যুগ্মসচিব হলেন ১৭৯ কর্মকর্তা
দণ্ডপ্রাপ্ত ও বিতর্কিতরাও বাগিয়ে নিলেন পদোন্নতি
তালিকা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, বিগত সরকারের মন্ত্রী-আমলাদের আস্থাভাজন, বিভিন্ন বিভাগীয় মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত এবং দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত একাধিক বিতর্কিত কর্মকর্তাও এই পদোন্নতি বাগিয়ে নিয়েছেন।
উপসচিব থেকে যুগ্মসচিব পদে পদোন্নতি পেয়েছেন প্রশাসনের ১৭৯ জন কর্মকর্তা। গতকাল বৃহস্পতিবার এ-সংক্রান্ত পৃথক প্রজ্ঞাপন জারি করেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। বিএনপি সরকার গঠনের পর প্রশাসনে এটিই প্রথম বড় ধরনের পদোন্নতির ঘটনা। তবে পদোন্নতি পাওয়া কর্মকর্তাদের তালিকা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, বিগত সরকারের মন্ত্রী-আমলাদের আস্থাভাজন, বিভিন্ন বিভাগীয় মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত এবং দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত একাধিক বিতর্কিত কর্মকর্তাও এই পদোন্নতি বাগিয়ে নিয়েছেন।
প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়েছে, পদোন্নতি পাওয়া সকল কর্মকর্তাকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করা হয়েছে। তাদের জনপ্রশাসন সচিবের কাছে সরাসরি বা ই-মেইলে যোগদানপত্র পাঠাতে বলা হয়েছে। আদেশে আরো উল্লেখ করা হয়, পরবর্তী সময়ে কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিরূপ বা ভিন্নরূপ তথ্য পাওয়া গেলে কর্তৃপক্ষ এই পদোন্নতির আদেশ সংশোধন বা বাতিল করার অধিকার সংরক্ষণ করে।
বিতর্কিতদের তালিকা ও পদোন্নতির চিত্র
পদোন্নতির তালিকা পর্যালোচনা করে বেশ কয়েকজন বিতর্কিত ও বিভাগীয় লঘুদণ্ডপ্রাপ্ত কর্মকর্তার তথ্য পাওয়া গেছে।
সাবেক মন্ত্রীদের আস্থাভাজন : আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো: শহীদুজ্জামান সরকারের একান্ত সচিব (পিএস) ও ২৫তম ব্যাচের কর্মকর্তা হোসেন আহমেদ যুগ্মসচিব হিসেবে পদোন্নতি পেয়েছেন। এ ছাড়া জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যানের দীর্ঘ ৬ বছরের একান্ত সচিব মোহাম্মদ নায়িরুজ্জামানকেও পদোন্নতি দেয়া হয়েছে। দণ্ডপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (তালিকার ৩ নম্বর) : প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম ডেমরার সহকারী কমিশনার (ভূমি) থাকাকালে অসদাচরণের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হন। তাকে ৩ বছরের জন্য বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি স্থগিতের লঘুদণ্ড দেয়া হয়। রাষ্ট্রপতি বরাবর আপিল করলেও তার দণ্ড বহাল রাখা হয়েছিল।
বালুমহল কেলেঙ্কারি ও লঘুদণ্ড (তালিকার ১১ নম্বর) : নীলফামারীর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) থাকাকালে তিস্তা নদীর বালুমহলের ইজারা গ্রহীতার চেক ব্যাংকে জমা না দিয়েই অর্থ প্রাপ্তির ভুয়া চুক্তি করার অভিযোগে মো: শাহীনুর আলমের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়। অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় তাকে ১ বছরের জন্য বেতন গ্রেডের সর্বনিম্ন ধাপে অবনমিতকরণের দণ্ড দেয়া হয়। ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের দুর্নীতি (তালিকার ৩২ নম্বর) : রংপুর ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডে কর্মরত থাকাকালে নির্মাণকাজে দুর্নীতি ও অসদাচরণের দায়ে মুহাম্মদ মকবুল হোসেনকে ২ বছরের জন্য দু’টি বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি স্থগিত রাখার দণ্ড দেয়া হয়। পরবর্তীতে প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল তার এই দণ্ড বাতিল করেন।
বিভাগীয় মামলা ও দুদকের অনুসন্ধান পার পাওয়া কর্মকর্তারা
দণ্ডপ্রাপ্তদের পাশাপাশি দুদকের অনুসন্ধান ও বিভাগীয় মামলার মুখোমুখি হয়ে পরবর্তীতে অব্যাহতি পাওয়া একাধিক কর্মকর্তাও পদোন্নতির তালিকায় স্থান পেয়েছেন : ডিজিটাল ঘুষের অভিযোগ (তালিকার ৭ নম্বর) : সাভারের সহকারী কমিশনার (ভূমি) থাকাকালে মো: শরিফুজ্জামানের বিরুদ্ধে স্টাফদের মাধ্যমে ডিজিটালে ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ ওঠে। দুদক অনুসন্ধানে প্রমাণ না পাওয়ায় এটি নথিভুক্ত করে। নামজারি ও মিসকেসের অনিয়মের বিভাগীয় মামলা থেকেও তিনি অব্যাহতি পান।
ভুয়া মৃত্যু সনদ ও সরকারি জমি রেকর্ড (তালিকার ২৪ ও ২৯ নম্বর) : ক্ষমতার অপব্যবহার করে ভুয়া মৃত্যু সনদ ইস্যুর অভিযোগে মুহাম্মদ আবদুর রউফ মিয়া এবং জালিয়াতির মাধ্যমে সরকারি সম্পত্তি ব্যক্তি মালিকানায় রেকর্ড করে দেয়ার অভিযোগে মো: আবুল কালাম আজাদের বিরুদ্ধে দুদক অনুসন্ধান চালায়। পরবর্তীতে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় অনুসন্ধান সমাপ্ত করা হয়।
অন্যান্য অব্যাহতিপ্রাপ্ত কর্মকর্তা : গোপালগঞ্জের সাবেক ইউএনও এস এম মুনীর উদ্দিন (তালিকার ২১ নম্বর), বিভিন্ন জালিয়াতির অভিযোগে অভিযুক্ত মো: মনিরুজ্জামান (তালিকার ৩৩ নম্বর), মোবাইল কোর্টের রায়ে অনিয়মের অভিযোগে তদন্তাধীন থাকা তাড়াইল উপজেলার সাবেক ইউএনও সাজিয়া জামান (তালিকার ৩৪ নম্বর) এবং বাণিজ্য-প্রতারণার অভিযোগ ওঠা সাইফুল ইসলামকে (তালিকার ৪০ নম্বর) পদোন্নতি দেয়া হয়েছে।
প্রশাসনে বিএনপি সরকারের প্রথম এই বড় পদোন্নতিতে মাঠপর্যায়ের শৃঙ্খলা ভঙ্গকারী ও বিতর্কিতদের অন্তর্ভুক্ত করা নিয়ে প্রশাসনের সচেতন মহলে চরম ক্ষোভ ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।
তালিকার ৪৩ নম্বরে থাকা এস এম জাহাঙ্গীর হোসেন নেত্রকোনার বারহাট্টা উপজেলা নির্বাহী অফিসার থাকাকালে ক তফসিলভূক্ত সম্পত্তি বিধি বহির্ভূতভাবে নামজারি করলে তার বিরুদ্ধে দুর্র্নীতি ও অসদাচরণের বিভাগীয় মামলা দায়ের করা হয়। এই মামলা তদন্ত শেষে তার দুইটি বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি পরবর্তী দুই বছরের জন্য স্থগিত রাখার লঘুদণ্ড দেয়া হয়। রাষ্ট্রপতি বরাবর আপিল করলে একটি বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি পরবর্তী এক বছরের জন্য স্থগিত রাখার দণ্ড প্রদান করা হয়। পরবর্তীতে প্রশাসনিক ট্রাইবুনাল তার দণ্ড বাতিল করেন।
তালিকার ৪৪ নম্বরে থাকা মোহাম্মদ দিদারুল আলমের বিরুদ্ধে শাহবাগ থানায় দায়েরকৃত মামলার এজাহারে আনীত অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তাকে অব্যাহতি দেয়া হয়।
তালিকার ৬৫ নম্বরে থাকা মো: সাইদুজ্জামান ঢাকার রমনার সহকারী কমিশনার (ভূমি) থাকাকালে অনৈতিক সুবিধা নিয়ে খতিয়ান সংশোধন করার অভিযোগে বিভাগীয় মামলা দায়ের করা হয়। বিভাগীয় মামলায় অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তাকে অব্যাহতি দেয়া হয়।
তালিকার ৬৭ নম্বরে থাকা মো: ছাদেকুর রহমানের বিরুদ্ধে জাল জালিয়াতির মাধ্যমে দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে সেটি প্রমাণিত না হওয়ায় দুর্নীতি দমন কমিশন পরিসমাপ্তি করে।
তালিকার ৯৫ নম্বরে থাকা সাইয়েদ এ জেড এম মোরশেদ আলীর বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠলে সেটি প্রমাণিত না হওয়ায় দুর্নীতি দমন কমিশন সেটি পরিসমাপ্তি করে।
তালিকার ১০৪ নম্বরে থাকা শারমিন আক্তার জাহানের বিরুদ্ধে অর্থের বিনিময়ে মিসকেইস মামলা নিষ্পত্তি ও ঘুষের বিনিময়ে নামজারি করাসহ বিভিন্ন দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে সেটি প্রমাণিত না হওয়ায় দুর্নীতি দমন কমিশন সেটি নথিভূক্তির মাধ্যমে নিষ্পত্তি করে।
তালিকার ১১৯ নম্বরে থাকা এইচ এম রকিব হায়দার শরীয়তপুর জেলার জাজিরা উপজেলায় পদ্মা সেতু নির্মাণের অধিগ্রহণের টাকা চেক প্রদানের সময় মালিকদের কাছ থেকে ঘুষ গ্রহণ ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠলে দুদকের তদন্তে প্রমাণিত না হওয়ায় সেটি নথিভূক্তির মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা হয়।
তালিকার ১২৭ নম্বরে থাকা লুৎফুন নাহারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রকল্পে খাদ্যশস্য উত্তোলনে বাধা প্রদানপূর্বক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাধাগ্রস্ত করার অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় দুর্নীতি দমন কমিশন পরিসমাপ্তি করে।
তালিকার ১৩০ নম্বরে থাকা মো: নুরুল হাফিজ পাসপোর্ট প্রত্যাশীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ফি আদায়সহ বিভিন্ন দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধানে প্রমাণিত না হওয়ায় দুর্নীতি দমন কমিশন অভিযোগটি নথিভূক্তির মাধ্যমে নিষ্পত্তি করে।



