বাকস্বাধীনতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার সনদে স্বীকৃত একটা মৌলিক অধিকার। ধর্মনিরপেক্ষ ভারত মুসলমানদের ধর্ম পালন করা, মুসলিম পোশাক পরে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়া, পশু কোরবানি করার সুযোগ সঙ্কুচিত করেছে। ফ্যাসিস্ট এবং উগ্রবাদী গেরুয়া হিন্দু সন্ত্রাসীরা ভারতের কর্নাটকের ছাত্রী মুসকানকে হিজাব পরে কলেজে ঢুকতে দেবে না বলে প্রতিজ্ঞা করেছে। সেখানে কলেজছাত্রী মুসকান একাই শত শত টেরোরিস্ট ধর্মান্ধ গেরুয়া সদস্যের সামনে স্কুটি থেকে নেমে ‘আল্লাহু আকবর’ স্লোগান দিতে দিতে কলেজে প্রবেশ করল। অধিকার আদায়ের সংগ্রামে এক জীবন্ত লড়াকু হয়ে দাঁড়িয়ে গেল দুনিয়ার তাবৎ অপশক্তির সামনে। অনেক দিন এমন বিপ্লবী দেখি নাই।

হিজাব বিতর্ক : ভারতের কর্নাটকের ছাত্রী মুসকান খান বললেন, ‘যখন ভয় পাই, তখন আমি আল্লাহর নাম নিই’। ‘কথাগুলো বলছিলেন কর্নাটকের মান্ডা জেলার একটি প্রি-ইউনিভার্সিটি কলেজের বিকম দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী মুসকান খান।

মুসকানের একটি ভিডিও নেট দুনিয়ায় ভাইরাল হয়েছে, যাতে দেখা গেছে যে, তিনি হিজাব পরে স্কুটি পার্ক করে ক্লাসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন, কিন্তু বেশ কিছু উগ্রবাদী গেরুয়া হিন্দু সম্প্রদায়ের সন্ত্রাসী তাকে অনুসরণ করছে। দেখা যায়, গেরুয়া রঙের স্কার্ফ পরিহিত একদল ব্যক্তি ‘জয় শ্রী রাম’ স্লোগানে ছাত্রীটির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে আর চিৎকার করছে। ওই ছাত্রীও তখন ভিড়ের দিকে ফিরে দুই হাত তুলে ‘আল্লাহু আকবার’ বলে চিৎকার করতে থাকেন। ওই ঘটনা আর ভিডিওটি পুরো দেশেই আলোচনার ঝড় তুলেছে। কর্নাটকের শিক্ষার্থী মুসকান খানের সাক্ষাৎকার বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতি পেয়েছে!

এতে আছে, কী হয়েছিল সেদিন আপনার সাথে? মুসকান : আমি আগে থেকে কিছুই জানতাম না। সবসময় যেভাবে কলেজে যাই, সেভাবেই গেলাম। বাইরে থেকে আসা একদল লোক সেখানে বলল, ‘বোরকা পরে কলেজের ভেতরে যাবে না। কলেজে যেতে হলে বোরকা ও হিজাব খুলে ভেতরে যেতে হবে। তুমি যদি বোরকা পরে থাকতে চাও, তবে বাড়ি ফিরে যাও।’ আমি ভেতরে এলাম। ভেবেছিলাম, চুপচাপ চলে যাব। কিন্তু সেখানে অনেক স্লোগান উঠছিল। ‘বোরকা ছাড়’, ‘জয় শ্রী রাম’-এর মতো স্লোগান উঠছিল। আমি ভেবেছিলাম আমি ক্লাসে যাব, কিন্তু ছেলেগুলো আমাকে এমনভাবে অনুসরণ করছিল যেন তারা সবাই আমাকে আক্রমণের চেষ্টা করছে। তারা ছিল ৪০ জনের মতো। আমি ছিলাম একা। কারো মধ্যে আমি মনুষ্যত্ব লক্ষ করিনি। হঠাৎ তারা আমার কাছে এসে চিৎকার করতে লাগল। কারো কারো হাতে ছিল কমলা রঙের স্কার্ফ।

আর আমার মুখের সামনে এসে স্কার্ফ দোলাতে দোলাতে বলতে লাগল - জয় শ্রী রাম, চলে যাও, বোরকা খুলে ফেল।

আপনি কত দিন ধরে হিজাব পরছেন? প্রি-ইউনিভার্সিটিতে যাওয়ার পর থেকে আমি হিজাব পরে আসছি। কলেজে কোনো সমস্যা হয়নি। সব কিছু আগের মতোই ছিল। আমরা হিজাব পরে ক্লাসে যাচ্ছিলাম। আমরা বোরকা পরি না। শুধু হিজাব পরি। চুল আড়াল করে ক্লাসে যাই। কিন্তু ওই লোকেরা আমাকে ক্যাম্পাসে ঢুকতেও দিচ্ছিল না। তারা অনেকে বহিরাগত ছিল এবং কলেজের ছাত্র ছিল কম। বেশির ভাগই ছিল বহিরাগত।

ওই লোকগুলো কী বলছিল? তারা বলছিল, ‘বোরকা খুলে ফেল, না হলে কলেজে যেতে পারবে না।’ তারা সবাই আমাকে ভয় দেখাচ্ছিল।

আমার সামনে চার মেয়ে এসেছিল। গেট তালাবদ্ধ ছিল। তারপর কোনোমতে প্রিন্সিপাল এলেন। অধ্যক্ষ ও শিক্ষকরা আমাকে রক্ষা করেন। ছেলেরা তাদের সাথে কথা বলতে ভেতরে গিয়েছিল। কিন্তু বেরিয়ে এসে একই কাজ করল। আমি কাঁদিনি। আমি এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছি।

আপনি কী বললেন..?

আমি বললাম ‘আল্লাহু আকবার’। কারণ আমি ভয় পেয়েছিলাম। ভয় পেলে আমি আল্লাহর নাম নিই। আল্লাহর নাম নিলেই আমার সাহস বেড়ে যায়।

হিজাব সম্পর্কে আপনার মতামত কী? কলেজে আমাদের প্রিন্সিপাল নিজেই বলেছিলেন যে তুমি হিজাব পরে আসতে পারো। এই বাইরের লোকগুলো এসে এমন চমক তৈরি করছে। তিনি নিজেই বললেন, আগে যেভাবে আসতে, এসো। কোনো সমস্যা নেই।

কার হিজাব পরা উচিত বলে আপনি মনে করেন? হ্যাঁ, আমার এটি পরিধান করা উচিত।

এ বিষয়ে আপত্তি থাকলে আপনার মতামত কী হবে? ভারতের সংবিধানে আমার বিশ্বাস আছে। ইনশাআল্লাহ, আমরা হাইকোর্টের আদেশের অপেক্ষায় আছি।

এ মুহূর্তে যে হিজাব বনাম গেরুয়া বিতর্ক চলছে, তা কি অন্য ছাত্রদের সাথে আপনার সম্পর্ককে প্রভাবিত করবে? আমি এখানে হিন্দু বা মুসলিম কোনো জাতপাত ছড়াচ্ছি না। আমি শুধু আমার শিক্ষার জন্য, আমার অধিকারের জন্য দাঁড়িয়েছি। আমরা হিজাব পরছি বলে আমাদের ঢুকতে দেয়া হচ্ছে না।

আমরা বছরের পর বছর ধরে এটি পরছি। এটি নতুন কিছু নয়। কিন্তু এ লোকগুলো এমনভাবে বলছে যে, ‘তুমি যদি এটা পরে আসো, তাহলে আমরা এটা (গেরুয়া) পরে আসব।’

ছেলেরা আমার কলেজের প্রিন্সিপালকে বলছে, ‘সে যদি বোরকা পরে আসে, তাহলে আমরাও এসব সরাবো না’ (গেরুয়া, গামছা-পাতা ইত্যাদি)।

আমাদের কোনো সমস্যা নেই। তারা যে কোনোভাবে আসতে পারে। আমাদের শুধু হিজাব পরার অনুমতি দরকার। যেভাবেই তারা আসুক না কেন, তা নিয়ে আমাদের মাথাব্যথা নেই।

আমাদের শুধু দরকার শিক্ষা। আমাদের অধ্যক্ষ আমাদের সঙ্গে আছেন, শিক্ষকরা আমাদের সাথে আছেন। বাইরে থেকে এসে কিছু লোক কেবল নজর কাড়ার চেষ্টা করছে। আর সংবিধানের প্রতি আমাদের আস্থা আছে। হাইকোর্ট থেকে নেতিবাচক কিছুই আসবে না। ভারতের মুসলিমবিরোধী আগ্রাসন রুখতে হবে।

কর্নাটকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মুসলিম মেয়েদের মাথায় স্কার্ফ পরার বিরুদ্ধে বিজেপি রাজ্য সরকারের বিতর্কিত সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে মুসকানদের রুখে দাঁড়ানোর অধিকার রয়েছে। ভারতের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, ‘স্কুলে ইউনিফর্মের বাইরে কিছু গ্রহণ করা হবে না।’ মুসলিমবিরোধী আগ্রাসন রুখতে হবে। মুসলিম ছাত্রীদের হিজাব পরিধান করার অধিকার আদায়ের জন্য ওআইসিভুক্ত মুসলিম দেশগুলোকে ভূমিকা রাখতে হবে। প্রতিবেশী ভারতে সাম্প্রদায়িক বর্ণবাদী আচরণ বিশ্বব্যাপী নিন্দনীয়। বাংলাদেশ সরকারকে ভারতের মুসলমানদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য ওআইসিতে জোরালো ভূমিকা পালন করতে হবে।

ভারতীয় রাজনীতিবিদ বৃন্দা কারাত বলেছেন, ‘মুসলিম মেয়েরা ইউনিফর্ম অবশ্যই পরে, তারা কেউ কেউ অতিরিক্ত হিসেবে মাথায় একটা স্কার্ফ পরে মাথা ঢেকে রাখে। কিন্তু এটি তো তার মৌলিক অধিকারের বিষয়। ভারতীয় সংবিধানেই এটি স্বীকৃত। যেমন শিখ সম্প্রদায়ের ছেলেরা ইউনিফর্ম পরার সাথে মাথায় পাগড়ি পরে মাথা আবৃত রাখে। এটিও তাদের বিশ্বাসের অংশ। সেখানে তো ইউনিফর্ম বিধান লঙ্ঘিত হচ্ছে না। তাহলে মুসলিম মেয়েরা ইউনিফর্মের সাথে মাথায় স্কার্ফ পরলে সমস্যা হবে কেন?’ বিশ্বখ্যাত আমেরিকান পণ্ডিত অধ্যাপক নোয়াম চমস্কি বলেছেন, “প্রায় ২৫ কোটি মুসলমানকে ‘সংখ্যালঘু’তে পরিণত করেছে ভারত।

হিজাব পরতে না পেরে অধ্যাপিকা চাঁদনির চাকরি থেকে অব্যাহতি।

টুমাকুরুর জৈন পিইউ কলেজের ওই অধ্যাপিকার দাবি, গত তিন বছর ধরে চাকরি করছেন। হিজাব পরেই পড়ুয়াদের পড়িয়েছেন। কখনো তাকে কেউ বলেননি হিজাব খোলার কথা। এই প্রথম তাকে এভাবে বাধা দেয়া হলো। চাঁদনির কথায়, ‘হঠাৎ করে বৃহস্পতিবার কলেজের অধ্যক্ষ বললেন, হিজাব অথবা অন্য কোনো ধর্মীয় চিহ্ন থাকে, এমন পোশাক পরে ক্লাস নেয়া যাবে না। কিন্তু গত তিন বছর ধরে তো আমি হিজাব পরেই ক্লাস নিলাম!’

চাকরি ছাড়া প্রসঙ্গে তার মন্তব্য, ‘এই নতুন সিদ্ধান্ত আমার আত্মমর্যাদায় আঘাত করেছে। তাই ইস্তফা দিলাম।’ ইস্তফাপত্রেও এ কথা উল্লেখ করেছেন তিনি। হিজাব নিয়ে নিষেধাজ্ঞা প্রসঙ্গে কলেজ কর্তৃপক্ষের উদ্দেশে লেখেন, ‘আপনাদের এই অগণতান্ত্রিক কাজের আমি তীব্র নিন্দা করছি।’ অন্য দিকে কলেজের অধ্যক্ষ কে টি মঞ্জুনাথের দাবি, তিনি বা কলেজ কর্তৃপক্ষের কেউ চাঁদনিকে বলেননি যে, হিজাব পরে ক্লাস নেয়া যাবে না।

মুসলমান নারীর অধিকার ও ইবাদত হলো হিজাব পরিধান করা। মুসকান হিজাব পরিধান আন্দোলনের সাহসী বীর। বাংলাদেশ এবং মুসলিমরাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের ভারতীয় মুসলমানদের রক্ষায় এগিয়ে আসতে হবে। বিশ্বব্যাপী নারীর অধিকার আদায়ের জন্য মানবাধিকার সংগঠন এবং রাজনৈতিক লিডার, নারীনেত্রী ও সংগঠনকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে ভূমিকা রাখতে হবে।

লেখক : গবেষক ও উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ