স্রস্টার হুকুম ছাড়া গাছের পাতাও নড়ে না। মহাবিশ্বে ভালো-মন্দ যা কিছু ঘটছে তা তাঁরই হুকুমে। অন্যদিকে তাঁর হুকুম ছাড়া কোনো কিছুই ঘটেতে পারে না। সব উন্নতি ও অগ্রগতি তাঁরই হাতে নিবদ্ধ। আর এ বিশ্বাস না থাকলে কেউ মুসলিম থাকতে পারেন না। ফেরাউন, নমরুদ ও বখতে নাছারসহ সব স্বৈরশাসক বহু লম্ফঝম্ফ করেছে। কিন্তু কোনো কুল-কিনারা পায়নি। অবশেষে ধ্বংস হয়ে গেছে। অধুনা ক্ষমতাধর হিটলার, সাদ্দাম, গাদ্দাফি, হোসনি মুবারক ও কামাল আতাতুর্ক সব একই পথের পথিক।

বিজ্ঞানের সমৃদ্ধি ও প্রযুক্তির উৎকর্ষতা বহু দূর এগিয়ে গেছে। তাই মানুষ কল্পনাও করতে পারে নি, আলোকসজ্জিত এই পৃথিবী হঠাৎ করে এভাবে থমকে যাবে। অবিশ্বাসীরা এভাবে ভাবতে পারে যে, পৃথিবী নামক এ গ্রহ বিজ্ঞান প্রযুক্তি ও মেধাবীদের একক অবদান। এর পেছনে অন্য কোনো শক্তি কাজ করছে না। কোনো মুসলিম এমন ধারণা করতে পারে না। ক্ষুধা ও দারিদ্র্য দূর করে সব মানুষের শান্তি ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ২০১৫ সালে যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল, ২০২০ সালে কোভিড-১৯ সংক্রমণ তা আজ অনিশ্চিত করে দিয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে এসডিজির ১৭টি লক্ষ্যমাত্রার প্রধান যে বিষয়গুলো তথা দারিদ্র্য, ক্ষুধা ও এইডস প্রশমনে বেশি প্রভাব পড়েছে।

বিশ্বব্যবস্থার নেতৃত্ব থেকে মুসলিম দেশগুলো পিছিয়ে পড়ায় ইউরোপীয় দেলগুলোর উত্থান হয়েছে। তারা বিশ্বকে নিজেদের ইচ্ছামতো চালানোর অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়েছে। তাদের ক্ষমতার দাপটের সামনে মহান স্রষ্টা মনে হয় ঞযরৎফ ঢ়বৎংড়হ ংরহমঁষধৎ হঁসনবৎ মাত্র। তার সাথে যুক্ত হয়েছে বড় বড় বিজ্ঞানীরা, এদের আল্লাহ গবেষণা ও উদ্ভাবনের ক্ষমতা দিয়েছেন। ক্ষমতা পেয়ে তারা দিশেহারা হয়েছেন, ধরাকে সরাজ্ঞান করছে। কখনো কখনো তাদের কেউ কেউ বলে ফেলে ঞযবৎব রং হড় এড়ফ। তাদের তৎপরতা ও দৃষ্টিভঙ্গি পর্যবেক্ষণ করলে মনে হয়, মহাবিশে^র স্রষ্টা গোটা বিশ্ব সৃষ্টি করেই চুপ করে বসে আছেন! সুতরাং এই বিশ্বব্যবস্থা চালাতে তাঁর এখন নি®প্রয়োজন। আমরা তাঁকে মাঝে মাঝে তাঁর কিছু প্রশংসা বা উপাসনা করব আর তাঁর কিতাব জাদুঘরে রেখে পুরনো বইয়ের মতো মাঝে মধ্যে একটু নেড়েচেড়ে দেখব এবং তা থেকে কোনো শিক্ষা নেবো না।

আল্লাহ তায়ালা সূরা আস-সাজদার ৪-৫ আয়াতে বলেছেন, ‘যিনি আকাশ, জমিন ও এর মাঝে অবস্থিত সবকিছু ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তিনি আরশে সমাসীন হলেন। তিনি ছাড়া তোমাদের কোনো অভিভাবক কিংবা সুপারিশকারী নেই। তোমরা কি বোঝার চেষ্টা করবে না? মহাকাশ থেকে পৃথিবী পর্যন্ত সবকিছু তিনিই পরিচালনা করছেন, তারপর তিনি সবকিছুকে তার কাছে ফিরিয়ে নিয়ে যাবেন।’ এ বিষয়ে সূরা ফাতির-৪১ আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহ তায়ালাই আকাশ ও পৃথিবীর ব্যবস্থাপনাকে নিজ হাতে পরিচালনা করছেন, যাতে তারা স্বীয় কক্ষপথ থেকে সরে না যায়, যদি এরা কক্ষপথ থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়ে তাহলে তিনি ছাড়া এমন কে আছে যে এদের উভয়কে স্থির রাখতে পারবে, অবশ্যই তিনি মহাসহনশীল ও ক্ষমাপরায়ণ।’
বিজ্ঞানী ও রাজনীতিবিদদের ধারণা, আমরা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সাহায্যে এমনিই এই বিপুল উন্নতি করতে সক্ষম হয়েছি। এর রক্ষায় কোনো করুণাময়ের দরকার হবে না। বিশ্বকে আমরা আমাদের মতো করে সাজাব। মুসলিদের মধ্যে বিশ্বাসের দুর্বলতা দেখা যাচ্ছে। দুনিয়ার ভোগ-বিলাস আরাম-আয়েশে তাদের অনেকে ডুবে যাচ্ছে। উদাসীন মানবজাতিকে সচেতন করার জন্যই যুগে যুগে বিভিন্ন নবী-রাসূল পাঠিয়ে তাদের হেদায়েত করা এবং মাঝে মাঝে বড় বড় রোগ-ব্যাধি দিয়ে ভয় দেখানো হয়েছে।

পৃথিবী নামক যে গ্রহে আমরা বাস করছি তা মহাবিশ্বের মাঝে বিমানের মতো উড়ন্ত গতিময়, যা নিয়ন্ত্রণ করছেন স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল আলামিন। মনে রাখতে হবে, আমাদের এমন কোনো নিয়ামতের অভাব নেই, যা আল্লাহ দেননি। আমাদের লাজলজ্জা নেই, অপরাধ করেও মুখ না ঢেকে সমাজে বুক উঁচু করে চলাফেরা করি। এই অবস্থায় আল্লাহই কি করোনার মতো মহামারীর মাধ্যমে আমাদের মুখে মাস্ক পরতে বাধ্য করেছেন। মুখ ঢেকে দিয়েছেন।

মানুষের চোখের সামনে মারা যাচ্ছে তার দাদা-দাদী, নানা-নানী বাবা-মা, সন্তান ও নাতি-পুতি, কিন্তু তা দেখেও কোনো ভয় হচ্ছে না। মনে হে চ্ছ পৃথিবী যেন ৯৯ বছরের জন্য নয়, বরং চিরদিনের জন্য লিজ নেয়া। এখান থেকে কখনো যেতে হবে না। কিছু লোক পৃথিবীকে ধর্মহীন করার যে কর্ম পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে তা যদি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়, তাহলে বিশ্বে মানবিকতা ও নৈতিকতা বলতে কিছু অবশিষ্ট থাকবে না। মানুষ যখন ধর্মহীন হচ্ছে, আল্লাহ তখন মানুষকে কর্মহীন করছেন। গোটা পৃথিবীতে নৈতিক নিয়ন্ত্রণহীন কার্যক্রম দেখে সাধারণ মানুষ স্রষ্টা সম্পর্কে বেমালুম গাফেল হয়ে গেছে, এ অবস্থায় আল্লাহ চুপ থাকতে পারেন না। একটা ব্যবস্থা তাই নিতে হয়। করোনা কি সেকারণেই একটি ছোবল দিতে এসেছে?

সূরা ইবরাহিমের ৪২ আয়াতে বলা হয়েছে, ‘অত্যাচারী সম্প্রদায় যা করছে সে সম্পর্কে তুমি আল্লাহকে কখনো বেখবর মনে করো না। তিনি তাদের সে দিন আসা পর্যন্ত অবকাশ দিয়ে রেখেছেন যেদিন তাদের চক্ষু স্থির হয়ে যাবে। আল্লাহ তায়ালা মানুষকে তাদের আচরণের জন্য পাকড়াও করলে পৃথিবীর কোনো একটি জীব-জন্তুকেও তিনি রেহাই দিতেন না। কিন্তু তিনি তাদের একটি সুনির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত অবকাশ দিয়ে থাকেন, অতঃপর যখন সময় উত্তীর্ণ হয়ে যাবে (তখন তিনি তাদের পাকড়াও করবেন)। আল্লাহ তায়ালা অবশ্যই তাঁর বান্দাদের যাবতীয় কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ করছেন।’

চলমান বিশ্ব ব্যবস্থাপনার দিকে তাকালে যে কেউ বুঝতে পারবে যে, মহাবিশ্বের এত সুন্দর, বৈচিত্র্যময় ও আরামদায়ক ব্যবস্থাপনা, যিনি মানুষের জন্য করেছেন তিনি আসলে মানুষের কোনো অকল্যাণ করতে পারেন না। মানুষ তাদের নিজেদের কর্ম দ্বারা মহামারী নিয়ে আসে। মানুষকে লক্ষ্য করে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তোমরা কি দেখতে পাও না আল্লাহ তায়ালা কিভাবে এ পৃথিবীতে যা কিছু আছে তা এবং সমুদ্রে চলমান নৌযানগুলো নিজের আদেশক্রমে তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন। তিনিই মহাকাশকে ধরে রেখেছেন যাতে করে তা পৃথিবীর ওপর পড়ে না যায়, কিন্তু তাঁর আদেশ হলে (ভিন্ন কথা)। অবশ্যই আল্লাহ তায়ালা মানবজাতির প্রতি স্নেহশীল ও দয়াবান।’ (সূরা আল-হজ-৬৫) আল্লাহ তায়ালা সূরা আস-সাজদার ২১ নম্বর আয়াতে বলেন, ‘ছোট ছোট মুসিবত পাঠান যাতে মানুষ আল্লাহর কল্যাণকর বিধানের প্রতি মনোনিবেশ করে। বড় আজাবের আগে অবশ্যই তাদের ছোট ছোট আজাব আস্বাদন করাব যাতে করে তারা আমার দিকে ফিরে আসে।’

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য মতে, ২০১৯ সালের ৩১ ডিসেম্বরে শুরু হওয়া করোনাভাইরাস সংক্রমণে ২০২১ সালের ৩১ জুলাই পর্যন্ত সারা বিশ্বে প্রায় ৪২ লাখ ৩২ হাজার ২৯০ জন মানুষ মারা গেছে। প্রায় ৭৮০ কোটি বিশ্ববাসীর তুলনায় এ মৃত্যু সংখ্যা তেমন বেশি নয়। যেখানে ব্ল্যাক ডেথ নামক ভয়ঙ্কর প্লেগ রোগে ১৩৩১-১৩৫৩ সাল পর্যন্ত ২২ বছরে পৃথিবীর ৫০ কোটি মানুষের মধ্যে প্রায় ২০ কোটি অর্থাৎ ৪০ শতাংশ মানুষের প্রাণ গিয়েছিল। ১৯১৮ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় স্প্যানিশ ফ্লুর সংক্রমণে ১৮ মাসে এরচেয়ে অনেক বিশি সংখ্যায় মানুষের প্রাণ গিয়েছিল। প্রতি ৩০-৪০ বছর পর পর পৃথিবীর বিভিন্ন অংশে বিভিন্ন নামের ভাইরাস ফ্লুয়ের নিয়মিত সংক্রমণ ঘটছেই। বহু মানুষের মৃত্যুর অভিজ্ঞতার পর হয়তো ভ্যাকসিন আবিষ্কৃৃত হয়। একটি ফ্লু শেষ হতে না হতে আরেকটি ফ্লু দেখা দেয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান ২০২০ সালের ডিসেম্বরে বিশ্ববাসীকে সতর্ক করে বলেছেন, ‘আত্মতৃপ্তির কোনো সুযোগ নেই। হয়তো বর্তমান কোভিড-১৯ সর্বশেষ ও বৃহত্তম বৈশ্বিক মহামারী নয়। হতে পারে তা এটা আরো বড় কোনো দুর্যোগের শুরু। মানুষ যেভাবে প্রাকৃতিক জীববৈচিত্র্য নষ্ট করছে তাতে পৃথিবীর জমাকৃত তুষার স্তর যদি উন্মুক্ত হয়, তবে সেখানে চাপাপড়ে থাকা আট লাখ ৫০ হাজার ধরনের ভাইরাসের অনেকগুলোই বেরিয়ে আসতে পারে। এ ধরনের মহামারী ও পৃথিবীতে বিভিন্ন বিপর্যয় মানুষের কর্মের ফল বলে কুরআন ঘোষণা করেছে। সূরা আর-রুমের ৪১ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘জলে ও স্থলের বিপর্যয়, মানুষের দুই হাতের কামাই, যা তাদের আমলের পরিণতি। হয়তো তারা ফিরে আসবে।

আসলে মহাবিজ্ঞানী আল্লাহ তায়ালা তাঁর বিশ্বকে সাজিয়েছেন সঠিক স্থাপনায়। কেউ কেউ সেখানে তার বিধানকে উপেক্ষা করে নিজেদের পাণ্ডিত্য জাহির করতে গিয়ে বিশ্বের শান্তি-শৃঙ্খলা ভেঙে দিয়েছে। পৃথিবীতে সুখ-শান্তি ও নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনতে হলে মুসলিম জাতি ও তার নেতাদেরকে ফিরে আসতে হবে স্রষ্টার সব বিধানের কাছে পরিপূর্ণভাবে। ফিরিয়ে আনার সে কার্যক্রমে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে কুরআনের আলোকে মুসলিম নেতাদেরকে। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে সেই যোগ্য নেতাদের সন্ধান দিন। ভাইরাসের কোনো ক্ষমতা নেই কাউকে সংক্রমণ করার যদি আল্লাহর হুকুম না হয়। ভরসা কেবলই আল্লাহর ওপর। মুমিন তো প্রতি রাতে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে। তার ভাবনা এই যে, এখনই আমার জীবনের শেষ সময়। আমার ওপর অর্পিত দায়িত্ব কতটুকু পালন করেছি, যা নিয়ে আমি আমার প্রভুর সাথে দেখা করব। মুমিনের দায়িত্ব-উপলব্ধি জাগ্রত হোক সব হৃদয়ে।