নারায়ণগঞ্জে একটি ফ্রুট জুস কারখানায় এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ৫২ জনের মৃত্যু হয়েছে, যাদের বেশির ভাগই শিশু । এই শিশুদের অনেকেই স্কুলে লেখাপড়া করত। করোনাকালে স্কুল বন্ধ থাকায় এখানে কাজ করতে এসেছিল। এরা আর কখনো স্কুলে ফিরবে না। তারা এখন লাশ হয়ে মায়ের কোলে ফিরে গিয়েছে। বাংলাদেশসহ পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই শিশুশ্রম নিষিদ্ধ। শিশুশ্রম আইন মানা হচ্ছে কি না তা দেখার জন্য সরকারের অধিদফতর আছে, পরিদর্শক আছেন। যে ভবনে ওই ভয়াবহ ট্র্যাজেডির ঘটনা ঘটেছে তা গোডাউন হিসেবে চিহ্নিত। জানা গেছে, ঘটনার সময় ওই ভবন থেকে বের হওয়ার সব দরজা বন্ধ ছিল । মানে এটি একটি ‘হত্যাকাণ্ড’।
এই দুর্ঘটনা ২০১২ সালের আশুলিয়ার তাজরীন ফ্যাশনস এর ঘটনাকে মনে করিয়ে দেয়, যেখানে আগুনে পুড়ে ১১১ জনের মৃত্যু হয়েছিল। নিয়ম অনুযায়ী, প্রত্যেক কারখানায় অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা থাকাটা বাধ্যতামূলক । যারা এ ধরনের কারখানায় কাজ করে, তাদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ দিতে হবে। এসব দেখার দায়িত্ব যাদের, তারা তাদের কাজ সঠিকভাবে করলে এ রকম ট্র্যাজেডি হয়তো ঘটত না। আসলে সরকারের অনেক কর্মচারী দায়িত্ব পালন করে না। তাদের কেউ ছোট আমলা, কেউবা বড় আমলা। দেশ যেন অসৎ আমলাদের হাতে চলে গেছে। আধুনিক রাষ্ট্রে গণতন্ত্রই সামাজিক অগ্রগতির একমাত্র চাবিকাঠি। তাই আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্য গণতন্ত্রকেই বেছে নিতে হবে, এর কোনো বিকল্প নেই। সংসদই গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে পারে এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বই তা পারে। সরকারের আমলানির্ভরতা নিয়ে হঠাৎ জাতীয় সংসদে শোরগোল উঠছে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও তাদের পার্টনার জাতীয় পার্টির সিনিয়র সদস্যরা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, রাজনীতি নেই। দেশ চালাচ্ছেন আমলারা। আমলারা দেশে দুর্নীতি করে কানাডায় বেগম পাড়ায় বাড়ি করেছেন। রাজনীতিবিদরা এখন তৃতীয় সারিতে।’ আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতা ও সাবেক মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, জাতীয় পার্টির অন্যতম শীর্ষ নেতা ফিরোজ রশীদ বেশ ঝাঁজালো কণ্ঠেই সরকারের আমলা তোষণের সমালোচনা করেছেন। এ সময়ে সংসদ নেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংসদে উপস্থিত ছিলেন।
করোনা মহামারী মোকাবেলায় গত এপ্রিলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে অফিস আদেশ জারি করে ৬৪ জেলায় ৬৪ জন সচিবকে দায়িত্ব দেয়া হয় সিনিয়র সচিব, সচিব ও সচিব মর্যাদার কর্মকর্তাদের। আওয়ামী লীগ ও জাপা নেতাদের ক্ষোভের জায়গাটা এখানেই। তোফায়েল আহমেদ সরকারের আমলানির্ভরতা নিয়ে সমালোচনার সূত্রপাত করার পর তার সঙ্গে সুর মেলান কাজী ফিরোজ রশিদ । তোফায়েল বলেন ওয়ারেন্ট অব প্রেসিডেন্স অনুযায়ী সংসদ সদস্যারা সচিবের উপর- এটা খেয়াল রাখতে হবে। তিনি বলেন, যারা রাজনীতিবিদ, যারা নির্বাচিত প্রতিনিধি তাদের জন্য নির্ধারিত যে স্থান আছে, সেখানে তাদের থাকা উচিত। এক সময় জেলার দায়িত্ব মন্ত্রীরা পালন করতেন, সেটা স্মরণ করিয়ে দেন তিনি। ফিরোজ রশিদ উষ্মা প্রকাশ করে বলেন, প্রধানমন্ত্রী ডিসিদের সঙ্গে কথা বলেন, আর এমপি সাহেবরা পাশে বসে থাকেন, দূরে।
তারপর বলেন, ডিসি সাহেব আমি একটু কথা বলব প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে। এই হচ্ছে রাজনীতিবিদদের অবস্থা। দেশে কোনো রাজনীতি নেই।’ আওয়ামী লীগের বৃহস্পতি এখন তুঙ্গে। এখন রাজনীতিবিদদের চেয়ে আমলাদের বেশি প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে। জগৎশেঠরা দেশ চালাচ্ছে বলে মন্তব্য করেন ফিরোজ রশিদ। আমি মনে করি ভোটারবিহীন নির্বাচন এবং এ ধরনের সাজানো নির্বাচনের এমপি ও মন্ত্রীদের দুর্বলতা ‘তেলবাজ’ আমলারা ভালোই বোঝেন। এজন্য তারা এখন রাজনীতিবিদদের পাত্তা দেন না। এ পরিস্থিতির জন্য সরকারের আমলা তোষণ নীতিই দায়ী।
রাজনীতি করবেন রাজনীতিকরা; আমলারা নয়। কিন্তু এখন রাজনীতি করেন আমলারা। তারা চাকরিবিধি লঙ্ঘন করে রাজনৈতিক বক্তব্য দেন ও তৎপরতা চালান। এর জন্য কোনো জবাবদিহিতা করতে হয় না।
তিনি লিখেছেন, একটা ব্যাপারে আমলাতন্ত্র খুব নিপুণ। রুল দিয়ে দেশকে রুল করা। প্রায় পঞ্চাশ বছর আগের গোলামি যুগের কতগুলো জরাজীর্ণ নিয়মাবলির বস্তা এখনো কাঁধে নিয়ে বেড়াচ্ছে । এই রুলই নাকি আসল বস্তু আর বাকি সব জড়পদার্থ। কোনো কাজ করতে গেলে করার চেয়ে না করার যত নিয়ম, উপনিয়ম, ধারা, উপধারা, প্রকরণ সব মুখস্থ। উদ্ধৃত করে দেবে আমলাতন্ত্র । এক পা এগোবার উপায় নেই।
আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ, বাহান্নর ভাষা আন্দোলন, ’৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান, ’৯০-এর স্বৈরাচারী এরশাদের পতনসহ সব কয়টি রাজনীতিবিদদের অর্জন। মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি বিনির্মাণ, জনগণকে সংগঠিত ও মুক্তিপাগল করেছেন রাজনীতিকরা। জেল-জুলুম, অত্যাচার, অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্ট বেদনা বুকে, মাথায় মামলা, হুলিয়া নিয়ে জনতার স্বার্থে দুর্দমনীয় তারা। অধিকার বঞ্চিতদের দাবি আদায় করতে রাজপথে থাকেন, জেলের ঘানি টানেন। এ পবিত্র দায়িত্ব পালনে তারা কখনো রক্তচক্ষু পরোয়া করেন না। রাজনীতিকরা জনগণের সঙ্গে মালকোঁচা দিয়ে নামেন।
ক্ষেতের আইলের উপর বসে কিষানের সঙ্গে নুন মরিচের ভাত খেয়ে ধন্য হন। জনস্বার্থে তারাই হাতে হাতকড়া, কোমরে রশি, ফাঁসির মঞ্চে তেজোদীপ্ত পায়ে এগোতে থাকেন মহান ব্রত নিয়ে।
আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আমলারা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী বা সার্ভেন্ট অব দ্য পিপল। কিন্তু নীতিহীনভাবে ও গণসমর্থন হারিয়ে ক্ষমতায় থাকার জন্য রাজনীতিবিদরা যখন আমলাদের ব্যবহার করেন তখন তারা মাথায় ওঠেন । দেশের পরিস্থিতি এখন তাই। এ পরিস্থিতি কাম্য হতে পারে না।
লেখক : নব্বইয়ের সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের কেন্দ্রীয় সাবেক ছাত্রনেতা এবং
সভাপতি ‘সাংবিধানিক অধিকার ফোরাম’ কেন্দ্রীয় কমিটি
