২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, রাজশাহীতে ৬০০ চড়ুই পাখি হত্যাকারী বাবা-ছেলে দু’জনকে ধরা এবং একহাজার টাকা জরিমানা ও এক বছরের কারাদণ্ড দেয়ার খবর প্রকাশ হয়। দণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন নলডাঙ্গা জেলার মদনহাটের আবু বকর সিদ্দিক ও তার ছেলে ফিরোজ হোসেন। এরা বিভিন্ন ফসলের জমিতে ফাঁদ পেতে পাখি শিকারের পর জবাই করে বস্তায় ভরে বিভিন্ন এলাকায় প্রতিটি পাখি ২০ টাকা করে বিক্রি করে।
অন্য আরেকটি খবর- ৩০ মার্চ ২০২৩, নাটোরের সিংড়ায় আড়াই শতাধিক চড়ুই পাখি উদ্ধার করেছেন পরিবেশ সংগঠন চলনবিল জীববৈচিত্র্য রক্ষা কমিটির সদস্যরা। এক ব্যক্তির কাপড়ের ব্যাগভর্তি চড়ুই পাখি উদ্ধার করেন। এখানেও দেখা যায় পাখিগুলো জবাইকৃত। রিপোর্টটি দেবাশীষ কুমার সরকার, নাটোর, সারা দেশ পত্রিকার।
তাহলে এটি দাঁড়ায় যে, মানুষজন চড়ুই পাখি খেতে শুরু করেছে। আদিকাল থেকে বর্তমান একটি চিত্র মনুষ্যসমাজে এটি প্রতীয়মান যে, মানুষ যার নাম আশরাফুল মাখলুকাত অর্থাৎ সৃষ্টির সেরা, এরা যা কিছু খাওয়া শুরু করেছে তার প্রায় সবই ধরাধাম থেকে একসময় বিলুপ্ত হয়ে গেছে। তবে চড়ুই চীনসহ পৃথিবীর বহু দেশেই সখের খাবার। এ সব চড়ুই চোরাকারবারিরা তাদের রেস্টুরেন্টগুলোতে পৌঁছে দেয়। কোনো কারণ ছাড়াই কি পৃথিবীর ৫০ শতাংশ চড়–ই কমে গেছে!
সুতরাং চড়ুই সম্পর্কে আমাদের গোচরে আগেও এসেছে যে, কোনো কোনো অঞ্চলে চড়ুই পাখির গোশত খায়। তবে বাংলাদেশে সব অঞ্চলে সচরাচর চড়ুই পাখি খায় না। চড়ুই একটি ক্ষুদ্রাকার পাখি, তার গায়ে কতটুকুই বা গোশত, তা খাওয়ার প্রবণতা কেন? এমন প্রবণতা শত শত হাজার হাজার লাখ লাখ পাখি শিকারের দিকে নিয়ে যাচ্ছে লোভী মানুষগুলোকে। তবে নেহায়েত লোভে না প্রয়োজনে তা দেখার সুযোগ নেই। এই প্রবণতা রোধ করতে হবে এখনই আইনের প্রয়োগে, জন সচেতনতায়, যেকোনো উপায়ে। না হলে দুর্ভিক্ষের করাল গ্রাসে পড়ে যাবে জাতি। কেননা, চড়–ইয়ের অনুপস্থিতির কারণেই কৃষক একমুঠো ফসলও ঘরে তুলতে পারবে না। চড়ুই ধান নয় অনবরত ধানের ক্ষতিকর পোকা খায়, পোকা ধরে নিয়ে যায় শিশুদের জন্য। ওদের শিশুদের প্রোটিনের জোগান দিতে হয় যেমন আমাদের মায়েরা শিশুদের ডিম, দুধ, গোশতের ব্যবস্থা করে থাকেন। শিশুদের যথাযথ শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য। চড়ূই কৃষকের ধান কাটার পর ক্ষেতে পড়ে থাকা কিছু ধান খায় বটে, তবে ধান গাছে বসে গাছের পোকা ও তার শূককীট, মুককীট নিধনে ব্যাপৃত থাকে বেশিটা সময়েই, শিশুদের জন্য নিয়ে যায় অসংখ্য শূককীট, মুককীট যাতে শিশুরা তর তর করে বড় হয়ে উড়তে শিখে। কৃষকের এমন বন্ধুকে মানুষ নামের অমানুষরা নিধনে ব্যাপৃত থাকলে জাতিকে দুর্ভিক্ষের করাল গ্রাসে পড়তেই হবে। প্রকৃতিকে মাত্র টোকা দিলে প্রকৃতি রুদ্ররূপ ধারণ করবে, প্রতিশোধ নেবে।
চড়ুই পাখি ধরে জবাই করে লুকিয়ে লুকিয়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে বিক্রি করা হচ্ছে এ এক ভয়াবহ চিত্র। এ কারবারিদের কর্মকাণ্ড খুব কমই সাধারণের চোখে পড়ে। যেমন সুমদ্রে বরফের চাঁই, দেখে বোঝার উপায় নেই কত বড় আকার তার। এভাবে চলতে থাকলে চড়ুই দেশ থেকে বিলুপ্ত হবে অচিরেই। চড়ুই বিলুপ্ত হলে যে দেশে দুর্ভিক্ষ ঠেকানো সম্ভব হবে না তার একটি উদাহরণ এখানে তুলে ধরলাম।
১৯৫৮ সাল। ঘটনাটি চীনের। চড়ুই ফসলের ক্ষেতের ব্যাপক ক্ষতি করে ভেবে মাও সেতুং নির্দেশ দিলেন দেশের সব চড়ুই নিধন করতে। মাও সেতুং হিসাব করে দেখেছেন, একটি চড়ুই বছরে চার-পাঁচ কেজি শস্য খায়। প্রতি ১০ লাখ চড়ুইয়ের খাবার বাঁচিয়ে প্রায় ৬০ হাজার মানুষের খাদ্যের জোগান হবে। তাই শুরু হলো চড়ুই নিধনযজ্ঞ। শুরু হলো চড়ুইনিধন প্রচারণা। তৈরি হলো লাখো রঙিন পতাকা। চড়ুই মারার উৎসবে মেতে উঠল গোটা দেশের মানুষ। আকর্ষণীয় পুরস্কার ঘোষণা করা হলো চড়ুই মারার জন্য। নানা পদ্ধতিতে চড়ুই নিধন হতে লাগল। যেমন খুব জোরে জোরে ড্রাম বাজাতেই চড়ুই উড়ে উড়ে ক্লান্ত হয়ে মাটিতে পড়তে লাগল। অসংখ্য ডিম নষ্ট করা হলো। রাতারাতি তছনছ করা হলো বাসা। জাল দিয়ে ধরা হলো লাখ লাখ চড়–ই। বন্দুক দিয়ে মারা হলো অসংখ্য চড়–ই। এমনকি এসব কাজের জন্য তৈরি হলো স্প্যারো আর্মি। এভাবে ‘দ্য’ গ্রেট স্প্যারো ক্যাম্পেইন নামে প্রচারণার মাধ্যমে চড়–ইশূন্য হলো গোটা চীন। চীন থেকে চড়ুই হলো বিলুপ্ত।
১৯৬১-৬২ সাল। চীনে দেখা দিলো দুর্ভিক্ষ। না খেয়ে মারা গেল প্রায় তিন কোটি মানুষ। ফসলের ক্ষেতে বিভিন্ন ক্ষতিকর পোকার আক্রমণ এত বেড়ে গেল যে, ক্ষেত থেকে ফসল আর ঘরেই তোলা গেল না। দুর্ভিক্ষে মৃতের মিছিল। টনক নড়ল দেশটির সরকারের। নিরূপায় হয়ে প্রকৃতিতে চড়ুই ফিরিয়ে দিতে সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে শুরু হলো চড়ুই আমদানি।
অতএব চড়ুইয়ের মতো একটি অতি ক্ষুদ্র প্রাণী থেকে বৃহত্তম সব প্রাণীর অস্তিত্ব রক্ষায় যথাযথ কর্তৃপক্ষ যথাযথ পদক্ষেপ নেবে আশা করি। তা না হলে প্রাকৃতিক বিপর্যয় দেখা দেবে, ফুঁসে উঠবে প্রকৃতি, যার প্রতিকার আর মানুষের হাতে থাকবে না। তখন আফসোস করারও সময় পাওয়া যাবে না।
চড়ুইকে বলা হয় সৌভাগ্যের প্রতীক। কেন তা মাও সেতুংয়ের গল্প থেকে উপলব্ধি করতে পারলাম। এ পাখি যার বাসায় বাসা বাঁধে তার ঘরে প্রশান্তি বয়ে যায়। শিশুদের বলুন বারান্দায় ওদের জন্য একটি পাত্রে পানি রাখতে। একটি বক্স ফুটো করে রাখুন বারান্দায়। চড়ুই বাসা বাঁধবে। প্রশান্তিতে ভরে যাবে ঘর। শিশুরা ভালোবাসবে পাখি তথা প্রকৃতি। প্রকৃতি হবে প্রসন্ন সবার প্রতি।
লেখক : পরিবেশ ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ, প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
