টিএফআই সেলে গুমের মামলায় সাক্ষীর জবানবন্দী
‘মোদিবিরোধী পোস্টের কারণেই আমাকে গুম করা হয়, দায়ী শেখ হাসিনা’
র্যাবের টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন (টিএফআই) সেলে গুম ও নির্যাতনের জন্য ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকেই সরাসরি দায়ী করেছেন মামলার অন্যতম সাক্ষী মাসরুর আনোয়ার চৌধুরী। গতকাল বুধবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আসামি পক্ষের আইনজীবীদের জেরার জবাবে তিনি এই দাবি করেন। একই সাথে তিনি উল্লেখ করেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিরুদ্ধে ফেসবুকে পোস্ট দেয়ার কারণেই তাকে গুম ও অমানবিক নির্যাতন করা হয়েছিল।
- জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিচার
- মানবতাবিরোধী অপরাধ
র্যাবের টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন (টিএফআই) সেলে গুম ও নির্যাতনের জন্য ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকেই সরাসরি দায়ী করেছেন মামলার অন্যতম সাক্ষী মাসরুর আনোয়ার চৌধুরী। গতকাল বুধবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আসামি পক্ষের আইনজীবীদের জেরার জবাবে তিনি এই দাবি করেন। একই সাথে তিনি উল্লেখ করেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিরুদ্ধে ফেসবুকে পোস্ট দেয়ার কারণেই তাকে গুম ও অমানবিক নির্যাতন করা হয়েছিল।
বুধবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো: গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেলে এই জেরা অনুষ্ঠিত হয়। প্যানেলের অপর সদস্য হলেন বিচারপতি মো: শফিউল আলম মাহমুদ। এ দিন মামলার ৩ নম্বর সাক্ষী মাসরুর আনোয়ারের দ্বিতীয় দিনের মতো জেরা শেষ হয়। আদালত পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য আগামী ৪ মে দিন ধার্য করেছেন।
এ দিন পলাতক আসামি শেখ হাসিনার পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত (স্টেট ডিফেন্স) আইনজীবী আমির হোসেন এবং অন্যান্য আসামির পক্ষে তাবারক হোসেন ও আবুল হাসান সাক্ষীকে জেরা করেন। জেরার সময় আইনজীবী আমির হোসেন দাবি করেন, গুম-নির্যাতনের জন্য তার মক্কেল শেখ হাসিনা দায়ী নন; বরং সাক্ষী নিজে ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের হওয়ায় সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে অসত্য তথ্য দিচ্ছেন। জবাবে মাসরুর আনোয়ার চৌধুরী দৃঢ়তার সাথে বলেন, ‘গুম, অমানবিক নির্যাতন এবং আমার ক্যারিয়ার নষ্ট করার জন্য শেখ হাসিনাই দায়ী। আমি ট্রাইব্যুনালে কোনো মিথ্যা সাক্ষ্য দিইনি।’
জেরায় সাক্ষী মাসরুর জানান, ২০২০ সালে তাকে যখন আটক করা হয়, তখন তাকে তার ফেসবুক অ্যাকাউন্টে থাকা নরেন্দ্র মোদিবিরোধী পোস্টটি দেখানো হয়েছিল। তবে সেটি মুছে ফেলতে বলা হয়নি, বরং অ্যাকাউন্টের পাসওয়ার্ডসহ সব কিছু কেড়ে নেয়া হয়েছিল, যা আজ পর্যন্ত তিনি ফেরত পাননি।
আসামি পক্ষের আইনজীবী তাবারক হোসেন দাবি করেন, মোদিবিরোধী পোস্টের জন্য নয়, বরং জঙ্গিগোষ্ঠীর সাথে সংশ্লিষ্টতার কারণে তাকে আটক করা হয়েছিল। এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে মাসরুর বলেন, ‘জঙ্গিবাদের সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। শুধুমাত্র রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকে মোদিবিরোধী পোস্ট দেওয়ার কারণে আমাকে গুম করা হয়েছিল।’ আইনজীবীরা আরো অভিযোগ করেন যে, সাক্ষী কৌশল করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সাথে টিএফআই সেল পরিদর্শন করেছেন এবং পরে একটি বানোয়াট ‘নাটক’ সাজিয়েছেন। এ ছাড়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মসজিদ নির্মাণের আড়ালে জঙ্গি তৎপরতা এবং বরখাস্তকৃত মেজর সৈয়দ জিয়াউল হকের ‘মুক্তি পরিষদ’ সংগঠনের সাথে মাসরুরের সম্পৃক্ততার দাবি করেন আইনজীবীরা। জবাবে মাসরুর বলেন, ‘বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়দের সহায়তায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আমি মসজিদ নির্মাণ করেছি, যা সম্পূর্ণ মানবিক কাজ ছিল। মুক্তি পরিষদ বা মেজর জিয়ার কোনো কার্যক্রমের সাথে আমার বিন্দুমাত্র সম্পৃক্ততা নেই।’
এ মামলার ১৭ জন আসামির মধ্যে গ্রেফতার হওয়া ১০ জন সাবেক ও বর্তমান সেনা কর্মকর্তাকে গতকাল সেনানিবাসের সাব-জেল থেকে কড়া পাহারায় ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। তারা হলেন: ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো: জাহাঙ্গীর আলম (র্যাবের সাবেক এডিজি), তোফায়েল মোস্তফা সারোয়ার, মো: কামরুল হাসান ও মো: মাহাবুব আলম। কর্নেল কে এম আজাদ, আবদুল্লাহ আল মোমেন, আনোয়ার লতিফ খান ও মো: মশিউর রহমান (র্যাবের গোয়েন্দা শাখার সাবেক পরিচালক)। লেফটেন্যান্ট কর্নেল সাইফুল ইসলাম সুমন ও মো: সারোয়ার বিন কাশেম।
মামলার প্রধান আসামি শেখ হাসিনা ছাড়াও আরো ছয়জন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি বর্তমানে পলাতক রয়েছেন। তারা হলেন শেখ হাসিনার সাবেক প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব:) তারিক আহমেদ সিদ্দিক, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ, র্যাবের সাবেক ডিজি এম খুরশীদ হোসেন ও ব্যারিস্টার হারুন অর রশিদ এবং র্যাবের সাবেক পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব:) মো: খাইরুল ইসলাম।
ট্রাইব্যুনালে গতকাল প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট মিজানুল ইসলাম ও গাজী এম এইচ তামীম। তাদের সহযোগিতা করেন প্রসিকিউটর শাইখ মাহদী, তাসমিরুল ইসলাম উদয় ও আবদুস সাত্তার পালোয়ানসহ অন্যরা।
নরসিংদীতে গণহত্যা : তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলে ফের সময় বেড়েছে
এ দিকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নরসিংদীতে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলে আরো দুই মাস সময় বাড়ানো হয়েছে। আগামী ২২ জুন প্রতিবেদন জমা দেয়ার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। গতকাল বুধবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো: গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ নির্দেশ দেন। প্যানেলের অন্য সদস্য হলেন- বিচারপতি মো: শফিউল আলম মাহমুদ।
ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামিম। তিনি এ মামলার অগ্রগতি তুলে ধরে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য দুই মাস সময়ের আবেদন করেন। শুনানি শেষে নতুন দিন ধার্য করেন আদালত। এ দিন এ মামলায় গ্রেফতার তিনজনকে কারাগার থেকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। তারা হলেন- সাবেক সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সাইফুল ইসলাম, তৎকালীন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার অনির্বান চৌধুরী ও রবিউল ইসলাম।
এর মধ্যে সাইফুল ইসলামের জামিন আবেদন নিয়ে শুনানি করতে চান তার আইনজীবী। তবে চিফ প্রসিকিউটরের উপস্থিতিতে এ শুনানি করার আর্জি জানান প্রসিকিউটর তামিম। পরে এ বিষয়ে উভয় পক্ষকে শোনার জন্য আগামী ২৯ এপ্রিল দিন নির্ধারণ করেন ট্রাইব্যুনাল।
প্রসিকিউশন সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট আন্দোলনের সময় ছাত্র-জনতার ওপর পুলিশকে সরাসরি গুলি করার নির্দেশ দিয়েছিলেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সাইফুল ইসলাম। গুলির নির্দেশ দেয়ার সাথে জড়িত এমন আরো কয়েকজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে চিহ্নিত করা হয়। এর মধ্যে ২০২৫ সালের ১৪ এপ্রিল নরসিংদীতে হত্যাযজ্ঞের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাইফুল ইসলামকে গ্রেফতার দেখান ট্রাইব্যুনাল-১।
প্রসিকিউশনের অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই নরসিংদীতে পুলিশের গুলিতে শহীদ হন দশম শ্রেণীর শিক্ষার্থী তাহমিদ ভূঁইয়া। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন ছাত্র-জনতা। পরে তার লাশ নিয়ে মিছিল করতে গেলে আবারো গুলি করা হয়। ওই সময় আরো একজন নিহত হন। এ ছাড়া গণ-অভ্যুত্থান চলাকালীন নরসিংদীতে ২০ জনের মতো শহীদ ও বহু মানুষ আহত হন।






