ঈদুল ফিতর উৎসবের আধ্যাত্মিকতা
আসমানি তাকিদ হিসেবে রমজান কঠোর সাধনার মাস। এ মাস মুসলমানদের সওয়াব হাসিলের নির্ধারিত মওসুমী মাস। এ মাসের একটি ফরজ অন্য মাসের সত্তরটি ফরজের সমান। এ মাসের একটি নফল অন্য মাসের ফরজের সমান।
জাকিয়া সুফিয়ান
মুসলিম জাহান বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশ প্রেক্ষিত ঈদ উৎসবের তাৎপর্য অতি ব্যাপক। আল্লাহ তায়ালার এমন মহিমা বাংলার ধনী গৃহ হতে শুরু করে দিনমজুরের পর্ণ কুঠিরেও ঈদের বাহ্যিক আনন্দ উপচে পড়ে। কিন্তু মধ্যবিত্ত, নিম্ন বেতনভুক্ত চাকরিজীবী ও নিরন্ন খেটেখাওয়া মানুষের বিপত্তি ঘটে সর্বাধিক
জাতীয় কবির ভাষায়-
ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে
এল খুশির ঈদ
তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে
শোন আসমানি তাকিদ ।।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে পবিত্র ঈদের খুশির ব্যাপারে আসমানি তাকিদ কি? এক মাস পবিত্র রমজানের সিয়াম সাধনার পর ঈদুল ফিতরের আগমন। ঈদ শব্দের অর্থ আনন্দ। তাই ত্যাগের পর আনন্দ উপভোগ একটি আকর্ষণীয় বিষয়। এই ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে হলে রমজান মাসের প্রতি ফিরে তাকাতে হয়। যেহেতু ঈদের খুশি সম্পূর্ণভাবে রমজান মাসের ওপর নির্ভরশীল ঠিক যেমন পরকালে বেহেশত লাভ দুনিয়াবি জিন্দেগির ওপর নির্ভরশীল। আসমানি তাকিদ হিসেবে রমজান কঠোর সাধনার মাস। এ মাস মুসলমানদের সওয়াব হাসিলের নির্ধারিত মওসুমী মাস। এ মাসের একটি ফরজ অন্য মাসের সত্তরটি ফরজের সমান। এ মাসের একটি নফল অন্য মাসের ফরজের সমান। এ মাসের এক টাকা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য খরচ করলে অন্য মাসে সত্তর টাকা খরচ করার সওয়াব পাওয়া যায়। একজন ভুখা লোককে আহার করালে সত্তর জনকে আহার করানোর সওয়াব পাওয়া যায়। মসজিদে গিয়ে যাদের নামাজ আদায়ের অভ্যাস তাদের জন্য রমজানুল মোবারক আরো খোশখবরি বয়ে এনেছে। কারণ মানুষ যখন উত্তমরূপে অজু করে একমাত্র নামাজের উদ্দেশ্যে মসজিদের পানে অগ্রসর হয় তখন তার প্রতি কদমেই নেকি বৃদ্ধি পেতে থাকে। তাই কোনো কোনো সাহাবা কেরাম ছোট ছোট পদক্ষেপে মসজিদে গমন করতেন। সুতরাং অন্য সময় প্রতি পদক্ষেপে একটি সওয়াব লেখা হলে পবিত্র রমজান মাসে প্রতি পদক্ষেপে সত্তরটি সওয়াব লেখা হয়। ইফতারির মধ্যে রয়েছে আরো পুণ্য। যে এই মাসে কোনো রোজাদার মানুষকে ইফতার করায় ফেরেশতারা রমজানের প্রতি রাত্রে তার প্রতি রহমত পাঠান অধিকন্তু তাকে রোজাদার মানুষের সমান পুণ্য দান করা হয় অথচ ইফতার গ্রহণকারীর পুণ্য কমানো হয় না কিন্তু শর্ত অবশ্যই হালাল রুজি হতে হবে। এরপর পবিত্র রমজান সম্পর্কে আল্লাহ পাক হাদিসে কুদসিতে এরশাদ করেছেন, রোজা আমারি জন্য, আমিই এর প্রতিদান দেবো।
সুতরাং দীর্ঘ প্রতিবেদনে প্রতীয়মান হলো যে, রমজান মাসে কায়মনোবাক্যে ইবাদত বন্দেগিতে আত্মনিয়োগ করলে বেহেশত লাভ অবশ্যম্ভাবী। কিন্তু কিছুসংখ্যক লোকের জন্য খুবই আফসোসের বিষয় যেহেতু আল্লাহ পাক রমজানের পুণ্য হাসিলের পাশাপাশি রোজাদারদের ব্যাপারে এ সতর্ক বাণী উচ্চারণ করেছেন, অনেক রোজাদার রয়েছে যাদের রোজায় অনাহারে থাকা ছাড়া কোনো উপকার নেই। আর এমন অনেক লোক রয়েছে যারা রাতে জাগ্রত থেকে নামাজে দণ্ডায়মান হয় কিন্তু জাগরণ ছাড়া তাদের কোনো উপকার নেই। ঠিক তেমনি হজরত কাব ইবনে আজরাহ রা: বর্ণনা করেন, এক দিন প্রিয় নবী সা: তার মিম্বরের প্রথম সিঁড়িতে কদম মুবারক রেখে ইরশাদ করলেন, ‘আমিন’। দ্বিতীয় সিঁড়িতে আরোহণ করে ইরশাদ করলেন ‘আমিন’। তৃতীয় সিঁড়িতেও একইভাবে ইরশাদ করলেন ‘আমিন’। পরে সাহাবায়ে কেরাম যখন এর কারণ জিজ্ঞেস করলেন তখন হুজুর সা: ইরশাদ করলেন, ‘জিব্রাঈল আ: এসেছিলেন। তিনি দোয়া করেছেন ধ্বংস হোক সে ব্যক্তি যে রমজানের সুযোগ লাভ করেছে, অথচ সে তার গুনাহ মাফ করাবার সাধনা করেনি। তাই তার গুনাহ মাফ হয়নি। তখন আমি বলেছি ‘আমিন’। এরপর যখন জিব্রাঈল আ: বলেছেন ধ্বংস হোক সে ব্যক্তি যার নিকট আপনার নাম মুবারক উচ্চারণ করা হয় কিন্তু সে আপনার প্রতি দরূদ পাঠ করে না। তখন আমি বলেছি ‘আমিন’। তার পর যখন জিব্রাঈল আ: বলেছেন যে, তার পিতামাতা উভয়কে বা তাদের একজনকে পেয়ে তাদের সেবা যতœ করে জান্নাতের ব্যবস্থা করে নেয় না সে ধ্বংস হোক। তখন আমি বলেছি ‘আমিন’।
সুতরাং এখন সম্মানিত পাঠক সমাজের প্রতি সকরুণ প্রশ্ন- কাদের জন্য ঈদের আনন্দ? প্রকৃতপক্ষে ঈদের আনন্দ দুই ধরনের। একপ্রকার আনন্দ আধ্যাত্মিক অন্য প্রকার বাহ্যিক। আধ্যাত্মিক আনন্দ তাদের জন্য যারা সংযম ও আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে রমজানের সূচিতা অর্জনে সক্ষম হয়েছেন এবং যাদের ইবাদত বন্দেগি রহমানুর রহিমের দরবারে গ্রহণীয় হয়েছে। এতদোপলক্ষে ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর রা:-এর ঈদের ঘটনাটি প্রণিধানযোগ্য। তৎকালীন আরব জাহানের মুসলমানরা যখন পবিত্র ঈদের আনন্দ উদযাপনে রত তখন হজরত ওমর ইবনুল খাত্তাব রা: স্বীয় গৃহের কপাট বন্ধ করে এমনভাবে ক্রন্দনে রত ছিলেন চোখের অশ্রুতে দাড়ি মুবারক ভিজে গিয়েছিল। অবস্থা অবলোকন করে জনৈক সাহাবি তার নিকট গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন- ‘হে আমিরুল মোমেনিন! সব লোক একান্তভাবে আজকে আনন্দ উপভোগ করছে অথচ এমন আনন্দ ঘন মুহূর্তে আপনি কেন চোখের অশ্রুতে বুক ভাসিয়ে দিচ্ছেন? উত্তরে তিনি বললেন ‘যারা পবিত্র রমজান মাসে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করে আল্লাহর মকবুল বান্দাদের তালিকাভুক্ত হতে পেরেছেন কেবল তাদেরই উচিত ঈদের আনন্দ উপভোগ করা। আর যারা মকবুলিয়তের লিস্টভুক্ত হতে পারেনি তাদের ক্রন্দন করাই উচিত। আমি তো জানি না পবিত্র রমজানের সিয়াম সাধনার দ্বারা আল্লাহর মকবুল বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত হতে পেরেছি কি না। সুতরাং ঈদের আধ্যাত্মিক আনন্দ তারাই উপভোগ করতে সক্ষম যারা রমজান এক মাস আসমানি তাকিদ অনুসারে রমজানের বিধিবিধান পালনের মাধ্যমে করুণাময় আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে পেরেছেন।
মুসলিম জাহান বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশ প্রেক্ষিত ঈদ উৎসবের তাৎপর্য অতি ব্যাপক। আল্লাহ তায়ালার এমন মহিমা বাংলার ধনী গৃহ হতে শুরু করে দিনমজুরের পর্ণ কুঠিরেও ঈদের বাহ্যিক আনন্দ উপচে পড়ে। কিন্তু মধ্যবিত্ত, নিম্ন বেতনভুক্ত চাকরিজীবী এবং নিরন্ন খেটেখাওয়া মানুষের বিপত্তি ঘটে সর্বাধিক। কেননা ঈদুল ফিতর উপলক্ষে প্রত্যেক মুসলমান এ সময় তার প্রিয়জনদের মুখে হাসি ফোটাতে চান, সঞ্চয়ের শেষ অর্থ প্রদানের মাধ্যমে হলেও ক্রয় করতে ইচ্ছুক সুন্দর পোশাক ও আনুষঙ্গিক অন্যান্য জিনিস। কিন্তু এ ব্যাপারে কয়জনই বা সফলকাম যেহেতু বাংলার অধিকাংশ লোক এখনো দারিদ্র্যসীমার নিচে এবং দারিদ্র্যই যাদের নিত্য অলঙ্কার। দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যায়- সামান্য বেতনে চাকুরে পরিবারে কর্তার আওতাধীন পিতামাতা, স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততিসহ মোট আটজন। ঈদ উপলক্ষে নতুন জামাকাপড় ও আনুষঙ্গিক জিনিস পাওয়ার ব্যাপারে পরিবারের সবাই গৃহকর্তার প্রতি আশাবাদী। মাসের শেষে বেতন ও ঈদ বোনাসসহ সর্বসাকুল্যে যে অর্থ পাওয়া যায় তা দিয়ে বাসা ভাড়া, চাল-ডাল ভোজ্য পদার্থ ইত্যাদি ক্রয়ের পর যে অর্থ উদ্বৃত্ত থাকে তা দিয়ে স্ত্রী-সন্তান-সন্ততি ও বৃদ্ধ পিতা, মাতার জন্য নতুন জামাকাপড় ইত্যাদি ক্রয় করা কি আদৌ সম্ভব? তুলনামূলক এর চেয়েও সমাজের নিম্নশ্রেণী দিনমজুর খেটেখাওয়া মানুষের অবস্থা সত্যিই স্পর্শকাতর। তাই এ পরিস্থিতিতে আসমানি তাকিদ আত্মত্যাগ, সংযম সাধনার মধ্য দিয়ে ধনী বিত্তশালীদের উচিত সমাজের গরিব, দুঃখী, শোকার্ত পরিবারের পাশে এসে ঈদের আনন্দকে সমভাগ করে নেয়া।
যেহেতু ইসলাম শান্তির ধর্ম এবং শান্তি অর্জনের উপায় রমজানের এক মাস সিয়াম সাধনা।
নবী করিম সা:-এর সে বাণী ভুলে গিয়েছি বিধায় ঈদের আনন্দের ঝরনাধারা আজ অবরুদ্ধ। তাই জাতীয় কবির ভাষায় আক্ষেপের সুরে বলতে হয়-
কোথা সে মহান শক্তি সাধক আনিবে যে পুনঃ ঈদ?
ছিনিয়া আনিবে আসমান থেকে ঈদের চাঁদের হাসি,
ফুরাবে না কভু যে হাসি জীবনে, কখনো হবে না বাসি।
সমাধির মাঝে গনিতেছি দিন, আসিবেন তিনি কবে?
রোজা ইফতার করিব সকলে, সেই দিন ঈদ হবে।






