ফিলিস্তিনের আদি হিব্রু জনগোষ্ঠীই ৬৩৬-৩৭ সালে ইসলামের আলোয় আলোকিত হয়েছিল। এরা জেরুসালেমকে মধ্যমণি করে আবাদের মাধ্যমে ভূমধ্যসাগরের পূর্বে ১০৪২৯ বর্গমাইলের দেশ ফিলিস্তিনকে উর্বর করে তোলে। শান্ত প্রকৃতির এসব মুসলমান বুক আগলে স্থান দিয়েছিল দুই হাজার বছরের যাযাবর জাতি ইহুদিদের। আজ সেখানে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। হত্যা, খুন, গুম সেখানকার নিত্যদিনের ঘটনা। দখলদার ইসরাইলিরা ফিলিস্তিনিদের স্বীয় মাতৃভূমি থেকে বিতাড়িত করার বীভৎস খেলায় মেতে উঠেছে।
১৯৪৮ সালে ফিলিস্তিনে বিষবৃক্ষ রোপণ করে জায়নবাদীরা। এতে করে ফিলিস্তিনসহ পুরো মধ্যপ্রাচ্য জ্বলেপুড়ে ছারখার হচ্ছে- যার পুরো সুবিধা নিচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপীয় খ্রিষ্টসমাজ। প্রতিনিয়ত আগ্রাসন চালিয়ে যাচ্ছে অবৈধ রাষ্ট্র ইসরাইল। এরই মধ্যে বৃহৎ আকারে ১৯৪৮, ১৯৫৬, ১৯৬৭, ১৯৭৩ এবং সর্বশেষ ২০২৩ সালের যুদ্ধ চলমান।
বিশ্বব্যাপী একটি মিথ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল যে, জায়নবাদীরা অজেয়। এর ফলে তারা যা ইচ্ছা তাই করতে থাকে। এরা পশুপাখির মতো ফিলিস্তিনের আবাল, বৃদ্ধ, শিশু-কিশোর, নারী-পুরুষ যখন যাকে ইচ্ছে হত্যা করে। তাদের ভয়ে কেউ ফিলিস্তিনিদের পক্ষে তেমন কথা বলে না। জায়নবাদীদের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সমরাস্ত্র কিংবা বৈজ্ঞানিক তৎপরতার সব জায়গায় অতিরঞ্জিত মিথের ওপর প্রতিষ্ঠিত। এই বানোয়াট মিথ ও আরবের গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোর সাথে তার নব সখ্য ভেঙে দিতেই প্রয়োজন ছিল অবৈধ দেশটির অভ্যন্তরে একটি আক্রমণ। হামাস তাই করেছে।
৭ অক্টোবর, ২০২৩ শনিবার স্থানীয় সময় ভোর সাড়ে ৬টায় হামাসের মিলিটারি উইং ইসরাইলে আক্রমণ করে। এতে করে ইসরাইলের এতদিনের নিরাপত্তা-বিষয়ক জাতীয় দম্ভ চুরমার হয়ে যায়। হামাস এ হামলার নাম দিয়েছে ‘অপারেশন আল-আকসা ফ্লাড’।
এ ঘটনার পর ইসরাইল এক লাখের অধিক সেনা নামিয়েছে গাজায়। গাজা লম্বায় ২৫ মাইল আর প্রস্থে ৮-৯ মাইল। এইটুকু গাজায় সাড়ে ২৩ লাখ মানুষের বাস। ইসরাইল সাধারণ মানুষকে ভবনগুলো থেকে সরে যেতে বলেছে। অনেকে স্কুলভবনে আশ্রয় নিয়েছে। কিন্তু সেটি কতটা নিরাপদ এই ঘনবসতির মধ্যে, তা নিশ্চিত না। ইসরাইল একের পর এক স্থাপনা ধ্বংস করছে, কিন্তু এরই মধ্যে একটি সমস্যা ইসরাইল বোধ করছে। যেসব ইসরাইলি নাগরিক ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, তাদের কী হবে? ইসরাইল বলেছে, এই ধরে নিয়ে যাওয়া যুদ্ধাপরাধ। এই অতর্কিত হামলা নিয়ে দু’পক্ষ থেকেই কিছু দৃষ্টিভঙ্গি জানা গেছে। হামাস বলেছে, আমরা তো যুদ্ধের মধ্যেই আছি দীর্ঘকাল ধরে- যা চিরন্তর সত্য। আর ইসরাইলের বক্তব্য হলো- যখন আরব দেশগুলোর সাথে সুসম্পর্ক গড়ে উঠছে, তখন এ হামলা আমাদের নতুন করে যুদ্ধের ময়দানে নামিয়েছে।
আন্তর্জাতিকভাবে সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থানে দেখা যাচ্ছে কয়েকটি দেশকে। যুক্তরাষ্ট্রের বাইডেন প্রশাসন, যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপীয় দেশগুলো ইসরাইলের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করেছে। প্রেসিডেন্ট বাইডেন অবিচল সমর্থনের কথা বলেছেন। জার্মানি ফিলিস্তিনে প্রদত্ত আর্থিক সহায়তা বন্ধের বিবেচনার কথা জানিয়েছে। অন্য দিকে, ইরান হামাসকে পূর্ণ সমর্থন দিয়েছে। ইরানের প্রেসিডেন্ট রাইসি হামাস নেতা ইসমাইল হানিয়া ও ফিলিস্তিনের ইসলামিক জিহাদ জেনারেল সেক্রেটারি জিয়াদ আল নাকালার সাথে টেলিফোন আলাপ করে এ হামলার জন্য অভিনন্দন জানিয়ে তার সমর্থন ব্যক্ত করেছেন। কাতারও হামাসের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে।
হামাস কেন এ সময় এমন আক্রমণের পথ বেছে নিলো তার কিছু কৌশলগত রাজনৈতিক কারণ থাকতে পারে। ইসরাইল ২০২১ সালে ৮৫০ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করে ৩২ মাইল দীর্ঘ একটি অত্যাধুনিক দেয়াল নির্মাণ করতে শুরু করে, যা দ্রুত শেষ হতে চলেছে। এ দেয়াল মাটির ওপরে ২০ ফুট উঁচু এবং মাটির নিচে এতটাই গভীর পর্যন্ত, যাতে হামাস বা ফিলিস্তিনি যোদ্ধারা কোনোক্রমেই টানেল খুঁড়তে না পারে।
অন্যদিকে আরব দেশগুলোর সাথে দ্রুত ইসরাইলের সম্পর্ক গড়ে উঠতে শুরু করেছে। সৌদি আরব ইসরাইলকে আকাশ ব্যবহারের অনুমোদন দিয়েছে। কয়েকটি মুসলিম দেশের সাথে সম্পর্ক গড়ে তুলতেও ইসরাইলকে সহায়তা করে সৌদি আরব। ইরানের সাথে চরম বৈরিতা ফিলিস্তিনের স্বার্থ থেকে সৌদি আরবকে দূরে ঠেলে দিয়েছে।
নেতানিয়াহু বলেছেন, এমন হামলার শিকার হবে হামাস, যা আগে কখনো দেখেনি। সত্যিকারার্থে গত ৪৮ দিনে গাজা নরকে পরিণত করা হয়েছে। কিন্তু চিত্রটা দেখা যাচ্ছে ভিন্ন। হামাস ইসরাইলের মতো বর্বর হতে পারেনি। তারা বন্দীদের মানব ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেনি। হামাস কয়েকজন ইসরাইলি বন্দীকে মুক্তিও দিয়েছে।
জাতিসঙ্ঘের স্থায়ী পরিষদ নিয়ে গত কয়েক বছর বিশ্বমঞ্চে প্রশ্ন উঠেছে। এরা কি মানবতার জন্য প্রতিষ্ঠিত নাকি মার্কিনিদের জন্য যুদ্ধরীতি সহজীকরণে কাজ করছে! জাতিসঙ্ঘকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে যুদ্ধের ১১তম (১৭ অক্টোবর মঙ্গলবার রাত) দিনে গাজা ভূখণ্ডের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত আল-আহলি হাসপাতালে বিমান হামলা করে ইসরাইল। এতে অন্তত ৫০০ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এর আগে ইসরাইলি হামলায় আহত শত শত রোগী ও গৃহহীন অসংখ্য বাসিন্দা নিরাপদ ভেবে ওই হাসপাতালে আশ্রয় নিয়েছিল।
অপর দিকে, হাসপাতালে অভিযানের আগের দিনগুলোতে ইসরাইল জোর দিয়ে বলেছিল, আল-শিফা হাসপাতালের নিচে হামাসের কমান্ড সেন্টার রয়েছে- যেখান থেকে তারা টানেল পরিচালনা করছে। এই দাবির ভিত্তিতে তারা আল-শিফা হাসপাতালে আক্রমণ করে। তারা গত ১৫ নভেম্বর বুধবার দুপুর ২টায় প্রথমবারের মতো হামলা চালায়। এরপর ইসরাইলি বাহিনী দাবি করে, অভিযানে তাদের দাবির পক্ষে প্রমাণ মিলেছে। ইসরাইলি সামরিক বাহিনী হাসপাতালের একটি অব্যবহৃত ভবনের ভিডিও ফুটেজ প্রকাশ করে। অবশ্য এসব ভিডিওর সত্যতা নিশ্চিত নয়। প্যালেস্টাইন ন্যাশনাল ইনিশিয়েটিভের জেনারেল সেক্রেটারি মুস্তাফা বারঘৌতি বলেন, ইসরাইলের প্রকাশিত ভিডিওতে যা দেখা গেছে, তা তো তারাই সেখানে রাখতে পারে। তিনি আরো বলেন, ইসরাইল প্রথমে কিছু দর্শককে আল-শিফার ওই অব্যবহৃত কামরায় নিয়ে যাওয়ার ভিডিও প্রকাশ করেছে, সেখানে তারা দাবি করেছিল যে, কোনো সম্পাদনা বা কাটছাঁট ছাড়াই তারা ভিডিওটি প্রকাশ করেছে। পরে তারা ওই ভিডিওটি আবার ডিলিট করে দেয়। এরপর তারা পুনরায় ভিডিওটি প্রকাশ করছে। কিন্তু নতুন ভিডিওর সাথে পুরোনো ভিডিওর অভিন্নতা পাওয়া যায়নি।
আল-জাজিরার হানি মাহমুদ বলেন, ইসরাইলের সামরিক বাহিনী আল-শিফাতে আক্রমণ চালিয়ে হাসপাতালের অপারেশন সেন্টার ধ্বংস করেছে। চিকিৎসাসামগ্রীও সম্পূর্ণ অকেজো করে ফেলেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে, গাজার সবচেয়ে বড় এই হাসপাতালে ৭০০ রোগী, ৪০০ স্বাস্থ্যকর্মী এবং প্রায় তিন হাজার বেসামরিক লোক ছিল। এদিকে বিদ্যুৎ লাইন বিচ্ছিন্ন করায় হাসপাতালে ভেন্টিলেশনে থাকা অধিকাংশ রোগীই মারা গেছে।
অবশেষে কাতারের সহায়তায় চার দিনের যুদ্ধবিরতির দ্বার উন্মোচিত হয়েছে- বিনিময়ে ৫০ জন ইসরাইলি মুক্তি পাবে। অন্যদিকে, ১৫০ জন ফিলিস্তিনি নারী ও শিশু ইসরাইলের কারাগার থেকে বেরিয়ে আসবে।
৭ অক্টোবরের আক্রমণে এক হাজার ২০০ ইসরাইলি নিহত ও ২৪০ জন জিম্মি হয়েছিল হামাসের হাতে। বিপরীতে জায়নবাদী অবৈধ ইসরাইলের ৪৮ দিনের আগ্রাসী আক্রমণে ১৩ হাজার ৩০০-এর অধিক ফিলিস্তিনি নিহত- যার মধ্যে ৫৬০০ শিশু ও তিন হাজার ৫৫০ নারী রয়েছে।
কিন্তু এ-কি সমাধান! এ সঙ্ঘাত এখন কত শিশুর, কত মায়ের, কত নিরীহ পিতা বা সন্তানের জীবন নেবে! বিশ্ব মানবতা এ-দায় এড়াতে পারে না।
লেখক : কলামিস্ট
