আজকের পত্রিকা

সাক্ষাৎকার : আবুল কাসেম ফজলুল হক

রাজনীতি নেই, রাজনৈতিক দলও নেই

রাজনীতি নেই, রাজনৈতিক দলও নেই
আবুল কাসেম ফজলুল হক · সংগৃহীত

“চিন্তা ও মেধা চর্চার ধারাবাহিকতার মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো গঠনের কোনো প্রচেষ্টা নেই। এতে আমরা গত ৫৪ বছরে অনেকটাই পরনির্ভরশীল হয়ে পড়েছি।”

এটা কোনো আক্ষেপ থেকে নয়, স্বদেশ ভাবনা ও রাজনৈতিক চিন্তায় ঋদ্ধ শিক্ষাবিদ আবুল কাসেম ফজলুল হক যখন বলেন, বাংলাদেশে কোনো রাজনীতি নেই, এমনকি রাজনৈতিক দলও নেই তখন খুব সহজে আমাদের মনে ভাবনার উদ্রেক হয়, হতাশা নয়, কেন জুলাই আন্দোলনের পরও মানুষের কাছে রাজনৈতিক দলের অভিপ্রায় এখনো পরিষ্কার নয়।

নয়া দিগন্তকে দেয়া সাক্ষাৎকারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে দীর্ঘ চার দশক শিক্ষকতা করার পাশাপাশি যিনি সবসময় তার লেখা ও কথায় জনগণের মাঝে সৎ চিন্তা উসকে দিয়েছেন, মানুষের মধ্যে শুভবোধের জাগরণ কামনা করেছেন তার কাছেও বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির উত্তরণ কোন পথে কিংবা কোন পথে ধাবিত হয়েছে তা অস্পষ্ট হলেও বেমানান নয় বলেই মনে হয়েছে।

নিরপেক্ষ রাজনৈতিক চিন্তা ও তত্ত্বের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত এই রাষ্ট্রচিন্তাবিদ বলেন, চিন্তা ও মেধা চর্চার ধারাবাহিকতার মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো গঠনের কোনো প্রচেষ্টা নেই। এতে আমরা গত ৫৪ বছরে অনেকটাই পরনির্ভরশীল হয়ে পড়েছি। এর পরিবর্তন না হলে আমরা ক্রমান্বয়ে পরাধীনতার দিকে এগিয়ে যাবো। রাজনৈতিক প্রস্তুতি নেই বলেই আমাদের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক কেমন হবে তা স্পষ্ট নয়, স্পষ্ট কোনো পররাষ্ট্রনীতি না থাকায় আন্তর্জাতিক সম্পর্ক কেমন হবে তা নির্ধারণ করতে পারছি না। আমরা বুঝি না আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো যতটা না অর্থনৈতিক তার চেয়ে বেশি রাজনৈতিক। তারা পরাশক্তি দেশগুলোর স্বার্থই রক্ষা করে আর আমাদের মতো দেশগুলোর স্বাধীন চিন্তা ও কমর্তৎপরতা না থাকায় দরিদ্র থেকে দরিদ্রতর হয়ে পড়ি। ক্ষতিগ্রস্ত হই। বাধ্য হয়ে তাদের চাপিয়ে দেয়া সংস্কারের মধ্যে আবদ্ধ থেকে উন্নয়নের চেষ্টা করি বটে কিন্তু কখনোই সম্ভবপর হয়ে ওঠে না।

নয়া দিগন্ত : বর্তমান অস্থিরতা নিয়ে রাজনৈতিকদলগুলো ক্ষমতায় যেতে চাইছে তাদের রাষ্ট্রকাঠামো পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে রাজনীতির গুণগত পরিবর্তনের কোনো প্রস্তুতি নেই কেন, বৃহৎ কোনো প্রচেষ্টা কি দেখা যাচ্ছে?

আবুল কাসেম ফজলুল হক : রাজনৈতিক দলগুলো, বিএনপি খুব দ্রুত নির্বাচন চাইছে। নির্বাচন নিয়ে আগেও গণ্ডগোল হয়েছে এখনো আগামী নির্বাচন নিয়ে সে রকম হবে কি না সেম্পর্কে নিশ্চিত বলা যায় না কারণ রাজনৈতিক দলগুলো দলীয়ভাবে ভেতর থেকে সংগঠিত হওয়ার কোনো উন্নত রাজনৈতিক চিন্তা অবলম্বন করার কোনো চেষ্টা করেছে বলে আমরা জানি না। কাজেই দ্রুত ইলেকশন হলে নির্বাচিত দল বা সংসদ সদস্যরা সংসদে আসবে, একটা মন্ত্রিপরিষদও গড়বে, বিরোধী দলও থাকবে। এই যা। যেহেতু কোনো রাজনৈতিক দলই ভেতর থেকে সংগঠিত হয়নি তার সাথে এই নির্বাচন যদি একটু ভালোভাবে হয়ে যায়, তারপরের নির্বাচন আরো ভালোভাবে হবে তার কোনো নিশ্চয়তা বোধ করা যায় না। তার মানে রাজনৈতিক সঙ্কট যেমনটি ছিল কমবেশি সেই রকম সঙ্কটই সামনের দিনগুলোতে থাকবে।

নয়া দিগন্ত : রাষ্ট্রকাঠামোর পরিবর্তন না হলে নির্বাচিত রাজনৈতিক দল পুরো শাসনতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জনগণের কতটুকু প্রত্যাশা পূরণ করতে পারবে?

আবুল কাসেম ফজলুল হক : এইভাবে ইলেকশনের মধ্যে দিয়ে এক রকম ক্ষমতায় যাবে, তা ছাড়া কোনো কিছুই করতে পারবে না। ভালো কিছু করতে হলে রাজনৈতিক দল গঠন করতে হবে। আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টির মতো রাজনৈতিক দল আমি বলছি না। যে রাজনৈতিক দল নির্বাচন করতে গিয়ে কোনো কারচুপির প্রশ্ন তুলবে না। যে রাজনৈতিক দল নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে কোনো কথা বলবে না। এবং যে রাজনৈতিকদল জনগণের জন্য বর্তমান পর্যায়ে বা বর্তমান ঐতিহাসিক পর্যায়ে স্বল্প বা দীর্ঘমেয়াদি কি কাজ করবে তার একটা সুস্পষ্ট ধারণা অর্থাৎ ১৫ থেকে ২০ বছরের মধ্যে কি কাজ করতে হবে সে সম্পর্কে জনগণের মাঝে পরিষ্কার ধারণা থাকতে হবে। আরেকটা হলো ইমিডিয়েট শর্টটার্ম প্রোগ্রাম। কি করবে রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচিত হলে তা জানান দেয়া দরকার। আগামী নির্বাচনের পর পাঁচ বছর রাজনৈতিক দলগুলো কি করবে জনগণ তা এখনই জানতে চায়। এসব বিষয় স্পষ্ট করে না বললে এবং কোনো রকম আশ্বাস দিয়ে কেবল ক্ষমতায় গেলে কোনো রাজনৈতিক দল কোনো কিছু করতে পারবে না। জনগণের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে বা কাকে সে ভোট দিবে সে জন্য তার পরিষ্কার ধারণা দরকার। এগুলো ছাড়া অতীতের মতো নির্বাচন হলে তারপর ভালো, মন্দ বা দুই রকমই হবে। একটু ভালো, একটু মন্দ এভাবেই পরিস্থিতি বিরাজ করবে।

নয়া দিগন্ত : বিশ্বের পরিবর্তিত পরিস্থিতির সাথে তালমিলিয়ে চলতে হলেও তো রাজনৈতিক এই পরিস্থিতির দরকার, তাই না?

আবুল কাসেম ফজলুল হক : তাতো বটেই। কোনো রকম প্রস্তুতি ছাড়া ক্ষমতায় গেলে কোনো সরকার বা দল ভালো কিছুই করতে পারবে না। পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতির মোকাবেলা করার জন্য যে প্রস্তুতি দরকার সেজন্যই রাজনৈতিক দল একান্তই প্রয়োজন। বিশ্বব্যাংক বলবে বা আইএমএফসহ দাতাগোষ্ঠীরা নানা শর্ত দেবে। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোর প্রস্তুতি না থাকলে, তাদের মধ্যে কোনো ঐক্য না থাকলে জাতীয় স্বার্থ বজায় রেখে তাদের কাজ করা সম্ভব হবে না। এ জন্য আগে রাজনৈতিক দল গঠন দরকার। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বা পররাষ্ট্রমন্ত্রী হয়তো বলবে রাজনৈতিক দল গঠন করতে গেলে ঐক্য থাকবে না কিন্তু তাদের কথামতো চলতে গেলে কোনোকালেই রাজনৈতিক ঐক্য হবে না। পশ্চিমা বা বড় শক্তিগুলো এইটাই বুঝাচ্ছে যে এখন ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে যে সরকার গঠিত হয়েছে সে সরকারের অধীনে সংস্কার করে নির্বাচনে গেলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবে তা সম্ভব নয়।

নয়া দিগন্ত : রাজনৈতিক চিন্তা চর্চার ধারাবাহিকতার মধ্যে দিয়ে রাজনীতি, শিক্ষা, জনজীবন, প্রশাসনে সংস্কার না এলে বাইরে থেকে সংস্কার চাপিয়ে দিলে কি কাক্সিক্ষত পরিবর্তন অর্জন করা সম্ভব?

আবুল কাসেম ফজলুল হক : না চিন্তা চর্চা নাই, এটা না হলে আমাদের ভবিষ্যৎ পরাধীনতার দিকে যাবে। অলরেডি গত ৫৪ বছরে আমরা অনেকটাই পরাধীনতার দিকে চলে গেছি। এখন আর কোনো দেশ অন্য কোনো দেশ দখলে নেয় না। সভ্যতার কিছুটা বিকাশ হয়েছে কাজেই ওরকমভাবে যুদ্ধ করে বা হঠাৎ সৈন্য পাঠিয়ে দেশ দখল করে কেউ নেয় না। কিন্তু অর্থনৈতিকভাবে কর্তৃত্ববাদ, আধিপত্যবাদ পশ্চিমা পরাশক্তিগুলো করবে, এর দ্বারা যারা নিজেদেরকে সংগঠিত করবে না, রাজনৈতিকভাবে উন্নত করবে না, পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে খুব স্পষ্ট নীতিমালা অবলম্বন করবে না তারা তো সম্পূর্ণ পরনির্ভর হয়ে যাবে। আন্তর্জাতিক দাতাগোষ্ঠীগুলো যতটা অর্থনৈতিক ততটাই রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান এবং এদের রাজনীতি হল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের সহযোগী শক্তিগুলোকে ক্ষমতায় রেখে নিজেরা লাভবান হওয়া। এতে গোটা মানবজাতি অপমানিত হয়, ক্ষতিগ্রস্ত হয়, দরিদ্র থেকে আরো দরিদ্র হয়।

নয়া দিগন্ত : রাজনৈতিক বা জাতীয় এই প্রস্তুতির চেতনা আমাদের মধ্যে তাহলে কিভাবে আসবে?

আবুল কাসেম ফজলুল হক : দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি যে খারাপ তার একটা প্রকৃত পরিচয় আমাদের কাছে স্পষ্ট হতে হবে। উন্নতি করতে হলে রাষ্ট্রব্যবস্থার কিছু সংস্কার জরুরি, জনমন ও জনজীবনকে উন্নত করা, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক কেমন হবে, আইনশৃঙ্খলা উন্নয়নে আরো কী কী কাজ করতে হবে তা চিহ্নিত করা এবং আমাদের পররাষ্ট্রনীতিতে আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গী কী হবে তা নির্ধারণ করতে হবে। আর এর আলোকে রাজনৈতিক দল গঠন করতে হবে। নির্বাচন কিভাবে হবে এবং কিভাবে রাজনৈতিক দলগুলো রাষ্ট্রক্ষমতায় যাবে এর প্রস্তুতি থাকতে হবে। কোনো একটা দল যদি এসব চিন্তা করে কাজ আরম্ভ করত তাহলে একটু বেশি সময় লাগবে বটে কিন্তু বছর দশকের মধ্যে আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থার একটা সংস্কার হয়ে যাবে। এগুলো করেই জনগণের স্বার্থে একটু একটু করে রাজনৈতিক দলগুলো অগ্রসর হতে পারত। কিন্তু সেই সদিচ্ছা কোনো রাজনৈতিক নেতার মধ্যে নেই। আর এমন একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিকে খুঁজে পাওয়া খুব মুষ্কিল যাকে রাজনৈতিক নেতা বলা যায়। নেতার মিনিমাম যোগ্যতা রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অনুপস্থিত। আমি তো খুঁজে পাই না। রাজনীতির উদ্দেশ্য কী? নির্বাচন করব, ইলেকটেড হবো কিছু টাকা খরচ করে, ক্ষমতায় গিয়ে এক বা দুই বছরের মধ্যে সেই টাকাটা ন্যায়সঙ্গত উপায় না অবৈধ উপায়ে তুলে নেবো। তারপর আরো তিন বছর থাকব ক্ষমতায় তখন অনেক অনেক বেশি প্রফিট করব। সম্ভব হলে বিদেশে সম্পদ গড়ে তুলব। আর দেশের ভেতর বাড়ি, গাড়ি যা করার সেটা করব। কিন্তু কোনটাই কোনো ন্যায়নীতির ভিত্তিতে নয়। দুর্নীতির ভিত্তিতে। এই বাস্তবতা এটা কি রাজনীতি। রাজনীতি নেই, বাংলাদেশে কোনো রাজনৈতিক নেতা নেই। একজন নেতার মিনিমাম কী কী গুণ থাকলে তাকে নেতা বলা যাবে, তা কি তার আছে? সে তো যেকোনো উপায়ে ক্ষমতায় যেতে চায়। সে চায় ক্ষমতা দখল।

নয়া দিগন্ত : রাজনীতির স্বাভাবিক বিকাশ ও অগ্রগতি না হলে শাসনব্যবস্থা কিভাবে দাঁড়াবে? এখন সংস্কারের একটা বিরাট সুযোগ আছে, এই ট্রেনও কি মিস করতে যাচ্ছি?

আবুল কাসেম ফজলুল হক : এখন একটা সুযোগ আমরা বলছি, তা পশ্চিমা পরাশক্তি দেশগুলোও এইগুলো বুঝাচ্ছে, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে একটা নির্বাচন হলে অনেক রাজনৈতিক সংস্কার বা রাষ্ট্রব্যবস্থার পুনর্গঠন সম্ভব হবে এটা ওয়াশিংটন, লন্ডন, দিল্লি, ঢাকা সর্বত্রই এ কথা বলা হচ্ছে। বাংলাদেশে একটা অতুলনীয় সুযোগ আসছে, এসব কথা বলছে বাইরের নানান শক্তি। বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ তাই বলছে। কিন্তু রাজনৈতিক দল গঠন না করে এই এনজিও ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সংস্কারের মধ্যে দিয়ে প্রকৃতপক্ষেই ভালো কিছু করে ফেলা যাবে? ১৯৪৭ সালের পর থেকে তো একরকম নানা উত্থান পতনের মধ্যে দিয়েই চলছে। রাশিয়ায় তখন স্ট্যালিন ছিলেন রাষ্ট্র ও কমিউনিস্ট পার্টির প্রধান। ১৪ আগস্টের পর স্ট্যালিন, জওহারলাল নেহেরু ও লিয়াকত আলী খানকে বলেছিলেন আমরা আপনাদের এই স্বাধীন রাষ্ট্র দেখে আনন্দিত ও আপনাদের প্রতি আন্তরিক শুভেচ্ছা রইল। আমরা চাই একটা ডিপ্লোম্যাটিক সম্পর্ক গড়ে তুলে একটা উন্নত পৃথিবী গড়ে তোলার পথে অগ্রসর হতে। উত্তরে জওহারলাল নেহরু বলেছিলেন, আমরাও চাই আপনাদের সাথে ডিপ্লোম্যাটিক রিলেশনশিপ প্রতিষ্ঠা করতে। কিন্তু লিয়াকত আলী খান প্রশ্ন তুলেছিলেন রাশিয়ায় ঈশ্বরকে বিশ্বাস না করার বিষয়টি নিয়ে। কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে পাকিস্তান ধর্মের বিষয়টি তুলে কিছুটা পিছিয়ে যায়। এরপর ভারতেও ইন্দিরা গান্ধী, রাজীব গান্ধী হত্যার মতো ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু গড়পরতায় ভারত রাজনৈতিক বিপত্তি অতিক্রম করে গণতন্ত্রকে অনুসরণ করে অনেকদূর এগিয়েছে। বলতে পারে এখানে ধনিক শ্রেণীর দ্বন্দ্বের একটা বিকাশ ঘটেছে। কিন্তু ধনিক শ্রেণী যে ভালো কিছুই করতে পারবে না এ রকম ধারণা কিন্তু ভুল। পুঁজিবাদ সম্পর্কে কার্লমার্কস তার সমস্ত চিন্তুা ও শক্তি দিয়ে লিখে গেছেন যার মধ্যে সত্য আছে কিন্তু সেই সত্য বাস্তবায়নে কোন পথে আগাতে হবে, কতদূর আগানো যাবে, ধারাবাহিকতা কিভাবে রক্ষা করা যাবে, এগুলো আবার লেনিন রাশিয়ার বাস্তবতায় ওয়ান পার্টি সিস্টেমে গিয়েছেন। ওয়ান পার্টি সিস্টেম কিন্তু কার্লমার্কস বা এ্যাঙ্গেলের কোনো লেখায় নেই। এজন্য ওয়ান পার্টি সিস্টেম, নির্বাচন ব্যবস্থা, কমিউনিস্ট পার্টি গঠনে একটা পদ্ধতি এগুলো মোটামুটি লেনিন যেভাবে নির্দেশ করেছেন সেভাবে হয়েছে। পরবর্তীকালে চীনও তার প্রয়োজনীয় সংস্কারগুলো করার ক্ষেত্রে এসব বিষয় পর্যবেক্ষণ করেছে। এখন আমাদেরও যে কয়েক হাজার বছরের ইতিহাস আছে সেসব বিবেচনায় নিয়ে সংস্কার ও রাজনৈতিক দলগঠনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। সাইক্লোজিক্যাল বেশ কিছু বিষয় মাওসেতুংয়ের চিন্তার মধ্যে দিয়ে চীনে সংস্কারের মধ্যে এসেছে। মাওসেতুং মানুষের মনের দিকটি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন। কিভাবে সোশিও পলিটিক্যাল ভিত্তি পরিবর্তন করলে অটোমেটিক মানুষের মন বদলে যাবে তা তিনি জানতেন। মানুষের মন বদলিয়ে নতুনভাবে রিকনস্ট্রাক্ট করতে হবে। এটি অত্যন্ত জটিল হলেও অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা এটিই। আরম্ভ করাটা বেশি কঠিন তবে আরম্ভ করতে পারলে তা ধীরে ধীরে এগিয়ে নেয়া যাবে।

নয়া দিগন্ত : কিন্তু আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতো উচ্চমানসিকতা সম্পন্ন নাগরিক তৈরিতে ব্যর্থ হচ্ছে, এ ধরনের ঘাটতি কিভাবে পূরণ করা যাবে?

আবুল কাসেম ফজলুল হক : এইটা খুবই সত্য কথা। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যে ধরনের চিন্তা হলে ভালো হবে মানে আমরা যে ধরনের রাষ্ট্র বিনির্মাণ চাই ওই দিকে শিক্ষার্থীর মন যাবে এই ধরনের কোনো ব্যবস্থা বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে নেই। এবং এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতো চলছে বিশ্বব্যাংকের নীতিতে। যখনি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উচ্চশিক্ষার প্রশ্ন ওঠে তখনি বিশ্বব্যাংক আমাদের সরকারগুলো বলে যে উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে সংস্কার দরকার। যদি সংস্কারে হাত দেন তাহলে মিনিমাম ইন্টারেস্টে ঋণ দেবো। আমরা চাই আপনারা সংস্কার করেন। বিশ্বব্যাংক ঋণ দেয় এবং যেভাবে আগাগোড়া বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করে এবং শর্তাবলির মধ্যে এমন কিছু অস্পষ্ট বিষয় থাকে যে শেষ পর্যন্ত সংস্কারগুলো আর হয়ে ওঠে না। ফলে আমাদের বুদ্ধিজীবীরা মাটি ও মানুষের বা জনমানসের প্রয়োজন অনুযায়ী যেভাবে চিন্তা করে তার উল্টোদিকে নিয়ে যায় বিশ্বব্যাংক। তো সংস্কার হলেই, টাকা পেলেই গ্রাউন্ডওয়ার্ক যদি সঠিক না হয় পুরো ব্যবস্থাটা হয়ে যায় অন্যায় থেকে আরেক অন্যায়ের মধ্যে যাওয়া। এখনো সংস্কার চাইলে টাকা চাইলে বিশ্বব্যাংক দেবে এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গার্ড রাখবে, শর্তগুলোর মধ্যে অস্পষ্ট উল্লেখ থাকবে এবং দেখা যাবে যে ধরনের সংস্কার আমাদের আদতে দরকার ছিল তার বিপরীত দিকে চলে গেছি আমরা।

নয়া দিগন্ত : তাহলে এই দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ, নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থান, চব্বিশের জুলাই আন্দোলন এগুলো আমাদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছে বা যাবে?

আবুল কাসেম ফজলুল হক : এই বাস্তবতা অতিক্রম করার জন্যই আমাদের প্রস্তুতি প্রয়োজন এবং সেটা সফল হতো বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরই যদি শেখ মুজিব সেই প্রস্তুতির জন্য উদ্যোগটা নিতেন, তাহলে কাজটা অনেক সহজ হতো, আমরা সফল হতাম ও দাঁড়ায়ে যেতাম। যদি পারতাম। কিন্তু শেখ মুজিবের চিন্তায় অনেক লিমিটেশন ছিল। এবং তিনি মুক্তিযুদ্ধে যাননি। তার অনুপস্থিতিতে তাজউদ্দিন একাধিক প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছেন। শেখ মুজিবের চিন্তায় ও তার রাজনৈতিক জীবনে সবচেয়ে বড় পরাজয়ের বিষয় ছিল তিনি কখনো কাছের লোকজনের কথা ও পরামর্শ গ্রহণ করেননি। এই যে আমার নেতৃত্বে এই দেশে বড় কিছু বা ভালো কিছু হবে। আমার নেতৃত্ব ছাড়া আর কেউ কোনোটাই করতে পারবে না। এবং কোনোটাই হতে দেবো না। এই রকম মনোভাব নিয়ে শেখ মুজিব তার নেতৃত্ব চালিয়েছেন। জনপ্রিয়তার ওপর ভিত্তি করে দেশ চালিয়েছেন। কিন্তু যখন রাজনীতি দিয়ে চলছে না, যুদ্ধ দরকার। যুদ্ধটাই হয়ে গেল রাজনীতি, এই জায়গায় তো মুজিব যাননি। মুজিব জেনে শুনে ধরা দিলেন পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে। তিনি চলে গেলেন বন্দী হয়ে ইসলামাবাদ। বলা হয় যে তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন। কিন্তু কোনো বাস্তব প্রমাণ পাওয়া যায় না। স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে কেউ ঘরে বসে শত্রুর হাতে ধরা দিবেন। তিনি তো ইয়াহিয়া যিনি গভর্নর ছিলেন তার সাথে তাদের আলাপ চলছিল। কাজেই শেখ সাহেব কি ধরনের নেতৃত্ব দিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পরে তিনি এসে কি রাজনীতি করলেন এটা একটা রহস্য। ফলে কোনো ধরনের রাজনৈতিক নেতৃত্ব বা রাজনৈতিক চিন্তা আমাদের রাজনীতিবিদদের মধ্যে বাংলাদেশের শুরু থেকেই গড়ে ওঠেনি।

নয়া দিগন্ত : তাহলে তো রাজনৈতিক নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা গড়ে না ওঠায় আমাদের বারবার স্বৈরাচারের কবলে পড়তে হচ্ছে, জনগণকে খেসারত দিতে হচ্ছে।

আবুল কাসেম ফজলুল হক : না রাজনৈতিক নেতৃত্বে বৈচিত্র্য ও ভিন্নতা থাকবে। কিন্তু দেশের মানুষের জন্য কাজ করার যোগ্য নেতৃত্ব তৈরি করে যেতে হবে। সবাই হয়তো একমত হবেন না। কিন্তু এ ধরনের রাজনৈতিক চিন্তা বা রাজনৈতিক নেতৃত্ব আমাদের দেশে নেই। হবে যে তার সম্ভাবনাও দেখা এখন যাচ্ছে না। যারা একটু যোগ্য এমন নেতৃত্ব দেবেন তারা এবং তাদের সন্তানরা এ দেশ ছেড়ে আমেরিকা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া বা অন্য সব উন্নত দেশে চলে যায়।

নয়া দিগন্ত : এই বিশৃঙ্খল অবস্থা থেকে পরিত্রাণের উপায় কী?

আবুল কাসেম ফজলুল হক : বিশ্ব রাজনৈতিক ব্যবস্থায় প্রযুক্তি পরিবর্তন একটা বিরাট ভূমিকা রাখছে। এটাকে আমাদের অনুধাবন করতে হবে। যারা আমাদের দেশে এখনো এই পরিবর্তনের চিন্তা জারি রাখতে চাচ্ছেন তাদের দিকে নজর দেয়ার অভাব রয়েছে প্রকট। আওয়ামী লীগ নেতাদেরতো ছিলই না। এখন অন্যান্য দলেরও দেখছি না। বিএনপিসহ বামপন্থী এতগুলো দল তাদের মধ্যেও তো পরিবর্তনের আভাস ধরার কোনো প্রচেষ্টা দেখছি না। যেখানে চিন্তাই নাই, যেখানে আগ্রহ নাই, কোনো আকাক্সক্ষা নাই, সেখানে তো ভালোর দিকে কোনো পরিবর্তন যায় না। ভালোর দিকে পরিবর্তন অটোমেটিক হয় না, নেতৃত্ব দরকার হয়, চেষ্টার দরকার হয়, জনগণকে ডাকতে হয়, জনসম্পৃক্ততা দরকার হয়। ওইরকম দৃষ্টিভঙ্গী বা চিন্তাতো কারো মধ্যে দেখি না। কাজেই বাংলাদেশ অলরেডি অনেকখানি পরনির্ভর। স্বাধীনতার সীমা অতিক্রম করেনি কিন্তু এটা অতিক্রম করে যাবে আগামী পাঁচ-সাত বছরে।

নয়া দিগন্ত : অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে তো জনগণের প্রত্যাশা অনেক...

আবুল কাসেম ফজলুল হক : এই সরকার সম্পূর্ণ সিভিল সোসাইটি অর্গানাইজেশন মেম্বারদের নিয়ে গঠিত সরকার। তাদের মধ্যে একজনও রাজনৈতিক নেতৃত্ব নেই। নির্দলীয় প্রত্যেকে। নিরপেক্ষ প্রত্যেকে। ভালো ছাত্র ছিলেন প্রত্যেকে। পরীক্ষার ফল ভালো, চিন্তাভাবনা মন দেয়া যায় বা চিন্তাশক্তি ভালো কিন্তু রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ছাড়া সুস্পষ্ট রাজনৈতিক লক্ষ্য না নিয়ে রাজনৈতিক প্রস্তুতি রাজনৈতিক দলের ভেতর থেকে নেয়া সম্ভব নয়। শিক্ষাগত শিক্ষা লাভ স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে হবে না, দলের ভেতরে একটা স্টাডির ব্যবস্থা থাকতে হবে। সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে বাস্তবতার নিরিখে সময়ে সময়ে তার আলোচনা চলবে, প্রয়োজনীয় জ্ঞানটা অর্জন করব। পলিটিক্যাল পার্টি ছাড়া এটা হবে না।

নয়া দিগন্ত : তার মানে রাজনৈতিক দলের মধ্যেই আগে সংস্কার প্রয়োজন?

আবুল কাসেম ফজলুল হক : অবশ্যই তাতে কোনো সন্দেহ নেই। সংস্কার মানে কী? তার মানে আওয়ামী লীগ কোনো রাজনৈতিক দল না। শেখ মুজিব পর্যন্ত রাজনৈতিক দল ছিল। তারপরে হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক দল থাকেনি? হাসিনার কি রাজনৈতিক বক্তব্য ছিল? তার পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চাপ থেকে আত্মরক্ষা করতে এমন জাতীয় ঐক্য সৃষ্টি করতে পারেননি শেখ হাসিনা বা জাতির ঐক্য চাননি। যা ঐক্য হবে আওয়ামী লীগের মধ্যে দিয়ে হবে। কিন্তু পৃথিবীর যেসব রাষ্ট্র টিকে আছে তারাতো কেবল ক্ষমতাসীন দল নিয়ে নয়, তাদের বাইরেও দল আছে। সব দলের ভেতরে যে প্রতিনিধি আছে তাদের সাথে আলোচনা করে বৈঠক করে তর্ক-বিতর্ক করে সমাধান করে একপর্যায়ে কাজ শুরু করে। তো হাসিনা তো ওই দিকে যায়নি। আওয়ামী লীগ কী করবে? হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি ওর বাবা সবকিছু করে দিয়ে গেছে। আমি ও রেহানা। হাসিনা তার বোন রেহানাকে নিয়ে চলেছে, সজীব ওয়াজেদ জয়কে পরবর্তী নেতা করার আয়োজন করছে। তো এটা কোনো রাজনীতি হলো? আর বিএনপির তো সেরকম রাজনৈতিক দল ছিলও না, এখনো নাই। জিয়াউর রহমান আওয়ামী লীগের বিপরীতে যে বিপুল রাজনৈতিক শক্তি ছিল, শেখ মুজিবের মৃত্যুর আগে ও মৃত্যুর পরে তাদের সমর্থন নিয়ে জনপ্রিয় হিসেবে রাজনৈতিক নেতা হয়ে উঠেছিলেন। দ্বিতীয় কথা হলো জিয়াউর রহমানকে হত্যা কারা করল, কেন করল এই প্রশ্নোত্তর কি আমরা পেয়েছি, সেগুলো দরকার, কিন্তু সে চিন্তাও নেই চেষ্টাও নেই।

এই সম্পর্কিত আরও

সোম, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

সাত মিনিটে এক মাইল দৌড়াতে হবে

সোম, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

ডিআরইউ গেমসের পুরস্কার বিতরণ

সোম, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

পিএসজির প্রথম জয়

সোম, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

ঝিলি-বর্ষার লক্ষ্য মূল জাতীয় দল

সোম, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

ইউএস ওপেনের নতুন চ্যাম্পিয়ন জভেরেভ