মানুষের জন্মরহস্য যা পবিত্র কুরআনে বর্ণিত হয়েছে, তা সমভাবে সব দেশের সব মানুষের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। মানুষের জন্ম-মৃত্যু, হাসি-কান্না, সুখ-দুঃখ ইত্যাদির বর্ণ-গোত্র, দেশ-জাতি বা বংশভেদে কোনো পার্থক্য হয় না। কার জন্ম ও মৃত্যু কোথায় এবং কখন, কিভাবে হবে ইত্যাদি স্বয়ং আল্লাহ পাক নির্ধারণ করেছেন। আল্লাহ তায়ালার হুকুম ছাড়া কেউ মারা যেতে পারে না। সে জন্য একটি সময় নির্ধারিত রয়েছে।

একদিন না একদিন মৃত্যু আসবেই। পার্থক্য শুধু সময়ের। ক্ষমতার দাপট কিংবা শক্তি-সামর্থ্য সম্পর্ক- কোনো কিছুই কাউকে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করতে পারবে না। এতটুকু বদলাতে পারবে না মৃত্যুকালীন অবস্থা। সম্পূর্ণ একাকী সেই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে যেকোনো মুহূর্তে। তাই মানুষের জীবনে মৃত্যু একটি পরম সত্য- চিরসত্য। স্রষ্টার ডাক এলেই তাকে চলে যেতে হয়।

একজন বদ্ধ উন্মাদকে উদাম অবস্থায় রাস্তার পাশ দিয়ে হাঁটতে দেখা যায়। রাস্তার মাঝপথে হাঁটলে সে গাড়িচাপা পড়ত। যদি তার মৃত্যু গাড়িচাপায় হতো, তাহলে হয়তো রাস্তার মাঝপথে হাঁটত। তাই তাকে রাস্তার মাঝপথে হাঁটতে দেখা যায় না। অথচ সে বদ্ধ উন্মাদ। যখন যেভাবে যে সময় মৃত্যুর জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে ঠিক সেই মুহূর্তেই মানুষের মৃত্যু ঘটবে। এর ব্যত্যয় কখনো হবে না। মৃত্যু অনিবার্য।

এক হাদিস রয়েছে, যখন আল্লাহ পাক আজরাইল আ:-এর ওপর গোটা বিশ্বের প্রাণিজগতের মৃত্যু সংঘটনের দায়িত্ব অর্পণ করেন, তখন আজরাইল আ: নিবেদন করেন; হে প্রভু, আপনি আমার ওপর এমন দায়িত্ব অর্পণ করলেন যার ফলে বিশ্ব জগৎ ও মানবজাতি আমাকে ভর্ৎসনা এবং আমার প্রসঙ্গ উঠলে অত্যন্ত বিরূপ মন্তব্য করবে। প্রত্যুত্তরে আল্লাহতায়ালা বললেন, এর সুরাহা এভাবে করেছি যে, জগতে রোগব্যাধি ও অন্যান্য রূপে মৃত্যুর কিছু বাহ্যিক কারণ রেখে দিলাম, যার ফলে প্রত্যেক মানুষ সেসব উপলক্ষ ও রোগব্যাধিকে মৃত্যুর কারণরূপে আখ্যায়িত করবে এবং তুমি তাদের অপবাদ থেকে রক্ষা পাবে। [কুরতবি] (মাওলানা মুহিউদ্দীন খান অনূদিত ও সম্পাদিত হজরত মাওলানা মুফতি মুহাম্মদ শাফী রহ:-এর তাফসির গ্রন্থ মা আরেফুল কোরআন পৃ. ১০৬৫)

করোনাকালে মৃত্যুর মিছিল বড় হচ্ছে। সকাল-সন্ধ্যায় কারো না কারো মৃত্যুর খবর আসছেই মহামারীতে আক্রান্ত হয়ে। এ পর্যন্ত ২১৫টি দেশ ও অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বের আতঙ্ক, এই প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস। এখন পর্যন্ত বিশ্বের ১ কোটি ৮৫ লাখ ১০ হাজার ১১৭ জন করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। এর মধ্যে মারা গেছেন ৬ লাখ ৯৮ হাজার ৯০১ জন। তবে করোনা থেকে সুস্থ হয়ে উঠেছে ১ কোটি ৬৮ হাজার ৮৮৩ জন [৫-৮-২০]।

করোনাকালে ক্ষমতা দখল, গুম, খুন, ধর্ষণ, চাঁদাবাজি, অন্যের সম্পদ দখল, ত্রাণে দুর্নীতি, মাদক, অবৈধ অস্ত্র, জঘন্য দেহব্যবসা, করোনার ভুয়া রিপোর্ট, জাল চেক দিয়ে টাকা আত্মসাৎ, চোরাচালান, নারীপাচার এসব তো বন্ধ হয়নি। এ রকম সাহেদ, সাবরিনা, আরিফ, পাপুল, পাপিয়া একদিনে তৈরি হয়নি।

আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘স্থলে ও জলে মানুষের কৃতকর্মের দরুন বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে। আল্লাহ তাদেরকে তাদের কর্মের শাস্তি আস্বাদন করাতে চান, যাতে তারা ফিরে আসে’ (সূরা আররুম, ৪১)। এই আয়াতের ব্যাখ্যাতে বলা হয়েছে : ‘কুরআন পাক সব বিপদাপদকে গুনাহর ফল সাব্যস্ত করেনি; যেসব বিপদ সমগ্র বিশ্ব অথবা সমগ্র শহর কিংবা জনপদকেই ঘিরে ফেলে এবং তার প্রভাব থেকে সাধারণ মানুষ ও জন্তুর মুক্ত থাকা সম্ভব হয় না; সেসব বিপদাপদকে সাধারণ গুনাহ এবং বিশেষত প্রকাশ্য গুনাহর ফল সাব্যস্ত করেছে। ব্যক্তিগত কষ্ট ও বিপদের ক্ষেত্রে এই নিয়ম প্রযোজ্য নয়। বরং এ ধরনের বিপদ কখনো কখনো পরীক্ষার জন্যও প্রেরণ করা হয়ে থাকে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে তার পরকালীন মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। ফলে এই মুসিবত তার জন্য রহমত হয়ে দেখা দেয়। তাই ব্যক্তিগত পর্যায়ে কাউকে বিপদে পতিত দেখে এ কথা বলা যায় না যে, সে অত্যন্ত গুনাহগার। এমনিভাবে কাউকে সুখী ও স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ দেখে এরূপ বলা যায় না যে, সে খুব সৎকর্মপরায়ণ বা বুজুর্গ। হ্যাঁ, ব্যাপকাকারের বিপদাপদ যেমন দুর্ভিক্ষ, বন্যা, মহামারী ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বরকত নষ্ট হয়ে যাওয়া ইত্যাদির প্রধান কারণ মানুষের প্রকাশ্য গুনাহ ও পাপাচার [ঐ তাফসির পৃ. ১০৪৭]।

আল কুরআনের সূরা নূরের ৩১ নম্বর আয়াতের শেষাংশে আল্লাহ পাক বলেন, ‘হে ঈমানদার ব্যক্তিরা (ত্রুটি-বিচ্যুতির জন্য) তোমরা সবাই আল্লাহর দরবারে তওবা করো; আশা করা যায়, তোমরা নাজাত পেয়ে যাবে।’ তিনি আরো বলেন, ‘তোমরা প্রকাশ্য ও প্রচ্ছন্ন গুনাহ পরিত্যাগ করো। নিশ্চয়ই যারা গুনাহ করেছে, তারা অতিসত্বর তাদের কৃতকর্মের শাস্তি পাবে [সূরা আল আনআম, আয়াত ১২০]।

করোনাকালে আমাদের সরকারের স্বাস্থ্য অধিদফতরের নির্দেশনা অনুযায়ী স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। জনস্বাস্থ্যের বিষয়গুলো যেমন মাস্কের সঠিক ব্যবহার, হাঁচি-কাশির শিষ্টাচার, শারীরিক দূরত্ব, হাত ধোয়া, জীবাণুমুক্তকরণÑ এই বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিতে হবে।

মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব নয়। মৃত্যু প্রত্যেকের জীবনে একটি অবধারিত ও অলঙ্ঘনীয় ঘটনা। এই সময়ের অন্যতম প্রধান আমল হতে হবে তওবা করা। তওবা করার অর্থ শুধু মুখে ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ উচ্চারণ নয় বরং গুনাহ থেকে সম্পূর্ণভাবে নিজেকে পরিশুদ্ধ করা। আল্লাহ পাক তওবা-ইস্তেগফার ও বেশি বেশি নেক আমল করার তওফিক দান করুন সবাইকে। তিনি আমাদের এ বৈশ্বিক মহামারী করোনা থেকে হেফাজত করুন।