এই লেখাটি যখন লিখতে শুরু করেছি তখন এই উপমহাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি কি উত্তপ্ত হতে যাচ্ছে? ভারতে মনিপুরে একটি পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে। ভারতে আইন সভায় সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব এনেছে বিরোধীরা। যখন মনিপুরে মেইতেই জনগোষ্ঠী ও কুকি উপজাতিদের মধ্যে জাতিগত সঙ্ঘাত আর নারী লাঞ্ছনার ঘটনায় কেন্দ্রীয় সরকার সর্বোচ্চ আদালতে তোপের মুখে পড়েছে। আর মিয়ানমারে জরুরি অবস্থার মেয়াদ বাড়িয়েছে জান্তা সরকার। দেশটিতে নির্বাচনও পেছাচ্ছে। পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে তোষাখানা দুর্নীতির অভিযোগে আবার গ্রেফতার করা হলো। ইমরানের ভবিষ্যৎ এখনো অনিশ্চিত। দণ্ডিত হওয়ায় তিনি পাঁচ বছরের জন্য রাজনীতিতে নিষিদ্ধ হচ্ছেন। সব মিলিয়ে পাকিস্তানে তুলকালাম কাণ্ড চলছে। জাতীয় নির্বাচন পেছানোর কথাও চলছে। পাশাপাশি বাংলাদেশেও জাতীয় নির্বাচন আসন্ন এবং নির্বাচনের আগে নানা কারণে রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়ছে।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার দল বিএনপিসহ তার জোটের সব রাজনৈতিক দল দাবি তুলেছে নির্বাচনের আগে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি মানতে হবে। এই উদাহরণগুলো দিলাম এই কারণে যে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার ঘরে বাইরে উপন্যাসে বলেছিলেন, পাশের বাড়িতে যদি আগুন লাগে তা হলে, সে আগুনের তাপ আমার বাড়িতে এসে পড়ে। সেটা বড় ভয়ের, বিপদের আশঙ্কা থাকে।
বিএনপি এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের রাজনীতির প্রধানতম নিয়ামক। দু’টিই বৃহৎ দল। দুটোরই রয়েছে দেশ পরিচালনার প্রচুর অভিজ্ঞতা। দু’টি দলেই রয়েছেন প্রচুর অভিজ্ঞ রাজনীতিক, পরীক্ষিত, ত্যাগী, দলীয় আদর্শের প্রতি অনুগত, বিচক্ষণ নেতৃবৃন্দ। তা সত্ত্বেও পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বাসের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের রাজনীতির প্রধানতম এ দু’টি দলের মধ্যে বিদ্যমান রয়েছে এক উঁচু দেয়াল। এ দেয়ালে ধাক্কা খেয়েই রাজনৈতিক ব্যবস্থায় সহিষ্ণুতা, সমঝোতা আপস-মীমাংসার সম্ভাবনা দীর্ঘদিন ধরেই এক দিকে যেমন ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে, অন্য দিকে তেমনি রাজনীতিকে কল্যাণের পথ থেকে সরিয়ে এনেছে। প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র থেকে টেনে এনেছে বৈরিতার তপ্ত কড়াইয়ে। সদ্ভাবের মৃদুমন্দ হাওয়া ছাড়িয়ে চরম শত্রুতার ঝড়ের মুখে ফেলে দিয়েছে। তাই বাংলাদেশের আগামী দিনগুলো কেমন হবে, কিভাবে কাটবে, শান্তির পায়রা এ দেশের আকাশে আদৌ উড়বে কি না- ভেবে অস্থির লাগে।
এখন পর্যন্ত কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারছে না আসলে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ গঠনের জন্য সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে কী না! নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হবে অক্টোবরে। অথচ এ পর্যায়ে উপনীত হতে সমগ্র জাতিকে কম মূল্য দিতে হয়নি। একবার দু’বার নয়, চার বার অবরোধের বেড়াজাল অতিক্রম করে, লগি-বৈঠার নির্মম আঘাতে সৃষ্ট রক্তাক্ত পথ ধরে এবং শত ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে ২০০৮ সালের সাধারণ নির্বাচনের ক্ষেত্র তৈরি হয়। তাও আজ অনিশ্চয়তার ঘন অন্ধকারে আচ্ছন্ন। কে জানে সব দলের অংশগ্রহণের মাধ্যমে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে কী না। অন্য জোট অংশগ্রহণ না করলে তা কিছুতেই গ্রহণযোগ্য হবে না। হবে না জাতীয় পর্যায়ে। হবে না আন্তর্জাতিক পর্যায়েও। তার মূল্যও দিতে হবে এ হতভাগ্য জাতিকে। আবারও লগি-বৈঠা অথবা কাস্তের ঝনঝনানি চারদিক প্রকম্পিত করে তুলবে। বহুসংখ্যক নিরীহ আদম সন্তানকে প্রাণ দিতে হতে পারে। এমনিতেই দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভঙ্গুর। সেটি অস্বাভাবিক হয়ে উঠতে পারে। জনজীবন পর্যুদস্ত হয়ে উঠবে।
অন্য দিকে সব দলের অংশগ্রহণের মাধ্যমেও যদি ২০২৩ অথবা ২০২৪ সালে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, তাহলেও যে দেশে শান্তিপূর্ণ অবস্থা বিরাজ করবে তাও নিশ্চিত নয়। নিশ্চিত নয় এ জন্য যে, এ দেশে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন শুধু বিজয় লাভের জন্য। পরাজিত হতে তারা শেখেননি অথচ নির্বাচন এমনি এক ব্যবস্থা যেখানে সব দল জয়যুক্ত হতে পারে না। বাংলাদেশের আজকের রাজনৈতিক বাস্তবতায় কিন্তু নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সব দল বিজয় লাভে কৃতসঙ্কল্প। নির্বাচনে হেরে গেলে হাজারো অভিযোগে তারা আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত করে তুলবেন। নির্বাচনে কারচুপি হয়েছে, তা স্থূল হোক আর সূক্ষ্ম হোক ; বলবেন ষড়যন্ত্র করে তাদের বিজয় ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে। চার দিকে তোলপাড় করে সমগ্র দেশকে জ্বলন্ত চুল্লির মধ্যে নিক্ষেপ করবেন তারা। ব্যক্তিজীবন তখন হয়ে উঠবে অনিশ্চিত। সামাজিক জীবন হয়ে পড়বে বিপর্যস্ত। আবার যারা বিজয়ী হবেন, তাদের চেলাচামুণ্ডারাও দেশে ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে। কেননা বিজয়ীরাও উদারভাবে বিজয়কে গ্রহণ করতে শেখেননি।
এ সবের মূলে রয়েছে রাজনীতিকদের সীমাহীন রাজনৈতিক লোভ এবং ক্ষমতার অন্তহীন ক্ষুধা, অন্য দিকে আছে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অবক্ষয় ও অসহায়ত্ব। সত্যি বটে, এ দেশে রাজনীতিকদের রাষ্ট্রক্ষমতার প্রতি দুর্বলতার কোনো সীমা নেই। রাজনৈতিক দল নির্বাচন, জনসংযোগ সব কিছুই যেন তৈরি হয়েছে ক্ষমতা লাভের রাজপথ রূপে। ন্যায়-অন্যায় বোধ, বিবেক-বিচার জাতীয় স্বার্থ ও জনস্বার্থের সব নৈতিকতা এসব ক্ষেত্রে মৃত। জীবন্ত শুধু ব্যক্তিগত ও দলীয় স্বার্থ। এ জন্য তারা সব কিছু করতে প্রস্তুত।
আর একটি বিষয় এ জাতিসত্তার প্রতি বিরাট আঘাতরূপে দেখা দিতে পারে এবং তা হচ্ছে- বিদেশীদের মুখে কথার ফুলঝুরি ও নানামুখী চাপ। হাজার মুখে এই দুর্ভাগ্যপীড়িত জাতিকে শুনতে হবে রাশি রাশি উপদেশ। অথচ জাতি হিসেবে বাংলাদেশের রয়েছে এক বৈশিষ্ট্যপূর্ণ অবস্থান। এক সম্মানজনক মর্যাদা। কোনো বৃহৎ শক্তির দাক্ষিণ্যে এ জাতির জন্ম হয়নি। এর জন্ম হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের রক্তাক্ত প্রান্তরে। এ জাতি মাথা উঁচু করেছে সীমাহীন ত্যাগ তিতিক্ষার মধ্য দিয়ে। এ জাতির ভাগ্যে নির্বাচনের পরে জুটবে বিদেশীদের করুণামিশ্রিত সমবেদনা। জুটবে বিভিন্ন মহল থেকে সান্ত্বনার বাণী, পরামর্শ, উপদেশ।
আমরা নতুন কিছু গড়তে ব্যর্থ হলেও ভেঙে ফেলেছি অনেক কিছু। জাতীয় সংসদকে কার্যকর করতে সক্ষম হইনি। বিচার বিভাগকে নিঃশেষ করেছি। প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে দলীয়করণের অভিশাপে অভিশপ্ত করেছি। আইন অমান্য করে তার মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছি। সংবিধানকে অগ্রহণযোগ্য করে তুলেছি। এর পরিণাম যে শুভ হবে না, তা বলাই বাহুল্য।
বাংলাদেশে রাজনৈতিক সংস্কার বলতে বোঝায় দ্বিমাত্রিক পরিবর্তন- এক. রাজনৈতিক ব্যবস্থার রূপান্তর। দু’ভাবেই প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে দেশের রাজনীতির প্রকৃতির সার্বিক পরিবর্তন, যেন সেই রাজনীতি জাতীয় এবং জনস্বার্থ সংরক্ষণের মোক্ষম অস্ত্র হয়ে উঠতে পারে। প্রথমটির অন্তর্গত হলো- ক. শাসনকারী ক্ষমতাসীন পদাধিকারীদের মধ্যে ক্ষমতার বিন্যাসে বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধন। সমগ্র ব্যবস্থায় চেক অ্যান্ড ব্যালান্স প্রবর্তন করে, শাসনকারীদের ক্ষমতা সীমিত করে, যে জনগণের প্রতিনিধিরূপে তারা নির্বাচিত হয়েছেন, তাদের কাছে জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ। খ. জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি সমন্বয়ে সংগঠিত জাতীয় সংসদকে জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে রূপান্তরকরণ। গ. গণতন্ত্র যে সামগ্রিক এক প্রত্যয়, তাকে অর্থপূর্ণ করার লক্ষ্যে জাতীয় পর্যায়ে কেন্দ্র থেকে প্রান্ত পর্যন্ত অর্থাৎ শুধু জাতীয় পর্যায়ে নয়, স্থানীয় পর্যায় পর্যন্ত গণতন্ত্রের বিস্তৃতি ঘটিয়ে সমগ্র জনসমষ্টিকে অংশগ্রহণকারী নাগরিকরূপে গড়ে তোলা এবং ঘ. বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করে সঙ্গে সঙ্গে জনগণকে তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করে গণ-অধিকার নিশ্চিতকরণ।
রাজনৈতিক ব্যবস্থার এভাবে সংস্কার করা জরুরি হলেও কাজটি অত্যন্ত কঠিন ও জটিল। তত্ত্বাবধায়ক বা কোনো অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাজ নয় এটি। রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে ভারসাম্যপূর্ণ করা এতই মৌলিক বিষয় যে দেশের সংবিধান সংশোধন না করে এক পাও এগোনো সম্ভব নয়। তাই সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের এই মৌলিক কাজটি সম্পন্ন করতে হবে। অন্য কারো পক্ষে তা সম্ভব নয়। দেশের রাজনীতি ও সাংবিধানিক ক্ষমতা পুনর্গঠিত হতে হবে, যেন দলীয় নেতৃত্ব পরিবারতন্ত্রে বিশ্বাসী না হয়ে গণতন্ত্রে বিশ্বাসী হয়। অতীতমুখী না হয়ে উজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে দৃষ্টি রাখে। সঙ্ঘাতের পরিবর্তে তার সহযোগিতার মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ হয়।
গ্রামাঞ্চলে একটি রীতি চালু রয়েছে গৃহকর্তা যখন তার বড় ছেলের বিয়ে দিতে চান তখন বাড়িটিকে সাজিয়ে গুছিয়ে নিতে চান, যেন ভবিষ্যতের কর্ত্রী সব দিক মানিয়ে নিয়ে বাড়ির সম্মান রক্ষা করে চলতে পারে। এ ক্ষেত্রে দু’টি রীতি এখনো চালু আছে। কেউ কেউ ঘর সাজিয়ে নতুন বউকে ঘরে তোলে। কেউ কেউ আবার বউ এলে নতুন বউকে সঙ্গে নিয়ে, তার রুচি এবং সৌন্দর্যবোধকে মূল্য দিয়ে, শুধু বর্তমানকে নয় ভবিষ্যৎকেও সামনে রেখে ঘর সাজান। আমাদের দেশ সাজাতে হবে দুর্নীতিবাজ ও লুটেরাদের জন্য নয়, গণমানুষের জন্য।
রাজনৈতিক-সামাজিক ব্যবস্থারূপে যে গণতন্ত্রকে আজকের বিশ্বনন্দিত এক সিস্টেম হিসেবে গ্রহণ করেছে, তার অতীতের দিকে দৃষ্টি দিন, দেখবেন উন্নত মানবসভ্যতার তিনটি ধারার অবদানে সমৃদ্ধ হয়েই আজ তা সর্বজনীন ব্যবস্থায় রূপান্তরিত হয়েছে। গ্রিক সভ্যতা থেকে সংগৃহীত হয়েছে শাসনব্যবস্থার সঙ্গে জনগণের গভীর সংশ্লিষ্টতা। রোমান সভ্যতার বৈশিষ্ট্যপূর্ণ অবদান হলো, যাদের জন্য শাসন, প্রাকৃতিক আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ তাদের সব অধিকার সংরক্ষণের রক্ষাকবচ। আর এসেছে শাসনকারীদের ন্যায়পরায়ণতা, দায়িত্ববোধ ও জবাবদিহি। তিনটি ক্ষেত্রেই কিন্তু রয়েছে শাসনকারী রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের উপস্থিতি। তাদের কর্মকাণ্ডই প্রাইম মুভার। সুতরাং রাজনৈতিক সংস্কার তাদের উপস্থিতিতেই অর্থপূর্ণ হয়ে ওঠে।
গণতান্ত্রিক দল কখনো দলীকরণের ঘৃণ্য পদক্ষেপ গ্রহণ করে না। যুক্তরাষ্ট্রে একই মঞ্চ থেকে দলীয় নেতা তার কর্মসূচি ব্যাখ্যা করেন এবং বিরোধী দলের নেতা তার সমালোচনা করেন। তবে সাথে সাথে এটিও উল্লেখযোগ্য যে, নির্বাচন কমিশনকে স্বাধীনভাবে কাজ করার সার্বিক সুযোগ সৃষ্টি করে দিতে হবে।
এ পর্যন্ত নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার যা করেছে, তা প্রশংসনীয়। নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগের পৃথকীকরণ অনেকটা ঐতিহাসিক। তেমনি বিষয়বস্তু উপস্থাপন করে দেশের রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের কথা শোনা এবং যতদূর সম্ভব কথা কম বলা। দেখবেন, দেশের রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা এসব সমস্যা সমাধানে নিজেরাই আগ্রহী।
লেখক : কলামিস্ট, ’৯০-এর সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যর
কেন্দ্রীয় সাবেক ছাত্রনেতা
