ধূমপান মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর, তা জানা সত্তে¡ও কিছু মানুষ ধূমপান করে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায়- ধূমপান হলো বিষপান। এ প্রসঙ্গক্রমে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বহু আগে গান লিখেছেন ‘আমি জেনেশুনে বিষ করেছি পান।’ চুরুট, বিড়ি ও সিগারেটের মাধ্যমে মানুষ ধূমপান করে। যারা ধূমপান করেন তাদের ধারণা ধূমপানে শরীরের ক্লান্তি ও অবসাদ দূর হয়, স্মার্টনেস এবং সামাজিক মর্যাদা ও ব্যক্তিত্বকে বাড়িয়ে দেয়। তবে এগুলোর কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। আসক্তি থেকেই কিছু মানুষ ধূমপান করে। চলার পথে হাট-বাজারে, রাস্তাঘাটে, গণপরিবহনে কিংবা ফুটপাথে সিগারেট-বিড়ি খাওয়ার দৃশ্য প্রায়ই দেখা যায়। যারা ধূমপান করে সবাই অশিক্ষিত তা কিন্তু নয়! সমাজের শিক্ষিত লোকজনও জেনেশুনে ধূমপান করে। যদিও ধূমপান শুধু ব্যক্তির নিজের ক্ষতি করে না, আশপাশের সবারই ক্ষতি করে। এক গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ধূমপানজনিত কারণে ফুসফুসের ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে লাখো মানুষ মারা যাচ্ছে। যে জীবন ধূমপানমুক্ত, সে জীবন মাদকমুক্ত। জরিমানার বিধান থাকা সত্ত্বেও ধূমপান আইন কার্যকর নয়। এ ব্যাপারে প্রশাসনিক তৎপরতা দেখা যায় না। ধূমপান করে কেউ অন্যকে কষ্ট দিতে পারে না। এ অধিকার তার নেই।

বিশ্বের অনেক দেশে প্রকাশ্যে ধূমপান নিষিদ্ধ। পাকিস্তান, ফিলিপাইন ও শ্রীলঙ্কায় প্রকাশ্যে ধূমপান করলে জরিমানা গুনতে হয়। কিন্তু আমাদের দেশে জরিমানার বিধান থাকা সত্ত্বেও রাস্তায় ফুটপাথে কিংবা গণপরিবহনে ধূমপায়ীদের ধোঁয়ায় দম বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। বাসের একজন ড্রাইভার আসনে বসে দিব্যি সিগারেট খাচ্ছে। অথচ তারই আসনের পেছনে বসা শিশু কিংবা অন্তঃসত্ত্বা একজন নারী। ময়লার গন্ধ সওয়া গেলেও সিগারেটের ধোঁয়া সহ্য করা যায় না। প্রকাশ্যে ধূমপানে ধূমপায়ীর যে ক্ষতি হয় যিনি ধূমপান করেন না তারও একই ক্ষতি হয়। এমনো দেখা যায়, সন্তানকে কোলে নিয়ে বাবা সিগারেট টানছে। কপালে, ঠোঁটে চুমু খাচ্ছে। কিন্তু একবারো ভাবছে না, সন্তানকে ভালোবাসার পরিবর্তে বিষ দিচ্ছে। যততত্র সিগারেট খাওয়া কারো জন্য কল্যাণকর নয়। অথচ গণপরিবহন, পার্ক, সরকারি-বেসরকারি অফিস, গ্রন্থাগার, রেস্তোরাঁ, শপিংমল, পাবলিক টয়লেটসহ বিভিন্ন জনসমাগস্থলে সিগারেটের ধোঁয়ায় অধূমপায়ী ব্যক্তিরা বিড়ম্বনার শিকার হচ্ছেন।

সরকার ২০০৫ সালে প্রকাশ্যে ধূমপান বন্ধে একটি আইন প্রণয়ন করে এবং ৫০ টাকার জরিমানার বিধান করা হয়। ২০১৩ সালে ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ আইন সংশোধন করা হয়। জরিমানার বিধান ৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০০ টাকা করা হয়। কিন্তু ধূমপান বন্ধ হয় না। প্রকাশ্যে ধূমপান অপরাধ- এটা কারো অজানা নয়। কয়েকদিন আগে কিছু মানুষকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, অপরাধ জেনেও কেন ধূমপান করছেন? তারা আমাকে সাফ জানিয়ে দিলেন- জরিমানাটা নেবে কে? পুলিশও তো পাবলিক প্লেসে প্রকাশ্যে ধূমপান করে।

আমাদের দেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে এখনো সবার দুবেলা আহার যেখানে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়ে উঠেনি, সেখানে ধূমপান করে অপচয় করার কোনো মানে হয় না। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে যেখানে অনেকে মাসিক বাজারের তালিকা কাটছাঁট করে দিনপাত করছে, সেখানে ধূমপান করে অপচয় করা মানে পারিবারিক জীবনকে আরো বেশি সঙ্কটের মুখে ঠেলে দেয়ার শামিল। জাতিসঙ্ঘের মাদকবিষয়ক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে- ধূমপানের কারণে সারা বিশ্বে প্রতি বছর ৫০ লাখ মানুষ মারা যায়। দেশে প্রতি ৪০ সেকেন্ডে একজন করে দৈনিক দুই হাজার ২০০ জন এবং বছরে কমপক্ষে ৯.৩ লাখ মানুষ ধূমপানের ফলে মারা যায়। ধূমপায়ীদের প্রতি দুজনের একজন তার নির্ধারিত আয়ুর প্রায় ১৪ বছর আগেই মারা যায়। উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, স্কুলপড়–য়া শিশু-কিশোর এখন ধূমপানে আসক্ত। ঢাকা শহরের বিভিন্ন এলাকায় বিশেষ করে টিএসসি, বোটানিক্যাল গার্ডেন, লালমাটিয়া, ধানমন্ডি সুলতানা কামাল ক্রীড়া কমপ্লেক্সরোড, বসুন্ধরা শপিং কমপ্লেক্স, যমুনা ফিউচার পার্কে প্রকাশ্যে ধূমপান করতে দেখা যায়।

রাজশাহীতে প্রকাশ্যে ধূমপান করে তোপের মুখেপড়া এক তরুণীর ভিডিও ২০২০ সালের ভাইরাল হয়েছিল। ভাইরাল হওয়া ওই ভিডিওতে তরুণীর ঠোঁটে সিগারেট দেখে ঘিরে ধরে একদল লোক। তারা ওই তরুণীকে সিগারেট ফেলে দিয়ে স্থান ত্যাগ করতে বাধ্য করেন। রাজশাহী মহানগরীর সার্কিট হাউজ এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। প্রকাশ্যে ধূমপান করে ক্ষমা চাইলেন মন্ত্রী। এ ঘটনাটি কারো কারো কাছে অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে! কিন্তু অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে, ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে সিলেটের গার্ড পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজে স্কুলশিক্ষার্থীদের একটি সমাবেশে তৎকালীন সমাজকল্যাণমন্ত্রী সৈয়দ মহসিন আলী মঞ্চে বসে ধূমপান করেছেন। এই ছবি সামাজিক ওয়েবসাইটের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন পত্রিকাতেও মুদ্রিত হলে সমালোচনার ঝড় বইতে থাকে। একপর্যায়ে মন্ত্রী তার ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চান। বাংলাদেশ আমেরিকা নয়। এ দেশের হাজারো মানুষ মুসলিম ঐতিহ্য হৃদয়ে লালন করে। সুতরাং কেউ যদি মনে করে পাশ্চাত্যের ধ্যান ধারণা লালন করলেই উন্নত হয়ে যাবে। এটি নিতান্তই ভুল ধারণা।

ধূমপানের কারণে গলায় ও ফুসফুসে ক্যান্সার, শ্বস-প্রশ্বাসের সমস্যা, স্ট্রোক, হৃদরোগ হয়। সিগারেটের প্যাকেটের গায়ে লেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে পুরোপুরিভাবে সিগারেট নিষিদ্ধ করা প্রয়োজন। মদ, গাঁজা, আফিম, হিরোইন ও ইয়াবার মতো সিগারেট একেবারে নিষিদ্ধ করতে হবে। বিশ্বের কোনো দেশের সিগারেট-ই নিরাপদ নয়। ফিলিপ মরিস ইন্টারন্যাশনাল, ব্রিটিশ অ্যামেরিকান টোব্যাকো, ইম্পেরিয়াল টোব্যাকো ও জাপান টোব্যাকো ইন্টারন্যাশনালের মতো বড় কোম্পানিগুলো আজ পর্যন্ত বলতে পারেনি তাদের সিগারেটে ক্ষতিকর বস্তু নেই। ধূমপান প্রতিরোধে জনসচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি পাবলিক পরিবহন ও পাবলিক প্লেসে ধূমপানের শাস্তি নিশ্চিত করতে ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে ধূমপায়ীদের যন্ত্রণা থেকে অধূমপায়ীদের রক্ষা করুন। সুস্থ জাতি গঠনের যেমন বিকল্প নেই, তেমনিভাবে শারীরিক সুস্থতা ছাড়া বুদ্ধিবৃত্তিক জাতি গড়ে তোলা সম্ভব নয়। সুতরাং এ ব্যাপারে সরকারকে উদ্যোগী ভ‚মিকা পালন করতে হবে।