যুবশক্তি একটি রাষ্ট্রের মূল শক্তি। বাংলাদেশকে এগিয়ে নিচ্ছে যুবশক্তিই। তারাই বড় করছে বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার। গার্মেন্ট শিল্পে বিপ্লব ঘটাচ্ছে যুবশক্তি। তাছাড়া বাংলাদেশের প্রায় এক কোটি যুবক পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে কর্মরত। এসব খাত থেকে যে আয় হচ্ছে, তা দিয়েই মূলত বাংলাদেশ চলছে; বাংলাদেশ সমৃদ্ধ হচ্ছে, বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার বড় হচ্ছে এবং বাংলাদেশ সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। এই যুব শক্তির ওপর বদনজর দৃষ্টি পড়েছে অপশক্তির।

যুবশক্তিকে ধ্বংস করে দেয়ার ষড়যন্ত্র হচ্ছে বলে প্রতীয়মান হয়। নানা রকমের মাদক সরবরাহ ও সহজলভ্য করে যুবসমাজকে ঠেলে দেয়া হচ্ছে ধ্বংসের দিকে। এটা অবশ্যই একটা ষড়যন্ত্র।

মরণঘাতী নেশা ও অপসংস্কৃতির মরণব্যাধি বাংলাদেশের তরুণ-তরুণীদের তিলে তিলে কুরে কুরে খাচ্ছে। এভাবে তাদের ইচ্ছাশক্তি, কল্পনাশক্তি, মেধাশক্তি, দৈহিক শক্তি ও মানসিক শক্তিও ধ্বংস করে দেয়া হচ্ছে। অন্যদিকে ধ্বংস করছে আমাদের হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী ও গৌরবোজ্জ্বল সংস্কৃতিকে। কথায় আছে, ‘একটি রাষ্ট্রকে ধ্বংস করতে চাইলে, আগে তার সংস্কৃতিকে ধ্বংস করো।’

বাংলাদেশের অবস্থা সেরকমই হয়েছে। ফেনসিডিল আর ইয়াবার ছোবলে গোটা যুবসমাজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। বাংলাদেশের সীমান্তজুড়ে পরিকল্পিতভাবে মাদক তৈরির কারখানা স্থাপন করছে একটি প্রতিবেশী বড় দেশ, যাতে আমরা একটি উন্নত জাতি গঠন করতে না পারি; যার জন্য স্বাধীনতার ৫০ বছর অতিবাহিত হওয়ার পরও আমরা উন্নত মূল্যবোধসম্পন্ন একটি জাতি গঠন করতে সমর্থ হইনি। উপরন্তু কোন ধর্ম, ভাষা ও সংস্কৃতিতে আমাদের প্রজন্ম বেড়ে উঠছে, তা আমরা নিজেরাই জানি না। তবে এটুকু জানি, একটা হ-য-ব-র-ল জাতি হিসেবে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি অন্ধকার গহ্বরের দিকে। অথচ স্বাধীন জাতি হিসেবে মাথা উঁচু করে টিকে থাকতে হলে, আগে প্রয়োজন উন্নত মূল্যবোধসম্পন্ন একটি জাতি গঠন। এর জন্য দরকার সৎ, দূরদর্শী রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও শক্তিশালী সামাজিক নেতৃত্ব। কেননা, সংস্কৃতির সাথে রাজনীতির সম্পর্ক ওতপ্রোত, রাজনৈতিক সচেতনতা ছাড়া সুস্থ সংস্কৃতি চর্চা আশা করা যায় না।

বিদেশী অপসংস্কৃতি, হেরোইন, ফেনসিডিল ও ইয়াবা জায়গা করে নিয়েছে বাংলাদেশের অনেক পরিবারে। তৈরি করছে মূল্যবোধহীন হাজারো সন্তান। তারা না চেনে নিজের দেশকে, না চেনে ধর্ম, না চেনে নিজের ভাষা ও সংস্কৃতি; সর্বোপরি না চেনে নিজের বাবা-মাকে। এ ধরনের সন্তানের হাতেই নৃশংসভাবে জীবন দিতে হচ্ছে বাবা-মাকে। আবার বাব-মায়ের হাতেও জীবন দিতে হচ্ছে সন্তানকে। আপন মমতাময়ী মাও নয়নজুড়ানো প্রাণ ভরানোর মতো আদরের সন্তানকে হত্যা করছেন নির্দয়, নিষ্ঠুর ও নৃশংসভাবে। অপরূপা রূপসীরাও তাদের ভালোবাসার স্বামীদের হাতে প্রাণ দিচ্ছেন। এমনকি শিক্ষকের কাছেও নিরাপদ নয় শিক্ষার্থী। মানুষ গড়ার কারিগর কিছু শিক্ষকও লালসা চরিতার্থ করতে ঝাঁপিয়ে পড়ছেন শিশুছাত্রীর ওপর।

পারিবারিক মূল্যবোধের অভাব ও ধর্মীয় শিক্ষায় উদাসীনতাও সামাজিক অপরাধ বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। বাংলাদেশে আজ অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলে-মেয়েদের হাতে হাতে ইন্টারনেট সংযোগসহ মাল্টিমিডিয়া মোবাইল ফোন। এই ফোনগুলোতে অনায়াসে অশ্লীল ছবি ও ভিডিও ডাউনলোড করা যায়। সাথের বন্ধুদের নিয়ে নির্জন জায়গায় বসে এসব দেখে থাকে অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলেরা। এ থেকেই তাদের মধ্যে লোভ-লালসা-মোহ ও অপরাধপ্রবণতা জাগ্রত হচ্ছে। তারা জড়িয়ে পড়ছে ভয়ঙ্কর সব অপরাধের সাথে। তাতে সমাজে বেড়ে যাচ্ছে ধর্ষণ, যৌন হয়রানি ও নারী নির্যাতন। এ ব্যাপারে পরিবারের দায়িত্ব অপরিসীম। দায়িত্ব আছে রাষ্ট্রেরও।

ভালো মানুষ বা অন্য ভালো যা অর্জন, তা সর্বপ্রথম পরিবার থেকেই সূচিত হয়। সুখ-শান্তি ও নিরাপত্তা অনেকটা পরিবারের ওপর নির্ভর করে। একজন মানুষের প্রথম নিরাপত্তা তার পরিবারে। পরিবার বলতে টুকরো টুকরো পরিবার নয়, যৌথ পরিবার; মানুষ গড়তে যৌথ পরিবারের গুরুত্ব অপরিসীম। যৌথ পরিবারে মানুষের মন-মনন, মেধা ও নৈতিকতা-মূল্যবোধের পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটে। আয়-উন্নতিও যৌথ পরিবারে বেশি হয়। সুতরাং যৌথ পরিবার গড়তে রাষ্ট্রকে এগিয়ে আসতে হবে, রাষ্ট্রকে দিতে হবে সব ধরনের পৃষ্ঠপোষকতা; রাষ্ট্রের সার্বিক শাসন কাঠামোও হতে হবে যৌথ পরিবার গড়ার মুখী।

বাংলাদেশে যৌথ পরিবারের সংখ্যা ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে বলে সমাজে দিন দিন ভয়ঙ্কর সব পারিবারিক অপরাধ বাড়ছে। পারিবারিক অপরাধ বৃদ্ধির ফলে রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলায় তৈরি হচ্ছে নানা নতুন ট্র্যাজেডি, বাড়ছে মাদকাসক্তি। পরিবারে সংঘটিত নেতিবাচক ঘটনার প্রভাব সমাজ ও রাষ্ট্রের সব ক্ষেত্রেই প্রতিফলিত হয়। পারিবারিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের নেতিবাচক প্রভাব কোনো না কোনোভাবে রাষ্ট্রকেই বহন করতে হয়, বাংলাদেশে তা-ই হচ্ছে।

অর্থনৈতিক ও বৈষয়িক উন্নতির জন্য একটি জাতির যেসব সামাজিক ও মানবীয় গুণাবলি প্রয়োজন জাপানি ও চীনা পরিবারগুলোর মধ্যে আছে, এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়। জাপানের শিক্ষাব্যবস্থা, মানবিক মূল্যবোধ, আধুনিক প্রযুক্তি ও কর্মনিষ্ঠা, স্বভাব-চরিত্র, অতিথিপরায়ণতা, পরোপকার, আত্মত্যাগ, আত্মসম্মান ও আত্মমর্যাদাবোধ বিশ্বে যেকোনো জাতির জন্য অনুসরণ ও অনুকরণযোগ্য। যৌথ পরিবার গড়েই জাপানিরা এমন উন্নত নৈতিক, পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধের অধিকারী হয়েছে।

যৌথ পরিবার চীনের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি বৈশিষ্ট্য। চীনা সভ্যতার লক্ষ্য হচ্ছে আদর্শ স্বনির্ভর গ্রাম গড়া। চীনের মানুষ বাস করেছে যৌথ পরিবার গড়ে। যৌথ পরিবার ব্যক্তিজীবনকে দিয়েছে নিরাপত্তা। চীনের মানুষ চেয়েছে আদর্শ রাষ্ট্র গড়ে তার মাধ্যমে আদর্শ মানুষের জীবন গড়ে তুলতে। চীনের সভ্যতা অন্য সভ্যতার মতোই ছিল কৃষিভিত্তিক। চীনের যৌথ পরিবারগুলো গড়ে তুলেছে আদর্শ স্বনির্ভর গ্রাম, যেখানে বাড়িঘরগুলো নিরাপদ; জীবন উপভোগ্য ও আনন্দপূর্ণ। এক গ্রাম থেকে দেখা যাবে অন্য গ্রাম।

আমাদের সভ্যতাও কৃষিভিত্তিক। আমাদের মানুষরা সব সময় চেয়েছে স্বনির্ভর গ্রাম গড়তে। কিন্তু পরিস্থিতি এখন ভিন্ন। এখন গ্রামের মানুষ শহরমুখী। শ্রম বিক্রি করতে মানুষ শহরমুখী হচ্ছে। তাতে গ্রাম ও শহরের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। শহর বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। গ্রামীণ সংঘবদ্ধ জীবন-যাপনে অভ্যস্ত মানুষ হঠাৎ শহরে এসে জড়িয়ে পড়ছে নেশাসহ নানা অপরাধের সাথে। এ প্রবণতা রোধ করতে হবে। গ্রামীণ জীবন ব্যবস্থার দিকে নজর দিতে হবে।

সমাজে মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করতে হলে, পরিবারে ধর্মীয় অনুশাসন অপরিহার্য। ইসলাম ধর্মে সৎ চরিত্র গঠনের নির্দেশনা দেয়া আছে। সন্তানদের ছোট থেকেই পড়ালেখার পাশাপাশি ধর্মীয় শিক্ষা দেয়াও বাধ্যতামূলক। ধর্মীয় অনুশাসনে বেড়ে উঠা সন্তানদের অন্তর্নিহিত শক্তি হয় পরিশুদ্ধ। অন্যায়, পাপাচার, কাম-ক্রোধ মোহ ও যাবতীয় লোভ লালসা এবং অযাচিত চাওয়া-পাওয়া তাদের মনোবৃত্তিকে দুর্বল করতে পারে না। ধর্মীয় মূল্যবোধে বিশ্বাসী ছেলে-মেয়েদের মূল্যবোধ তৈরি হয় পরিবার ও সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতার আলোকে, তাদের কাছে নর সুরক্ষিত, নারীও সুরক্ষিত; সুরক্ষিত পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র। তারা জানে অন্যের মা বোনের ইজ্জত ও সম্ভ্রম নষ্ট হলে, অনুরূপ ইজ্জত ও সম্ভ্রম নষ্ট হবে তাদের মা-বোনদেরও। সুতরাং ধর্মীয় অনুশাসনের প্রতি সবার মনোনিবেশ করা অত্যাবশ্যক।

দেশের কোটি কোটি যুবক দৈহিকভাবে বেঁচে থাকলেও ভেতরে ভেতরে মরে গেছে। মরণঘাতী নেশা ও অপসংস্কৃতির ছোবল তাদের জীবনীশক্তি কেড়ে নিয়েছে। রাষ্ট্র ও সমাজ এ বিষয়ে দ্রæত কার্যকর ও ইতিবাচক পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যৎ অন্ধকার হতে বাধ্য।
লেখক : কলামিস্ট
belaYet_1@yahoo.com