দেশে রাজনীতি এখন স্থবির, গতিহীন, দিকনির্দেশনাহীন, অচল। সাধারণ মানুষ পাচ্ছেন নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের চাপে। অনেক পণ্য তাদের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে। তবু তারা চুপ রয়েছেন এই আশা নিয়ে যে, নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠা হবে, তারা ভোট দিতে পারবেন। নির্বাচনপদ্ধতিতে আস্থা-অনাস্থার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রশ্ন এবং নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা-না করার প্রশ্নে দেশ এখন উত্তাল। এমন উত্তাল তরঙ্গের দুই দিকে রয়েছে দু’টি রাজনৈতিক দল। দেশের রাজনৈতিক গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাসে দুই প্রধান রাজনৈতিক দলেরই (আওয়ামী লীগ ও বিএনপি) কমবেশি ভূমিকা রয়েছে। নব্বই-পরবর্তী সময়ে এই দুই দলই একাধিকবার দেশের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়। কখনো সরকারি দল আবার কখনো বিরোধী দলের ভ‚মিকায় শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে সরকার গঠিত হয়। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও রীতিনীতি সুরক্ষার ক্ষেত্রে সরকারের পাশাপাশি বিরোধী দলের ভ‚মিকাও খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সরকার ও বিরোধী দল উভয়ই গণতন্ত্রের খুঁটি হিসেবে বিবেচিত। সংসদীয় পদ্ধতিতে সরকারের যেমন দায়িত্ব ও দায়বদ্ধতা আছে, ঠিক তেমনি বিরোধী দলেরও দায়িত্ব ও দায় কম নয়। কারণ বিরোধী দল সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত গণতন্ত্রের অন্যতম ধারক-বাহক। গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে নির্বাচন ও নির্বাচন পদ্ধতির ওপর আস্থার পাশাপাশি যথাযথ রাজনৈতিক অঙ্গীকারও গুরুত্বপূর্ণ। সংবিধান সমুন্নত রেখে রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বশীল আচরণেই গণতান্ত্রিক কাঠামো শক্তিশালী হতে পারে। কেননা, বাঘের পিঠে আরোহণ কঠিন কাজ, কিন্তু অবরোহণ আরো কঠিন। এ জন্য বলছি, অত্যন্ত দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়া জরুরি সরকারের নিজের স্বার্থে, দেশের স্বার্থে, গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার স্বার্থে।
দেশে গণতন্ত্রের অনেক শত্রু। আর্থ-সামাজিক অবস্থা, দারিদ্র্য, অশিক্ষা, কুসংস্কার এবং সঙ্কীর্ণ ভেদবুদ্ধি কোনোটিই গণতন্ত্রের অনুকূল নয়। আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও বাংলাদেশের ভ‚-রাজনৈতিক অবস্থানও গণতন্ত্রের সহায়ক শক্তি নয়। বাংলাদেশের দুই পাশে দুই বৃহৎ শক্তি ভারত ও চীনের টানাপড়েন, বিশেষ করে এ দুই বৃহৎ শক্তির পৃষ্ঠপোষকদের আগাম চিন্তাও ছোট্ট এ দেশটির স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক অগ্রগতি, গণতান্ত্রিক গতিশীলতার এক ধরনের নিয়ামক। দেশের অভ্যন্তরে থেকে আমরা যেভাবে যে আলোকে জাতীয় সমস্যা অবলোকন করি, যারা স্থায়ীভাবে দেশের বাইরে ইউরোপ, আমেরিকা অথবা মধ্যপ্রাচ্যে ও দূরপ্রাচ্যে অবস্থান করছেন তারা কিন্তু দেখেন অন্যভাবে, আরো গভীরভাবে, অনেকটা ভয়ার্ত চোখে। এ কারণে দেশের মেরুদণ্ডহীন রাজনৈতিক নেতাদের প্রতি তাদের অনেকে এক করুণামিশ্রিত দৃষ্টিতে তাকান। সবার আশা, হয়তো নির্দলীয় সরকার প্রতিষ্ঠা হবে।
যাই হোক, এই পোড়া দেশে গণতন্ত্রের শত্রু অনেক, গণতন্ত্রের বন্ধু আমার চোখে একমাত্র দেশের সাধারণ মানুষ। হয়তো তাদের হারানোর কিছু নেই, তাই তারা গণতন্ত্রের মাধ্যমে পেতে চান তাদের কোনো কোনো সময়ে কিছু কথা বলার সুযোগ, নির্বাচনে ভোট দেয়ার অধিকার। তারা নির্বাচনকালে প্রতাপশালী জাতীয় নেতাদের কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেতে চান, শুনতে চান তাদের মিথ্যা আশ্বাসও। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ অন্যান্য প্রতিবেশী দেশের জনগণ থেকে একটু ভিন্ন এবং এই ভিন্নতা তাদের রাজনৈতিক সচেতনতা সম্পর্কিত। হাজারো সভা-সমিতিতে তাদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য। মিটিং-মিছিলের অগ্রভাগেই তাদের অবস্থান। ভোট দানের ক্ষেত্রেও তাদের অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ। এও উল্লেখযোগ্য যে, জাতির যেসব শ্রেষ্ঠ অর্জন তা তখনই অর্জিত হয়েছে যখন সাধারণ মানুষ গভীরভাবে সম্পৃক্ত হয়েছেন। কিন্তু সাধারণ মানুষ তো সাধারণই। তাদের সঙ্ঘবদ্ধ বা মবিলাইজ না করা পর্যন্ত তারা সাধারণ থেকে যান। এ কারণে রাজনীতির ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলের ভ‚মিকা মুখ্য এবং সর্বব্যাপী। রাজনৈতিক দল আছে বলেই রাজনীতি এত প্রাণবন্ত, এত উত্তেজনাকর, এত আবেগময়। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাজনীতি শুধু যে আকর্ষণীয় তাই নয়, সমষ্টিকে সম্পৃক্ত করে বলে তা সামষ্টিক অগ্রগতির সূচকও বটে। সবার আশা-আকাক্সক্ষা ধারণ করে রাজনীতিই সবার কাছে ধরা দেয় কিংবদন্তির সেই রাজপুত্রের সোনার কাঠিরূপে। রাজনীতি তাই এত অর্থপূর্ণ কার্যক্রম। কল্যাণমূলক যৌথ কার্যক্রম হিসেবে রাজনীতির কোনো বিকল্প এখন পর্যন্ত আবিষ্কার হয়নি।
দেশে রাজনীতির বর্তমান হাল-হকিকত কেমন? মনে হয়, উত্তর সবার জানা। এখানে রাজনীতির দুর্বৃত্তায়ন, রাজনীতিকে দুর্নীতি এবং সঙ্ঘাতের কেন্দ্রে পরিণত করার জন্য কে বা কারা দায়ী তাও মোটামুটিভাবে সবার জানা। তাই এ নিয়ে বেশি কিছু বলার দরকার নেই। যা গুরুত্বপূর্ণ তা হলো রাজনীতির রাহুমুক্তি। রাজনীতিকে জনকল্যাণের মাধ্যম করে তোলা, যৌথকর্মের স্বচ্ছ এবং নির্মল সামাজিক প্রক্রিয়ারূপে রাজনীতিকে শাণিত করা, খরস্রোতা নদীর মতো প্রবহমান করাই এখন বড় কাজ। এ জন্য প্রয়োজন স্বার্থান্বেষী ও দুর্নীতিগ্রস্তদের কবল থেকে রাজনীতিকে উদ্ধার করা। প্রয়োজন হলো সুনির্দিষ্ট ব্যক্তি বা ব্যক্তিদের সর্বাত্মক প্রভাবমুক্ত করে রাজনীতিকে জনসমষ্টির সম্পদে রূপান্তর করা। কাজটি দ্রæত করতে হবে। বেশি দেরি হলে লাভের চেয়ে ক্ষতি হবে বেশি। শেওলা জন্মে বদ্ধ জলাশয়ে। কোনো স্রোতঃস্বিনীতে শেওলা বা বিষাক্ত আগাছা গজাতে পারে না।
ইতিহাস সাক্ষী, রাজনীতির আধিক্য কোনো সমাজকে তেমন ক্ষতিগ্রস্ত করে না; বরং সমাজ ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় বিরাজনীতিকরণ প্রক্রিয়ায়। দু’টি বিশ্বযুদ্ধের মধ্যবর্তী সময়ে জার্মানি ও ইতালিতে বিরাজনীতিকরণের ফলে কীভাবে নাৎসি ও ফ্যাসিস্ট দলের জন্ম হয়েছিল তা লক্ষ করলেই বিষয়টি স্পষ্ট হবে। রাজনীতির প্রতি জনগণের অনাগ্রহ বেড়ে গেলে, রাজনীতির প্রতি সাধারণ মানুষ বীতশ্রদ্ধ হলে, জনগণের ক্ষোভ, ঘৃণা ও অনীহা ভয়ঙ্কর হয়ে উঠলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় গণতন্ত্রের সম্ভাবনা। কেননা, জনগণের রাজনীতির অন্য নাম গণতন্ত্র। অগণতান্ত্রিকতা অথবা স্বৈরতন্ত্রের মূল নিহিত রয়েছে রাজনীতি সম্পর্কে জনগণের তীব্র ঘৃণা এবং অনীহার অভ্যন্তরে। তেমন অবস্থায় সামষ্টিক নেতৃত্বের পরিবর্তে একক ব্যক্তির নেতৃত্বের ভিত্তি সুদৃঢ় হয়। একনায়কতন্ত্রের পদতলে গণতন্ত্রের শত সম্ভাবনা লুটিয়ে পড়ে। এডলফ হিটলার তার গ্রন্থ যা লিখেছিলেন তা এমনি পরিস্থিতির সঠিক প্রতিফলন। তিনি লিখেছিলেন, ‘সংখ্যাগরিষ্ঠতা কোনো একক নেতৃত্বের বিকল্প হতে পারে না। ... এক শ’ নির্বোধ যেমন একজন জ্ঞানী সৃষ্টি করতে পারে না, তেমনি কোনো বীরত্বব্যঞ্জক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এক শ’ কাপুরুষের দ্বারা সম্ভব নয়।’
মূলত কোনো একক প্রাজ্ঞ নেতৃত্বের নয়, অসংখ্য ‘নির্বোধের’ চিন্তা চেতনার সমাহার হলো গণতান্তিক চেতনা। লাখ লাখ ‘কাপুরুষের’ সরব উচ্চারণের ফলে যে নীতি নির্ধারিত হয় তা একজন ‘প্রাজ্ঞ’ নেতার বীরত্বব্যঞ্জক সিদ্ধান্ত থেকে হাজরোগুণে শ্রেয়। গণতন্ত্রে আকাশে একক সূর্যের কোনো স্থান নেই। লাখ লাখ তারকারাজির মৃদু আলোয় আলোকিত গণতন্ত্রের আকাশ। বাংলাদেশে রাজনৈতিক সমাজ এ মুহূর্তে রয়েছে একদিকে আগুন এবং অন্যদিকে উত্তপ্ত কড়াইয়ের মধ্যখানে। অগ্নিতে নিক্ষিপ্ত হলে পুড়ে ছারখার হবে, উত্তপ্ত কড়াইতে পড়লে ঝলসে মরবে।
জনসাধারণের ঘৃণা ও ক্ষোভ তীব্রতর হওয়ার আগেই যদি রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের শুধরে নিতে পারে, সময়ের দাবি মেনে যদি জাতীয় ও জনস্বার্থের নিরিখে সহজ সরল পথ অনুসরণ করতে পারে, তাহলেই মঙ্গল। এসব বিষয় সরকারকে গভীরভাবে ভাবতে হবে। দেশের ভেতর থেকে উত্থাপিত দাবি-দাওয়া এবং বিশ্বয়নের একালে রাজনৈতিক নেতৃত্বের অর্বাচীনতার কারণে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নিম্নতর পর্যায়ের বিদেশী কর্মকর্তারা যেভাবে সুযোগ গ্রহণে আগ্রহী, সেই পরিপ্রেক্ষিতে অবিলম্বে সিদ্ধান্ত গ্রহণ অপরিহার্য। রাজনীতিকে জয়যুক্ত করার এটিই সময়।
লেখক : কলামিস্ট, সভাপতি, সাংবিধানিক অধিকার ফোরাম
