উত্তর প্রদেশের মাফিয়া ডন আতিক আহমদ ও তার ভাই আশরাফকে মধ্য এপ্রিলে এক শ্বাসরুদ্ধকর ঘটনায় তিন যুবক গুলি করে হত্যা করে। যে সময় এ ঘটনা ঘটে, ওই সময় দুই ভাই আদালতের নিরাপত্তায় ছিলেন এবং তাদের নিরাপত্তার জন্য দেড় ডজন পুলিশ নিযুক্ত ছিল। হামলার সময় তাদের কেউ বাধা দেয়নি। আতিক আহমদ বহু দিন ধরে কারাগারে ছিলেন এবং তাকে হত্যা করা হবে বলে কয়েকবার আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন তিনি । এমনকি এ ব্যাপারে সুপ্রিম কোর্টের দরজায় পর্যন্ত কড়াঘাত করা হয়েছিল। কিন্তু কেউ তার কথা শোনেননি এবং অবশেষে তাই হয়েছে, যার আশঙ্কা ছিল। এ মামলার সবচেয়ে বিস্ময়কর কথা হচ্ছে, যে তিন হত্যাকারী যুবক আতিক ও তার ভাইকে বেশ দক্ষতার সাথে হত্যা করেছে, তারা মিডিয়াকর্মীদের ছদ্মবেশ ধারণ করে এসেছিল। তাদের কাছে প্রেসকার্ড, ক্যামেরা ও মাইক্রোফোনও ছিল। প্রথমে তো এটিই মনে করা হয়েছিল যে, দুই ভাইকে সেই মিডিয়া হত্যা করেছে, যারা বিগত কয়েক সপ্তাহ ধরে আতিকের পেছনে কোমর বেঁধে নেমেছিল। কিন্তু বাস্তবে এমনটি ছিল না। হামলাকারী পেশাদার খুনি ছিল এবং তারা নিজেদের রক্ষার জন্য মিডিয়ার আশ্রয় নিয়েছে। এ কারণে এই জোড়া খুনের পরের দিন এক পত্রিকার কার্টুনে আতিক ও তার ভাইয়ের ওপর টিভি ক্যামেরা এবং মাইক্রোফোন থেকে গুলি বর্ষিত হতে দেখানো হয়েছিল।

দেশের ইতিহাসে সম্ভবত এটি প্রথমবারের ঘটনা যে, দুর্ধর্ষ খুনের ঘটনা মিডিয়ার ছদ্মবেশে ঘটানো হয়েছে। আতিক, তার ভাই আশরাফ ও তার পুত্র আসাদের (যাকে এ হত্যাকাণ্ডের কয়েকদিন আগে বন্দুকযুদ্ধে হত্যা করা হয়) হত্যার পর গৃহপালিত মিডিয়ার টার্গেটে এখন রয়েছে তার স্ত্রী শায়েস্তা পারভিন ও পরিবারের অন্য সদস্যরা। বিস্ময়কর নয় যে, মিডিয়ার এ বেয়াড়া ঝড়ের সময় আতিকের পরিবারের অপর সদস্যরাও এ পরিণামের মুখোমুখি হবে। নকুলে মিডিয়ার লোকদের হাতে আতিক ও তার ভাইয়ের হত্যাকাণ্ডের পর সবচেয়ে বড় উৎসব পালন করা হয় আসল নিউজ চ্যানেলগুলোর স্টুডিওগুলোতে। সত্য বলতে কি, আতিক আহমদ বিগত এক মাস ধরে মিডিয়ার হাতের খেলনায় পরিণত হয়েছিলেন। যেভাবে তার প্রতিটি পদক্ষেপ ও তৎপরতার লাইভ টেলিকাস্ট করা হচ্ছিল, তা দেখে তারা আগে কিছু অনুভব করেছিলেন।

গত মাসে অমিশ পাল হত্যা মামলায় বক্তব্য দেয়ার জন্য আতিককে যখন আহমদাবাদের সবরমতি কারাগার থেকে এলাহাবাদ নিয়ে যাওয়া হয়, তখন ২৪ ঘণ্টার এ যাত্রার প্রতিটি মুহূর্তের ঘটনা মিডিয়ার ক্যামেরায় ধারণ হচ্ছিল। সবচেয়ে দ্রুত খবর পরিবেশনকারী চ্যানেল তো তার প্রস্রাব করাকেও একটি খবর বানিয়ে উপস্থাপন করতে লজ্জাবোধ করেনি। মনে হচ্ছিল, পুরো টিভি সাংবাদিকতা আতিকের প্রস্রাবের বোতলে ঢুকে গেছে। আতিককে আহমদাবাদ থেকে বিমানযোগেও এলাহাবাদ নেয়া যেতে পারত। কিন্তু এতে মিডিয়া লাইভ টেলিকাস্টের সুযোগ পেত না। এ জন্য পরিকল্পিতভাবে পুলিশ মিডিয়ার লোকজনদের সাথে নিয়ে সবরমতি কারাগার থেকে এলাহাবাদের রথযাত্রা বিশেষ লম্ফঝম্ফের সাথে সম্পন্ন করে। পুরো দেশের দৃষ্টি আতিক আহমদের দিকে নিবদ্ধ ছিল। কেননা আতিক আহমদ দেশ ও জাতির সবচেয়ে বড় সমস্যা। সম্ভবত এ জন্য এ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করা হচ্ছে, আতিকের হত্যাকাণ্ডের পর উত্তর প্রদেশে অপরাধ পরিপূর্ণরূপে নিয়ন্ত্রণে এসেছে। এটি ভিন্ন কথা যে, আতিকের হত্যাকাণ্ডের পরের দিন ইউপির জালৌন জেলায় এক ছাত্রীকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। তবে এ সংবাদ মিডিয়ার মনোযোগ আকর্ষণ করতে পারেনি। কেননা, মিডিয়া আতিকের বিধবা স্ত্রী শায়েস্তা পারভিনের অনুসন্ধানে ব্যস্ত রয়েছে। তারা এমন এমন শিরোনাম বানাচ্ছে যে, দর্শকরা টিভির সাথে আঠার মতো লেগে থাকছে এবং এক মুহূর্তের জন্য আতিক ও তার পরিবারকে ভুলছে না।

এটিও কোনো আকস্মিক ঘটনা নয় যে, আতিকের খুনের পর মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের সাথে হাসিমুখে প্রথম লাইভ সেলফি তোলেন গৃহপালিত মিডিয়ার একালের একজন নিন্দিত উপস্থাপক। সেই সেলফিতে মুখ্যমন্ত্রীকে ওই নামসর্বস্ব সাংবাদিকের প্রশংসা করতে দেখা গেছে। এ ক্ষেত্রে আমাদের একটি পুরোনো কাহিনী মনে পড়ছে, যার দ্বারা আপনারা সংবাদ লেখার নীতি শিখতে পারবেন। ইংরেজি দৈনিক ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের মালিক রামনাথ গোয়েঙ্কাকে একজন মুখ্যমন্ত্রী যখন বললেন, ‘আপনার রিপোর্টার বেশ ভালো কাজ করছে’। গোয়েঙ্কা এ কথা শোনার পরদিন ওই রিপোর্টারকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেন। কেননা, তিনি এমন সাংবাদিকদের পছন্দ করেন না, যারা সরকারের প্রিয় ও কাক্সিক্ষত হবে। সাংবাদিকের মৌলিক কাজ হচ্ছে, সরকারের সমালোচনা করা। আর এ কারণে সাচ্চা ও নির্ভেজাল সাংবাদিক সরকার ও সরকারি সংস্থাগুলোর চোখের কাঁটায় পরিণত হন। কিন্তু গৃহপালিত মিডিয়ার উপস্থাপকদের সবচেয়ে বড় আদর্শ হচ্ছে সরকারের তোষামুদি করা।

সবাই জানেন, মিডিয়ার মৌলিক কাজ হচ্ছে নিরপেক্ষভাবে সংবাদ পরিবেশন করা। কিন্তু যখন থেকে আমাদের দেশে ইলেকট্রনিক মিডিয়ার উত্থান ঘটেছে, তখন থেকে সাংবাদিকতার অর্থ একেবারে পাল্টে গেছে। নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার চিন্তাভাবনা শেষ হয়ে গেছে। টিভি চ্যানেলগুলো নির্লজ্জতা ও আত্মমর্যাদাবোধহীনতার সব সীমা অতিক্রম করেছে। সাম্প্রতিককালে এ চ্যানেলগুলো দেশের ভেতর সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ছড়ানোর কাজ যেভাবে আঞ্জাম দিয়েছে, দেশের ইতিহাসে তার কোনো নজির পাওয়া যাবে না। টিভি চ্যানেল নিজেরা সংবাদ তৈরি করছে। তারা সর্বদা নিজেদের দর্শকদের উত্তেজনায় ডুবিয়ে রাখতে চায় এবং তাদের অপরাধমূলক তৎপরতার সমর্থনে উসকাতে থাকে। তারা মৌলিক প্রশ্নের ওপর কোনো আলোচনা বা তর্ক-বিতর্ক করে না; বরং সর্বদা এক নতুন শত্রু সৃষ্টির সন্ধানে তৎপর থাকে। যাতে তার ওপর নিজেদের ক্যামেরা ও মাইক্রোফোন থেকে গুলিবর্ষণ করে প্রশান্তি লাভ করতে পারে। যদি কোনো মামলায় অপরাধী কোনো মুসলমান হয়ে থাকে, তাহলে গৃহপালিত মিডিয়ার লম্ফঝম্ফ দেখার মতো হয়ে থাকে। এরা মুহূর্তে ওই মুসলমানকে ফাঁসির কাষ্ঠে চড়াতে কোমর বেঁধে নেমে পড়ে। নিজেদের মুসলিমবিদ্বেষী মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ ঘটানোর সময় তারা কোনো লজ্জাবোধ করে না।

যদি আমাদের দেশে মিডিয়া স্বাধীন ও নিরপেক্ষ হতো, তাহলে অবশ্যই এ প্রশ্ন করা যেত যে, ভয়ঙ্কর অস্ত্র নিয়ে নকুলে মিডিয়াধারী আতিক আহমদ ও তার ভাইয়ের এত কাছে কিভাবে পৌঁছল যে, তারা উভয়ের কানের ওপর পিস্তল রেখে তাদের মৃত্যুর কোলে শুইয়ে দিলো? বাহ্যত এর দ্বারা মিডিয়ারও দুর্নাম হয়েছে। কিন্তু এ ব্যাপারে কোনো প্রশ্ন করা হয়নি। প্রশ্ন এটিও আছে যে, আতিক ও তার ভাইয়ের নিরাপত্তায় নিয়োজিত দেড় ডজন পুলিশ কোনো বাধা দেয়নি কেন? তিন খুনিকে গ্রেফতার করার পর তাদের রিমান্ডে নেয়ার পরিবর্তে সোজা আদালতের জিম্মায় কেন পাঠানো হলো? তাদের দামি পিস্তল ও ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগানের ব্যাপারে কোনো তদন্ত কেন করা হলো না? গোপন তথ্য সম্ভবত কোনো এক সময় দৃশ্যপটে আসবে। কেননা, সরকারি ব্যবস্থাপনা কোনো বড় ধরনের তথ্য ফাঁস রোধ করতে পারে না। আমরাও এ কথা স্বীকার করি যে, আতিক আহমদের জীবনটা অপরাধে ভরপুর ছিল। তিনি শতাধিক মামলায় অভিযুক্ত ছিলেন। তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডও দেয়া হয়েছিল। কিন্তু দেশীয় আইনের আলোকে ভাগ্য নির্ধারণ করা আদালতের কাজ ছিল। অথচ আদালতের ফায়সালার আগে এক ‘ভয়ঙ্কর অপরাধী’কে পুলিশের বেষ্টনীতে কেন হত্যা করা হলো? এর জবাব অবশ্যই একসময় পাওয়া যাবে। আতিক আহমদের আদালতের বাইরে হত্যার বিষয়টি এখন সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত পৌঁছে গেছে এবং তারা এর চূড়ান্ত ফায়সালা গ্রহণ করবেন। এ মামলায় যোগী সরকারের শাসনামলে অপর ১৮০টি এনকাউন্টারেরও হিসাব তলব করা হয়েছে।

মুম্বাই থেকে প্রকাশিত দৈনিক মুম্বাই উর্দু নিউজ ২৩ এপ্রিল,
২০২৩ হতে উর্দু থেকে ভাষান্তর
ইমতিয়াজ বিন মাহতাব
ahmadimtiajdr@gmail.com
লেখক : ভারতের প্রখ্যাত সাংবাদিক ও কলামিস্ট