আজকের পত্রিকা

আকস্মিক বন্যা ও জোয়ার ভাটা অঞ্চলে চাষের জন্য ব্রির নতুন তিন জাতের আমন ধান

আকস্মিক বন্যা ও জোয়ার ভাটা অঞ্চলে চাষের জন্য ব্রির নতুন তিন জাতের আমন ধান
ব্রির লোগো ও নতুন জাতের আমন ধান · নয়া দিগন্ত গ্রাফিক্স

বন্যার চেয়ে আকস্মিক বন্যায় কৃষক সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন। অন্য দিকে উপকূল তথা জোয়ার ভাটা অঞ্চলের মানুষের ফসল নিয়ে দুঃখ তো বর্ণনাতীত।

জাতীয় বীজ বোর্ডে ছাড় পেল

গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রিমিয়াম কোয়ালিটির এবং সুপ্রিম সিডের জিংক সমৃদ্ধ জাতের অনুমোদন

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে দেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগ লেগেই থাকে। বন্যার চেয়ে আকস্মিক বন্যায় কৃষক সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন। অন্য দিকে উপকূল তথা জোয়ার ভাটা অঞ্চলের মানুষের ফসল নিয়ে দুঃখ তো বর্ণনাতীত। দুর্যোগের ঘনঘটাকে সামনে রেখে এবার বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) আমন মৌসুমে বন্যা ও আকস্মিক প্লাবন অঞ্চল এবং জোয়ার ভাটা অঞ্চলের জন্য তিনটি ধান উদ্ভাবন করেছে। নিয়ম অনুযায়ী মাঠে ট্রায়ালের পর সর্বশেষ জাতীয় বীজ বোর্ডের (এনএসবি) ১১৩তম সভায় অনুমোদন দেয়া হয়েছে। কৃষি সচিব ড. মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান এই বোর্ডের সভাপতি। এই সভায় পাঁচটি ইনব্রিড ধানের জাতের ছাড় (অনুমোদন) দেয়া হয়েছে। আর চারটি হাইব্রিড ধানের জাতও নিবন্ধন পেয়েছে।

ইনব্রিড জাতের ধানের মধ্যে ব্রি উদ্ভাবিত তিনটি জাত আমন মৌসুমে আবাদের জন্য। বাকি দু’টির মধ্যে একটি গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক উদ্ভাবিত এবং আরেকটি বেসরকারি বীজ কোম্পানি সুপ্রিম সিড উদ্ভাবন করেছে। এ দুটো ধানও আমন মৌসুমে চাষের জন্য।

ব্রি’র ৩ আমন ধানের জাত : দেশের বড় একটি অংশে প্রতি বছরই কম বেশি বন্যা হয়। আবার কিছু অঞ্চল রয়েছে যেখানে আকস্মিক বন্যায় ধান নষ্ট হয়ে যায়। অন্য দিকে উপকূলীয় অঞ্চলে জোয়ার ভাটার খেলায় কৃষক আমন ধান চাষ করতে পারেন না। এসব কিছু বিবেচনায় নিয়ে ব্রি’র বিজ্ঞানীরা ব্রি ধান ১০৯, ১১০ ও ১১১ উদ্ভাবন করেছেন।

ব্রি ধান ১০৯ : দেশের উপকূলীয় জোয়ার ভাটা অঞ্চলের জন্য আমন মৌসুমে চাষাবাদের উপযোগী জাত ব্রি ধান ১০৯। ব্রি ধান ৪৪-এর সাথে ব্রি ধান ৫২-এর সঙ্করায়ন এবং পরবর্তী সময়ে মার্কার অ্যাসিস্টেট ব্যাকক্রসের মাধ্যমে এই ধানটি উদ্ভাবন করা হয়। ব্রি’র গবেষণা মাঠে হোমোজাইগোসিটি আনানয়ন এবং ফলন পরীক্ষার পর ২০২০-২১ এবং ২০২২ সালে দেশের বিভিন্ন বন্যা এবং জোয়ার ভাটাপ্রবণ এলাকায় কৃষকের মাঠে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে কৌলিক সারিটি বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সির তত্ত্বাবধানে দেশের ১০টি স্থানে মাঠ মূল্যায়ন করা হয়। আধুনিক উফশী ধানের সব বৈশিষ্ট্য রয়েছে এই ধানে। পূর্ণবয়স্ক ধানগাছের চারার গড় উচ্চতা ১২৮ সেন্টিমিটিার। চালের আকৃতি লম্বা ও মাঝারি মোটা। দানায় অ্যামাইলোজের পরিমাণ ২৫.৪ শতাংশ। প্রোটিনের পরিমাণ ১০.৬ শতাংশ। ভাত ঝরঝরে। ব্রি ১০৯ ধানের জাতটি সারা দেশে আমন মৌসুমে জোয়ার ভাটা অঞ্চলের জন্য ছাড়করণের অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এ ধানের হেক্টর-প্রতি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ছয় টন।

ব্রি ধান ১১০ : আকস্মিক বন্যাপ্রবণ অঞ্চলে চাষাবাদ উপযোগী ব্রি ধান ১১০ একটি ইনব্রিড আমন জাত। আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ইরি) ২০১৩ সালে আইআর২৬২-এর সাথে পিআর৩০২৪৫-১০-৪১৪ এর সঙ্করায়ন করে এবং পরবর্তী সময়ে বালক্স ব্রিডিং মেথডের মাধ্যমে উদ্ভাবিত হয়। বিগত ২০১৭ সালে ব্রি এই কৌলিক সারিটি ইরি থেকে এনে নিজস্ব গবেষণা কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করে। ব্রি’র গবেষণা মাঠে চার বছর ধরে হোমোজাইগোসিটি আনানয়ন এবং ফলন পরীক্ষার পর ২০২০ এবং ২০২১ সালে দেশের বিভিন্ন বন্যাপ্রবণ এলাকায় কৃষকের মাঠে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সির তত্ত্বাবধানে দেশের ১০টি স্থানে মাঠ মূল্যায়ন করা হয়। ব্রি ধান ১১০ গড় উচ্চতা ১২০ সেমি। জীবনকাল বন্যামুক্ত পরিবেশে ১২৩ দিন এবং দুই সপ্তাহের বন্যায় ১৩৩ দিন। প্রোটিনের পরিমাণ ৮.৮ শতাংশ এবং ভাত ঝরঝরে। আমন মৌসুমে আকস্মিক বন্যাপ্রবণ অঞ্চলের জন্য এই জাতটি ছাড়করণ করেছে জাতীয় বীজ বোর্ড।

ব্রি ধান ১১১ : ব্রি ধান ১১১ জাতটি সারা দেশে আমন মৌসুমে বন্যাপ্রবণ এলাকার জন্য অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় বীজ বোর্ড। হাওর ও বিলের অগভীর বন্যার পানিযুক্ত (১ মিটার পানি) নিচু এলাকার উপযোগী বোনা আমন মৌসুমের জন্য জলি আমন ধানের এ জাতটি নির্বাচন করা হয়। তিলোক কাচারি এবং ব্রি ধান ৪১-এর মধ্যে সঙ্করায়নের মাধ্যমে এবং কৌলিক বাছাই পদ্ধতিতে ধানটি উদ্ভাবিত হয়। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সির তত্ত্বাবধানে দেশের ১০টি স্থানে মাঠ মূল্যায়ন করা হয়। ব্রি ধান ১১১ একই সাথে লম্বা ও হেলে পড়া সহিষ্ণু। ১৬৭ সেমি উচ্চতার লম্বা গাছে উফশী ধানের সব বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এ জাতের কাণ্ডের গোড়া বাঁশের মতো শক্ত, কাণ্ডে শর্করার পরিমাণ প্রচলিত জাতের চেয়ে প্রায় তিন গুণ বেশি। এটি অগভীর বন্যার পানিযুক্ত (১ মিটার) নিচু অঞ্চলে টিকে থাকতে পারে। প্রোটিনের পরিমাণ ৭.৯ শতাংশ।

গাউ ধান ৩ : গাজীপুর অ্যাগ্রিকালচার ইউনিভার্সিটি (গাউ) বিএই এসিসি ৩৪-এর সাথে বিইউ এসিসি ৫১-এর সঙ্করায়ন করে এবং পরবর্তী সময়ে বংশানুক্রমে সিলেকশনের মাধ্যমে গাউ ধান ৩ উদ্ভাবন করে। এটি প্রিমিয়াম কোয়ালিটি ও জিংক সমৃদ্ধ ইনব্রিড জাতের ধান। গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা মাঠে চার বছর ধরে হোমোজাইগোসিটি আনায়ন এবং ফলন পরীক্ষার পর ২০২১ এবং ২০২২ সালে দেশের বিভিন্ন এলাকায় কৃষকের মাঠে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। ২০২৩ সালে বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সির ফলন পরীক্ষায় কৃষকের মাঠে সন্তোষজনক ফলাফল প্রদান করায় জাতীয় বীজ বোর্ডেও মাঠ মূল্যায়নদল সুপারিশের পর রোপা আমন মৌসুমের জিংক ও আয়রন সমৃদ্ধ সুগন্ধি প্রিমিয়াম কোয়ালিটির জাত হিসেবে ছাড়করণের আবেদন করা হয়। এই ধানের জীবনকাল আমন মৌসুমে ১২০-১২৫ দিন এবং বোরো মৌসুমে ১৪০-১৪৫ দিন। লম্বা চাল, ভাত ঝরঝরে। চালে দস্তা ও লোহার পরিমাণ যথাক্রমে ২৩.৬ মিগ্র এবং ১১ মিগ্রা।

সুপ্রিম ধান ১ : আমন মৌসুমে জিংক সমৃদ্ধ এই জাতটি বেসরকারি বীজ কোম্পানি সুপ্রিম সিডের। পানপাতা এবং সাদা স্বর্ণার মধ্যে সঙ্করায়নের মাধ্যমে এবং কৌলিক বাছাই পদ্ধতিতে উদ্ভাবিত হয়েছে। সুপ্রিম ধান গবেষণার মাঠে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে চূড়ান্তভাবে নির্বাচন করা হয়। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে কৌলিক সারিটি বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সির তত্ত্বাবধানে দেশের ১০টি স্থানে মাঠ মূল্যায়ন করা হয়। এই ধানের দানা মাঝারি মোটা এবং পাকার পরে ধান ঝরে পড়ে না। ধানের রঙ গাঢ় লাল এবং ভাত ঝরঝরে ও খেতে সুস্বাদু। এই ধানের পলিশ্ড গ্রেইনে জিংকের পরিমাণ ২৮.৫ পিপিএম। সুপ্রিম ধান ১ জাতটিতে জিংকের পরিমাণ সর্বোচ্চ।

এ ছাড়া ১১৩ তম বীজ বোর্ডের এই সভায় চারটি হাইব্রিড ধানের জাতের নিবন্ধন দেয়া হয়। এর মধ্যে ভিএনআর সিডস বাংলাদেশ প্রাইভেট লিমিটেডের দু’টি, মাহিকো বাংলাদেশ প্রাইভেট লিমিটেডের একটি এবং বায়ার ক্রপ সায়েন্স লিমিটেডের একটি। এই জাতগুলো চট্টগ্রাম, খুলনা, রংপুর এই তিন অঞ্চলের জন্য সাময়িকভাবে নিবন্ধনের অনুমোদন দেয়া হয়।

এই সম্পর্কিত আরও

সোম, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

সাত মিনিটে এক মাইল দৌড়াতে হবে

সোম, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

ডিআরইউ গেমসের পুরস্কার বিতরণ

সোম, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

পিএসজির প্রথম জয়

সোম, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

ঝিলি-বর্ষার লক্ষ্য মূল জাতীয় দল

সোম, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

ইউএস ওপেনের নতুন চ্যাম্পিয়ন জভেরেভ