আজকের পত্রিকা

অ্যালগরিদম ও এআইয়ের কবলে তথ্যের ভবিষ্যৎ

অ্যালগরিদম ও এআইয়ের কবলে তথ্যের ভবিষ্যৎ

ডিজিটাল গোলকধাঁধায় বিপন্ন সত্য

সোশ্যাল মিডিয়া অ্যালগরিদম এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) একত্রে তথ্যকে এমন এক ‘ডিজিটাল গোলকধাঁধায়’ পরিণত করেছে, যেখানে ব্যবহারকারী নিজেই অনেক সময় বুঝতে পারেন না তিনি তথ্য দেখছেন, নাকি তাকে তথ্য দেখানো হচ্ছে। এই পরিস্থিতিকে বিশেষজ্ঞরা ‘ইনফোডেমিক’-অর্থাৎ ভুল তথ্যের মহামারী হিসেবে চিহ্নিত করছেন।

বর্তমান বিশ্বের তথ্যপ্রবাহ এক দিকে যেমন অভূতপূর্ব মুক্তি ও গণতন্ত্রীকরণের সুযোগ তৈরি করেছে, অন্য দিকে তেমনি একই প্রযুক্তির ভেতরেই গড়ে উঠেছে এক জটিল, অদৃশ্য ও নিয়ন্ত্রণহীন বাস্তবতা- যেখানে সত্য ও মিথ্যার সীমারেখা দিন দিন অস্পষ্ট হয়ে পড়ছে। সোশ্যাল মিডিয়া অ্যালগরিদম এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) একত্রে তথ্যকে এমন এক ‘ডিজিটাল গোলকধাঁধায়’ পরিণত করেছে, যেখানে ব্যবহারকারী নিজেই অনেক সময় বুঝতে পারেন না তিনি তথ্য দেখছেন, নাকি তাকে তথ্য দেখানো হচ্ছে। এই পরিস্থিতিকে বিশেষজ্ঞরা ‘ইনফোডেমিক’-অর্থাৎ ভুল তথ্যের মহামারী হিসেবে চিহ্নিত করছেন।

অ্যালগরিদমের অদৃশ্য ক্ষমতা ও নতুন তথ্য যুদ্ধ

তথ্য যুদ্ধ এখন আর রাষ্ট্রীয় সীমান্তে সীমাবদ্ধ নয়। এটি প্রতিটি ব্যক্তির হাতে থাকা স্মার্টফোনের স্ক্রিনেই সংঘটিত হচ্ছে। সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোর অ্যালগরিদম ব্যবহারকারীর আগ্রহ, আচরণ ও আবেগ বিশ্লেষণ করে কনটেন্ট পরিবেশন করে, যা অনেক সময় বাস্তবতার চেয়ে বেশি ‘এনগেজমেন্ট-নির্ভর’ হয়ে ওঠে।

ডিসমিসল্যাবের সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা যায়, গত বছরে বাংলাদেশে ফ্যাক্ট-চেকাররা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ বেশি ভুল তথ্য শনাক্ত করেছে। এই তথ্য বিভ্রাটের একটি বড় অংশ রাজনৈতিক বিষয়বস্তু ঘিরে, যার মধ্যে ভিডিও কনটেন্ট এবং এআই-নির্ভর কনটেন্টও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, গত বছর বাংলাদেশে কমপক্ষে ৫,৭০৬টি ফ্যাক্ট-চেক রিপোর্ট প্রকাশিত হয়, যার মধ্যে ৪,১৩১টি ছিল স্বতন্ত্র ভুল তথ্য। এসব তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তি ও অ্যাকাউন্ট বারবার ভুল তথ্য প্রচারের সাথে যুক্ত রয়েছে।

ভুয়া তথ্যের গতি : সত্যের চেয়ে দ্রুত বিস্তার

আন্তর্জাতিক গবেষণাগুলোও একই প্রবণতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। এমআইটি-সংক্রান্ত এক গবেষণায় দেখা গেছে, ভুয়া খবর সত্য খবরের তুলনায় প্রায় ৭০ শতাংশ বেশি দ্রুত শেয়ার হয়। এর প্রধান কারণ হলো-ভুয়া তথ্য সাধারণত বেশি আবেগপ্রবণ, চমকপ্রদ এবং বিভাজনমূলক হয়, যা ব্যবহারকারীদের দ্রুত প্রতিক্রিয়া ও শেয়ার করতে উদ্বুদ্ধ করে।

অন্য দিকে রয়টার্স ইনস্টিটিউটের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ১৮-২৪ বছর বয়সী তরুণদের প্রায় ৫১ শতাংশ এখন প্রচলিত সংবাদমাধ্যমের চেয়ে ইনফ্লুয়েন্সার ও কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের ওপর বেশি আস্থা রাখে। ফলে তথ্যের উৎস হিসেবে সাংবাদিকতার পরিবর্তে ব্যক্তিকেন্দ্রিক মতামত দ্রুত প্রাধান্য পাচ্ছে।

এআই-নির্ভর বিভ্রান্তির নতুন যুগ : প্রযুক্তি বনাম নিয়ন্ত্রণ

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অগ্রগতির ফলে এখন কয়েক সেকেন্ডেই হাজার হাজার ভুয়া সংবাদ তৈরি করা সম্ভব। এসব কনটেন্ট এতটাই বাস্তবসম্মত যে, সাধারণ ব্যবহারকারীর পক্ষে তা শনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজনৈতিক অস্থিরতা বা নির্বাচনী সময়গুলোতে এআই-চালিত বট নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে নির্দিষ্ট মতাদর্শ বা এজেন্ডা ছড়িয়ে দেয়া এখন একটি বৈশ্বিক কৌশলে পরিণত হয়েছে। এতে জনমত প্রভাবিত করা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক সহজ হয়ে গেছে।

বাংলাদেশেও এই চ্যালেঞ্জ ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) ফেসবুক ও টিকটকের সাথে যৌথ মনিটরিং সেল গঠন করেছে। নতুন গাইডলাইন অনুযায়ী, এআই-জেনারেটেড সংবেদনশীল কনটেন্টে লেবেল বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে ডিএমপির ডিসি (মিডিয়া) এন এম নাসিরুদ্দিন বলেন, সোশ্যাল মিডিয়ায় এআই-নির্ভর বিভ্রান্তিকর তথ্যের বিস্তার দ্রুত বাড়ছে। সীমিত জনবল, প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার কারণে তাৎক্ষণিকভাবে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে, যদিও বিদ্যমান সক্ষমতা দিয়ে সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে।

অন্য দিকে ডিসমিসল্যাব এবং রিউমর স্ক্যানারের মতো ফ্যাক্টচেকিং সংস্থাগুলো তথ্য যাচাই ও ভুল তথ্য শনাক্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

বৈশ্বিক নীতি ও নিয়ন্ত্রণ কাঠামো

বিশ্বজুড়ে এখন ডিজিটাল তথ্য নিয়ন্ত্রণে আইনগত কাঠামো গড়ে উঠছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘ডিজিটাল সার্ভিসেস অ্যাক্ট’-এর আওতায় এআই-জেনারেটেড কনটেন্টে লেবেল বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। বাংলাদেশেও একই ধরনের মনিটরিং ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ধীরে ধীরে শক্তিশালী হচ্ছে।

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল আইন দিয়ে এই সঙ্কট মোকাবেলা সম্ভব নয়। কারণ প্রযুক্তি যত দ্রুত এগোচ্ছে, তার চেয়ে দ্রুতগতিতে অপব্যবহারও বাড়ছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই ‘তথ্য-মহামারী’ থেকে মুক্তির সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো ডিজিটাল সচেতনতা বা ‘ডিজিটাল হাইজিন’ তৈরি করা। কোনো তথ্য শেয়ার করার আগে তার উৎস যাচাই, একাধিক নির্ভরযোগ্য মাধ্যমের সাথে মিলিয়ে দেখা- এ ধরনের অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি।

অক্সফোর্ড ইন্টারনেট ইনস্টিটিউটের প্রস্তাবিত ‘ল্যাটারাল রিডিং’ পদ্ধতিও গুরুত্বপূর্ণ- যেখানে কোনো তথ্য শুধু এক জায়গায় নয়, বরং বিভিন্ন উৎসে যাচাই করে সত্যতা নির্ধারণ করা হয়।

সত্যের ভবিষ্যৎ এখন ব্যবহারকারীর হাতে

তথ্য প্রযুক্তির এই যুগে আমরা কী দেখব তা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়, তবে আমরা কী বিশ্বাস করব এবং কী শেয়ার করব- তা নির্ধারণ করার ক্ষমতা এখনো আমাদের হাতেই আছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অ্যালগরিদম ও এআই যতই শক্তিশালী হোক না কেন, শেষ পর্যন্ত সত্য রক্ষার সবচেয়ে বড় ঢাল হলো একজন সচেতন ব্যবহারকারী।

এই সম্পর্কিত আরও

সাত মিনিটে এক মাইল দৌড়াতে হবে

সাত মিনিটে এক মাইল দৌড়াতে হবে

মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:২৪ এএম

ডিআরইউ গেমসের পুরস্কার বিতরণ

ডিআরইউ গেমসের পুরস্কার বিতরণ

মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:২৪ এএম

পিএসজির প্রথম জয়

পিএসজির প্রথম জয়

মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:২৪ এএম

ঝিলি-বর্ষার লক্ষ্য মূল জাতীয় দল

ঝিলি-বর্ষার লক্ষ্য মূল জাতীয় দল

মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:২৪ এএম

পাকিস্তানের পতনে শক্ত অবস্থানে টাইগাররা

পাকিস্তানের পতনে শক্ত অবস্থানে টাইগাররা

মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:২৪ এএম

ইউএস ওপেনের নতুন চ্যাম্পিয়ন জভেরেভ

ইউএস ওপেনের নতুন চ্যাম্পিয়ন জভেরেভ

মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:২৩ এএম