যে সব ভয়ঙ্কর কৌশল অবলম্বন করে শাসক দল নিজ নিজ দলের চরম স্বার্থ রক্ষা করে বা জনমনে ভয়ের পরিবেশ সৃষ্টি করে নিজস্ব লোকের বা দলের প্রতিকূলে যাতে কোনো মত সৃষ্টি না হয় সেই ব্যবস্থা করে, তা হলো- Political Stupid Technique (PST) বা রাজনৈতিক দুষ্ট কৌশল। PST বিভিন্নভাবে হতে পারে। যেমন- প্রখ্যাত কোনো সিনিয়র সিটিজেনকে হত্যা করা, শাসক দল নিজ দলের প্রসিদ্ধ কোনো প্রবীণ ব্যক্তিত্বকে হত্যা করে দোষ অন্যের ওপর চাপিয়ে দিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করা, বিলাসবহুল যাত্রী বোঝাইকৃত কোনো নৌযানকে সুকৌশলে সমুদ্রে ডুবিয়ে দিয়ে যাত্রীদের উদ্ধারের অভিনয় করা; অল্পসংখ্যক যাত্রী উদ্ধার করা এবং তা এক বা একাধিক নিউজ মিডিয়াতে সরাসরি সম্প্রচারে বাধ্য করা যাতে জনমত সেদিকে প্রবাহিত হয়, নিন্মবিত্ত লোকদের কর্মপরিবেশে অগ্নিসংযোগ ঘটিয়ে বহু লোক হত্যা করা, মিলকারখানায় অগ্নিকাণ্ড ঘটানো, বিশেষ করে দাহ্যপদার্থ আছে এমন অবস্থানে আগুন লাগিয়ে দেয়া এবং শ্রমিক হত্যা করা; আবার মধ্যবিত্ত ও উচ্চ মধ্যবিত্তের কর্মস্থলে আগুন লাগিয়ে এই শ্রেণীর মানুষকে হত্যা করা, কোনো নিউজ মিডিয়ায় আগুন লাগানো, প্রতিপক্ষের রাজনৈতিক কর্মসূচিতে নিজ দলের সশস্ত্র কর্মীদের ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীদের সশস্ত্র সদস্যদের ব্যবহার করা। এ ছাড়াও গুম, খুন, অপহরণ করে বিরোধী মত দমনের চেষ্টা করা। আমাদের দেশে এর দৃষ্টান্ত রয়েছে। রাজনীতিবিদ অধ্যাপক গোলাম আযমের পুত্র অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আযমীকে অপহরণ ও বর্ষীয়ান পার্লামেন্টারিয়ান সালাহ উদ্দীন কাদের চৌধুরীর পুত্র হুম্মাম কাদের চৌধুরীকে অপহরণ করা হয়।

উল্লিখিত বিভিন্ন ঘটনা ঘটিয়ে শাসক দল এমন ভান করে যে, তারা এগুলো দমনের সাধ্যমতো চেষ্টা করছে। স্বাধীনতার অব্যবহিত পর পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের স্পিকার ও বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ ফজলুল কাদের চৌধুরীকে জেলখানায় হত্যার বিষয়টিকে পলিটিক্যাল স্টুপিড টেকনিক বলা যায়। আবার সিরাজ সিকদার হত্যাকাণ্ড হলো রাজনৈতিক হিংসাত্মক প্রতিরোধ। এটিও এক ধরনের পলিটিক্যাল স্টুপিড টেকনিক।

যেকোনো স্বৈরশাসক তার রাজনৈতিক কাজকে তিনটি অংশে বিভক্ত করে প্রয়োগ করতে পারে। এর একটি অতীত। এই অংশটি হলো প্রতিশোধাত্মক। শাসক দল তার প্রধান প্রতিপক্ষ দ্বারা অতীতে যে নির্যাতন বা গুম বা খুনের শিকার হয়েছিল তার প্রতিশোধ নিয়ে থাকে। ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে প্রথমে তারা এই কাজটি করে থাকে। বেগম খালেদা জিয়ার জেল-জুলুমও প্রতিশোধাত্মক। দ্বিতীয়টি হলো ক্ষমতার কাল। এই অংশে শাসক দল ক্ষমতায় টিকে থাকার চেষ্টা করে। ফলে তারা জনকল্যাণমূলক বিভিন্ন কাজ করে থাকে যাতে পরবর্তীতে তারা আবার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হতে পারে। কিন্তু প্রতিশোধাত্মক ক্রিয়াকলাপে তারা এতই মেতে উঠে যে, জনকল্যাণ, রাষ্ট্রচিন্তা, সার্বভৌমত্ব রক্ষা সব কিছু এরা ভুলে যায়। বর্তমান বিশ^ায়নের যুগে শত্রুদেশগুলো এর সুযোগ নিতে থাকে। ফলে ওই সমস্ত এক বা একাধিক রাষ্ট্র যারা আমাদের দেশ থেকে ব্যাপক সুবিধাপ্রত্যাশী তারা ক্ষমতাসীনদের উসকে দিতে থাকে। ফলে ক্ষমতাসীন দল ধীরে ধীরে তাদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। তাদের নির্দেশে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে থাকে। এ অবস্থায় জনমত তাদের বিপক্ষে চলে যায়। অথচ তারা তা খেয়াল করে না। যখন তাদের দৃষ্টিতে তা ধরা পড়ে তখন সেখান থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ থাকে না। তৃতীয়টি হলো- ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য ভবিষ্যৎ ভাবনা।

সরকার যখন লক্ষ করে জনমত তাদের বিপক্ষে চলে গেছে, নির্বাচন করলে শাসক দলের জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে না; তখন তারা লোকদেখানো নির্বাচনের আয়োজন করে। এ ধরনের নির্বাচন করতে গিয়ে আমলাতন্ত্র, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বিভাগ, নির্বাচন কমিশন প্রভৃতিকে এমনভাবে বিতর্কিত করে তোলে যে এই প্রতিষ্ঠানগুলো শাসকদলের সহায়তা করা ছাড়া আর কোনো গত্যন্তর থাকে না। এই সুযোগে দলীয় সরকার আইন বিভাগ, শাসন বিভাগ, বিচার বিভাগ, প্রতিরক্ষা বিভাগকে নিজেদের সাথে সাথে দুর্নীতিপরায়ণ করে তোলে। ফলে সংস্থাগুলো ব্যাপক দুর্নীতিবাজ হয়ে যায়। সরকার পরিবর্তন হলে এদের চাকরি হারানোও জেল-জুলুমের ভয় থাকে; অত্যাচার-নিপীড়নের ভয় থাকে। এমনকি প্রতিপক্ষের দ্বারা গুম-খুনের ভয় থাকে। তাই এরা শাসক দলকে টিকিয়ে রাখার কৌশলে ব্যস্ত থাকে।

বিশ্বায়নের এই যুগে বর্তমান বিশ্বকে পূর্ব অংশ ও পশ্চিম অংশে বিভক্ত করলে পূর্ব অংশের প্রভাবশালী দেশগুলো বর্তমান সরকারকে ক্ষমতায় টিকে থাকতে সহায়তা করছে বিশ^রাজনীতির কারণে। এই অংশে প্রভাবশালী রাষ্ট্র হচ্ছে- ভারত, চীন ও রাশিয়া। বিএনপি তথা বিরোধী জোটকে পরোক্ষ সমর্থন করছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, এমন ধারণা সাধারণ মহলে রয়েছে। এ অঞ্চলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব সৃষ্টির জন্য তারা তাদের অনুকূলের একটি সরকার প্রত্যাশা করে।

কোনো প্রভাবশালী রাষ্ট্র একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রে হস্তক্ষেপ করে সমরশক্তি প্রয়োগ করে ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটানোর স্বল্প নজির থাকলেও বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তা ঘটার সম্ভাবনা কতটুকু তা দেখার অপেক্ষা থাকল। কৌশলে এ ধরনের পরিবর্তন ঘটাতে হলে জনগণের সম্পৃক্ততার মাধ্যমে তা করতে হবে। ভাববার বিষয় হলো- বিএনপি ও জোট জনগণকে নিয়ে সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করতে পারবে কি না। বিগত দিনের সমাবেশ, হরতাল ও অবরোধ পর্যালোচনা করলে বুঝা যায় বিএনপি ও সরকারবিরোধীদের সাথে জনগণের ব্যাপক সমর্থন রয়েছে। কিন্তু এই সমর্থনকে বিএনপি যথাযথভাবে হ্যান্ডেল করতে পারছে না। এ পর্যন্ত বিএনপিরও কিছু ব্যর্থতা বোদ্ধাদের দৃষ্টিতে পড়েছে। এগুলো হলো- ১. আমলাতন্ত্রকে সরকারবিরোধী আন্দোলনে সম্পৃক্ত করতে না পারা; ২. সামরিক বাহিনীর সমর্থন অনুকূলে আনতে না পারা; ৩. নৌবাহিনীও বিমানবাহিনীর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সমর্থন না পাওয়া; ৪. আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করে এক অংশকে তাদের অনুকূলে আনতে না পারা; ৫. সরকারের বেসামরিক বিভিন্ন বিভাগকে আন্দোলনে সম্পৃক্ত করতে না পারা; ৬. সর্বস্তরের জনগণকে এই আন্দোলনে যুক্ত করতে না পারা।

উল্লিখিত ব্যর্থতা থাকলেও জনসমর্থন যে, বিএনপির রয়েছে তা অবিশ^াস করার কোনো কারণ নেই। এই সমর্থন ধরে রেখে গণতন্ত্রকে পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য ও রাজনৈতিক দুষ্ট কৌশলকে প্রতিহত করার জন্য বিএনপিকে দুই ধারার আন্দোলন তৈরি করতে হবে। একটি হলো বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন। অন্যটি হলো গণ-আন্দোলন। বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন Domestic (অভ্যন্তরীণ) এবং Abroad (বহিবির্শ্ব) দু’ভাবে হতে পারে। অভ্যন্তরীণ বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনে দেশের জাতীয়তাবাদী ও ইসলামপন্থী পেশাজীবীদের ভূমিকা পালনের জন্য সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দল প্রধানত বিএনপি তাদের নিয়োগ করবে। তাদের কাছে পরামর্শ চাইবে। সরকারবিরোধী পক্ষ এদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। এইসব পেশাজীবী নিরপেক্ষ, অংশগ্রহণমূলক ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের জন্য ভূমিকা পালন করবে। এদের কাজ বেশ ঝুঁকিপূর্ণ হবে। এরা আমলাতন্ত্র, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সব সামরিক বিভাগ, বাংলাদেশে অবস্থিত বিভিন্ন দেশের হাই-কমিশনার বা রাষ্ট্রদূতদের সাথে সভা করে কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। অন্যদিকে, বহির্বিশ্বে বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনকারীরা যারা যে দেশে অবস্থান করেছেন, তারা সে দেশে সংগঠিত হয়ে ওই দেশের সরকারের সহায়তা চাইবে এবং সহায়তা আদায় করে নেবে। যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্র্রেলিয়া, ইউরোপের রাষ্ট্রসমূহ, যুক্তরাজ্য, ল্যাতিন আমেরিকা, ভারত, পাকিস্তান, চীনসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের সহায়তা চাইবে বাংলাদেশে গণতন্ত্রকে ফিরিয়ে আনার জন্য। তবে এ ক্ষেত্রে ভারতকে কম বিশ্বাস করে এগিয়ে যেতে হবে। আর এই বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনে সম্পৃক্ত থাকবে সরকারের কট্টরবিরোধী বিএনপিপন্থী সাবেক আমলা, সেনা, নৌ, বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা, সরকারের ব্যাপক নির্যাতনের পর যেসব সাংবাদিক দেশের বাইরে অবস্থান করছেন তারা। বহির্বিশ্বে অবস্থানরত শিক্ষক-গবেষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী প্রভৃতি পেশাজীবীদেরকে সরকারবিরোধী বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনের উদ্যোক্তারা সংযুক্ত করবেন।

দেশে সরকারবিরোধী সব রাজনৈতিক দল এখন হরতাল-অবরোধ কর্মসূচি দিয়ে আসছে। অবরোধে বেশির ভাগ সফলতা পেলেও রাজধানীতে হরতালে সফলতা আংশিক। এর মাত্রা আরো বাড়াতে হবে। কর্মসূচির নতুনত্ব আনার জন্য হরতাল-অবরোধের পাশাপাশি কখনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কখনো মিলকারখানায় ধর্মঘটের ডাক দিতে হবে। স্বল্প সময়ের মধ্যে গণ-অভ্যুত্থানের আহ্বান করতে হবে। এ ধরনের ক্ষেত্রে আন্দোলন সহিংস রূপ নিলেও ধৈর্যের সাথে পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হবে।

লোকমুখে একটি কথা শোনা যায়, তাহলো- অন্য কোনো দেশের কিছু লোক আমাদের দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতে চাকরি করছে; এমনকি আধা-সামরিক ও সামরিক বাহিনীতে অন্য দেশের সশস্ত্রবাহিনীর সদস্যরা চাকরি করছে। যদি তা সত্য হয়, তাহলে এদের মোকাবেলা করা বিরোধী পক্ষের জন্য কঠিন হবে। আন্দোলনের মাত্রা যখন তীব্র থেকে তীব্রতর হবে তখন এরা সরে যেতে বাধ্য হবে। একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে অন্য কোনো দেশ ব্যাপক ঝুঁকি নেবে না যা কোনো নিয়মের মধ্যেও পড়ে না। বিরোধীদের এখন দরকার একটি গণ বিপ্লবের ডাক দেয়া, নেতাকর্মীদের বিপ্লবে প্রশিক্ষিত করে তোলা; জনগণকে সম্পৃক্ত করা; এ লক্ষ্যে দেশের তরুণ ও যুবসমাজকে সংযুক্ত করা এবং এদেরও বিপ্লবের জন্য প্রশিক্ষিত করে তোলা।

লেখক : অধ্যাপক ও রাজনীতি বিশ্লেষক
ইমেইল : kazimain@gmail.com