চীন আজ বিশ্বে অর্থনৈতিকভাবে যথেষ্ট এগিয়েছে। তাই বলে প্রতিবেশীদের প্রতি বিরূপ মনোভাব পোষণ করবে সেটি ঠিক নয়। কিন্তু তার মনোভাব এবং শরীরী ভাষায় তেমনটাই প্রকাশ পায়। এশিয়ার অন্যতম শক্তিশালী দেশ হিসেবে চীনের প্রভাব যেমন বিপুল তেমনই ভারতের প্রভাবও কম নয়। চীন মনে হয় আগ্রাসী নীতির দিকে এগোচ্ছে। ভারত নিজেকে একটি শান্তিপ্রিয় দেশ হিসেবে দাবি করে এবং প্রতিবেশীদের সাথে সুসম্পর্ক রক্ষায় সচেষ্ট। স্বাধীনতার ৭৪ বছর পরও দেশটি কারো সাথে গায়ে পড়ে ঝগড়া-বিবাদ কমই করেছে। তবে আক্রান্ত হলে কঠোর জবাব দিতে দ্বিধাও করে না। ভারত এমন একটি দেশ যেখানে মহাত্মা গান্ধী, নেতাজী সুবাস বসু, পণ্ডিত জওয়াহের লাল নেহরু শান্তির বাণী মুখে নিয়েই কাজ করে গেছেন, তবে দেশের মাটি রক্ষায় এক বিন্দুও পিছপা হননি। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যখন মার্কিন প্রেসিডেন্টের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখার লক্ষ্যে কাজ করছেন ঠিক সে মুহূর্তে পাকিস্তানের পরামর্শে চীন ভারতের সীমান্তে শুধু সৈন্য হত্যা করেনি, দখলও করেছে লাদাখের কিছু এলাকার জায়গাজমি।

বলেছিলাম, ভারত শান্তি ও বিরোধ থেকে দূরে থাকতে চায়। যুদ্ধে সব পক্ষেরই ক্ষতি হতে পারে এ জন্যই যুদ্ধের পথে না গিয়ে ভারত একের পর এক আলোচনা ও ক‚টনৈতিক প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এতেও কোনো ফলপ্রসূ আলোচনা হয়নি বা সম্ভবত হওয়ার কথাও নয়। কারণ চীন বিশ্বে নিজেকে বড় শক্তিধর দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। তাই ভারতের পেছনে লেগেছে। এর আগে মিয়ানমারের আরাকান রাজ্যে চীনা অর্থনৈতিক জোন গড়ে তোলার লক্ষ্যে সেখান থেকে প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গাকে জ্বালাও পোড়াও ও নির্যাতন করে প্রতিবেশী বাংলাদেশে পাঠিয়ে দিয়েছে। পরে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে জাতিসঙ্ঘে ভেটো দিয়ে শুধু ক্ষান্ত হয়নি, রোহিঙ্গারা বাংলাদেশী এ কথা বলে সারা বিশ্বে অপপ্রচার চালায়। বাংলাদেশের সাথে ভারতের তিস্তার পানি ও সীমান্তে গোলাগুলি নিয়ে কিছু সমস্যা নেই তা নয়। তারপরও ভারত বাংলাদেশের ওপর জুলুম-নির্যাতন করে না। বন্ধুসলুভ সুসম্পর্ক চালিয়ে যাচ্ছে। ভারত-বাংলাদেশ বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্র। দু’দেশের সম্পর্ক উভয় দেশের জনগণের বন্ধনে আবদ্ধ।

চীনের সাথে সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে বেশ কয়েকবার পর্যালোচনা হয়েছে। পরিস্থিতির ওপর ভারত কড়া নজর রাখছে। চীন শুধু পাকিস্তান কেন শ্রীলঙ্কা, নেপাল পারলে বাংলাদেশকে বাগে নিতে চায়। চীনের কাছে পরমাণুসহ অনেক আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র থাকা সত্তে¡ও মনে রাখতে হবে, যুদ্ধ কখনো শান্তি বয়ে আনে না; বরং উভয় দেশের জনগণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ধ্বংস হয় দেশ দু’টি। যুদ্ধ কিন্তু শক্তির উপরে চলে না, এটা বুদ্ধি ও কৌশলের ব্যাপার। কৌশল জানা থাকলে অল্প সৈন্য দিয়ে যুদ্ধে জয় লাভ করা সহজ এবং সেই কৌশলটি ভারতের জানা আছে।

ইতোমধ্যে ভারতের সাবেক সেনাপ্রধান ও চিফ অব ডিফেন্স স্টাফ দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলে দিয়েছেন, ভারত ও চীনের মধ্যকার বিরোধ নিয়ে আলোচনার কোনো সুরাহা না হলে এবং ইন্দো-চীন সীমান্তে লাগাতার বিরোধ চলতে থাকলে যুদ্ধের বিকল্প নেই। সে জন্য ভারতীয় সেনাবাহিনীও পুরোপুরি তৈরি রয়েছে বলে ঘোষণা দিয়েছেন। সৈন্যদের কথা বাদ দিয়ে রাজনৈতিক আলোচনার জন্য চীনকে নমনীয় করার জন্য জাতিসঙ্ঘসহ বিশ্বের বৃহৎ দেশগুলোকে শান্তি ও সৌহার্দ্যরে পক্ষে এগিয়ে এসে আলোচনার পথ সুগম করাই উচিত হবে। চীন সারা বিশ্বে ব্যবসাবাণিজ্য করছে, ভারতেও তার বিরাট বাজার রয়েছে। ভারতকে তার একটি শক্তিশালী প্রতিবেশী দেশ হিসেবে গণ্য করতে হবে। কারণ ভারত এখন আর ১৯৬২ সালের সেই ভারত নেই। প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করার মতো যথেষ্ট শক্তিশালী হয়ে উঠেছে ভারত। শান্তির বাণী মুখে থাকলেও স্বাধীনতার প্রশ্নে নিরাপস ভারত বিপুল রণসজ্জায় নিজেকে সজ্জিত করেছে। সার্বভৌমত্ব নিয়ে ভারত কখনো আপস করে না বিষয়টি চীনকে ভেবে দেখার আহ্বান জানাই।
লেখক : সাংবাদিক ও নিবন্ধকার