কিয়ামত শব্দের অর্থ উঠে দাঁড়ানো। এটি আরবি শব্দ ‘কিয়াম’ থেকে আগত। যার অর্থ উঠা, দাঁড়ানো ইত্যাদি। আর কিয়ামত হলো- আল্লাহর সব সৃষ্টির ধ্বংস শেষে বিচার দিবস। ইসলামী আকিদা অনুসারে ফেরেশতা ইসরাফিল আ: শিঙ্গায় ফুৎকার দেয়ার মাধ্যমে কিয়ামত শুরু হবে। সেদিন আল্লাহ এই বিশ্বজগত এবং এর সব কিছু ধ্বংস করে দেবেন। একেই বলে কিয়ামত। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে বলেন- ‘যেদিন শিঙ্গায় ফুৎকার দেয়া হবে, সে দিনটি হবে অনেক কঠিন দিন।’ (সূরা মুদাচ্ছির : ৮-৯)
বিশ্বজগতের ধ্বংস প্রক্রিয়া বা মহাপ্রলয়ের সূচনা ঘটবে ফেরেশতা হজরত ইসরাফিল আ: কর্তৃক শিঙ্গায় প্রথম ফুৎকার দেয়ার মাধ্যমে। আবার মানুষকে হাশরের ময়দানে সমবেত করানো হবে শিঙ্গায় দ্বিতীয় ফুৎকারের মাধ্যমে। ইসরাফিল আ: বিশাল আকৃতির এই শিঙ্গা হাতে নিয়ে মাথা নিচু করে আল্লাহর আদেশের প্রতীক্ষায় বসে আছেন। আল্লাহর আদেশ পাওয়া মাত্রই তিনি শিঙ্গায় ফুৎকার দেবেন। মূলত শিঙ্গায় প্রচণ্ড আওয়াজের মাধ্যমেই কিয়ামত বা বিশ্বজগতের ধ্বংস প্রক্রিয়া শুরু হবে। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন- ‘যখন শিঙ্গায় ফুৎকার দেয়া হবে, একটি মাত্র ফুৎকার, পর্বতমালা সমেত পৃথিবী উৎক্ষিপ্ত হবে এবং মাত্র এক ধাক্কায় এগুলো চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাবে। সেদিন সংঘটিত হবে মহাপ্রলয় এবং আকাশ বিদীর্ণ হয়ে যাবে, আর সেদিন তা বিশ্লিষ্ট হয়ে পড়বে।’ (সূরা আল-হাক্কাহ : ১৩-১৬)
বস্তুত যখন শিঙ্গায় প্রথম ফুৎকার দেয়া হবে, তখন এর ভয়ঙ্কর আওয়াজে পৃথিবী ভীষণভাবে প্রকম্পিত হতে থাকবে, আকাশ বিদীর্ণ হয়ে যাবে, মহাজগতের নক্ষত্র-গ্রহগুলো ধ্বংস হয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়বে, পাহাড়-পর্বত চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে তুলার মতো উড়তে থাকবে। পৃথিবীর সব মানুষ ও জীবজন্তু ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করবে।
কিয়ামতের দিন হবে এক ভয়াবহ ও বিভীষিকাময় দিন। এ ভয়াবহতা যে কত ব্যাপক হবে, তা কল্পনা করা মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন- ‘সেদিন মানুষ বিক্ষিপ্ত পতঙ্গের মতো হবে।’ (সূরা কারিয়াহ-৪) তার পায়ের নিচে তখন কোনো মাটিই থাকবে না, সব কিছু জ্বলন্ত ধূলিকণা হয়ে বাতাসে উড়তে থাকবে; অবস্থা হয়ে উঠবে অত্যন্ত ভীতিকর ও যন্ত্রণাদায়ক। সেদিন মানুষ চিৎকার দিয়ে বলবে- আজ কী হলো? কাফির, মুশরিক ও অবিশ্বাসীরা আতঙ্কিত হয়ে পালাতে থাকবে। কিন্তু পালাবে কোথায়? পালানোর কোনো জায়গা থাকবে না। এ ব্যাপারে আল্লাহ বলেন- ‘পৃথিবী যখন আপন কম্পনে প্রবলভাবে প্রকম্পিত হবে এবং পৃথিবী যখন তার ভারসমূহ বের করে দেবে, আর মানুষ বলবে- এর কী হলো? সেদিন পৃথিবী তার বৃত্তান্ত বর্ণনা করবে, কারণ তোমার প্রতিপালক তাকে আদেশ করবেন।’ (সূরা জিলজাল : ১-৫) এ সময় পৃথিবীর কোনো আপনজনই কেউ কারো খবর রাখার কথা চিন্তাও করতে পারবে না। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বলেন-‘যেদিন কিয়ামত উপস্থিত হবে, সেদিন মানুষ পলায়ন করবে তার ভাই হতে এবং তার মাতা, তার পিতা, তার পত্নী ও তার সন্তান থেকে। সেদিন তাদের প্রত্যেকের অবস্থা হবে গুরুতর যা তাকে সম্পূর্ণভাবে ব্যতিব্যস্ত করে রাখবে।’ (সূরা আবাসা : ৩৩-৩৭)
কিয়ামতের বিভীষিকাময় দিন সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন- ‘হে মানুষ! তোমরা তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় করো। কিয়ামতের প্রকম্পন এক ভয়ঙ্কর ব্যাপার। যেদিন তোমরা তা প্রত্যক্ষ করবে, সেদিন প্রত্যেক স্তন্যধাত্রী তার দুগ্ধপোষ্য শিশুর কথা ভুলে যাবে এবং প্রত্যেক গর্ভবতী নারী গর্ভপাত করে ফেলবে। আর তুমি মানুষকে দেখবে মাতালের মতো, অথচ তারা নেশাগ্রস্ত নয়। বস্তুত আল্লাহর শাস্তি খুব কঠিন হওয়ায় মানুষের অবস্থা এরূপ হবে।’ (সূরা হজ : ১-২)
ফেরেশতা ইসরাফিল আ: আল্লাহর আদেশে দ্বিতীয়বার শিঙ্গায় ফুৎকার দেবেন। এ ফুৎকারের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা পৃথিবীর সব মৃত মানুষকে পুনর্জীবিত ও পুনরুত্থিত করবেন। এরপর নিজ নিজ কবর থেকে পুনর্জীবিত মানুষরা বের হয়ে আসবে এবং হাশরের ময়দানে একত্রিত হবে। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন- ‘যখন শিঙ্গায় ফুৎকার দেয়া হবে, তখনই মানুষ নিজের কবর থেকে বের হয়ে তাদের প্রতিপালকের দিকে ছুটে আসবে।’ (সূরা ইয়াসিন-৫১) কবর থেকে উত্থিত হওয়ার আগে সবাই থাকবে অচেতন অবস্থায়। তাদের কাছে মনে হবে শিঙ্গার ভয়ঙ্কর আওয়াজ শুনে তারা ঘুম থেকে জেগে উঠেছে। কবর থেকে বের হয়ে আসার পর মানুষের অবস্থা কতটা বিপজ্জনক ও ভীতিকর হবে পৃথিবীর কোনো মানুষের পক্ষে তা কল্পনা করাও সম্ভব নয়।
কবর থেকে মানুষ নগ্নদেহ, নগ্নপদ ও খতনাবিহীন অবস্থায় বের হয়ে আসবে। দুনিয়ার কোনো চিহ্নই মানবদেহে অবশিষ্ট থাকবে না। এ ব্যাপারে আল্লাহ বলেন-‘তোমাদিগকে প্রথমবার যেভাবে সৃষ্টি করেছিলাম, সেইভাবে তোমরা আমার কাছে হাজির হয়েছ।’ (সূরা কাহফ-৪৮) হাশরের ময়দানে কঠিন অবস্থায় মানুষ এমনভাবে অস্থির ও দিশেহারা হয়ে যাবে যে, সেখানে কেউ কারো দিকে তাকানোর কথা চিন্তাই করতে পারবে না। এ প্রসঙ্গে হজরত আয়েশা রা: বলেন, আমি রাসূল সা:-কে বলতে শুনেছি, ‘কিয়ামতের দিন সব মানুষকে নগ্নপদে, নগ্নদেহে ও খতনাবিহীন অবস্থায় সমবেত করা হবে।’ তখন আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল সা:! তাহলে তো নারী-পুরুষ একজন আরেকজনের লজ্জাস্থানের দিকে তাকাতে থাকবে। তিনি বললেন, ‘হে আয়েশা! সেই সময়টি এতই ভয়াবহ ও বিভীষিকাময় হবে যে, কেউ কারো দিকে দৃষ্টি দেয়ার অবকাশই পাবে না।’ (বুখারি-৬৫২৭, মুসলিম-২৮৬৯, মিশকাত-৫৫৩৬)
কিয়ামতের দিন সব সৃষ্টিকে এক স্থানে একত্রিত করা হবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন- ‘আর কিয়ামতের দিন আমি তাদের সবাইকে একত্রিত করব।’ (সূরা আনআম-২২) অন্যত্র আল্লাহ বলেন- ‘আমি সেদিন তাদের সবাইকে একত্রিত করব এবং তাদের কাউকেও ছেড়ে দেবো না।’ (সূরা কাফ-৪৭)
কিয়ামতের দিন হাশরে মাঠে মানুষের বিচার হবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন- ‘আজ প্রত্যেককে তার কৃতকর্মের প্রতিফল দেয়া হবে; আজ কারো প্রতি জুলুম করা হবে না। আল্লাহ হিসাব গ্রহণে তৎপর।’ (সূরা আল-মুমিন-১৭) শেষ বিচারের দিন প্রতিটি মানুষ তার দুনিয়ার কর্মফল অনুযায়ী ন্যায্য প্রতিদান পাবে।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন-‘আমি কিয়ামতের দিন ন্যায়বিচারের মানদণ্ড স্থাপন করব। সুতরাং কোনো ব্যক্তির প্রতি সামান্য পরিমাণ অবিচার করা হবে না। যদি কারো আমল সরিষার দানা পরিমাণও হয়, তবুও আমি তা উপস্থিত করব। আর আমি হিসাব গ্রহণকারী হিসেবে যথেষ্ট।’ (সূরা আম্বিয়া-৪৭) এ আয়াত থেকে বুঝা যায়, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তায়ালা মানুষের ভালো-মন্দ আমলের হিসাব নেয়ার জন্য মিজান তথা দাঁড়িপাল্লা স্থাপন করবেন। কারো প্রতি সামান্য অবিচার করা হবে না।
তখন মানুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ তার ভালো-মন্দ কর্মের সাক্ষী দেবে। মানুষ যদি ভালো কিছু করে তা মানুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সাক্ষী দেবে এবং মানুষ যদি খারাপ কিছু করে তা মানুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সাক্ষী দেবে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বলেন- ‘আজ আমি তাদের মুখ মোহর মেরে দেবো। তাদের হাত আমার সাথে কথা বলবে এবং তাদের পা তাদের কৃতকর্মের সাক্ষ্য দেবে।’ (সূরা ইয়াসিন-৬৫)
কিয়ামতের দিন বান্দা তার ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র নেক আমল সম্পর্কেও জানতে পারবে। একটি ছোট নেক আমলও তাকে বড় ক্ষতি থেকে বাঁচিয়ে দিতে পারে। আল্লাহ তায়ালা বলেন- ‘কেউ যদি অণু পরিমাণ নেক আমল করে তবে সেদিন তা দেখতে পাবে। আবার কেউ যদি অণু পরিমাণ বদ আমল করে, তবে তাও সে দেখতে পাবে।’ (সূরা জিলজাল : ৭-৮)
সেদিন মানুষের নেক ও বদ আমল পাল্লায় মাপা হবে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন-‘সুতরাং যার নেকের পাল্লা ভারী হবে, সে জান্নাতে সুখে-স্বাচ্ছন্দ্যে থাকবে। আর যার পাল্লা হালকা হবে, তার স্থান হবে হাবিয়া। আপনার কি জানা আছে এটি কী? হাবিয়া হলো উত্তপ্ত অগ্নি।’ (সূরা কারিয়াহ : ৬-১১)
হাশরের ময়দানে মানবজাতি যার যার আমল অনুযায়ী নানাভাবে বিভক্ত হয়ে পড়বে। একদিকে থাকবে কাফির, মুশরিক ও মুনাফিকরা। অপরদিকে থাকবে সিদ্দিক, শহীদ ও প্রকৃত মুমিনরা। আবার কিছু লোক হবে পাপাচারী মুসলমান। এ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন- ‘যেদিন কিয়ামত হবে সেদিন মানুষ বিভক্ত হয়ে পড়বে। সুতরাং যারা ঈমান এনেছে ও সৎকাজ করেছে তারা থাকবে জান্নাতে। আর যারা কুফরি করেছে এবং আমার আয়াত ও পরকালের সাক্ষাৎ অস্বীকার করেছে তারাই শাস্তি ভোগ করতে থাকবে।’ (সূরা রুম : ১৪-১৬)
লেখক : সম্পাদক, মাসিক সারস, পূর্ব রূপসা, খুলনা



