বেকারত্ব বলতে সাধারণত আমরা বুঝি, কর্মক্ষম মানুষ প্রচলিত মজুরিতে কাজ করতে ইচ্ছুক হলেও যখন কাজ পায় না। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (ILO) মতে, কাজপ্রত্যাশী কোনো ব্যক্তি সপ্তাহে একদিন এক ঘণ্টা মজুরির বিনিময়ে কাজের সুযোগ না পেলে এই ব্যক্তিকে বেকার হিসেবে ধরা হবে।
বাংলাদেশ বেকারত্ব একটি অন্যতম আর্থসামাজিক সমস্যা। দেশের মোট কর্মক্ষম জনসংখ্যার প্রায় ৪০ ভাগ বেকারত্বের অভিশাপ নিয়ে বাস করছে এর মধ্যে শিক্ষিত তরুণ বেকারত্বের সংখ্যাই বেশি।
দেশে কর্মমুখী শিক্ষার অভাবে বাড়ছে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা। কারিগরি ও বিশেষায়িত শিক্ষায় যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের চাকরির বাজারে ভালো চাহিদা আছে। কিন্তু চাহিদানুযায়ী দক্ষ জনবল সরবরাহে আমাদের বিদ্যমান শিক্ষাব্যবস্থা যথোপযুক্ত ভ‚মিকা রাখতে পারছে না। ফলে আমাদের দেশের শিক্ষিত বেকাররা ব্যর্থতা ও হতাশায় আক্রান্ত হচ্ছে।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে কর্মমুখী শিক্ষার ভূমিকা অনস্বীকার্য। ভুলে গেলে চলবে না যে, ‘Better Skills, Better Jobs, Better Lives.’
শ্রমঘন কাজে আগ্রহ এবং শ্রমিকের যথাযথ মর্যাদা মানসিকতা থাকা দরকার, ‘শিখবো মোরা শক্ত কাজ, ঘুচবে অভাব মিলবে কাজ’। কিন্তু দুঃখজনক যে, আমাদের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা কর্মবিমুখ।
বাংলাদেশে বেকারত্বের সমস্যা এত প্রকট যে এশিয়া মহাদেশের মধ্যে দ্বিতীয় স্থানে। ১০ বছর আগে এ দেশে প্রায় ১২ লাখ মানুষ বেকার ছিল। কিন্তু বর্তমান দ্বিগুণ হয়ে বেকার জনসংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৭ লাখে। বেকারত্ব আমাদের জন্য যেন একটা অভিশাপে হয়ে গেছে। আশার দিক হচ্ছে, কয়েক বছর থেকে অনলাইন প্লাটফর্মের ব্যবহারে অর্থনৈতিক উন্নতি সাধনে সফল হচ্ছেন দেশের তরুণ প্রজন্ম। যার ফলে চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতায় না গিয়ে নিজেদের যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ করে আয় করা সম্ভব হচ্ছে। বেকারত্ব দূরীকরণে যেমন সহায়ক ভ‚মিকা রাখছে তেমনি দক্ষতা বৃদ্ধি হচ্ছে পাশাপাশি স্বাধীনভাবে কাজ করাও সম্ভব হচ্ছে। অনলাইন প্লাটফর্মের যেসব মাধ্যম থেকে আয় করা যাচ্ছে তা একনজরে দেখা যাক :
ফ্রিল্যান্সিং
অনলাইনে আয়ের ক্ষেত্রে ফ্রিল্যান্সিং কাজ করার বিষয়টি সবচেয়ে জনপ্রিয়। বিভিন্ন ফ্রিল্যান্সারদের দক্ষতার ওপর ভিত্তি করে ফ্রিল্যান্স কাজের সুযোগ দেয় কয়েকটি ওয়েবসাইট। সেখানে অ্যাকাউন্ট খুলে দক্ষতা অনুযায়ী কাজের জন্য আবেদন করতে হয়। কাজদাতা তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী যোগাযোগ করে ফ্রিল্যান্সারকে কাজ দেয়। এসব সাইটের মধ্যে ফাইভার ডটকম, আপওয়ার্ক ডটকম, ফ্রিল্যান্সার ডটকম ও ওয়ার্কএনহায়ার ডটকমে ফ্রিল্যান্সিং কাজ পাওয়া যায়। ঘণ্টায় ৫ থেকে ১০০ ডলার পর্যন্ত আয় করা যায় এসব সাইট থেকে।
উদ্যোক্তা
একটা সময় ব্যবসা বলতে একটা বড় ঘর ভাড়া, সারা দিন সেখানে বসে থাকা এগুলো বুঝাত। এখন সেদিন নেই। অনলাইনের কল্যাণে ঘরে বসেই ব্যবসায়ী হওয়া যাচ্ছে সহজে। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও ব্যবসা করা সম্ভব হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে এখন অধিকাংশ ব্যবসা গড়ে উঠেছে। অনেকে বেশ ভালো করছেন। এ ক্ষেত্রে পণ্যের গুণগতমান এবং সততা জরুরি।
গ্রাফিকস ডিজাইন
অনলাইনে ঘরে বসে আয়ের ক্ষেত্রে গ্রাফিকস ডিজাইন অন্যতম। যারা এই কাজে দক্ষ, তারা বিভিন্ন ডিজাইন অনলাইন মার্কেটপ্লেসগুলোতে দিয়ে রাখেন। সেখান থেকে তাদের আয় আসে। তাদের তৈরি একটি পণ্য অনেকবার বিক্রি হয়, অর্থাৎ একটি ভালো নকশা থেকেই দীর্ঘদিন পর্যন্ত আয় হতে থাকে। এ ছাড়া অনলাইন মার্কেটপ্লেসগুলোতেও গ্রাফিকস ডিজাইনারদের অনেক চাহিদা রয়েছে।
ওয়েবসাইট তৈরি
অন্যকে বানিয়ে দেয়ার পাশাপাশি এখন নিজের জন্য ওয়েবসাইট তৈরি করে আয় করা যাচ্ছে। এ জন্য অনলাইনেই অনেক উপাদান পাওয়া যায়। এর মধ্যে ডোমেইন নির্বাচন, টেমপেট ও ওয়েবসাইট তৈরির নকশা প্রভৃতি। যখন পাঠক বা দর্শককে ওয়েবসাইটের বিভিন্ন কনটেন্ট সেবা দেয়ার প্রস্তুতি শেষ, তখন গুগল অ্যাডসেন্সের জন্য আবেদন করতে পারেন। গুগলের বিজ্ঞাপন যখন সাইটে দেখানো শুরু হবে এবং তাতে ক্লিক পড়বে, তখন আয় আসতে শুরু করবে।
অনলাইন টিউটর
অনলাইন টিউটরদের এখন চাহিদা বাড়ছে। করোনাকালে অনলাইনে শিক্ষা গ্রহণের বিষয়টি ভালোভাবে কাজে লেগেছে। অনেকেই অনলাইনে শিক্ষক হিসেবে বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করতে পেরেছেন। মোটকথা, কোনো বিষয়ে যদি আপনার পারদর্শিতা থাকে, তবে অনলাইনে সে বিষয়ে শিক্ষা দিতে পারেন। সব বয়সী শিক্ষার্থীদের আপনি শিক্ষা দিতে পারবেন। এখানে অন্য দেশের শিক্ষার্থীদেরও পড়ানোর সুযোগ রয়েছে। এ ক্ষেত্র থেকে অনেক আয় করার সুযোগ আছে
অনুবাদ
অনুবাদ যদিও নতুন বিষয় নয়, তবে এখন সেটা আরো সহজ হয়েছে অনলাইনের কল্যাণে। সরাসরি না গিয়ে বাসায় থেকে অনুবাদের কাজ করা যাচ্ছে অনায়াসে। ইংরেজির পাশাপাশি অন্য কোনো ভাষা ভালোভাবে জানা থাকলে সেই দক্ষতা কাজে লাগিয়ে আয় করতে পারেন। বেশ কিছু ওয়েবসাইট আছে যেখানে বিভিন্ন ডকুমেন্ট অনুবাদ করে আয় করতে পারেন। যাদের স্প্যানিশ, ফ্রেঞ্চ, আরবি, জার্মানসহ অন্যান্য ভাষা জানা আছে এবং এগুলো থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ বা ইংরেজি থেকে এসব ভাষায় অনুবাদ করতে পারলে ভালো আয় করতে পারবেন।
ওয়েব ডিজাইন
এখনকার অনলাইনের কাজের ক্ষেত্রে ওয়েব ডিজাইনের চাহিদা ব্যাপক। কোনো প্রজেক্টে ২০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত সহজে আয় করা যায়। সব ব্যবসায়ী প্রযুক্তিপ্রেমী নন। নিজেদের ওয়েবসাইট তৈরিতে তাদের ওয়েব ডিজাইনারের দরকার পড়ে। ওয়েবসাইট তৈরিতে এখন কোডিং আর ওয়েব ডিজাইন দু’টিই গুরুত্বপূর্ণ। এ ছাড়া ওয়েবসাইট ব্যবস্থাপনা ও হালনাগাদের জন্যও ওয়েব ডিজাইনারকে দরকার পড়ে। ফলে ডিজাইনারকে বসে থাকতে হয় না। ক্লায়েন্ট ও কাজের ওপর ভিত্তি করে ওয়েব ডিজাইনারের আয় বাড়তে থাকে।
জরিপ, সার্চ ও রিভিউ
অনলাইন জরিপে অংশ নিয়ে অর্থ আয় করতে পারেন। অনেক ওয়েবসাইট জরিপে অংশ নিলে অর্থ দেয়। এ ছাড়া অনলাইন সার্চ ও পণ্যের পর্যালোচনা লিখে আয় করতে পারেন। তবে এ ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশের পাশাপাশি ক্রেডিট কার্ড বা ব্যাংকিং তথ্য দিতে হতে পারে। তাই এ ক্ষেত্রে কাজ করার সময় সতর্কভাবে কাজ করতে হবে।
ভার্চুয়াল সহকারী
এখন ভার্চুয়াল সহকারীদের কাজের ক্ষেত্র বেড়েছে। ঘণ্টাপ্রতি আয়ও বেশি। বাড়ি থেকে করপোরেট অফিসের নানা কাজ অনলাইনে করে দেয়ার সুবিধা আছে এখন। বিভিন্ন দক্ষতার ভিত্তিতে ভার্চুয়াল অ্যাসিস্ট্যান্ট নিয়োগ দেয় প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে ফোন কল, ই-মেইল যোগাযোগ, ইন্টারনাল রিসার্চ, ডেটা এন্ট্রি, এডিটিং, রাইটিং, বগ, গ্রাফিকস, টেক সাপোর্ট, সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবস্থাপনার মতো কাজ থাকে। ২৪/৭ ভার্চুয়াল অ্যাসিস্ট্যান্ট, অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যাচ, ফ্রিল্যান্সার ডটকম, পিপল পার আওয়ার, আপওয়ার্কের মতো সাইটগুলোতে কাজ পাওয়া যায়।
সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম
ফেসবুক, টুইটার, ইনস্টাগ্রাম, স্ন্যাপচ্যাট এখন আর শুধু বন্ধুদের সাথে যোগাযোগের জন্য নয়। এগুলো কাজে লাগিয়ে আয় করতে পারেন। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্র্যান্ডের পক্ষ থেকে সোশ্যাল মিডিয়া পরিকল্পকদের প্রচুর অর্থ দেয়া হয় তাদের ব্র্যান্ডের প্রচার করার জন্য। অনলাইনে গ্রাহক টানা, প্রচার করার জন্য অবশ্য সৃজনশীলতা দরকার। বিভিন্ন পোস্ট তৈরি, ভিডিওর মাধ্যমে ফেসবুক বা অন্যান্য মাধ্যমে প্রকাশ করে তা ভাইরাল করতে পারলে ভালো অর্থ আসে। তবে সোশ্যাল মিডিয়ায় ফ্যান-ফলোয়ার তৈরিসহ তাদের ধরে রাখতে প্রচুর ধৈর্য ও প্রাসঙ্গিক বিষয় হওয়া জরুরি।
ইউটিউব
যারা ব্লগ লিখে আয় করতে স্বচ্ছন্দ নন, তারা ক্যামেরার সাহায্য নিয়ে ভিডিও থেকে আয় করতে পারেন। এ জন্য অবশ্য সৃজনশীল আর ভালো সম্পাদনা জানতে হবে। নিজের ইউটিউব চ্যানেল খুলে তাতে ভিডিও আপলোড করে সেখান থেকে আয় করতে পারেন। যে বিষয়ে মানুষের আগ্রহ বেশি, সেই বিষয়ে ভিডিও না রাখলে মানুষ তা দেখবে না। চ্যানেলের সাবসক্রাইবার ও ভিডিও দেখার সময় বাড়লে আয়ের সম্ভাবনা বাড়বে। প্রতি হাজার ভিউয়ের হিসাবে গুগল থেকে অর্থ পাবেন। এ ছাড়া কন্টেন্ট তৈরির জন্য ইউটিউব কর্তৃপক্ষ থেকে প্রণোদনারও ব্যবস্থা রয়েছে।
কনটেন্ট রাইটিং
যারা লেখালেখিতে ভালো এবং একাধিক ভাষায় সাবলীল লিখতে পারেন, তাদের কাজের জন্য বসে থাকতে হয় না। অনলাইন প্লাটফর্মগুলোতে কাজ করে বা লিখে দক্ষতা অর্জন করতে পারেন। আর্টিকেল লেখার মানের ওপর ভিত্তি করে আয় আসে।
উপরেরগুলো ছাড়াও অনলাইন প্লাটফর্মে অসংখ্য মাধ্যম রয়েছে। দক্ষতা অনুযায়ী কাজ করে আয় করা যাচ্ছে।
অনলাইন আয় : ইসলামী দৃষ্টিকোণ
ইবাদত কবুলের অন্যতম শর্ত হালাল উপার্জন। সুতরাং আমাদের ইনকাম শতভাগ হালাল হওয়া চাই। মহাগ্রন্থ আল-কুরআনের সুরা বাকারার ২৭৫ নং আয়াতে ইরশাদ করেন, আল্লাহ তায়ালা ব্যবসা হালাল করেছেন আর সুদকে হারাম করেছেন।
অনলাইনের এসব প্লাটফর্মের মাধ্যমে কাজ এবং নির্ধারিত হারে পারিশ্রমিক প্রাপ্তিতে কোনো সুদি বা হারাম লেনদেনের প্রসঙ্গ নেই। বরং নিজের কর্মদক্ষতা এবং পরিশ্রমের বিনিময়ে এখানে উপার্জন করতে হয়। নিজের বুদ্ধি দিয়ে যাচাই করতে ভুলে গেলে চলবে না। যদি না বুঝে আসে তবে ইসলামিক স্কলারদের সহায়তা নেয়া যেতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে অবশ্যই কুরআনের একটি মৌলিক নীতির প্রতি লক্ষ রাখতে হবে। পবিত্র কুরআন বলছেন,‘সৎকর্ম ও তাকওয়ায় তোমরা পরস্পরের সহযোগিতা কর। মন্দকর্ম ও সীমালঙ্ঘনে পরস্পরের সহযোগিতা করো না। আর আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ আজাব প্রদানে কঠোর।’ [সূরা মাইদা-২]
এই আয়াত থেকে যে মূলনীতি বেরোয় তা হলো, ‘হালাল কাজে সহযোগিতা এবং হারাম কাজে অসহযোগিতা।’ সুতরাং এ নীতিতেই অনলাইন হোক বা অফলাইন ব্যবসা করা যাবে। ইনকাম করা যাবে। তাই বলে কোন অ্যালকোহল, সিনেমা বা সুদি প্রতিষ্ঠানের কাজে অংশ নেয়া যাবে না।
অন্য দিকে নানা আকর্ষণীয় প্যাকেজ দেখিয়ে এবং প্রায় বিনা পরিশ্রমে মোটা অঙ্কের লাভের প্রতিশ্রুতি দিয়ে অনেকে প্রতারণা করছে। এদের সাথে সংশ্লিষ্ট হওয়া মোটেই বৈধ হবে না। বিধর্মীদের সাথে যেহেতু ব্যবসা করা জায়েজ, সে হিসেবে ফ্রিল্যান্সিং করে যেকোনো ধর্মের মানুষ বা প্রতিষ্ঠানের কাজ করে টাকা ইনকাম করলে তা হারাম হবে না।
