্বাচন আসন্ন। তফসিল অনুযায়ী, আগামী ৩০ ডিসেম্বর এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। দলীয় সরকারের অধীনে এ নির্বাচনে সব দল অংশগ্রহণ করেছে। এটি এর একটি ভালো দিক। নির্বাচন উপলক্ষে আওয়ামী লীগ, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট, বিএনপি, জাতীয় পার্টি ও বাম জোট ইশতেহার ঘোষণা করেছে। দেয়া হয়েছে নানা প্রতিশ্রুতি। গত ১৮ ডিসেম্বর ইশতেহার প্রকাশ করেছে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর পৃথকভাবে ইশতেহার ঘোষণা করেন। আগের দিন ইশতেহার ঘোষণা করেছিল জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। আইন বিশেষজ্ঞ ড. কামাল হোসেন ঐক্যফ্রন্টের ইশতেহার ঘোষণা করেন। ১৪ ডিসেম্বর ১৮ দফার ইশতেহার ঘোষণা করে জাতীয় পার্টি। ১২ ডিসেম্বর বাম জোটও নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে। দেশ-বিদেশের গণমাধ্যমগুলো গুরুত্ব দিয়ে ইশতেহারের সংবাদ প্রচার করে। ফলে শিক্ষিত ও সচেতন মহলসহ সাধারণ মানুষ ইশতেহার সম্পর্কে জেনেছে। কোন দলের ইশতেহারে কী প্রতিশ্রুতি রয়েছে- সে হিসেব কষছেন ভোটাররা। বিশেষ করে, তরুণ ভোটারদের নিয়ে সব জোটই ইশতেহারে নানা পরিকল্পনা উল্লেখ করেছে। তবে ক্ষমতায় গেলে সে প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা হবে কি? -এমন প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে।
উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় ‘গ্রাম হবে শহর’ উল্লেখ করে নির্বাচনী ইশতেহারে ২১টি অঙ্গীকার তুলে ধরেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। ‘সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ’ শীর্ষক এই ইশতেহারে অঙ্গীকারগুলো হচ্ছে- প্রতিটি গ্রামে আধুনিক নগর সুবিধা সম্প্রসারণ; তরুণ যুবসমাজকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তরিত করা এবং কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা; দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি; নারীর ক্ষমতায়ন, লিঙ্গ সমতা ও শিশুকল্যাণ; পুষ্টিসম্মত ও নিরাপদ খাদ্যের নিশ্চয়তা; সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, সাম্প্রদায়িকতা ও মাদক নির্মূল; মেগা প্রকল্পগুলোর দ্রুত ও মানসম্মত বাস্তবায়ন; গণতন্ত্র ও আইনের শাসন সুদৃঢ় করা; দারিদ্র্য নির্মূল; সব স্তরে শিক্ষার মান বৃদ্ধি; সবার জন্য মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবার নিশ্চিয়তা; সার্বিক উন্নয়নে ডিজিটাল প্রযুক্তির অধিকতর ব্যবহার; বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নিরাপত্তার নিশ্চয়তা; আধুনিক কৃষি ব্যবস্থা- লক্ষ্য যান্ত্রিকীকরণ; দক্ষ ও জনসেবামুখী প্রশাসন; জনবান্ধব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা গড়ে তোলা এবং ব্লু-ইকোনমিসহ সমুদ্র সম্পদ উন্নয়ন। নিরাপদ সড়কের নিশ্চয়তা, প্রবীণ, প্রতিবন্ধী ও অটিজম কল্যাণ; টেকসই উন্নয়ন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ এবং সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি।
‘ভিশন ২০৩০’ লক্ষ্য নিয়ে ১৯টি প্রতিশ্রুতি উল্লেখ করে ইশতেহার ঘোষণা করেছে বিএনপি। এই ইশতেহারে থাকা প্রতিশ্রুতিগুলো হলো- গণতন্ত্রকে নিত্যদিনের চর্চার বিষয়ে পরিণত করা; সংবিধানে সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য; একাধারে পরপর দুইবারের বেশি প্রধানমন্ত্রী না করার বিধান; মন্ত্রিসভাসহ প্রধানমন্ত্রীকে সংসদের কাছে দায়বদ্ধ থাকা; বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার নিয়োগ; গণভোট ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তন করে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরিয়ে দেয়া; স্বল্প সুদে শিক্ষাঋণ চালু; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্র সংসদ নির্বাচন দেয়া; মাদরাসা শিক্ষাকে আরো আধুনিক ও যুগোপযোগী করা; মসজিদের খতিবদের জন্য সম্মানজনক ভাতা চালু; প্রশ্নফাঁস রোধে আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা; শিক্ষার্থীদের ওপর থেকে সব ভ্যাট বাতিল; ভ্যাটবিরোধী, কোটা সংস্কার আন্দোলনে ক্ষতিগ্রস্ত ছাত্রছাত্রীদের সব মামলা প্রত্যাহার ও ক্ষতিপূরণ দেয়া; গরিব ছাত্রছাত্রীদের জন্য আসন সংরক্ষণ; পিএসসি ও জেএসসি পরীক্ষা ব্যবস্থা বিলোপ করা হবে। প্রথম তিন বছরে মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে দুই লাখ মানুষকে চাকরি দেয়া; তরুণ দম্পতি ও উদ্যোক্তাদের জন্য ২০ বছর মেয়াদি ঋণ চালু করা; আগামী পাঁচ বছরে এক কোটি মানুষের কর্মসংস্থান; শিক্ষিত বেকারদের বেকার-ভাতা এবং যোগ্য অর্থনৈতিক উদ্যোগে আর্থিক সহায়তা দেয়া।
পুলিশ ও সামরিক বাহিনী ছাড়া সরকারি চাকরিতে প্রবেশের কোনো বয়সসীমা থাকবে না বলে উল্লেখ করে ইশতেহার প্রকাশ করেছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। তাদের ইশতেহারে রয়েছে- সরকারের দুর্নীতি তদন্ত করে বিচার করা হবে। পরপর দুই মেয়াদের বেশি প্রধানমন্ত্রী থাকা যাবে না। জেলা পরিষদ জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হবে। তুলে দেয়া হবে পিইসি এবং জেএসসি পরীক্ষা। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কার্যক্রম চলমান থাকবে। ভোটের অধিকার নিশ্চিত করা, নির্বাচন কমিশন, নির্বাচনী আইন ও নির্বাচন ব্যবস্থার সংস্কার; মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ এবং ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট বাতিল করা হবে। ক্ষমতার ভারসাম্য নিশ্চিত হবে। স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা এবং বিকেন্দ্রীকরণ, তরুণদের কর্মসংস্থান, দুর্নীতি দমন গুরুত্ব পাবে। দেশের সব ইউনিয়ন উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো স্বাস্থ্য ক্যাডারের একজন সরকারি কর্মকর্তার উপযোগী করে গড়ে তোলা হবে। খাদ্যে ভেজাল প্রতিরোধ; মাদক পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ; এ ছাড়া বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং গুম পুরোপুরি বন্ধ করা হবে। ঘটে যাওয়া এ ধরনের সব ঘটনার তদন্ত করা হবে। বিভাগীয় সদরে স্থায়ী হাইকোর্ট বেঞ্চ থাকবে। ক্রমাগত কমতে থাকা কৃষি ভর্তুকি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বাড়িয়ে সার, বীজ এবং অন্যান্য কৃষিউপকরণ সহজলভ্য করা হবে। দু’বছরের মধ্যেই গার্মেন্ট শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ১২ হাজার টাকা করা হবে। দ্রুত কঠোর ব্যবস্থার মাধ্যমে ব্যাংকিং খাত ও শেয়ার বাজার সেক্টরের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা হবে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মূল্য করা হবে যৌক্তিক। সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীকে অনেক বেশি শক্তিশালী করা হবে।
সব বয়োবৃদ্ধ অর্ধেক দামে সব যানবাহনে ভ্রমণের সুবিধা পাবেন এবং বিনা ফি তে তারা পার্ক, চিড়িয়াখানা, চিত্রশালা, জাদুঘর পরিদর্শন করতে পারবেন। নারীর নিরাপত্তা এবং ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা হবে। নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিশু-কিশোরদের ৯ দফা দাবির আলোকে সড়ক আইন সংশোধন করা হবে। প্রবাসীদের ভোটাধিকার নিশ্চিত হবে। স্বাধীন প্রেস কাউন্সিলের অধীনে সব গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হবে। কমানো হবে মোবাইলের কলরেট। সন্ত্রাসবাদ এবং জঙ্গিবাদের প্রতি জিরো টলারেন্স নীতি নেয়া হবে। সংখ্যালঘুদের মানবিক মর্যাদা, অধিকার, নিরাপত্তা এবং সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সংখ্যালঘু মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করা হবে। ক্রীড়া সংস্থাগুলোকে রাজনীতির বাইরে পেশাগতভাবে গড়ে তোলা হবে। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণকে গুরুত্বপূর্ণ প্রাধিকারে পরিণত করা হবে। ‘সবার সাথে বন্ধুত্ব ও কারো সাথে বৈরিতা নয়’- নীতিতে পররাষ্ট্রনীতি পরিচালিত হবে।
আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোটের শরিক জাতীয় পার্টি ১৮ দফার ইশতেহার ঘোষণা করেছে। ইশতেহার ঘোষণা করেন পার্টি চেয়ারম্যানের বিশেষ সহকারী ও সাবেক মহাসচিব রুহুল আমিন হাওলাদার। ইশতেহারে যেসব বিষয় প্রাধান্য পেয়েছে তা হলো- প্রাদেশিক ব্যবস্থা প্রবর্তন, দুই স্তর বিশিষ্ট সরকার কাঠামো, ধর্মীয় মূল্যবোধ, কৃষকের কল্যাণ, সন্ত্রাস দমনে কঠোর ব্যবস্থা, গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি স্থিতিশীল রাখা, ফসলি জমি নষ্ট না করা, খাদ্য নিরাপত্তা, শিক্ষা পদ্ধতির সংশোধন, স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ ইত্যাদি।
‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সংবিধান ও রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রবর্তন করা হবে’ উল্লেখ করে বাম গণতান্ত্রিক জোটের নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করা হয়েছে। ইশতেহার ঘোষণা করেন বাম জোটের সমন্বয়ক মোহাম্মদ শাহ আলম। ইশতেহারে আরো রয়েছে- বিকল্প অর্থনৈতিক নীতি, গণতান্ত্রিক বিকেন্দ্রীকরণ, দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ নিয়ন্ত্রণ, স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়ন, নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা, সংখ্যালঘুদের প্রতি বৈষম্যরোধ, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, স্বাধীন পররাষ্ট্র নীতির ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বৃদ্ধি প্রভৃতি।
রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহার অর্থাৎ পরিকল্পনা ঘোষণার পরপরই ভোটাররা দল ও প্রার্থী যাচাই-বাছাই করা শুরু করেছেন। তারা তাদের সুবিধার কথা বিবেচনা করেই বাছাই করবেন। বিশেষ করে আগের নির্বাচনগুলোতে বিজয়ী হয়ে যারা ইশতেহার ‘ভুলে গেছে’- তাদের প্রত্যাখ্যান করবেন নতুন ভোটাররা। নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে ক্ষমতাসীন দল তাদের অঙ্গীকার পূরণ করবে, এমন আশা সবার।
লেখক : সাংবাদিক
emdad.online24@gmail.com
