আত্মা কি? জীবনের সাথে আত্মার সম্পর্ক কি? এ নিয়ে বিজ্ঞান, চিকিৎসা বিজ্ঞান ও ধর্মের মধ্যে মূলগত পার্থক্য আছে। তবে পবিত্র কুরআনের আলোকে যখন আমরা রুহ বা আত্মার সংজ্ঞা খুঁজি তখন বিষয়টি পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারি এভাবে-
‘ওয়া ইয়াছ আলুনাকা আনির রুহি কুলি রুহু মিন আমরি রাব্বি ওয়ামা ঊতিতুম মিনাল ইলমি ইল্লা কালিলা।’ অর্থাৎ- তোমাকে তারা রুহ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। বলো, ‘রুহ হচ্ছে আমার প্রতিপালকের হুকুমের অন্তর্ভুক্ত (একটি হুকুম)। এ সম্পর্কে তোমাকে অতি সামান্য জ্ঞানই দেয়া হয়েছে।’ (সূরা বনি ইসরাইল, আয়াত-৮৫)
দার্শনিক ইমাম গাজ্জালি তার কিমিয়ায়ে সাআদাত গ্রন্থে পবিত্র কুরআনে উল্লিখিত ‘রুহ’ বলতে আত্মাকেই বুঝিয়েছেন। পবিত্র কুরআনে অন্তত ২৩ বার ‘রুহ’ শব্দ এসেছে।
তাফসিরে আহসানুল বয়ানে বলা হয়েছে, ‘রুহ বা আত্মা এমন অশরীরী বস্তু যা কারো দৃষ্টিগোচর হয় না। কিন্তু প্রত্যেক প্রাণীর শক্তি ও সামর্থ্য এই রুহের মধ্যেই লুক্কায়িত। এর প্রকৃত স্বরূপ কি? তা কেউ জানে না। ইহুদিরা একদা নবী করিম সা:-কে এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে এই আয়াত অবতীর্ণ হয়।’
তাফসিরে জাকারিয়ায় দেখা যায়, ‘রুহ শব্দটি অভিধান, বাকপদ্ধতি এবং কুরআনে একাধিক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। প্রসিদ্ধ ও সুবিদিত অর্থ তাই, যা এ শব্দ থেকে সাধারণভাবে বোঝা যায়। অর্থাৎ- প্রাণ যার বদৌলতে জীবন কায়েম রয়েছে।’
ওপরের আয়াতে ‘রুহ’ শব্দটি যে আত্মাকে বুঝানো হয়েছে সে ব্যাপারে সবচেয়ে প্রণিধানযোগ্য একটি বর্ণনা পাওয়া যায় হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা: বর্ণিত একটি হাদিস থেকে। হাদিসটি বর্ণিত হয়েছে সহিহ বুখারির ১২৫ এবং সহিহ মুসলিমের ২৭৯৪ নম্বর হাদিসে। এ হাদিসের সারাংশ এই- একজন ইহুদি মুহাম্মদ সা:-কে রুহ কি জিজ্ঞেস করার পর আল্লাহর রাসূল সা: খানিক চুপ করে রইলেন। পরে উপরের আয়াতটি নাজিল হয়।
তবে কোনো কোনো তফসিরবিদ বর্ণনার পূর্বাপর ধারার প্রতি লক্ষ্য করে ‘রুহ’ শব্দটি ওহি, কুরআন অথবা ওহিবাহক ফেরেশতা জিবরাইল জিবরিল সম্পর্কে সাব্যস্ত করেছেন। যেমন- তাফহিমুল কুরআনে রুহ বলতে ওহি, নবুওয়ত ও জিবরাইল আ:-কে বুঝানো হয়েছে।
রুহ বা আত্মা কি?
বাংলা ভাষায় রুহ এর অর্থ হলো প্রাণ বা আত্মা। পবিত্র কুরআনে রুহ শব্দটি তিনটি অর্থে দেখা যায়। ১. ‘রুহ’ হলো সেই অলৌকিক বস্তু, মানুষের ভেতর ফুঁঁ দিয়ে যাতে প্রাণের সঞ্চার করা হয়। ২. কুরআনে রুহ শব্দটি জিবরাইল আ:-এর জন্য ব্যবহৃত হয়েছে। ৩. রুহ শব্দ কয়েকটি জায়গায় কুরআন ও ওহি বোঝানোর জন্য ব্যবহৃত হয়েছে। রুহ বা আত্মা দৃষ্টিগোচর হয় না। অথচ মানুষসহ প্রত্যেক প্রাণের শক্তি ও সামর্থ্য এই আত্মার মধ্যেই লুকায়িত।
রুহ বা আত্মার বিষয়ে কুরআনের উপরের বর্ণনা ছাড়া বিশদ কিছু বর্ণনার অনুমতি শরিয়তে তেমন একটা পাওয়া যায় না।
রুহ মানে আমার ‘আমি’। মানুষের মধ্যে অভ্যন্তরীণ একটি বস্তুই রুহ। রুহ আরবি শব্দ। ‘নফস’ শব্দটিও রুহ শব্দের প্রতিশব্দ। পবিত্র কুরআনে ‘রুহ’ এবং ‘নফস’ শব্দ দু’টি একই অর্থে ব্যবহার হতে দেখা যায়। ফার্সিতে ‘দিল’ বাংলায় ‘হৃদয়’ বা ‘মন’ বলা হয়। রুহ সম্পর্কে আল্লাহর রাসূল সা: বলেন, ‘শরীরের মধ্যে একটি মাংসের টুকরা আছে, তা যখন ঠিক হয়ে যায়, গোটা শরীরই তখন ঠিক হয়ে যায়। আর তা যখন খারাপ হয়ে যায়, গোটা শরীরই তখন খারাপ হয়ে যায়। জেনে রাখো, সে মাংসের টুকরাটি হলো আত্মা।’ (সুনানে বায়হাকি, হাদিস-১০১৮০)
ইমাম গাজ্জালি বলেন, মানুষের বক্ষস্থলের ভেতরে বাম পার্শ্বে এক টুকরা গোশত আছে। মানুষের মূল বস্তু দিল বা আত্মা চর্মচক্ষে দেখা যায় না। যা চর্মচক্ষে দেখা যায় তা জড়জগতের অন্তর্গত। আত্মা জড়জগতের পদার্থ নয়।
এই বিশ্ব চরাচরে আত্মার আগমন মুসাফির হিসেবে। মুসাফির যেমন নির্দিষ্ট গন্তব্য সফর করে তার আসল জায়গায় ফিরে, তদ্রুপ আত্মাও দুনিয়ার জীবন পরিভ্রমণ শেষে আত্মার জগতে চলে যায়। যেটিকে ইসলামে ‘আলমে আরওয়াহ’ বা আত্মার জগৎ বলা হয়েছে।
ভালো-মন্দের ভেদজ্ঞান : রুহ বা আত্মাই মানুষকে ভালো বা মন্দ পথে পরিচালিত করে। মানুষের সমস্ত শরীরই রুহের অধীন। ধর্মগ্রন্থের সমুদয় আদেশ-নিষেধ মূলতঃরুহ বা আত্মাকে কেন্দ্র করেই আরোপিত হয়েছে। এই রুহ ঠিক থাকলে মানুষ আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করতে পারে। এই ধরাধমের যেকোনো মানুষ রুহের দ্বারা সংগঠিত সৎগুণাবলির কল্যাণে মঞ্জিলে মকছুদে পৌঁছে যেতে পারে। এ ঘোষণা এসেছে সূরা ফজরের শেষের চারটি আয়াতে। কুরআনে প্রশান্ত আত্মাকে ‘নাফসে মুতমায়িন্নাহ’ বলা হয়েছে।
মানুষ এই জগতে নিতান্তই মুসাফির। মায়ের গর্ভাশয়ে যখন একটি রুহের আবির্ভাব ঘটে তার নড়াচড়া আধুনিক আলট্রাসনোগ্রাফিতে দেখলে অবাক হতে হয়। একটি রুহ পৃথিবীতে আসার আগে তার ওই রুহের বাহ্যিক অবয়বের প্রাথমিক রূপ মায়ের গর্ভে কেমন হয় তা আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান শনাক্ত করতে পারে।
ধর্মতাত্ত্বিক দার্শিনকরা বলেন, মানুষের মধ্যে যে রুহ থাকে তার স্বভাবই মূলত আল্লাহর মারিফাত লাভ ও স্রষ্টার অতুলনীয় সৌন্দর্যদর্শন লাভ করা। আল্লাহর বন্দেগি করার দায়িত্বভারও এই রুহের ওপর ন্যস্ত। রুহ সমস্ত জগৎ সংসারে অতিশয় উৎকৃষ্ট রত্ন। মহান আল্লাহর দরবারেই রুহের উৎপত্তি।
মৃত্যুর পর প্রশান্ত রুহ বা নফস আল্লাহর দরবারে ফিরে যায়। পবিত্র কুরআনের সূরা ফজরের ২৭-৩০ নং আয়াত হচ্ছে প্রশান্ত আত্মা-বিষয়ক আয়াত। এখানে বলা হয়েছে- ‘হে প্রশান্ত আত্মা! তুমি তোমার প্রতিপালকের নিকট ফিরে এস সন্তুষ্ট চিত্তে ও সন্তোষভাজন হয়ে, আমার বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত হও এবং আমার জান্নাতে প্রবেশ করো।’
যে ব্যক্তি প্রশান্ত আত্মার অধিকারী হবেন তিনি আল্লাহর প্রতিদানে সর্বদা সন্তুষ্ট থাকবেন। এ ধরনের ব্যক্তির ওপর আল্লাহও সন্তুষ্ট থাকেন। কারো কারো মতে মুমিনদের মৃত্যুর সময় আল্লাহ এ আহ্বান জানান।
আত্মার রকমফের : রুহ-আত্মা-হৃদয় বা মন একেকজনের বেলায় একেক মর্জি বহন করে চলা একটি বস্তু। অকারণে এই হৃদয় কাউকে হাসায়, কাউকে কাঁদায় আবার কাউকে নাচায়! বলা হয়ে থাকে- হৃদয় বা আত্মার অধীন পুরো মানব শরীর! মানুষের অধীন নয় আত্মা। নইলে বলা নেই, কওয়া নেই হঠাৎ মানুষ এমন আজগুবি কাণ্ড ঘটায় কেন? যেমন- ‘এই মন যা চায়’ তা-ই করে বসে কোনো কোনো মানুষ। এই মন তার কাজ ভুলে যায়। অতীত ভুলে যায়। ভ্রষ্টাকে ভুলে যায়। হঠাৎ হঠাৎ ‘এই মন যা চায়’কে প্রধান্য দিতে গিয়ে কি করে হুঁশ হারিয়ে ফেলে।
রুহ বা আত্মার বিষয়ে দার্শনিক আলোচনা করতে গেলে দেখা যায়, একজন মানুষের শরীরের যা আছে তা সমস্তই রুহের অধীন।
আত্মাকে জানার আহ্বান : পবিত্র কুরআনে রুহ বা আত্মা কী তা ওপরে বর্ণিত হয়েছে। আরবিতে আছে- ‘মান আরাফা নাফসাহু ফাক্বাদ আরাফা রাব্বাহু’ অর্থাৎ ‘যিনি নিজেকে চিনেছেন, তিনি স্র্রষ্টাকে চিনেছেন’। একজন মানুষ আত্মার অস্তিত্ব না বুঝা পর্যন্ত তার প্রকৃত তত্ত্ব জানতে পারে না।
ইমাম গাজ্জালির মতে, মানুষ নিজের হাত, পা, মুখ, মাথা ও মাংসপেশীর বেশি আর আর কিছুই প্রকৃতপক্ষে চিনতে পারে না। আর শরীরের অভ্যন্তরীণ অংশে ক্ষুধা লাগলে আহার করা আর অন্যবিধ ইচ্ছে জাগ্রত হলে তা চরিতার্থ করা ছাড়া মানুষ আর কিছু পারে না।
আমি কে? কোথা থেকে কেন এলাম? আমার অস্তিত্ব আগে কোথায় ছিল? এসব প্রসঙ্গের আলাপ খুবই বিস্তর। তবে আত্মার দ্বারা পরিচালিত হলেও কিছু মানুষ চতুষ্পদ জন্তু ও হিংস্র প্রাণীর চেয়েও হিংস্র্র হতে পারে। অন্যভাবে বলা চলে, এই আত্মার কিছু গুণাবলি ফেরেশতার আর কতকগুলো শয়তানের।
আল্লাহ মানুষকে যে রূপে সৃষ্টি করেছেন তার মধ্যে মানুষের বাহ্যিক রূপ বা অবয়বটি দেখা যায়। কিন্তু ভেতরের রূপ অর্থাৎ রুহ বা আত্মাকে স্বয়ং মানুষও দেখতে পারে না। আত্মার দর্শন চর্মচক্ষুর পক্ষে সম্ভব নয়।
আত্মা এবং শরীর সম্পূর্ণ ভিন্ন জিনিস। মারা গেলে মানুষের শরীরটি পড়ে থাকে। আত্মা খোঁজ আর কেউ পায় না।
সুতরাং এ বিষয়ে রুহানি জ্ঞান ছাড়া অতিরিক্ত আলোচনা ঈমানহীনতার দিকে নিয়ে যাবে। তবে এক্ষেত্রে ইমাম গাজ্জালি তার দার্শনিক তত্ত্বে বলেছেন- কেউ যদি চোখ বন্ধ করে কল্পনায় নিজের শরীর, দুনিয়া ও দুনিয়াতে যা কিছু আছে সব ভুলে যায় তবে নিজ অস্তিত্ব সে অবশ্যই বুঝতে পারবে। তখন সে ব্যক্তি নিজ শরীর, দুনিয়া ও দুনিয়াতে যা কিছু আছে সব ভুলে গেলেও নিজে যে বর্তমান আছে তাতে তার কোনো সন্দেহ থাকবে না। এ ধরনের গভীর মনোনিবেশ মানুষকে পরকাল সম্বন্ধেও জ্ঞান দিতে পারে।
লেখক : সভাপতি, আলীকদম প্রেসক্লাব



