বাংলাদেশে কোটি কোটি মানুষ এখনো দারিদ্র্যসীমার নিচে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টি বারবার আলোচনায় এসেছে। বিভিন্ন কারণে খাদ্যদ্রব্য চাল, ডাল, তেল, লবণ, মরিচ, চিনি, দুধ, পেঁয়াজ, রসুন, শাকসবজি, মাছ-গোশত থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় ও অপরিহার্য পণ্যের মূল্য অস্বাভাবিক গতিতে বাড়ছে। এর পাশাপাশি গ্যাস, বিদ্যুৎ টেলিফোন ও পানির বিলও বাড়ছে পাল্লা দিয়ে। মূল্যবৃদ্ধির এই জাঁতাকলে পড়ে চরম ভোগান্তির কবলে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। কারণ তাদের আয় অনুপাতে ব্যয় বেড়েছে দ্বিগুণ। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার আগে বলেছিল, চালের নিম্নতম মূল্য হবে ১০ টাকা কেজি। সেই চাল এখন (২০২০) ৪০ থেকে ৪৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। জোট সরকারের (২০০১-০৬) আমলে চালের দাম প্রতি কেজি ২০ থেকে ২২ টাকা এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে (২০০৬-০৭) ৪০ থেকে ৪২ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছিল। বর্তমান সরকার (২০০৮-২০) আমলে চালের মূল্য ছিল প্রতি কেজি ৪৫-৫০ টাকা। জোট সরকারের আমলে প্রতি কেজি চিনির মূল্য ছিল ৪২ টাকা এবং বর্তমান সরকারের আমলে সেই চিনি ৭০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। জোট সরকারের আমলে প্রতি হালি ডিমের দাম ছিল ১৬ টাকা এখন সেই ডিমের হালি ৪০ টাকা। জোট সরকারের আমলে প্রতি কেজি লবণের দাম ছিল ১২ টাকা, বর্তমানে ৩৫ টাকা। আলুর দাম ছিল ১৫ থেকে ১৮ টাকা, বর্তমান সরকারের (২০০৮-২০) আমলে সেই আলু প্রতি কেজি ৪৫ থেকে ৫০ টাকা। এখন শীতের মৌসুম। অথচ শীতকালীন শাকসবজির দাম কমেনি। বিভিন্ন জাতের শাক প্রতি আঁটি ২০ থেকে ৩০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। বিভিন্ন জাতের সবজি বিশেষ করে পটোল, বেগুন, শসা, পেঁপে, করল্লা, ঢেঁড়স, টমেটো প্রতি কেজি ৫০ থেকে ১২০ টাকা। একটি লাউয়ের দাম ৬০ থেকে ৭০ টাকা। আমার মতো সাধারণ মানুষ যারা নিয়মিত হাটবাজারে যান, তারাই উপলব্ধি করতে পারবেন, বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম কতটুকু সহনীয় অবস্থায় আছে।

গত এক দশকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম-প্রায় দুই থেকে তিন গুণ বেড়েছে। সেই অনুযায়ী সাধারণ মানুষের আয় বাড়েনি। বড় কষ্টে তারা দিন অতিবাহিত করছেন। এককথায়, মূল্যবৃদ্ধির এই বেহাল দশায় মধ্যবিত্ত এবং নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষরাই ভোগান্তির কবলে পড়েছেন। জোট সরকারের আমলে (২০০১-০৬) গরুর গোশত প্রতি কেজির দাম ছিল ১৬০ টাকা এবং খাসির গোশত প্রতি কেজির দাম ছিল ২৩০-২৫০ টাকা, বর্তমানে প্রতি কেজি গরুর গোশত ৫৫০ টাকা এবং প্রতি কেজি খাসির গোশতের দাম ৮৫০ টাকা। জোট সরকারের আমলে ব্রয়লার মুরগির দাম ছিল প্রতি কেজি ৯০ টাকা, বর্তমানে সেটা ১২৫ টাকা (তথ্যসূত্র- টিসিবি)।

সম্প্রতি একটি বহুল প্রচারিত দৈনিক পত্রিকার লিড নিউজ ছিল- বাজারে আগুন, পুড়ছে সাধারণ মানুষ। সুজলা-সুফলা শস্য শ্যামলা বাংলাদেশ আজ শ্রীহীন হয়ে পড়েছে। অভাব ও দারিদ্র্যের কশাঘাতে আজকের জনজীবন দুঃখ ও হাহাকারে পূর্ণ। বেঁচে থাকার মূল উপাদানগুলো না পেলে জীবনে ছন্দপতন হয়। মূল্যবৃদ্ধি তার অন্যতম কারণ। দেশে মাসে মাসেই যদি নিত্যপণ্যের দাম বাড়ে তা হলে বহু মানুষেরই জীবন অনিরাপদ হয়। স্বাভাবিক জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়ে। দ্রব্যমূল্যের সীমাহীন ঊর্ধ্বগতি মানুষকে অর্ধাহার ও অনাহারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। জনগণ সবসময় প্রত্যাশা করে একটু ভালোভাবে বাঁচার। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি তাদের প্রতিকূলে। কারণ মধ্যস্বত্বভোগীরাই বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। এদের কারণে গ্রামের কৃষকরাও পণ্যের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত। সরকার ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও এদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, এদের ক্ষমতা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চেয়েও বেশি। মূল্যবৃদ্ধির লাগাম টেনে ধরতে পারলে বাজারে শৃঙ্খলা ফিরে আসবে বলে আমরা মনে করি। এ ক্ষেত্রে ব্যর্থ হলে পুরো দেশই মগের মুল্লুকে পরিণত হবে। এ জন্য বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারকেই কঠোর হতে হবে।

দ্রব্যমূল্যের সাথে জীবনযাত্রার সম্পর্ক অতি নিবিড় ও বাস্তব। একটি পরিবার ও একটি সমাজ কিভাবে তাদের দৈনন্দিন জীবন চালাবে তা নির্ভর করে তাদের আয়, চাহিদা ও দ্রব্যমূল্যের ওপর। পণ্যের মূল্য যখন সহনীয় ও সাধারণের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে থাকে তখন তাদের জীবন কাটে স্বস্তিতে। অন্য দিকে পণ্যের মূল্য যখন মানুষের আর্থিক সঙ্গতির সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে যায় তখন তাদের জীবনে নেমে আসে হতাশা ও অশান্তি। বর্তমান সময়ে দেশে সাধারণ মানুষই সবচেয়ে বেশি বিপদে আছেন। লজ্জায় তারা না পারছেন কাউকে বলতে, না পারছেন হাত পাততে।

শুধু নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য মূল্য নয়, সর্বস্তরে যেমন : বাস, ট্রেন, বিমান ও লঞ্চ ভাড়া, রিকশা ভাড়া, গ্যাস, বিদ্যুৎ পানিসহ সব পরিষেবার দামও কয়েক গুণ বেড়েছে।

অথচ এক বা দুই দশক আগেও এ অবস্থা ছিল না। শায়েস্তা খাঁর আমলে টাকায় আট মণ চাল পাওয়া যেত, যেটি এখন রূপকথা। ব্রিটিশ শাসনামলেও দ্রব্যমূল্য ছিল নিয়ন্ত্রিত অবস্থায়। মন্বন্তর, চরম দুর্ভিক্ষ, দাঙ্গা আর ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর দেশের অবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটলেও দ্রব্যের মূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে ছিল। ১৯৭১ সালে নতুন রাষ্ট্র বাংলাদেশের জন্মের পর অর্থনৈতিক বিপর্যয়, দুর্ভিক্ষ ও মহামারী আমাদের জীবনে অতর্কিত হানা দেয়। ক্রমেই নিত্যপ্রয়োজনীয় বেশির ভাগ দ্রব্যমূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যেতে থাকে। আর এরই ধারাবাহিকতার চরম পর্যায় চলছে এখন। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, ভবিষ্যতে এ অবস্থা আরো নাজুক হবে, যা মানুষের কাম্য নয়। পণ্যমূল্যের বর্তমান ঊর্ধ্বগতির জন্য ক্রেতাসাধারণ বাজার ব্যবস্থাপনার ঘাটতিকে দায়ী করছেন। সরকার ও পাইকারি ব্যবসায়ী উভয়েই এ জন্য দায়ী। পানি, গ্যাস ও বিদ্যুৎ বিলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। আগে ওয়াসা কর্তৃক সরবরাহকৃত প্রতি এক হাজার লিটার পানির মূল্য ছিল ৪ টাকা ৩০ পয়সা। ২০০২ সালের আগস্ট মাসে ৪ টাকা ৫০ পয়সা হয়। ২০০৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ৪ টাকা ৭৫ পয়সা। আর বর্তমানে পানির মূল্য আরো বাড়ানো হয়েছে। বিদ্যুৎ বিল ও গ্যাসের মূল্যও জ্যামিতিক গতিতে বেড়েছে।

মূল্যবৃদ্ধির আরো কিছু কারণ অবশ্যই বিদ্যমান। কালোবাজারি, মুনাফালোভী, মজুতদাররা এ সমস্যাকে আরো প্রকট করে তুলছে। পণ্য কৃষকের ক্ষেত থেকে শহরের বাজার পর্যন্ত আসতে কৃষককে চাঁদা, দালালি, মধ্যস্বত্বভোগী, পরিবহন খরচ প্রভৃতি বাবদ প্রচুর অর্থ গুনতে হয়। ফলে পণ্যের মূল্য বেড়ে যায়। একশ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী পণ্য মজুদ রেখে বাড়তি মুনাফার জন্য দাম বাড়িয়ে দেয় বহুগুণ। অনেক সময় আমদানি পণ্যের মূল্য বাড়িয়ে বিক্রয় করে ব্যবসায়ীরা। এ ছাড়া জনসংখ্যা বৃদ্ধি, মাথাপিছু ফসলি জমির পরিমাণ কমে যাওয়া, জমির অনুর্বরতার কারণে উৎপাদন কম হওয়া, অনুন্নত পরিবহন ব্যবস্থার কারণে পর্যাপ্ত পণ্য বাজারজাত না হওয়া, চোরাচালান প্রভৃতি কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য হচ্ছে আকাশচুম্বী। রমজান মাসে ব্যবসায়ীদের কারসাজিতে প্রতিটি পণ্যের মূল্য হয়ে যায় দ্বিগুণেরও বেশি। আবার রাজনৈতিক কারণে, যেমন হরতাল, অবরোধে পণ্য পরিবহন বাধাগ্রস্ত হলেও দ্রব্যমূল্য বেড়ে যায়। এ ছাড়াও ঈদ, পূজাসহ পয়লা বৈশাখে এবং বিভিন্ন উৎসবের সময় দ্রব্যের মূল্য অস্বাভাবিক বেড়ে যায়। সীমাবদ্ধ আয় বা রোজগার নিয়ে পণ্যের বাজারে সাধারণ মানুষ হয়ে পড়ে কোণঠাসা, দিশেহারা ও উদ্ভ্রান্ত।

কিভাবে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধ করা যায় সে দিকে নজর দেয়া যাক। প্রথমে আমাদের নৈতিক চরিত্র ভালো করতে হবে। নীতিবান মানুষ কখনো অহেতুক দ্রব্যমূল্য বাড়িয়ে দেয় না। আমরা নৈতিকভাবে সৎ হলে দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল থাকবে। অতি মুনাফা যেন আমরা না করি এ ব্যাপারে দৃষ্টি দিলে মূল্যবৃদ্ধিজনিত সমস্যা অর্ধেক কমে যাবে। দেশের কালোবাজারি, চোরাচালানি যারা দৈত্যের মতো জনগণের ওপর চেপে বসে আছে, তাদের কর্মকাণ্ড রোধ করতে হবে সবার আগে। দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে হতে হবে আরো কঠোর ও দায়িত্বশীল। গ্রামীণ পর্যায়ে কৃষকদের ঋণদানসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করতে হবে। যোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন করতে হবে, যাতে তারা সহজে পণ্য বাজারজাত করতে পারে এবং ন্যায্যমূল্যে উৎপাদিত পণ্য বিক্রয় করতে পারে। জনসংখ্যার হার যাতে সহনীয় পর্যায় থাকে সে দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। এসব করা গেলে দ্রব্যমূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার আয়ত্তে থাকবে। বিক্রেতারা যাতে ইচ্ছামতো দ্রব্যমূল্য বাড়াতে না পারে সে জন্য সরকার এরই মধ্যে দোকানে পণ্যের নির্ধারিত মূল্য তালিকা প্রদর্শনের ব্যবস্থা করেছে। বিষয়টি মনিটরিং করার জন্য ‘টিসিবিকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে অসাধু ব্যবসায়ীদের শাস্তির ব্যবস্থা করেছে সরকার। সরকারি ও বেসরকারিভাবে এ ব্যাপারে আরো শক্তিশালী ভূমিকা পালন করলে পণ্যমূল্য স্থিতিশীল থাকবে বলে আমরা বিশ্বাস করি। শুধু সরকার নয় সাধারণ মানুষকেও দ্রব্যমূল্য সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি রোধের জন্য সামাজিকভাবে আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। অসৎ ও মুনাফালোভী ব্যবসায়ীদের আইনের আওতায় নিয়ে আসতে সরকারকে সহযোগিতা করতে হবে। এভাবে সরকার, জনগণ ও ব্যবসায়ী সমাজের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় পণ্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। সাধারণ মানুষ এরকম একটি বাজার ব্যবস্থা প্রত্যাশা করে।

লেখক : গ্রন্থকার ও গবেষক