৪ কারণে দ্রুত গণতন্ত্রে উত্তরণ প্রয়োজন
গবেষণামূলক নেটওয়ার্কের মতামত: বিএনপির বিরুদ্ধে মিডিয়া ট্রায়ালের পেছনে আছে রাজনীতিও
সরাসরি রাজনীতিতে যুক্ত নন এমন একটি ‘বুদ্ধিবৃত্তিক গবেষণামূলক নেটওয়ার্ক’ সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে এমন মতামত তুলে ধরেছে।
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা রক্ষা, ভবিষ্যৎ উন্নয়ন ও বিনিয়োগের পথ প্রশস্ত করা এবং প্রভাবশালী দেশগুলোর সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনর্বিন্যাস করতে দ্রুত একটি অবাধ গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্রে উত্তরণ প্রয়োজন। সরাসরি রাজনীতিতে যুক্ত নন এমন একটি ‘বুদ্ধিবৃত্তিক গবেষণামূলক নেটওয়ার্ক’ সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে এমন মতামত তুলে ধরেছে।
এই নেটওয়ার্কে যুক্ত রয়েছেন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, দেশী-বিদেশী সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবীরা।
বিভিন্ন পর্যায়ের এসব স্কলার মনে করছেন, স্বৈরাচার আওয়ামী লীগের পতনের পর রাষ্ট্রের স্বাভাবিক অবস্থা ব্যাহত করতে এবং অন্তর্বর্তী সরকারকে প্রতিনিয়ত নানামুখী চাপে রাখতে পরাজিত শক্তিগুলো গোপনে ও কৌশলে কাজ করছে। ফ্যাসিবাদী শক্তিকে অগণতান্ত্রিক ফর্মুলায় কিভাবে দ্রুত ফিরিয়ে আনা যায়, সেটি নিয়েও রয়েছে তৎপরতা। এ অবস্থায় প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে দূরে সরিয়ে না দিয়ে, তাদের পরামর্শ নিয়ে ও সহায়ক শক্তি হিসেবে মনে করে অন্তর্বর্তী সরকারের পথ চলা উচিত। এই সরকারের প্রধান লক্ষ্য যে দেশে প্রয়োজনীয় সংস্কার এনে গণতন্ত্রে উত্তরণ ঘটানো সেটিও বারবার স্পষ্ট করে বলা উচিত।
বুদ্ধিবৃত্তিক গবেষণামূলক নেটওয়ার্কের স্কলাররা অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহম্মদ ইউনূসের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। তবে তারা এও মনে করছেন, গণ-অভ্যুত্থানের পর ড. ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর যে বিশাল জন-প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, সেই প্রত্যাশায় কিছুটা হলেও চিড় ধরতে শুরু করেছে। সংস্কার, ফ্যাসিবাদের অপরাধের বিচার এবং নির্বাচন নিয়ে তারা কার্যকর ন্যারেটিভ তৈরি করতে পারছে না। রাজনৈতিক দলগুলোও বিভিন্ন ইস্যুতে উষ্মা প্রকাশ করতে শুরু করেছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের রাজনৈতিক দল এনসিপিও জনগণের দল হয়ে উঠার বদলে হতাশার জন্ম দিচ্ছে।
নেটওয়ার্কের এমন মতামতের বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক ড. মাহবুব উল্লাহ সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে লেখক-গবেষক ও বামপন্থী রাজনীতিক বদরুদ্দীন উমরের সাক্ষাৎকারের বক্তব্যের সাথে একমত পোষণ করার কথা তুলে ধরেন। ওই সাক্ষাৎকারে বদরুদ্দীন উমর বলেন, সরকারের উচিত এ বছরের মধ্যে নির্বাচন দেয়া। সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার নিজ থেকে আসেনি, ছাত্রনেতা ও অন্যরা এই সরকারকে ক্ষমতায় বসিয়েছে। কোনো প্রেক্ষাপটে সরকার গঠন হয়েছে সে বিষয়েও পরিষ্কার বক্তব্য দেন তিনি। পাশাপাশি সরকারের কাজের পরিধি কী হওয়া উচিত সে বিষয়ে তার বক্তব্য উঠে আসে।
ড. মাহবুব উল্লাহ এ বিষয়গুলো উল্লেখ করে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার জোর করে ক্ষমতায় আসেনি। সব দল ও মহল মিলে তাদের ক্ষমতায় বসিয়েছে। সরকার পরিচালনায় কিছু ক্ষেত্রে তাদের সাফল্য আছে। কিন্তু তারা নির্বাচিত সরকার নয়। দীর্ঘদিন অনির্বাচিত সরকার থাকলে নানা জটিলতা দেখা দেয়। নির্বাচিত সরকারের যে শক্তি থাকে সেটি দলীয় কিংবা যাই হোক, সেটি এই সরকারের নেই।
বদরুদ্দীন উমর তার ওই সাক্ষাৎকারে আরো বলেন, সাময়িকভাবে তাদের যে পরিস্থিতি মোকাবেলার কথা ছিল, সেটা সরকার করেছে। নির্বাচনের জন্য যেসব প্রস্তুতি নেয়া দরকার, সেটা করে তাদের উচিত তাড়াতাড়ি নির্বাচন দিয়ে দেয়া। আমি মনে করি, এ বছরের মধ্যেই তাদের কাজ শেষ করা দরকার। সরকারের মেয়াদ বেশি দীর্ঘায়িত করা ঠিক হবে না। নির্বাচন দিয়ে নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতা দিয়ে দিতে হবে। তারপরের দায়িত্ব তাদের (নির্বাচিত সরকার)। তিনি বলেন, নির্বাচিত সরকার দেশের মানুষকে দুধে ভাতে রাখবে, এমন নয়; কিন্তু একটা নির্বাচিত সরকার হয়ে গেলে তাদের একটা শক্তি থাকে, সামাল দেয়ার যে ক্ষমতা, সেটা থাকে। বেশি দিন যদি অস্থায়ী সরকার থাকে, দেশে নানা রকম বিশৃঙ্খলা দেখা দেবে। সেটা সামাল দেয়া তাদের পক্ষে সম্ভব হবে না। সব সংস্কার তাদের করতে হবে, তা তো নয়।
বিএনপির বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি-টেন্ডারবাজির অভিযোগ প্রসঙ্গে : বুদ্ধিবৃত্তিক এই নেটওয়ার্কটি বিএনপির বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি-টেন্ডারবাজির অভিযোগ, মিডিয়া ট্রায়াল ও অন্তর্বর্তী সরকারকে পাঁচ থেকে ১০ বছর ক্ষমতায় রাখার ক্যাম্পেইন নিয়েও নিজস্ব বিশ্লেষণ তুলে ধরেছে।
নেটওয়ার্কটির স্কলাররা মনে করছেন, ১৭ বছর ধরে ক্ষমতার বাইরে থেকে বিএনপির নেতাকর্মীরা বিশেষ করে মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীরা কেবল নিষ্পেষিত হয়নি, নিঃস্বও হয়েছে। ফলে ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ পালিয়ে যাওয়ার পর বিএনপির এসব নেতাকর্মীদের একটি অংশ ‘ক্ষমতায়িত’ হয়ে নানা অপকর্মে লিপ্ত হয়েছে। তারা এসব কর্মকাণ্ডে দলের বদনাম হতে পারে জেনেও সুযোগ হাতছাড়া করার লোভ সামলাতে পারছে না। তবে এদের বিরুদ্ধে বিএনপি কেন্দ্রীয়ভাবে যে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করেছে, সেটি নেটওয়ার্কটির স্কলাররা ‘সময়োচিত পদক্ষেপ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তারা বলেছেন, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সত্যিকার অর্থেই দলে শৃঙ্খলা আশা করছেন এবং জনগণের পালস তিনি আক্ষরিক অর্থেই বুঝতে পারছেন। তবে কিছু নেতাকর্মী এ ক্ষেত্রে দলকে বিব্রত করছেন।
নেটওয়ার্কটির স্কলাররা চাঁদাবাজি-টেন্ডারবাজির অভিযোগের পাশাপাশি মিডিয়া ট্রায়ালের বিষয়েও তাদের মতামত দিয়েছেন। তাদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বাস্তবতার চেয়ে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে কিংবা ছোট ঘটনা বড় করে তুলে ধরে বিএনপিকে ঘায়েল করার এজেন্ডা কেউ কেউ বাস্তবায়নের চেষ্টা করছেন। এক্ষেত্রে মেইন স্ট্রিম মিডিয়ার চেয়ে সোশ্যাল মিডিয়া এগিয়ে রয়েছে। এর পেছনে রয়েছে রাজনীতিও। বিভিন্ন মিডিয়াতে থাকা স্বৈরাচারের দোসররাও এ ক্ষেত্রে কৌশলে ভূমিকা রাখছে।
এখানে উল্লেখযোগ্য, ৫ আগস্টের পর চাঁদাবাজি-টেন্ডারবাজির অভিযোগে বিএনপি কমপক্ষে তিন হাজার নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে। বিএনপিকে এত কঠিন হতে অতীতে দেখা যায়নি।
এ বিষয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বলেন, বিএনপি নেতাকর্মীরা কিছু অপকর্মে জড়িত আছে এমন প্রচার থাকায় তারেক রহমান দায়ীদের ধরে পুলিশে দিতে বলেছেন। এখন দায়িত্ব সরকারের। তবে এটা বলতে পারি, বিএনপিকে ঘায়েল করার এক ধরনের চেষ্টা আছে। এটা দেশকে বিরাজনীতিকরণের নীলনকশার অংশ।
অন্তর্বর্তী সরকারকে পাঁচ থেকে ১০ বছর ক্ষমতায় রাখার ক্যাম্পেইনের পেছনেও সুনির্দিষ্ট এজেন্ডা রয়েছে বলে মনে করছেন নেটওয়ার্কের সদস্যরা। তারা বলেছেন, দ্রুত নির্বাচনের যে দাবি বিএনপি তুলেছে, সেই দাবির বিপক্ষে পাল্টা মতামত তুলে ধরতেই এ ধরনের ক্যাম্পেইন চালানো হচ্ছে। যদিও সরকারের সাথে এর কোনো সংশ্লিষ্টনা নেই। তারা বলেছেন, এই ক্যাম্পেইনের সাথেও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।






