এগিয়ে যাওয়ার অপর নাম উৎসাহ। কিন্তু বর্তমান সময়ে মানুষের মধ্যে যে বিষয়টির অভাব সবচেয়ে বেশি সেটা হলো উৎসাহ দেয়া। দেশ এবং সমাজের মানুষ এগিয়ে যাওয়ার জন্য উৎসাহ এবং প্রেরণা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং অতীব জরুরি। আমাদের বর্তমান সমাজে কিছু ব্যক্তি রয়েছে, যাদের ভেতর উৎসাহ দেয়ার প্রবণতা না থাকলেও এগিয়ে যাওয়ার পথে বাধা দেয়ার প্রবণতা আছে। তারা সমাজের যেকোনো ব্যক্তির উন্নয়ন দেখলে তাদের সমালোচনা করতে আগ্রহী হয়ে ওঠে। তাদের কাজ হয়ে দাঁড়ায় কোথায়, কার কী ভুল হয়েছে; সেটা নিয়ে বিশ্লেষণ করা। কিন্তু সেই ভুলের সমাধান কেউ দেয় না। মানুষকে ভালো কাজে এগিয়ে যাওয়ার পথে উৎসাহ দিতে না পারলেও মন্দ কাজে উৎসাহ দেয়ার মতো কিছু বিষাক্ত মানুষ আমাদের সমাজে বসবাস করে এখনো। তবে কোনো এক কবি তার কবিতায় বলেছেন, ‘পাছে লোকে কিছু বলে’। অন্যের কথায় কান না দিয়ে নিজের লক্ষ্যকে বাস্তবায়ন করতে হবে। আমাদের নিজেদের স্থানে নিজেদের পৌঁছাতে হবে। কে কী বলেছে সেটা শুনে সময় নষ্ট করার প্রয়োজন নেই। তবে এটাও বাস্তব অনেক সময় সামান্য উৎসাহের অভাবে ঝরে যায় দেশের অনেক সম্পদ। যারা হয়তো একদিন দেশের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকত। কিন্তু সেই উৎসাহ দেয়ার মতো মানুষ আমাদের সমাজে খুবই কম। সহপাঠী, বন্ধু, ছোটদের চেয়েও বড়রা উৎসাহ দিলে সেটা বেশি গ্রহণযোগ্য এবং প্রেরণাময় হয়।

আজকের প্রজন্ম উৎসাহ পাবে বিগত প্রজন্ম থেকে। আজকের প্রজন্ম থেকে উৎসাহ পাবে আগামী প্রজন্ম। একজন বন্ধু অন্য বন্ধুকে উৎসাহ দিতে পারে। মা-বাবার পরে বড় ভাই তার ছোট ভাইকে উৎসাহ দিতে পারে। শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের উৎসাহ দিতে পারে। সমাজের মুরব্বিরা সমাজের যুবকদের এগিয়ে যেতে উৎসাহ দিতে পারে। এই উৎসাহ দিতে কারো কোনো প্রকারের কষ্ট কিংবা ক্ষতি হবে বলে মনে হয় না। তবুও কেন আমরা এত কার্পণ্য বোধ করি উৎসাহ দিতে? এটা তো শুধু উৎসাহ নয়, এটা একটা প্রেরণা। এই প্রেরণার মাধ্যমে একটি ছেলে অথবা মেয়ের মনোবল আরো দৃঢ় হয়। আর এই দৃঢ় মনোবল নিয়ে হয়তো একদিন দেশের নাম উজ্জ্বল করবে তারা। কিন্তু সমাজের মানুষের ভেতর এমন চিন্তাধারা দেখা যায় না। আমরা যদি উৎসাহ দিতে না পারি তবে সমালোচনা করবই বা কেন? সমালোচনা করা তাদের সাজে, যাদের উৎসাহ দেয়ার ক্ষমতা আছে। কারো মনোবল ভেঙে দেয়ার জন্য সমালোচনা করা তো কারো অধিকার নয়।

সমাজে এমনও কিছু ব্যক্তি রয়েছে যারা অন্য মানুষের উন্নতি সহ্য করতে পারে না। তাদের ভেতর যত্ন করে পুষে রাখে হিংসা আর অহঙ্কার। তারা চায় না তাদের চেয়ে উচ্চস্থানে কারো স্থান হোক। তারা সবসময় ভালো কিছুতে বাধা দিবে। তাদের নীতি হচ্ছে, সমাজের কেউ উচ্চস্থানে যেতে পারবে না। কারো এগিয়ে যাওয়া দেখলে তাদের ভেতর যত্ন করে রাখা হিংসাগুলো তখন বেরিয়ে আসে। আমাদের মানবজাতির মধ্যে কিছু কিছু নিকৃষ্ট মানুষও রয়েছে যা আমাদের কাছে অজানার কিছু নয়। তবে সেই নিকৃষ্ট মানুষগুলোর সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়ছে। সমাজের চোখ থেকে হয়তো তারা খুব সহজেই ছাড় পেয়ে যাচ্ছে। কিন্তু নিয়তি তাদের কখনো ছাড় দেবে না। আজ আপনি একজনকে এগিয়ে যেতে বাধা দিচ্ছেন, একদিন আপনি সেই বাধাতে নিজেই আটকে যাবেন। আমরা যদি যার যার বিবেকের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে নিজের প্রশ্ন নিজেই করি, তবে আজ হয়তো আমাদের ভেতর থেকে হিংসা আর অহঙ্কারের আধিপত্য কিছুটা কমে যেত। আমাদের বিচার আমাদের করতে হবে। নিজে যদি সৎ হয়ে থাকেন তবে নিজের বিচারক নিজের চেয়ে বড় কেউ হতে পারে না। এ ধরনের অপরাধ শোধরানোর দায়িত্বও নিজের। কিন্তু আমাদের ভেতর এখনো সেই বোধটুকু কাজ করে না।

আমরা মানুষের মনোবল ভেঙে দিতে কার্পণ্য করি না। আবার উৎসাহ দেয়ার বেলায় ঠিকই সে কার্পণ্যবোধ সজাগ হয়ে উঠে। আমরা হবে না, পারবে না এগুলো বলতে বেশি আগ্রহী। হবে কিংবা পারব বলতে আমরা যেন বোবা হয়ে যাই। কিন্তু মনোবল দেয়ার জন্য হলেও বলি না, পারবে। আমরা না বলতে খুব বেশি পছন্দ করি, কিন্তু হ্যাঁ বলাটা যেন আমাদের জন্য কষ্টের বিষয়। আমাদের কাজে কর্মে হয়তো আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে, কিন্তু আমাদের মনের ভেতরে এখনো নোংরা মনোভাব লালন করে রেখেছি। আগে নিজেদের মন মানসিকতা পরিবর্তন করতে হবে, তবেই আমরা আমাদের দেশ এবং সমাজকে আধুনিকভাবে পাবো। আমরা উৎসাহ, উদ্দীপনা, প্রেরণামূলক কথা এখন খুব কমই শুনি। আমাদের লেখা লেখিতেও এখন উৎসাহ, উদ্দীপনা, প্রেরণা মূলক কিছু থাকে না।

আমরা শুধু ভুলটা তুলে ধরি, কিন্তু কেউ সেই ভুলের সমাধান কি হবে সেটা তুলে ধরি না। এটাই কি আমাদের শিক্ষা? একজন মানুষ হয়ে অন্য মানুষের মনোবল ভেঙে দেয়াটা কখনোই মনুষ্যত্বের মধ্যে পড়ে না। তাই আমাদের উচিত উৎসাহ আর প্রেরণা দেয়ার প্রবণতা বাড়ানোর। আর নিতান্তই যদি উৎসাহ দিতে না পারি তবে মনোবল যেন ভেঙে না দিই সে দিকে খেয়াল রাখতে হবে। কারণ আপনার জন্য যদি কোনো এক ব্যক্তির লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়, তার সেই ক্ষতিপূরণ দেয়ার সাধ্য আপনার নেই। উৎসাহ হয়তো আপনার স্থানে কেউ না কেউ দিবে, কিন্তু একবার মনোবল ভেঙে দিলে তার লক্ষ্যটাই হয়তো নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তাই বলা যায়, উৎসাহ দেয়াটা যতটুকু ভালো তার চাইতে ভালো মনোবল ভেঙে না দেয়া।

লেখক : আজহার মাহমুদ
ইমেইল : azharmahmud705@gmail.com