আজকের পত্রিকা

সঠিক পদ্ধতিতে বীজ বপন ও উৎপাদন না করার ফল

বছরে ৪ লাখ টন ধানের অপচয়

বছরে ৪ লাখ টন ধানের অপচয়

``প্রচলিত পদ্ধতিতে উৎপাদিত চারা অত্যন্ত ক্ষীণ ও দুর্বল হয়। তাই প্রতি গুছিতে ৪ থেকে ৭টা চারা রোপণ করা হয়। এতে করে প্রতি হেক্টরে ৪১ কেজি বীজ অতিরিক্ত ব্যবহার করে শুধুই অপচয় করা হচ্ছে।''

  • প্রতি হেক্টরে ৪১ কেজি বীজ অতিরিক্ত ব্যবহার
  • প্রচলিত পদ্ধতিতে উৎপাদিত চারা অত্যন্ত ক্ষীণ ও দুর্বল

প্রচলিত নয়, সঠিক পদ্ধতিতে বীজ ধান বপন ও ধান উৎপাদন করা হলে বাংলাদেশকে বিদেশ থেকে প্রতি বছর তিন লাখ টন চাল আমদানি করতে হতো না। প্রচলিত পদ্ধতিতে সারাদেশে ১১০ লাখ হেক্টর জমিতে ধান রোপণ করতে ৪.৫১ লাখ টন বীজ ধান অযথাই মাটির নিচে পুঁতে ফেলা হচ্ছে। এই অপচয় রোধ করতে পারলে দেশে আপাতত চাল আমদানি করা দরকার হবে না। এমনটি বেরিয়ে এসেছে গাজীপুরের বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) এক গবেষণায়। এ বিষয়ে সংস্থার রাইস ফার্মিং সিস্টেমস বিভাগের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. এস এম শহিদুল্লাহর সাথে কথা হলে তিনি বলেন, প্রচলিত পদ্ধতিতে উৎপাদিত চারা অত্যন্ত ক্ষীণ ও দুর্বল হয়। তাই প্রতি গুছিতে ৪ থেকে ৭টা চারা রোপণ করা হয়। এতে করে প্রতি হেক্টরে ৪১ কেজি বীজ অতিরিক্ত ব্যবহার করে শুধুই অপচয় করা হচ্ছে।

জানা গেছে, ভূখণ্ড ছোট হলেও বৈচিত্র্যে ভরপুর কৃষির এ বাংলাদেশ। আর কৃষির সিংহভাগ দখল করে আছে ধান। বাংলাদেশের প্রধান খাদ্যশস্য হিসেবে আমাদের আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এর প্রভাব অত্যন্ত প্রবল। প্রকৃতপক্ষে ধান আমাদের জীবনের নিত্যদিনের অনুষঙ্গ। বলা যায়, গ্রামে এখনো ‘ধানই ধন’ বলে মনে করা হয়। আর এই ধান ফসলের সফল উৎপাদনের বীজ হচ্ছে প্রথম এবং প্রধান ভিত্তি। ফসল উৎপাদনের অন্যসব কৃষি উপকরণের কমতি, ঘাটতি বা অনুপস্থিতিতেও কিছু না কিছু ফলন আসে। কিন্তু বীজ ব্যতীত কোনো ফলনই আশা করা যায় না। কাক্সিক্ষত ফসল উৎপাদনে বীজ ও চারার সঠিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতকরণ অন্যতম প্রধান শর্ত। ব্রি’র তথ্য বলছে, আমাদের দেশে নিট ফসলি জমির পরিমাণ ৮১ লাখ ২৬ হাজার ৩৪০ হেক্টর। আর মোট ফসলি জমির পরিমাণ এক কোটি ৬০ লাখ ৫৬ হাজার ৮১৬ হেক্টর।

ব্রি’র বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. এস এম শহিদুল্লাহ জানান, আমাদের দেশের কৃষকরা প্রচলিত ধারায় ফসল উৎপাদন করে থাকেন। উৎপাদিত ফসলের একটি অংশ বীজ হিসেবে ব্যবহার করেন। কিন্তু বিশেষ যতœ ও পরিচর্যা সুনিশ্চিত করে বীজ এবং চারা উৎপাদন কৌশল সম্পর্কে বেশিরভাগ কৃষক এখনো পূর্ণ সচেতন নন। ফলশ্রুতিতে ধান উৎপাদনের সার্বিক প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে তারা ব্যক্তিগতভাবে এবং বাংলাদেশ তার জাতিগতভাবে বিভিন্ন রকম ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে।

ব্রি’র গবেষণা মতে, এ দেশে বছরব্যাপী বিভিন্ন পরিবেশ ও বিভিন্ন মওসুমে নানা প্রকারের ধান চাষ হয়ে থাকে। মোটাদাগে বলতে গেলে ৫৬ লাখ হেক্টর জমিতে রোপা আমন, ৪৭ লাখ হেক্টরে বোরো, ৯ লাখ হেক্টরে আউশ এবং ৪ লাখ হেক্টর জমিতে জলি আমন ধানের আবাদ হয়। জলি আমন ধানের পুরো এলাকাই বপন পদ্ধতির আওতায় রয়েছে। তাছাড়া আউশ মওসুমের ধান চাষেও প্রায় এক-চতুর্থাংশ জমিতে বপন পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। এ দু’টি অঙ্ক বাদ দিলে বাকি প্রায় ১১০ লাখ হেক্টর জমিতে ধান চাষের ক্ষেত্রে একমাত্র রোপণ পদ্ধতিই ব্যবহার করা হয়।

ব্রি’র গবেষণা নিয়ে ড. শহিদুল্লাহ বলেন, সফলভাবে ধান উৎপাদনের জন্য প্রতি হেক্টর জমিতে ৩ লাখ গুছি প্রয়োজন হয়। বীজতলায় সঠিক প্রযুক্তি অনুসরণ করে চারা উৎপাদন করলে একটি চারাই একটি গুছির জন্য যথেষ্ট হয়। সুতরাং এক হেক্টর জমি রোপণের জন্য ৩ লাখ চারা ব্যবহার করলেই চলে। সে হিসাবে ৩ লাখ বীজধান বীজতলায় বপন করতে হবে। বর্তমানে যেসব জাতের ধান চাষ করা হয় সেগুলোতে একটি বীজের ওজন সর্বোচ্চ ২৫ মিলি গ্রাম হয়ে থাকে। তাই উল্লেখিত প্রয়োজনীয় বীজের পরিমাণ সাড়ে ৭ কেজি। মাঠ পর্যায়ে সেফটি অ্যালাউন্স হিসেবে সাধারণত ২০ শতাংশ অতিরিক্ত বীজের ব্যবহার উত্তম বলে গণ্য করা হয়। এ বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে এক হেক্টর জমিতে ধান রোপণ করতে সর্বোচ্চ ৭.৫ ী ১.২০ = ৯ (নয়) কেজি বীজ প্রয়োজন।

জাতীয় পর্যায়ে সারা বাংলাদেশের চিত্র তুলে ধরে গবেষক শহিদুল্লাহ বলেন, প্রতি হেক্টর জমিতে ধান রোপণের জন্য বীজ তলায় যে পরিমাণ বীজ বপন করা হয় তার পরিমাণ গড়পড়তা ন্যূনতম ৫০ কেজি। প্রচলিত পদ্ধতিতে উৎপাদিত চারা অত্যন্ত ক্ষীণ ও দুর্বল হয়। তাই প্রতি গুছিতে ৪ থেকে ৭টা চারা রোপণ করা হয়। এতে করে প্রতি হেক্টরে ৪১ কেজি বীজ অতিরিক্ত ব্যবহার করে শুধুই অপচয় করা হচ্ছে। সারাদেশে ১১০ লাখ হেক্টর জমিতে ধান রোপণ করতে ৪.৫১ লাখ টন বীজ ধান অযথাই মাটির নিচে পুঁতে ফেলা হচ্ছে। গবেষণায় দেখা যায়, বাংলাদেশে চাল আমদানির পরিসংখ্যানে সর্বশেষ বার্ষিক আমদানির পরিমাণ ৩ লাখ টন। পক্ষান্তরে অপচয়কৃত বীজ ধান থেকে ঠিক ৩ লাখ টন চাল পাওয়া সম্ভব ছিল। অর্থাৎ অপচয় এবং আমদানির পরিমাণ একেবারেই সমান সমান। এ অপচয় রোধ করতে পারলে দেশে আপাতত চাল আমদানি করা দরকার হবে না।

এখন প্রথম প্রশ্ন হচ্ছে এ অপচয় কেন করা হচ্ছে, তিনি বলেন, উত্তর খুবই সহজ। ধানের বীজ অত্যন্ত সহজলভ্য ও সস্তা বিধায় কৃষক ভাইয়েরা এটাকে কিছুই মনে করেন না। এটা যে অপচয় তা মেনে নিতেও নারাজ।

প্রশ্ন হচ্ছে এ অপচয় রোধ করা কি সম্ভব? তিনি বলেন, এ প্রশ্নের উত্তর হচ্ছে হ্যাঁ। তবে প্রথম প্রশ্নের মতো এত সহজ নয়। একজন কৃষকের জন্য ব্যক্তিগত পর্যায়ে এ চিন্তা করার দরকার নেই এবং তার দায়িত্বের মধ্যেও পড়ে না। এ ভাবনাটি জাতীয় পর্যায়ের। গবেষক, সম্প্রসারণ কর্মী এবং নীতিনির্ধারক গোষ্ঠী থেকে সম্মিলিতভাবে এ প্রয়াস চালাতে হবে। এ প্রস্তাবনা শুধুই একটি কল্পনা বিলাসী গাণিতিক মডেল নয়। এটি যে বাস্তব এবং কৃষকগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবেই এ প্রযুক্তি ব্যবহার করছেন তা সহজেই চোখে আঙুল দিয়ে দেখানো যেতে পারে।

ব্রি’র বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা জানান, কিছু কিছু হাইব্রিড ধানের বিভিন্ন জাতের চাষ হচ্ছে দেশের সর্বত্রই। উৎপাদনকারী কোম্পানি তাদের বীজ বিপণন করার স্বার্থে স্লোগান সার্থকভাবে প্রয়োগ করেছে যে -‘একটি মাত্র বীজ থেকে একটি সুস্থ সবল চারা, আর একটি মাত্র চারা থেকে একটি গুছি’। হাইব্রিড ধানের বীজ যেহেতু অনেক চড়া দামে বিক্রির টার্গেট নেয়া হয়েছে তাই চাষিদেরকে উদ্বুদ্ধ করার জন্য আগেভাগেই তারা এ প্রযুক্তির সফলতা প্রমাণ করেছে। আর সুকৌশলে কৃষককে একটি অশুভ বার্তাও পৌঁছে দিয়েছে যে, এ প্রযুক্তি শুধুই হাইব্রিড ধানের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। আর দুঃখজনকভাবে এ বার্তাটিকে কৃষকসহ সর্বস্তরের সংশ্লিষ্ট মহল না বুঝেই খুব ভালোভাবেই গিলেছে। কোম্পানির পক্ষে স্লেøাগান দেয়ার জন্য বুদ্ধিজীবীর কোনো অভাব হয় না; কিন্তু আমাদের উচিত দেশ ও জাতির স্বার্থ আগে দেখা। আমাদের কৃষি, কৃষক ও অর্থনীতির স্বার্থ সবার আগে দেখা।

এই সম্পর্কিত আরও

সোম, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

সাত মিনিটে এক মাইল দৌড়াতে হবে

সোম, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

ডিআরইউ গেমসের পুরস্কার বিতরণ

সোম, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

পিএসজির প্রথম জয়

সোম, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

ঝিলি-বর্ষার লক্ষ্য মূল জাতীয় দল

সোম, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

ইউএস ওপেনের নতুন চ্যাম্পিয়ন জভেরেভ