শিরোনামটি একটি জাতীয় দৈনিকের সম্পাদকীয় থেকে নেয়া। সম্প্রতি রাজধানীর নিউমার্কেটে ব্যবসায়ী-শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষে দু’টি প্রাণ ঝরেছে। এমনটি কেউ প্রত্যাশা করি না। প্রতিনিয়ত আমরা নিষ্ঠুরতার মুখোমুখি হচ্ছি। কিন্তু প্রতিকার পাচ্ছি না। বিরোধীদল যেখানে সমাবেশ কিংবা মিছিল-মিটিং করতে পারে না সেখানে ব্যবসায়ী-শিক্ষার্থীরা কিভাবে সংঘর্ষে জড়ায় তা বোধগম্য নয়। পত্রিকাটি লিখেছে, ‘নিউমার্কেটে সংঘর্ষে দু’জন সাধারণ মানুষের প্রাণহানি, অ্যাম্বুলেন্স ভাঙচুর ও বিপুল সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতি কারা করেছে এ ব্যাপারে সারা দেশের মানুষ জেনে গেছে। এ ঘটনায় আমরা দু’জন মানুষকে হারালাম। একজন হলেন নাহিদ। পেশায় কুরিয়ার সার্ভিসের ডেলিভারিম্যান ছিলেন। দ্বিতীয়জন মুরসালিন। তিনি পেশায় ছিলেন রেডিমেড কাপড়ের দোকানের বিক্রয়কর্মী ।
নাহিদ হত্যার নৃশংস দৃশ্য সিসিটিভিতে দেখা গেছে। হত্যাকারীরা ঢাকা কলেজের ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে জড়িত। আইনের শাসন থাকলে এমন ঘটনা ঘটতে পারতো না। কেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মেধাবী শিক্ষার্থীরা হত্যা কিংবা খুনের মতো জঘন্যতম অপরাধে জড়াচ্ছে তার কারণ খুঁজে বের করা দরকার। নিউমার্কেটের ঘটনার দায় কি ছাত্রলীগ এড়াতে পারে? ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে যারা জড়িত তারা কেউ আমাদের ভাই কিংবা ভ্রাতুষ্পুত্র কিংবা ভাগনে। প্রশ্ন হচ্ছে, তারা এতটা বেপরোয়া হলো কেন? ছাত্রলীগকে সামলানোর পুরনো প্রশ্ন আবার নতুন করে দেখা দিয়েছে। ঐতিহ্যবাহী সংগঠন হিসেবে ছাত্রলীগের একটি গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস আছে। কিন্তু এখন প্রতিনিয়ত নানা ধরনের আপত্তিকর কর্মকাণ্ড সংগঠনটির সুনাম নস্যাৎ করে দিলেও প্রতিরোধে ক্ষমতাসীন দলের তেমন কোনো তৎপরতা নেই।
নিউমার্কেট এলাকায় শিক্ষার্থীদের সাথে ব্যবসায়ীদের সংঘর্ষের ঘটনা নতুন নয়। প্রায়ই এমন সংঘর্ষ ঘটে থাকে। এবারের সংঘর্ষে দু’জন মারা গেছেন। আহত হয়েছেন শতাধিক ছাত্র, ব্যবসায়ী, পথচারী ও সাংবাদিক।
নিউমার্কেটে সংঘর্ষের ঘটনায় হত্যাকাণ্ডে জড়িত যাদের নাম এসেছে তারা সবাই মাধ্যমিক পরীক্ষায় পাস করা শিক্ষার্থী। তারা অনেক স্বপ্ন নিয়ে ঢাকা কলেজে ভর্তি হয়েছেন। অথচ আমাদের মেধাবীরা এখন খুনের তকমা নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের নেতিবাচক কর্মকাণ্ড এখন মাঝে মধ্যেই সংবাদের শিরোনাম হচ্ছে। পাঠকের নিশ্চয় মনে আছে, ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদ থেকে শোভন ও রাব্বানীকে টেন্ডারবাজির অভিযোগে সরিয়ে দেয়া হয়। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) এক পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, গত বছর ছাত্রলীগের বিভিন্ন গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষে তিনজন নিহত হয়েছেন। আওয়ামী লীগের সাথে সংঘর্ষে একজন নিহত হয়েছেন। এই সব ঘটনায় ছাত্রলীগের কমপক্ষে ৫০ জন আহত হয়েছেন। ২০২০ সালে ছাত্রলীগ বনাম ছাত্রলীগ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে ১৫টি। তাতে দু’জন নিহত এবং ৬০ জন আহত হয়েছেন। আর অন্য ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা তো আছেই। ২০১০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি রাতে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে স্যার এ এফ রহমান হলে সিট দখল নিয়ে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষে মেধাবী ছাত্র আবু বকর নিহত হন। ওই হত্যার ঘটনায় শাহবাগ থানায় একটি হত্যা মামলা হয়। ২০১৭ সালে আদালতের রায়ে ছাত্রলীগের অভিযুক্ত ১০ নেতাকর্মীর সবাই বেকসুর খালাস পান।
ন্যায়বিচার পাওয়া প্রতিটি মানুষের অধিকার। কিন্তু সে অধিকার সবার ভাগ্যে জোটে না বলেই কিছু মানুষ হত্যার বিচার চান না। যেমন চায়নি নাহিদের পরিবার। বিচারের ভার আরশের মালিকের কাছে সঁপে দিয়েছেন পরিবারের সদস্যরা। এই সংস্কৃতি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য সুখকর নয়। নাহিদের হত্যাকারীর পরিচয় উন্মোচিত হয়েছে। অথচ এই ঘটনায় বিএনপির একজন নেতাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বিরোধীদলের নেতাকর্মীরা যেখানে মানববন্ধন কিংবা দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির লিফলেট বিতরণ করতে মাঠে নামলেই ধাওয়া করা হয়, অথচ দু’দিন ধরে রাজধানী ঢাকায় এ ধরনের সংঘর্ষ চললেও পুলিশের ভূমিকা ছিল প্রশ্নবিদ্ধ! সামান্য লিফলেট বিতরণ করায় বিরোধী দলের নেতা ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেনকে গ্রেফতার করতে পুলিশের বাহাদুরি জাতি দেখেছে। অথচ একটি গণতান্ত্রিক দেশের রাজধানীর ব্যস্ততম এলাকা রণক্ষেত্রে রূপ নিলো। পুলিশ প্রশাসন সন্ত্রাসীদের দমন করতে পারল না।
শুধু ঢাকা কলেজ নয়। সারা দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ছাত্রলীগের একক আধিপত্য থাকায় কিছুদিন পরপর নেতাকর্মীরা সঙ্ঘাতে জড়াচ্ছেন। নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না আওয়ামী লীগ। তুচ্ছ বিষয় নিয়ে তারা সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছেন। সাতক্ষীরা কলেজের এক ছাত্রকে অপহরণ করে মুক্তিপণ দাবি করেছে ছাত্রলীগ। ওই খবর ফলাও করে গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। ছাত্রলীগ নিজেদের টর্চার সেলে তাকে পাঁচ ঘণ্টা আটক করে রাখে। বিবস্ত্র করে, মাথা ন্যাড়া করে ভিডিও ধারণ করে। নির্দয় মারধর করে সেই ভিডিও পরিবারের কাছে দেখিয়ে দুই লাখ টাকা মুক্তিপণ চেয়েছে। এমন নৃশংসতার অসংখ্য নজির তাদের বিরুদ্ধে রয়েছে। ছাত্ররাজনীতির স্বার্থে সব ছাত্রসংগঠনের উচিত সন্ত্রাসের পথ পরিহার করে ছাত্ররাজনীতির ঐতিহ্যকে ফিরিয়ে আনার প্রত্যয়ে কাজ করা।
