পল্লীর ৩৫টি সেতু সাত বছরেও নির্মাণ হয়নি
মেয়াদ কয়েক দফায় বাড়িয়ে এখন আট বছরে
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বলেছেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত ব্রিজগুলোর কাজের অগ্রগতি কম হওয়ায় প্রকল্পের সার্বিক অগ্রগতি কম হয়েছে।
পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের নেয়া নির্বাচনী ও রাজনৈতিক প্রকল্প এখন জনগণের গলার কাঁটা। সমীক্ষা ছাড়াই প্রকল্প নেয়ায় অনেক প্রকল্প সমাপ্ত করাই কঠিন হয়ে পড়েছে। দক্ষিণাঞ্চলের তিন জেলায় পল্লী অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে ৩৫টি সেতু নির্মাণের কাজ সাত বছরেও শেষ করতে পারেনি স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর (এলজিইডি)। প্রকল্পটি পাঁচ বছরে শেষ করার কথা ছিল। ঢিমেতালে কাজ করে দফায় দফায় মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। ফলে এখন খরচ ২২ কোটি টাকা বাড়িয়ে মেয়াদ আট বছরে উন্নীত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনের কৃষি, পানিসম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে এ তথ্য জানা গেছে। পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগ বলছে, ডিসেম্বর ২০২৪ পর্যন্ত ক্রমপুঞ্জিত আর্থিক অগ্রগতি মোট ৬৯৭ কোটি ৪০ লাখ ৩৯ হাজার টাকা বা ৭৪.৩৬ শতাংশ ব্যয়ে ভৌত অগ্রগতি ৭৯.৩৬ শতাংশ। প্রায় সাত বছর অতিবাহিত হলেও প্রকল্পটি সমাপ্ত হয়নি।
স্থানীয় সরকার বিভাগের প্রকল্প প্রস্তাবনা থেকে জানা গেছে, দেশের দক্ষিণাঞ্চলের বেশ কিছু সেতু নির্মাণসহ অবকাঠামো উন্নয়নে ‘খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা জেলার পল্লী অবকাঠামো উন্নয়ন’ শীর্ষক প্রকল্পটি মোট ৯৩৭ কোটি ৯২ লাখ টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে জুলাই ২০১৮ হতে জুন ২০২৩ মেয়াদে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ২০১৮ সালের ১১ অক্টোবর অনুষ্ঠিত একনেক সভায় অনুমোদিত হয়। পরবর্তীতে অপরিবর্তিত রেখে প্রকল্পের মেয়াদ জুন ২০২৪ পর্যন্ত এক বছর বাড়ানো হয়। যা স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন মন্ত্রী ২০২৩ সালের জুনে অনুমোদন করেন। তারপর ব্যয় বৃদ্ধি ছাড়াই মেয়াদ আরো এক বছর বাড়িয়ে জুন ২০২৫ পর্যন্ত বাড়ানো হয়। এখন ব্যয় ২২ কোটি টাকা বাড়িয়ে মেয়াদ ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব পাঠানো হলে পরিকল্পনা কমিশন সেখানে অনেকগুলো অসঙ্গতি ও ব্যাখ্যা চেয়ে প্রস্তাবনাটি আবার ফেরত পাঠিয়েছে।
বাস্তবায়নকারী সংস্থা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর (এলজিইডি) বলছে, প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হওয়ায় প্রকল্প এলাকায় বেশ কিছু বড় সেতুর কাজ বাস্তবায়নে বিলম্ব হয়। এ ছাড়া কিছু সড়কের অসমাপ্ত অংশের কানেকটিভিটি সম্পন্ন করার লক্ষ্যে নতুন সড়কের প্রয়োজনীয়তা, স্কিম বাস্তবায়নের সময় স্কিমের চেইনেজের সাথে সড়কের বাস্তব অবস্থার মিল না থাকায় চেইনেজ পরিবর্তন করা এবং প্রকল্পের আওতায় নেয়া কিছু সড়কে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বাঁধ থাকায় উক্ত প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে অনাপত্তিপত্র না পাওয়া ইত্যাদি কারণে প্রকল্পভুক্ত কার্যক্রমের পরিমাণ ও ব্যয়ের হ্রাস/বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রকল্পটির দ্বিতীয় সংশোধন প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রকল্পটির দ্বিতীয় সংশোধন প্রস্তাবে প্রকল্পটির মোট প্রাক্কলিত ব্যয় ৯৫৯ কোটি ১০ লাখ টাকা। মেয়াদ এক বছর বৃদ্ধি করে জুলাই ২০১৮ থেকে জুন ২০২৬ পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে।
অগ্রগতি কমের ব্যাপারে এলজিইডি’র কাছে জানতে চাইলে সংস্থার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বলেছেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত ব্রিজগুলোর কাজের অগ্রগতি কম হওয়ায় প্রকল্পের সার্বিক অগ্রগতি কম হয়েছে। প্রকল্পের আওতাধীন ৩৫টি সেতুর মধ্যে ১০টির কাজ সমাপ্ত হয়েছে, ২৪টির নির্মাণের কাজ বিভিন্ন পর্যায়ে চলমান আছে। একটির কাজ এখনো শুরু করা যায়নি। এসব বিবেচনায় প্রকল্পটি নির্ধারিত মেয়াদে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না বিধায় প্রকল্পের দ্বিতীয় সংশোধনের প্রস্তাব করা হয়েছে। যে সেতুটির নির্মাণ কাজ এখনো শুরু করা হয়নি সেটি ডিপিপি হতে বাদ দেয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে আরডিপিপিটি কিছু সিদ্ধান্ত ও পরামর্শ দিয়ে পরিকল্পনা কমিশন থেকে ফেরত পাঠিয়েছে।
সেতু নির্মাণের কার্যাদেশ প্রদানের বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক জানান, ২০২১ সালে কার্যাদেশ প্রদান করা হয়েছে এমন চারটি সেতুর কাজের অগ্রগতি ৫০ শতাংশের নীচে। তিনি বলেন, সড়ক নির্মাণ ও মেরামত, কালভার্ট নির্মাণ, বাজার নির্মাণ ও ঘাটলা নির্মাণের জন্য মোট ৮৩৬টি স্কিমের মধ্যে ৪৪১টি স্কিমের কাজ সমাপ্ত হয়েছে ৩৫৪টি স্কিমের কাজ চলমান রয়েছে, ৪১টি স্কিম বাদ দেয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে ও ৭৩টি স্কিম নতুন অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাব করা হয়েছে।
এদিকে, স্থানীয় সরকার ও সমন্বয় অনুবিভাগের যুগ্মপ্রধান প্রকল্পের ব্যয়ের বিভিন্ন অঙ্গের পরিমাণ ও ব্যয় যৌক্তিকভাবে নির্ধারণ করা প্রয়োজন বলে জানান। তিনি বলেন, ডাক, বিদ্যুৎ, পেট্রোল ও লুব্রিকেন্ট, মুদ্রণ ও প্রকাশনা, স্টেশনারি সিল ও স্ট্যাম্প, বই সাময়িকী, প্রচার বিজ্ঞাপন, ক্রিনিং অ্যান্ড ওয়াশিং, কম্পিউটার সামগ্রী, হায়ারিং চার্জ, অন্যান্য ব্যয়, যানবাহন/মোটরযান মেরামত, কম্পিউটার অ্যান্ড অফিস সরঞ্জাম মেরামত খাতগুলোর ব্যয় যৌক্তিকভাবে পুনঃনির্ধারণ করা প্রয়োজন।
আর পরিকল্পনা কমিশনের আইএমডি প্রকল্পটির ব্যাপারে বলছে, মে মাসের মধ্যে সেতুর অ্যাপ্রোচ সড়কের কাজ সমাপ্ত করা সম্ভব না হলে জুন মাসে প্রকল্প এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হবে। সেতুগুলোর কাজের অগ্রগতি কম হওয়ার যথাযথ কারণ চিহ্নিত করে এলজিইডিকে ব্যবস্থা নিতে হবে এবং স্থানীয় সরকার বিভাগ বিষয়টি মনিটর করবে। এ ছাড়া অ্যাপ্রোচ সড়কসহ সেতুগুলোর কাজ সমাপ্ত করার বিষয়ে অগ্রাধিকার দিতে হবে এবং প্রস্তাবিত বর্ধিত মেয়াদে অর্থাৎ জুন ২০২৬ মেয়াদের মধ্যে আবশ্যিকভাবে প্রকল্পটি সমাপ্ত করা। এ লক্ষ্যে একটি সময়াবদ্ধ কর্মপরিকল্পনা ডিপিপিতে সংযুক্ত করতে হবে।
মূল্যায়ন সভায় পরিকল্পনা কমিশনের সংশ্লিষ্ট বিভাগের সদস্য (সচিব) বলেন, প্রস্তাবিত প্রকল্পটি জুন ২০১৮ হতে অদ্যাবধি চলমান রয়েছে। ডিসেম্বর ২০২৪ পর্যন্ত ভৌত অগ্রগতি ৭৯.৩৬ শতাংশ। প্রায় সাত (সাত) বছর অতিবাহিত হলেও প্রকল্পটি সমাপ্ত হয়নি।
কৃষি, পানিসম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগের যুগ্মপ্রধান জানান, প্রকল্পটিতে বেশ কিছু পরামর্শ ও সিদ্ধান্ত দেয়া হয়েছে পিইসি সভা থেকে। সে আলোকে আরডিপিপিকে পরিবর্তন করে আবার পাঠাতে হবে। বলা হয়েছে, যে সেতুটির নির্মাণ কাজ এখনো শুরু করা হয়নি সেটি বাদ দিয়ে ডিপিপি সংশোধন করতে হবে এবং সেভাবে ব্যয় প্রাক্কলন করতে হবে। সেতুগুলোর বাস্তবায়ন কাজের অগ্রগতি কম হওয়ার যথার্থ কারণ চিহ্নিত করে এলজিইডি কর্তৃক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। স্থানীয় সরকার বিভাগ বিষয়টি মনিটর করবে। পিপিএ ২০০৬ এবং পিপিআর ২০০৮ অনুযায়ী ক্রয় পরিকল্পনা ও ক্রয় কার্যক্রম সম্পাদন করতে হবে।






