ভাষা মানুষের জীবনে অতি মূল্যবান সম্পদ। পৃথিবীতে প্রায় সাড়ে ৭০০ কোটি মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত কয়েক সহস্র ভাষার মধ্যে বাংলা একটি অন্যতম প্রধান ভাষা। নিজস্ব সমৃদ্ধ শব্দভাণ্ডার থাকার পরও যুগে যুগে নানা ভাষা থেকে প্রয়োজনীয় শব্দসম্ভার নিয়ে বাংলা ভাষা উৎকর্ষ লাভ করেছে। প্রতিটি জাতিগোষ্ঠীর মানুষের পরিচয়ের প্রধান বাহন মাতৃভাষা। মাতৃভাষা সমাসবদ্ধ পদ। বাংলা ব্যাকরণের নিয়ম অনুযায়ী ষষ্ঠী তৎপুরুষ সমাস। আভিধানিক অর্থ স্বদেশের ভাষা। ভাষা খেলা করে জিবের ডগায়। ঘোষিত হয় গলার মধ্য দিয়ে। প্রাণ লাভ করে ফুসফুসে আর এর উৎসমূল মানুষের মন। প্রতিটি শিশুর জন্য মায়ের দুধ যেমন পুষ্টিকর, তেমনি প্রতিটি মানুষের জীবনের উন্নতির জন্য মাতৃভাষা পুষ্টিকর। ভাষা যেকোনো জাতির মেধার অনন্য লালন ক্ষেত্র। জাতির মননের আকর্ষণীয় স্থাপত্য। সমগ্র বিশ্বে প্রায় সব ক্ষেত্রে ভাষার ভূমিকা এ রকমই হয়ে থাকে।
এই মাতৃভাষাকে অবলম্বন করেই গড়ে উঠেছে বিশ্বের প্রতিটি জাতিগোষ্ঠীর ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বিশ্বের সব মানুষের এক মৌলিক সম্পদ হচ্ছে তার মাতৃভাষা। একমাত্র মাতৃভাষার মাধ্যমেই মানুষ তার মনের ভাবকে পরিপূর্ণভাবে প্রকাশ করতে পারে। আমাদের মাতৃভাষার জন্য ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বুকের তাজা রক্ত দিয়ে বীর বাঙালি বিশ্ব ইতিহাসে আত্মত্যাগের অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। তাই এই দিনটিকে বিশ্ববাসী আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
একুশে ফেব্রুয়ারি প্রতিটি বাঙালির জাতীয় জীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। এর সাথে জড়িয়ে আছে বাঙালির গৌরব ও বেদনার ইতিহাস। মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষায় তরুণ সমাজকে জীবন দিতে হয়েছিল বলে দিনটি বেদনায় নীল। পক্ষান্তরে ভাষা আন্দোলনের পথে বাঙালি তার স্বাধিকার অর্জনের সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়ে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় সক্ষম হয়েছে বলে এ দিনটি জাতীয় জীবনে একান্ত গৌরবের। বুকের রক্তঝরা ওই আন্দোলনের ভেতর দিয়ে অর্জিত হয়েছে বাঙালির ভাষা ও সাংস্কৃতিক অধিকার। তাই আমাদের জাতীয় জীবনে প্রেরণাদীপ্ত একুশে ফেব্রুয়ারি অসাধারণ তাৎপর্য বহন করে।
একুশে ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার পেছনেও রয়েছে নিরন্তর সাধনা ও সংগ্রাম। এ ধারণাটির রূপকার ও প্রথম প্রস্তাবক কানাডা প্রবাসী বাঙালি রফিকুল ইসলাম ও তার সহযোগী আবদুস সালাম। তাদের প্রতিষ্ঠিত ‘The Mother Language Lover of the World’ সংগঠনের মাধ্যমে ২৯ মার্চ ১৯৯৮ সালে জাতিসঙ্ঘের তৎকালীন মহাসচিব কফি আনানের কাছে ২১ ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ ঘোষণার প্রস্তাব করে একটি চিঠি পাঠান। এ চিঠিতে ইংলিশ, ফিলিপিনো, ক্যান্ডানিজ, মালয়, জার্মান, হিন্দি ও বাংলাভাষী অর্থাৎ সাত জাতি ও সাত ভাষার ১০ জন স্বাক্ষর করেন। এরপর প্রায় এক বছর পার হয়ে যায়। পরে উদ্যোক্তারা ইউনেস্কো কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করেন। ইউনেস্কোর সদর দফতরের ভাষা বিভাগের আন্না মারিয়া কর্তৃক রফিকুল ইসলামকে ৩ মার্চ ১৯৯৯ সালে চিঠিতে ইতিবাচক উত্তর দিয়ে বলেন, বিষয়টি রাষ্ট্র কর্তৃক উত্থাপিত হতে হবে। সে অনুযায়ী উদ্যোক্তারা বাংলাদেশ সরকারের সাথে যোগাযোগ করেন। তৎকালীন সরকারের নির্দেশে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ৯ সেপ্টেম্বর ১৯৯৯ সালে ১৭ লাইনের প্রস্তাব প্যারিসে পাঠায়। ইউনেস্কোর ৩০তম সাধারণ অধিবেশনে যোগদানকারী বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল ও তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী বিভিন্ন দেশের মন্ত্রীদের সাথে বৈঠক করে বাংলাদেশের প্রস্তাবের সপক্ষে জনমত গড়ে তোলেন। ২৮ অক্টোবর বাংলাদেশের শিক্ষামন্ত্রী ইউনেস্কোর অধিবেশনে একুশে ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ ঘোষণার প্রস্তাবটি উত্থাপন করেন। পরে ইউনেস্কোর এক বিশেষ কমিশনে প্রস্তাবটি অনুমোদন লাভ করে। অবশেষে ১৭ নভেম্বর ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কোর সাধারণ অধিবেশনে গৃহীত প্রস্তাবে বলা হয়- ‘১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রæয়ারি বাংলাদেশে মাতৃভাষার জন্য অভূতপূর্ব আত্মত্যাগের স্বীকৃতিস্বরূপ ও সেদিন যারা প্রাণ উৎসর্গ করেছেন, তাদের স্মৃতির উদ্দেশে দিনটিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ ঘোষণার প্রস্তাব করা হচ্ছে।’ ইউনেস্কোর সাধারণ অধিবেশনে উপস্থিত সব সদস্য রাষ্ট্র সাথে সাথে বিপুল করতালির মধ্য দিয়ে প্রস্তাবটি গ্রহণ করে। এভাবেই একুশে ফেব্রুয়ারি স্বীকৃতি পায় ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে।
যেকোনো জাতির আত্মপরিচয়ের মধ্যে তার মাতৃভাষা খুবই মূল্যবান। একটি দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক হচ্ছে ভাষা। সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণে ভাষা হচ্ছে সবচেয়ে শক্তিশালী কার্যকর মাধ্যম। মাতৃভাষার প্রচলন শুধু ভাষাগত বৈচিত্র্য, বহুভাষাভিত্তিক শিক্ষাকেই উৎসাহিত করবে না, তা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অনুধাবন ও উন্নয়নের ক্ষেত্রেও অবদান রাখবে। প্রতিটি মাতৃভাষাকে যথাযোগ্য মর্যাদা দেয়া, বিশেষ করে দুর্বল ও জীর্ণ মাতৃভাষাগুলোকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করা এবং দুর্বল বলে কোনো ভাষার ওপর প্রভুত্ব আরোপের অপচেষ্টা না করাই হচ্ছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের তাৎপর্য। প্রত্যেক ভাষাভাষী মানুষ এ দিনে নিজের মাতৃভাষাকে যেমন ভালোবাসবে তেমন অন্য জাতির মার্তভাষাকেও মর্যাদা দেবে। পৃথিবীর সব মানুষের মাতৃভাষাকে সম্মান জানানোর দিন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। এভাবে একুশে ফেব্রুয়ারিকে বুকে ধারণ করে মাতৃভাষাকে ভালোবাসার প্রেরণা পাবে মানুষ।
মাতৃভাষার চর্চা ও বিকাশের ক্ষেত্রে আমরা এখনো অনেক পিছিয়ে আছি, যা ভাষা আন্দোলনের চেতনার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। প্রজ্ঞাপন-বিজ্ঞপ্তি দিয়ে সেটি করা সম্ভব বলেও অনেকে মনে করেন না। এ জন্য প্রত্যেকের ব্যক্তিগত উপলব্ধিকে শাণিত করতে হবে, পরিভাষা-অভিধানসহ সম্ভাব্য সব উপকরণ সহজলভ্য করার মাধ্যমে ভাষাচর্চার পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে এবং বিজাতীয় মনমানসিকতা থেকে বিনা প্রয়োজনে বিদেশী ভাষা ব্যবহারের অপচেষ্টাকে নিরুৎসাহিত করতে হবে। যদি সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালু না হয় তবে একুশে ফেব্রুয়ারি শুধু আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে। এর আদর্শ, এর শিক্ষা অধরাই থেকে যাবে, যা কোনো আত্মতুষ্টির বিষয় হতে পারে না।
আমাদের মাতৃভাষার ব্যবহার ও প্রয়োগ আরো ব্যাপকভাবে বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। কবি, লেখক, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, দার্শনিক তথা কলম কারিগররা মাতৃভাষায় তাদের সুনিপুণ লেখনীর আঁচড়ে কাব্য, সাহিত্য ও বিভিন্ন মতবাদ রচনা করেছেন এবং যথাযথ সম্মানও পেয়েছেন। বাংলা সাহিত্যের শক্তিশালী প্রাণপুরুষ মাইকেল মধুসূদন দত্ত মাতৃভাষা ছেড়ে ইংরেজিতে সাহিত্য রচনা করতে গিয়ে ব্যর্থ মনোরথে ফিরে এসে পুনরায় বাংলা ভাষায় কলম ধরে সফলকাম হয়েছিলেন।
ভাষা আন্দোলনের মহান অর্জন সমুন্নত রাখতে, মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে চির জাগরূক রাখতে নারী-পুরুষ, তরুণ-যুবক তথা সব বাঙালিকে ঐক্যবদ্ধভাবে সচেষ্ট থাকতে হবে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের সীমানা পেরিয়ে সমৃদ্ধির দ্বারে প্রবেশ করতে। আর আমাদের অবিরাম সংগ্রাম করে যেতে হবে একটি সমৃদ্ধশালী ও দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে যাতে থাকবে না ধর্ম-বর্ণ-দল-মতের বিভেদ। পৃথিবীতে মাতৃভাষার সম্মান রক্ষার জন্য আত্মাহুতি দেয়ার ঘটনা বিরল। এ জন্য জাতি হিসেবে আমরা গর্বিত। সেই গর্ব, সেই অহঙ্কার নিয়ে বাংলা ও বাঙালির ভাষাগত ঐতিহ্য, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও ইতিহাসকে এগিয়ে নেয়ার সার্বক্ষণিক চেষ্টাই করতে হবে আমাদের। আর তার মাধ্যমেই ভাষা আন্দোলনের শহীদদের প্রতি যথার্থ সম্মান প্রদর্শন করা সম্ভব বলে আমরা বিশ্বাস করি।
