পৃথিবীর প্রতিটি অঞ্চল ও দেশে যুব ও তরুণ সমাজের নৈতিক অবক্ষয় এখন মৌলিক সমস্যা। নৈতিক অবক্ষয়ের অন্যতম মৌলিক কারণ মাদকের ভয়াবহ ছোবল।
বাংলাদেশে উঠতি বয়সের কিশোর ও তরুণদের মধ্যে এর ব্যাপক প্রভাব সমাজবিজ্ঞানীদের ভাবিয়ে তুলছে। শহুরে জীবনে পাশ্চাত্য সংস্কৃতির অনুকরণে বেড়ে ওঠা কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণী ও যুবক-যুবতীর একটি বিরাট অংশ আজ মাদকের ভয়াবহ আক্রমণের শিকার। মাদকের নেশা মানুষের চিন্তাশক্তিকে ভোঁতা করে দেয়। তার বিবেকবোধকে জাগ্রত হতে দেয় না। ন্যায়-অন্যায় পরিমাপ করার বোধ ও জ্ঞান লোপ পাওয়ায় তারা নানাবিধ অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। সামাজিক ও নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের কারণে দেশে কিশোর ও তরুণ সমাজের মাঝে মাদকাসক্তি দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। এ কারণে যুব ও তরুণ সম্প্রদায়ের মাঝে অপরাধপ্রবণতা বাড়ছে আশঙ্কাজনক হারে। অনেক ভদ্র পরিবারের সন্তানরা বখাটে জীবনে অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছে।
পিতা-মাতা ও অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের নিয়ে চিন্তিত। তরুণ ও যুবসমাজের এই অধোগতি সমাজজীবনে সৃষ্টি করছে নানা সমস্যা। চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, রাহাজানি, খুন, ধর্ষণ, গুম, অশ্লীলতা, ইভটিজিং, অপহরণ ও বীভৎস হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনা ঘটছে অহরহ। সাম্প্রতিককালে কিছু বীভৎস হত্যাকাণ্ড সমাজ জীবনের ভিত্তিমূলকে নাড়িয়ে দিচ্ছে। এসব হত্যাকাণ্ডের পেছনে মাদক অন্যতম কারণ। প্রথমে মাদক সেবনের মাধ্যমে একে অপরের সাথে সম্পর্ক ও বন্ধুত্ব গড়ে তোলে, পরবর্তীতে এ সম্পর্ক ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের দিকে গড়ায়। এ ধরনের ঘটনা প্রায়ই পত্রিকায় প্রকাশিত হচ্ছে।
মাদক সমাজবিধ্বংসী এক ভয়াবহ আততায়ীর নাম। মাদকাসক্তির কারণে কিশোর, তরুণ ও যুবসমাজ মেধাশূন্য হয়ে যাচ্ছে। তাদের মেধা দেশ ও জাতির কল্যাণে যেভাবে কাজে লাগার কথা তা লাগছে না। একটি মাদকাসক্ত সন্তানের কারণে পুরো পরিবার ধ্বংস হয়ে যায়। এমন নজির অহরহ দেখা যাচ্ছে। মাদক মানুষের মৌলিক মানবীয় গুণাবলিকে ধ্বংস করে। তাদের মনুষ্যত্ববোধ এবং সামাজিক ও নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটায়। আমাদের বর্তমান সমাজ বাস্তবতায় পারিবারিক বিশৃঙ্খলা, অনাচার, মূল্যবোধহীনতার যে সয়লাব দেখছি তার পেছনে মাদক অন্যতম কারণ। চারিত্রিক অবক্ষয় ও অনৈতিকতার এক ভয়ঙ্কর পরিবেশে চার দিকে অবলোকন করা যায়। সামাজিক অবস্থায় সহনশীলতা, মমত্ববোধ, সৌহার্দ্য, সৌভ্রাতৃত্ব মানবীয় চরিত্র হতে লোপ পেয়েছে।
সামাজিক বন্ধনগুলো এমন অবস্থায় উপনীত হয়েছে যে, কেউ কাউকে আর সহ্য করতে পারছে না। তাই এক ভাই অপর ভাইকে দুশমন ভাবতে থাকে, এক বন্ধু অপর বন্ধুর পিঠে ছুরিকাঘাত করতে দ্বিধাবোধ করে না। এক প্রতিবেশী অপর প্রতিবেশীকে সহ্য করতে পারে না। এক আত্মীয় অন্য আত্মীয়কে যেভাবে আপন করে নেয়ার কথা; তা না হয়ে বরং শত্রæজ্ঞান করে। পিতা-মাতা, সন্তান, পরমাত্মীয়দের মধ্যে যে গভীর সম্পর্ক থাকার কথা তা লোপ পেয়েছে অনেকাংশে।
মানুষ সমাজবদ্ধ প্রাণী। সমাজে একে অপরের সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে তারা বসবাস করবে, এটিই স্রষ্টার বিধান। সামাজিক জীব হওয়ায় মানুষের কাছে সামাজিক আচরণ একান্তভাবে কাম্য। মানবীয় সৃষ্টির মাঝে যে মৌলিক মানবীয় গুণাবলি দেয়া হয়েছে তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে সে সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গায় নিজের বিবেক ও বোধকে কাজে লাগাবে। বর্তমান সময়টি একটি কঠিন সময়, এখন বিবেক ও বোধের পতন সর্বত্রই লক্ষ করা যায়। মৌলিক মানবীয় আচরণের অস্বাভাবিক ঘাটতি, সামাজিক আচরণের পতন সমাজজীবনকে কঠিন ও দুর্বিষহ করে তুলেছে। সামাজিক সম্পর্কের শিথিলতা এবং সামাজিক ও নৈতিক মূল্যবোধের অবনতির কারণে সমাজজীবনে অস্থিরতা ও অশান্তি বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমান পৃথিবীকে বলা হয় গ্লোবাল ভিলেজ। পৃথিবীর সব তথ্য এখন মানুষের হাতের মুঠোয়। বিশ্বায়নের চমকপ্রদ ¯স্লোগানের মোড়কে সংস্কৃতি ও সভ্যতার আদান-প্রদান হচ্ছে ব্যাপকভাবে; এতে ভালো কিছু গ্রহণের চেয়ে মন্দ বিষয়গুলো অতি দ্রুত সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ছে। সামাজিক পরিবর্তনের সূচকে ভোগ ও বিলাসসামগ্রীর অতি দ্রুত বিকাশ এবং সহজলভ্যতা মানুষের জীবনকে বস্তুতান্ত্রিকতার দিকে অতি দ্রুত ধাবিত করছে। উন্নয়ন কিংবা সামাজিক বিকাশ যেকোনো কারণেই হোক সামাজিক বিকেন্দ্রীকরণে মানুষ নিজ সভ্যতা সংস্কৃতি ও আচারকে লালন করার চেয়ে বস্তুতান্ত্রিকতার দিকে বেশি ধাবিত হচ্ছে। সামাজিক পরিবর্তনের যে সূচকগুলো আমাদের চোখে পড়ে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে আচরণ, পোশাক, খাদ্য, জীবনযাপন পদ্ধতি। শিষ্টাচার, মানবীয় মূল্যবোধ ইত্যাদিতে ব্যাপক পরিবর্তন- এর ফলে পরোপকারী মানসিকতা, সামাজিক ও নৈতিক মূল্যবোধ, মনুষ্যত্ববোধ, মানবতাবোধ, বিবেকবোধ ও ন্যায়বোধের জায়গাগুলোয় এক ধরনের শূন্যতা লক্ষ করা যায়। কোনো স্থানই শূন্য থাকে না, একটি বিদায় নিলে অপরটি এসে সেখানে জায়গা করে নেয়। আলোর শূন্যতা মানে আঁধার সে জায়গা গ্রাস করে নেয়া। সত্যের শূন্যতা মানে মিথ্যার রাজত্ব কায়েম হওয়া। নৈতিক ও মানবীয় মূল্যবোধের শূন্যতার অর্থই হচ্ছে নীতিহীনতা অমানবিকতার জয়জয়কার। মানুষের মধ্যে মানবিকতা ও মূল্যবোধের শূন্যতা নানাবিধ কারণে ঘটে। তবে বর্তমান সময়ে মাদকাসক্ততা সমাজজীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে; এটি যেকোনো মানুষ অনায়াসে স্বীকার করবেন।
পারিবারিক ভাঙন, সন্তান বখাটে হয়ে যাওয়া, সামাজিক অপরাধ বৃদ্ধি, নারী নির্যাতন, যৌতুক নামক অভিশাপের বিস্তার ইত্যাদির পেছনে মাদকের ভয়াবহতম প্রভাব রয়েছে। নতুন মাদক আইনের মাধ্যমে একুশ বছরের ওপর যে কারো জন্য মাদক সেবনকে স্বাধীন করে দেয়া এবং যেকোনো স্থানে এক শ’ ‘মাদকসেবী’ থাকলে তাদের জন্য একটিবারের অনুমোদন দেয়ার নীতিমালা অনুমোদন দেয়া হয়েছে। স্বাভাবিকভাবে আমাদের সমাজে কেউই প্রকাশ্যে মদপানের দুঃসাহস দেখায় না। এমনকি মাদকসেবীরাও নিজে কখনো ঘোষণা দেয় না যে, সে নিয়মিত মদপান করে। মদ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণের জন্য সরকারের অধিদফতর রয়েছে। দেশের প্রতিটি জেলায় এর কার্যালয় রয়েছে। মাদকদ্রব্য বিরোধী আইনও আছে। সরকারি ও বেসরকারিভাবে মাদকসেবীদের চিকিৎসার জন্য নিরাময় কেন্দ্র রয়েছে। এর পরও মাদকাসক্ততা ঠেকানো যায় না। কারণ ভালো কোনো কিছুর জন্য অনেক প্রচার ও পরিশ্রম করে সমাজে বিস্তার ঘটাতে হয়। অন্য দিকে খারাপ কোনো জিনিস অতি দ্রুত বিকাশ লাভ করে। মাদকের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে অভিযান পরিচালনা করা হয়। এমনকি মাদকবিরোধী অভিযানে বন্দুকযুদ্ধে বহু মানুষ হতাহতের সংবাদ শোনা যায় যদিও এসব বন্দুকযুদ্ধ নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন আছে। এ নিবন্ধে সেটি আমাদের আলোচনার বিষয় নয়। মদ ও মাদকতা প্রতিরোধের জন্য বিভিন্ন মাদকবিরোধী সংগঠন কাজ করে। ধর্মীয় আলোচনাগুলোতে মাদকের বিরুদ্ধে বক্তব্য তুলে ধরা হয়। এর পরও মাদকের বিস্তার রোধ করা কঠিন হয়ে যায়। যেখানে সমাজবিজ্ঞানী, অভিভাবক, শিক্ষক, ধর্মীয় পণ্ডিতসহ সুষ্ঠু চিন্তা লালনকারী প্রতিটি মানুষ মদ ও মাদকতা নিয়ে চিন্তিত সেখানে সরকার মদের অবাধ লাইসেন্স দিয়ে সমাজ ধ্বংসের মতো এহেন সিদ্ধান্ত কেন নিয়েছে তা আজ প্রতিটি বিবেকবান মানুষের প্রশ্ন।
মাদক উৎপাদনকারী দেশ না হয়েও বাংলাদেশে মাদকের ব্যবহার বেড়ে চলছে। বিশেষ করে যুব ও তরুণ সমাজের নৈতিক অবক্ষয়ের কারণ হচ্ছে মাদকতা। মদ ও মাদকতা প্রতিরোধে এ ব্যবস্থা যেখানে আরো কঠিন হওয়া দরকার সেখানে সরকার মদের সহজলভ্যতা ও অবাধ করে দেয়ার মাধ্যমে জাতিকে আসলে কোন দিকে নিয়ে যেতে চায়, তা ভাবনার বিষয়। অনেকেই পশ্চিমা বিশ্বের দেশগুলোর উদাহরণ দিয়ে বলেন, তাদের দেশে মদের সহজলভ্যতার কারণে মাদকদ্রব্য নিয়ে কোনো চোরাচালান ও মাদক সম্রাট গড়ে ওঠে না। কেউ মাদকাসক্ত হয়ে অপরাধের পথ বেছে নেয় না। যারা এ কথা বলেন, তারা মূলত বাস্তবতাকে জেনেই কথা বলেন। পশ্চিমা বিশ্বে বড় বড় যেক’টি সামাজিক সমস্যা তাদের সমাজব্যবস্থার স্থায়িত্বকে ঝুঁকিপূর্ণ করেছে তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, তাদের পারিবারিক ব্যবস্থা খুবই ভঙ্গুর। যখন তখন বিয়েবিচ্ছেদ সেখানে একটি স্বাভাবিক বিষয়। পিতা-মাতা সন্তানের মধ্যে একটি সময় পরে আর কোনো সম্পর্ক টিকে থাকে না। এ কারণে তাদের দেশে বৃদ্ধাশ্রমের সংখ্যা অনেক বেশি। একাকিত্ব, অবসাদগ্রস্ততা, আত্মহত্যা, অবাধ যৌনাচার ইত্যাকার বিষয় তাদের সমাজজীবনের অনুষঙ্গ হয়ে গেছে। পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্র আমেরিকায় প্রায়ই বিভিন্ন স্কুল ও মার্কেটে আততায়ীর গুলিতে একই সময়ে অনেক মানুষকে খুন করার সংবাদ আমরা শুনতে পাই। মাদকের সহজলভ্যতা তাদের সমাজজীবনকে উন্নত মানবিকতা নয়, বরং একটি বিশৃঙ্খল জীবন এবং ভঙ্গুর পারিবারিক ও সামাজিক ব্যবস্থা উপহার দিয়েছে।
প্রশাসন যে পদক্ষেপ নিয়েছে তা কোনো মতেই পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার জন্য কল্যাণকর হতে পারে না। এটি আগামী প্রজন্মকে ধ্বংসের দিকে ধাবিত করবে। এর ফলে অন্যায় অনাচার বৃদ্ধি পাবে। খুন, ধর্ষণ, ছিনতাই, ইভটিজিং, চারিত্রিক ও নৈতিক অধঃপতন গোটা জাতিসত্তার অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলবে। সমাজে একবার মদের অবাধ ব্যবহার চালু হয়ে গেলে আইন করে আর তা থামানো যাবে না। কোনো শুভ চিন্তা ও শুভ বুদ্ধি থেকে কর্তৃপক্ষ এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে মনে হয় না। আমরা ‘সোনার বাংলা’ গড়ার কথা বলি। সোনার বাংলা গড়ার জন্য অবশ্যই সোনার মানুষ দরকার। কোনো ব্যক্তি মাদকে আসক্ত হলে তার পক্ষে ন্যূনতম মানবীয় মূল্যবোধ ও চারিত্রিক সৌন্দর্য, সৌকর্য ধরে রাখা সম্ভব নয়। সরকার যে ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছে এটি দেশ, জাতি ও জনগণকে শুধু ধ্বংসের দিকেই নিয়ে যাবে। আশা করি, সরকার এ সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসবে। দেশের বিবেকবান মানুষেরা এ বিষয়ে সোচ্চার আওয়াজ তুলবেনÑ এটিই প্রত্যাশা। আমরা একটি সুন্দর সমাজ চাই, সুন্দর দেশ চাই, একটি সুন্দর পৃথিবী চাই। এ জন্য একদল সুন্দর মানুষ দরকার। সুশিক্ষা, নৈতিক শিক্ষা ও ধর্মীয় বিধানের অনুসরণেই একদল আদর্শ মানুষ তৈরি হতে পারে। মাদকের অবারিত সুযোগ নয়, বরং মাদক প্রতিরোধের মাধ্যমেই আমরা কাক্সিক্ষত সোনালি সমাজ গঠনের প্রচেষ্টাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারি। নৈতিক শক্তির উদ্ভাবন ও এর বিকাশের মাধ্যমেই একটি সোনালি সমাজ গড়া সম্ভব। যে সমাজে একদল মাদকমুক্ত, আদর্শ চরিত্রবান ও নৈতিক শক্তিতে বলীয়ান প্রজন্ম গড়ে উঠবে; তারাই বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। তাদের হাত ধরেই স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে উঠবে। পরিশেষে পবিত্র কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াতের মাধ্যমে লেখা শেষ করতে চাই। মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনগণ নিশ্চয়ই মদ, জুয়া, প্রতিমা, বেদি ও ভাগ্যনির্ধারক তীরগুলো অপবিত্র বিষয়। এগুলো শয়তানের কর্ম। সুতরাং তোমরা এগুলো পরিহার করো যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।’ (সূরা মায়েদা, আয়াত নং-৯০)
