সংস্কার না হলে ফ্যাসিবাদ ফিরে আসতে পারে
গোলটেবিল বৈঠকে অভিমত
‘‘সংস্কারপ্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্তের চেষ্টা বাইরে থেকে হচ্ছে, ভেতর থেকেও হচ্ছে। রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্ন উঠেছে এ কারণে যে, বিগত ১৫ বছরে দেশের ভঙ্গুর প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরো ভঙ্গুর করা হয়েছে।’’
সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রধান ও জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি ড. আলী রীয়াজ বলেছেন, সংস্কার শুধু সরকারের ইচ্ছার বিষয় নয়, এটি রাজনৈতিক দল এবং নাগরিকদের বহুল আকাক্সিক্ষত বিষয়। তাই সংস্কারের বিষয়ে জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা ও নাগরিক সনদ প্রণয়ন করতে হলে নাগরিকদের সোচ্চার হতে হবে। তিনি গতকাল রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে নাগরিক সংগঠন সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন আয়োজিত ‘রাষ্ট্র সংস্কারে রাজনৈতিক ঐকমত্য ও নাগরিক ভাবনা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে এ মন্তব্য করেন।
সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদারের সভাপতিত্বে এতে আরো বক্তব্য রাখেনÑ জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সদস্য বিচারপতি এমদাদুল হক, সাবেক সচিব আবদুল আউয়াল মজুমদার, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) সাবেক অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরী, প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের (ঢাবি) উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. আসিফ মোহাম্মদ সাহান, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আবু সাঈদ খান, ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেডের সত্ত্বাধিকারী মাহরুখ মহিউদ্দিন প্রমুখ। লিখিত প্রবন্ধ পাঠ করেন সুজনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী দিলীপ কুমার সরকার।
ড. আলী রীয়াজ বলেন, সংস্কারপ্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্তের চেষ্টা বাইরে থেকে হচ্ছে, ভেতর থেকেও হচ্ছে। রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্ন উঠেছে এ কারণে যে, বিগত ১৫ বছরে দেশের ভঙ্গুর প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরো ভঙ্গুর করা হয়েছে। স্বাধীনতার পর বিগত ৫৪ বছরে কোনো প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়া হয়নি। আমরা দেখেছি, গত ১৫ বছরে বিচার বিভাগকে কিভাবে ধ্বংস করা হয়েছে। সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়ন না হলে, প্রশাসন ও বিচার বিভাগকে পুনর্গঠিত করা না হলে সুষ্ঠু নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সরকার গঠিত হলেও ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থা ফিরে আসতে পারে। তাই বাংলাদেশে ভবিষ্যতে স্বৈরতন্ত্রের পুনরুত্থানের ঠেকাতে হলে কাঠামোগত পরিবর্তন করতে হবে, জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র গড়ে তুলতে হলে সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে হবে।
ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, শেখ হাসিনা দেশে স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এতে তার ১৫ বছর লেগেছে। তিনি নির্বাচনব্যবস্থা ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ভেঙে দিয়েছিলেন। ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে কারণে শেখ হাসিনার পলায়নের পর আমাদের রাষ্ট্র কাঠামোকে নতুন করে গড়ে তোলার জন্য এক অপূর্ব সুযোগ তৈরি হয়েছে। এ লক্ষ্যে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন কাজ করছে, যাতে একটি ‘নাগরিক সনদ’ তৈরি করা যায়।
বিচারপতি এমদাদুল হক বলেন, বিচার বিভাগ নিয়ে অতীতে বিভিন্ন প্রশ্ন ও বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশন তার প্রতিবেদনে এসব বিষয়ে বিস্তারিত উল্লেখ করেছে এবং প্রয়োজনীয় সুপারিশ তুলে ধরেছে। আমি মনে করি, সংস্কার একটি চলমান প্রক্রিয়া। কিন্তু এখন সময় এসেছে সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়নের।
ড. দিলারা চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশের মানুষ সত্যিকার অর্থেই ধর্মনিরপেক্ষ। এখানে সুফিবাদের মাধ্যমে ইসলামের প্রচার ও প্রসার হয়েছে। কিন্তু তারপর সংস্কার কমিশনের জরিপে ৮৫ শতাংশ মানুষ ধর্মনিরপেক্ষতার বিপক্ষে মতামত দিয়েছে। এর অন্যতম কারণ জর্জ ডব্লিউ বুশের সময়ে শুরু হওয়া ওয়ার অন টেরর বা সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অনন্ত যুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশকে একটি মৌলবাদী রাষ্ট্রে পরিচিত করার অপচেষ্টা চালানো হয়েছে। আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অনেক সমস্যা থাকলেও তাদের মাধ্যমেই রাষ্ট্র পরিচালিত হতে হবে। তাই যৌক্তিক কতগুলো সংস্কার করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে নির্বাচন আয়োজন করতে হবে।
আবদুল আউয়াল মজুমদার বলেন, বাংলাদেশের মূল সমস্যা হলো পারস্পরিক আস্থা না থাকা। আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো কেউ কাউকে বিশ^াস করে না। একদল মনে করে অন্যরা ক্ষমতায় এলে আমাদের ওপর জুলুম করবে। তাই আমাদেরকে সামনের দিকে এগোতে হলে সামাজিক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
আবু সাঈদ খান বলেন, সংস্কার কমিশনগুলোর অনেকগুলো ব্যাপারে ঐকমত্য রয়েছে। কিন্তু সংস্কার প্রস্তাবে কতগুলো বিষয়ে বিতর্ক উসকে দেয়া হয়েছে। যেমন, গণপ্রজাতন্ত্রী শব্দের বদলে নাগরিকতন্ত্র শব্দ প্রস্তাব করা। রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বহাল রাখার ব্যাপারে সংবিধান সংস্কার কমিশন থেকে যে যুক্তি দেয়া হয়েছে, তা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে।
ড. আসিফ মোহাম্মদ সাহান বলেন, সংস্কারের ব্যাপারে বর্তমানে দেশে একটি জাতীয় ঐকমত্য রয়েছে। সংস্কারের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক কিছু কাঠামো পরিবর্তন করা দরকার।
প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার বলেন, অতীতে সংস্কার একটি গালিতে পরিণত হলেও এখন বহুল আকাক্সিক্ষত বিষয়ে পরিণত হয়েছে। আমি মনে করি, সংস্কারের আগে আমাদের রাষ্ট্র ভাবনা কেমন হবে তা পরিষ্কার করা উচিত। বিগত ১৬ বছরের অভিজ্ঞতার ফলে সংস্কার একটি অনিবার্য বাস্তবতা এবং এ ক্ষেত্রে একটি স্ট্যান্ড তৈরি হয়েছে।
মূল প্রবন্ধ পাঠকালে দিলীপ কুমার সরকার পাঁচটি সংস্কার কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশগুলো সংক্ষেপে তুলে ধরে বলেন, রাষ্ট্র সংস্কারের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের বিশ্বাস জাতীয় ঐকমত্য কমিশন রাজনৈতিক দলগুলোসহ সব অংশীজনের সাথে বসে স্বল্পসময়ের মধ্যেই সংস্কারের ব্যাপারে ঐকমত্যে আসতে পারবে এবং সেই ঐকমত্যের সূত্র ধরেই আমরা সংস্কার প্রক্রিয়া প্রত্যক্ষ করব।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের সাথে বৈঠক : ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের প্রেসিডেন্ট এবং প্রধান নির্বাহী কমফোর্ট ইরোর সাথে বৈঠক করেছেন জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ। গতকাল রাজধানীর শেরেবাংলা নগর সংসদ ভবনে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের কার্যালয়ের সভাকক্ষে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের কাজের অগ্রগতিসহ বিবিধ বিষয়ে আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
বৈঠকে অধ্যাপক আলী রীয়াজ জানান, সংস্কার বিষয়ে জাতীয় ঐকমত্য সৃষ্টির লক্ষ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে আলোচনা শুরু হচ্ছে। ঈদের আগে অন্তত চারটি দলের সাথে সংলাপে বসবে কমিশন। ঈদের ছুটি শেষে পর্যায়ক্রমে অন্য দলগুলোর সাথেও আলোচনা হবে। তিনি জানান, বিভিন্ন কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশগুলোর ওপর সুনির্দিষ্ট মতামত জানতে ইতোমধ্যে স্প্রেডশিট আকারে ৩৮টি রাজনৈতিক দলের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে, এ পর্যন্ত ১৬টি রাজনৈতিক দলের কাছ থেকে মতামত পাওয়া গেছে।
বৈঠকে ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের এশীয় কর্মসূচির পরিচালক পিয়েরে প্রকাশ এবং প্রতিষ্ঠানটির মিয়ানমার ও বাংলাদেশিয় সিনিয়র কনসালট্যান্ট থমাস কিন উপস্থিত ছিলেন।






