যখন কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকার না থাকে, ব্যক্তির মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকে না, জনগণের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নষ্ট করা হয়, রাজনৈতিক স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা হয় তখন যে সঙ্কট তৈরি হয় তা রাষ্ট্রীয় সঙ্কট। ক্ষমতাসীনরা এ ধরনের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ক্ষমতায় থাকার জন্য রাষ্ট্রীয় প্রশাসনযন্ত্র ব্যবহার করে সাময়িক সফলতা অর্জন করে। এ প্রক্রিয়ার সরকার একক কর্তৃত্বে রাষ্ট্র পরিচালনা করে।
সীমিত রাজনৈতিক ক্রিয়াকলাপের সুযোগ দিয়ে মূলত বল প্রয়োগ এবং একক কর্তৃত্বে রাষ্ট্র পরিচালনার বিষয়টি এক ধরনের একনায়কতান্ত্রিক বা স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থা। যখন কোনো রাষ্ট্র এমন ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে যায় তখন সেটিকে রাষ্ট্রীয় সঙ্কট হিসেবেই দেখা হয়। সরকার যদি ব্যক্তি, রাষ্ট্র ও সমাজ জীবন কঠোর নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে পরিচালনা করে তখন তা হয় সর্বাত্মক ব্যবস্থা। এ ব্যবস্থায় সরকার কখনো আদর্শবাদী হয়, কখনো আদর্শহীন হয় আবার কখনো সাম্যবাদী বা ফ্যাসিবাদী হয়। এ ধরনের রাষ্ট্রীয় সঙ্কট থেকে পরিত্রাণ পেতে প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলসহ ব্যাপক রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে একটি ‘ফ্রি অ্যান্ড ফেয়ার’ ইলেকশন করার প্রয়োজন হয়। অন্য কথায় একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে এ ধরনের রাষ্ট্রীয় সঙ্কট থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। এ জন্য তিন ধরনের নির্বাচনকালীন সরকার হতে পারে।
যদি নির্বাচনকালীন ক্ষমতাসীন দল রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকে তাহলে তারা নির্বাচনী প্রচারকাজে বিশেষ সুবিধা পেয়ে থাকে। অন্য দলগুলো প্রচারকাজে সমান সুবিধা পায় না। এ ব্যবস্থায় সাংবিধানিক পদে থেকে ব্যক্তি নির্বাচন করার বৈধ সুযোগ পায় এবং প্রশাসনযন্ত্রকে নিজের অনুকূলে ব্যবহার করে। আমাদের মতো দরিদ্র বা উন্নয়নশীল দেশগুলোতে লক্ষ করা যায়, নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল বিপুল ভোটের ব্যবধানে জয়লাভ করে। তাই এ ব্যবস্থার মাধ্যমে নির্বাচন করলে জনসমর্থন সঠিকভাবে যাচাই হয় না।
বিশেষ ব্যবস্থায় যদি বহু দল নিয়ে নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করা হয় তাহলে এখানে একটি বিশৃঙ্খল অবস্থার সৃষ্টি হয়। কারণ এদেরও নির্বাচন করার সুযোগ থাকে। এমপিরা স্বপদে বহাল থাকেন বলে নির্বাচনী ফলাফল তাদের অনুকূলে আনার প্রচেষ্টা চালান। আর যারা এমপি নন কিন্তু নির্বাচনকালীন সরকারে রয়েছেন তারাও তাদের প্রার্থিতার সুযোগে নির্বাচনী ফলাফল নিজের অনুকূলে নিয়ে আসার চেষ্টা করেন। এ অবস্থা থেকে মুক্তির জন্য একটি সমঝোতায় আসতে হয়। যদি দলগুলো কোনো সমঝোতায় না আসে তাহলে নির্বাচনব্যবস্থা অর্থহীন হবে।
দলবিহীন সরকারব্যবস্থায় এই সরকারের কোনো পদে থাকা ব্যক্তি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারে না বলে নির্বাচন বিশ্বাসযোগ্য হয়। প্রফেসর ড. এস এম হাসান তালুকদার তার ‘নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠান, নির্বাচন কমিশন গঠন ও নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থা : প্রেক্ষাপট বাংলাদেশ’-শীর্ষক প্রবন্ধে আইনের জগতে তিন ধরনের নির্বাচনকালীন সরকারের কথা উল্লেখ করেছেন। প্রথম হলো ইনকামবেন্ট সরকার (Incumbent Government)। এরা হলো তারা, যারা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছে এবং নির্বাচনকালীনও রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থেকে রাষ্ট্র পরিচালনা করে। এই সরকারের রাজনৈতিক সদস্যরা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারে ও স্বপদে বহাল থাকতে পারে। বহুদলীয় সরকার (Many Parties Government)। এরূপ সরকারের রাজনৈতিক সদস্যরাও স্বপদে বহাল থেকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারে। তৃতীয় হলো- নির্দলীয় সরকার বা তত্ত্বাবধায়ক সরকার (No Parties Government)।
১৯৯৬ সালে সাংবিধানিকভাবে নির্দলীয় সরকারব্যবস্থার প্রবর্তন করা হয়েছিল। রাজনীতিতে এর সুফলও ছিল। আমাদের দেশে ১৯৯১ সালে পঞ্চম, ১৯৯৬ সালে সপ্তম এবং ২০০১ সালে অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচন এ ব্যবস্থার মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনও নির্দলীয় নির্বাচনকালীন সরকারের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়। তবে এই সরকারকে ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন ‘জরুরি সরকার’, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) এম সাখাওয়াত হোসেন ‘সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ বলে অভিহিত করেছেন। এই সরকারের প্রধান ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ফখরুদ্দীন আহমদ। প্রকৃতপক্ষে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন সেনা হস্তক্ষেপে নির্দলীয় সরকারের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়েছিল। এই নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতাও প্রশ্নবিদ্ধ ছিল। এই নির্বাচনে বাংলাদেশের প্রধান শক্তিশালী রাজনৈতিক দল বিএনপি ৩০টি আসনে জয়লাভ করায় নির্বাচনের ফলাফল ব্যাপক প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছিল।
প্রকৃত অর্থে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নির্দলীয় সরকারের অধীনেই গ্রহণযোগ্য হয় এটি বাংলাদেশে প্রমাণিত সত্য।
ভারতীয় উপমহাদেশে চার্বাক নামে এক দার্শনিক ছিলেন, তার প্রসিদ্ধ উক্তি হলো, ‘ঋণং কৃত্বা ঘৃতং পিবেৎ’- অর্থাৎ ঋণ করে হলেও ঘি খাও। কিন্তু ঋণ পরিশোধের চিন্তা তার ভোগবাদী নাস্তিক্যবাদী মাথায় ছিল না। অনুসারীদের তিনি পূর্বপুরুষের সম্পত্তি শেষ করে এবং ঋণ করে আভিজাত্য ধরে রাখার বিপজ্জনক ও দায়িত্বহীন উপদেশই রেখে গেছেন।
আমাদেরও একই অবস্থা। বাহ্যিক ও চাকচিক্যময় উন্নয়নের কথা বলে আমরাও দেশের অর্থভাণ্ডার নাজুক করে ঋণ গ্রহণের মাধ্যমে রাষ্ট্রকে বিপদে ফেলছি। বর্তমানে দেশের যে অবস্থা চলছে তা দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতির ইঙ্গিত দেয়। দেশ অকার্যকর হয়ে পড়ার আশঙ্কাও করেন কেউ কেউ। এ অবস্থা থেকে মুক্তির দু’টি পথ রয়েছে। একটি হলো খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি করে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন, অন্যটি হলো সরকার পরিবর্তন। অভিজ্ঞতা থেকে বলতে হচ্ছে সরকার পরিবর্তন জন্য তিনটি উপায় রয়েছে।
নির্বাচনের মাধ্যমে, গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে এবং অনাকাক্সিক্ষত সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে।
নির্বাচনের মাধ্যমে : বাংলাদেশের বর্তমান সাংবিধানিক ব্যবস্থায় নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনের সম্ভাবনা শূন্য বলা যায়। কারণ বর্তমান সাংবিধানিক ব্যবস্থায় ইনকামবেন্ট সরকারের অস্তিত্ব রয়েছে। বিভিন্ন মিডিয়ার তথ্য অনুসারে, এরা দুর্নীতিগ্রস্ত। ফলে পরবর্তীতে নিশ্চিত শাস্তি ভোগের আশঙ্কায় এরা ক্ষমতা ছাড়বে না। যেহেতু নির্বাচনকালীন সরকারে এরাই থাকবে সেহেতু নির্বাচনের মাধ্যমে এদের পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব নয়। নির্বাচন হলেও এটা অগ্রহণযোগ্য ও অবিশ্বাস্য নির্বাচন হবে। ক্ষমতার পরিবর্তন হবে না।
গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে পরিবর্তন : দেশের বিদ্যমান সঙ্কটে জনগণ যখন অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে তখন জনগণ সরকার পতনের প্রত্যাশায় থাকে। এই অবস্থায় সরকার পতনের ডাক দেয়ার মতো একজন নেতার দরকার হয়। এই আন্দোলনের ডাক দেয়া নেতার আহবানে জনগণ যখন সাড়া দেয় তখন তা হয় গণ-অভ্যুত্থান। আন্দোলনের ডাক দেয়ার মতো নেতার তিনটি বৈশিষ্ট্য থাকতে হবে। প্রথমত, তার অভ্যন্তরীণ ব্যাপক জনসমর্থন থাকতে হবে; দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক বিশ্বের ব্যাপক পরিচিতি থাকতে হবে অথবা তাকে বুদ্ধি পরামর্শদাতাদের বহির্বিশ্বের গ্রহণযোগ্যতা থাকতে হবে; তৃতীয়, তাকে বাগ্মী হতে হবে-তাকে হতে হবে অনলবর্ষী বক্তা।
বর্তমানে সরকার পতনের যে আন্দোলন বাংলাদেশে চলছে তাকে গণ-অভ্যুত্থান বলা যাবে না। তবে এখানে যে নেতা রয়েছে তার ব্যাপক জনসমর্থন রয়েছে। বহির্বিশ্বেও তার সমর্থন রয়েছে বা তাকে সমর্থন দেয়া গোষ্ঠীর বহির্বিশ্বে পরিচিতি রয়েছে। তার নেতৃত্ব রয়েছে নবীন, প্রবীণ ও বিজ্ঞ রাজনীতিবিদ, বিজ্ঞ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের বহির্বিশ্বেও সমর্থন আছে। ফলে গণ-অভ্যুত্থানের ডাক দিলে সফল হওয়ার সম্ভাবনা আছে।
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের প্রধানতম রাজনৈতিক দল। এছাড়াও এই দলটি মূলত ২০০৯ সাল থেকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় রয়েছে। সরকারের শাসন বিভাগ, বিচার বিভাগ ও সশস্ত্র বিভাগকে এরা নিজেদের মতো করে সাজিয়েছে। তাই সরকার হঠানোর জন্য গণ-অভ্যুত্থানের ডাক দিলে সরকার তার আধাসামরিক বিভাগ ও সশস্ত্র বিভাগকে ব্যবহার করতে পারে। ফলে দেশ ভয়ঙ্কর সঙ্ঘাতময় পরিস্থিতির দিকে যেতে পারে। এর পরও সরকারের পতন হলে বিক্ষুব্ধ জনগণ প্রতিশোধপরায়ণ হতে পারে। মোটের ওপর বলতে গেলে দেশ একটি দীর্ঘমেয়াদি সমস্যার মুখে পড়তে পারে, যা কাম্য হতে পারে না।
সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে পরিবর্তন : সামরিক অভ্যুত্থান হতে পারে দুই ধরনের। রক্তক্ষয়ী এবং রক্তপাতহীন। বাংলাদেশে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ঘটে যাওয়া ঘটনাটি ছিল রক্তক্ষয়ী। ১৯৭৭ সালে পাকিস্তানে জুলফিকার আলী ভুট্টোকে ক্ষমতাচ্যুত করে তারই নিয়োগকৃত আর্মি প্রধান জেনারেল জিয়াউল হক পাকিস্তানের রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন। এটি রক্তপাতহীন সামরিক অভ্যুত্থান।
বাংলাদেশে ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ লে. জে. হুসেইন মো: এরশাদ রক্তপাতহীন সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তারকে ক্ষমতাচ্যুত করে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন। পাকিস্তানে জেনারেল পারভেজ মোশাররফ ১৯৯৯ সালে রক্তপাতহীন অভ্যুত্থানে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফকে হটিয়ে ক্ষমতা দখল করেন।
বাংলাদেশে ২০০৭ সালের জানুয়ারি মাসে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি প্রফেসর ড. ইয়াজউদ্দিন আহমেদকে অকার্যকর করে বাংলাদেশ ব্যাংকের অবসরপ্রাপ্ত গভর্নর ড. ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে যে উপদেষ্টা পরিষদ গঠিত হয় তার পেছনে সেনা হস্তক্ষেপ ছিল তা বাস্তবে প্রমাণিত। এই সরকার ছিল রক্তপাতহীন সেনা অভ্যুত্থানের ফসল।
এসব আলোচনার পর প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এখন কী করা দরকার তা গভীরভাবে ভেবে দেখতে হবে। আমাদের ধারণা, রাজনৈতিক অঙ্গনে যে পাল্টাপাল্টি অবস্থান দেখা যাচ্ছে তার পরিবর্তে সমঝোতার পথে এগোতে না পারলে আমাদের পক্ষে ভয়াবহ পরিণাম এড়ানো কঠিন হবে।
লেখক : শিক্ষক, বিশ্লেষক
ইমেল : kazimain@gmail.com
