সত্যবাদিতা মানুষের একটি মহৎ গুণ। সত্যবাদিতার আরবি প্রতিশব্দ হলো ‘সিদক’। এর অর্থ হলো- সততা, সত্যবাদিতা, সত্যকথা বলা, সত্য সাক্ষ্য দেয়া ইত্যাদি। প্রকৃত ঘটনা যথাযথ প্রকাশ করাকে সত্যবাদিতা বলে। যে ব্যক্তির মধ্যে এ মহৎ গুণ আছে তাকে সাদিক বা সত্যবাদী বলে। সত্যবাদী লোকের কথা ও কাজে কোনো পার্থক্য থাকে না। সত্যবাদিতা মানুষকে খাঁটি সোনার মতো নিখাদ করে তোলে। একজন আদর্শ মানুষকে অবশ্যই সত্যবাদী হতে হবে।
রাসূল সা: বাল্যকাল থেকে সবার কাছে সত্যবাদী ও বিশ্বাসী বলে প্রসিদ্ধ ছিলেন। তাঁর সত্যবাদিতা ও বিশ্বস্ততায় মুগ্ধ হয়ে আইয়ামে জাহিলিয়ার সময়ও সবাই তাঁকে ‘আল-আমিন’ বলে ডাকত এবং সম্মান করত। তিনি জীবনে কোনো মিথ্যা কথা বলেননি। রাসূল সা: ছিলেন সত্যবাদিতার মূর্তপ্রতীক। তিনি শুধু নিজে সত্যবাদী ছিলেন, তা নয়; তিনি তাঁর উম্মতের লোকদেরও সত্য বলার নির্দেশ দিতেন। তিনি এক বাণীতে সত্যকে ধারণ করা মুসলমানদের জন্য অপরিহার্য বলে আখ্যায়িত করেছেন। রাসূল সা: সত্যবাদিতা সম্পর্কে বলেন, ‘সত্য হলো প্রশান্তি এবং মিথ্যা হলো সংশয়ের আধার।’ (তিরমিজি-২৫১৮) হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা: থেকে বর্ণিত- রাসূল সা: বলেছেন, ‘তোমাদের অবশ্যই সত্যবাদী হওয়া উচিত। কেননা, সত্যবাদিতা মানুষকে পুণ্যের পথে পরিচালিত করে, আর পুণ্য জান্নাতের দিকে নিয়ে যায়। কোনো মানুষ যখন সর্বদা সত্য কথা বলে এবং সত্য বলতে অভ্যস্ত হয়ে যায়, তখন সে আল্লাহর কাছে সত্যবাদী হিসেবে লিপিবদ্ধ হয়ে থাকে। আর তোমরা মিথ্যা থেকে বিরত থাকো। নিঃসন্দেহে মিথ্যা গুনাহর দিকে চালিত করে। গুনাহ জাহান্নামের দিকে নিয়ে যায়। আর কোনো মানুষ যখন অনবরত মিথ্যা কথা বলে এবং মিথ্যায় অভ্যস্ত হয়ে পড়ে, তখন আল্লাহর কাছে তার নাম মিথ্যাবাদী হিসেবে লিপিবদ্ধ হয়ে যায়।’ (বুখারি-৬০৯৪, মুসলিম-২৬০৭)
সততা যখন কোনো ব্যক্তির চরিত্রের ওপর আরোপিত হয় তখন তাকে বলা হয় সৎ। সততার অস্তিত্ব মননে। সততার ব্যবহারিক অভিব্যক্তি চরিত্রের মাধ্যমে ফুটে ওঠে। কোনো ব্যক্তির নৈতিক চরিত্র ভালো হলে তিনি সচ্চরিত্রের অধিকারী হন। অন্য দিকে নৈতিক চরিত্র খারাপ হলে তিনি দুশ্চরিত্রের অধিকারী হন। ইহলৌকিক জীবনে সমাজে আত্মসম্মান নিয়ে বসবাসের জন্য সত্যবাদিতা একটি অপরিহার্য গুণ, যা সবার থাকা উচিত।
সততার বিষয়টি অনেক ব্যাপক। সততা শুধু সত্য কথা বলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং সত্য কথা বলার সাথে সাথে কাজকর্ম, আকিদা-বিশ্বাস সব কিছুই সততার অন্তর্ভুক্ত। মুমিনের চরিত্র স্বচ্ছ, তাই তারা সত্যবাদী। মুমিনরাই যে সত্যবাদী আল্লাহ তায়ালা তা কুরআনের আয়াতে এভাবে বলেছেন- ‘তারাই তো মুমিন, যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান এনেছে, তারপর সন্দেহ পোষণ করেনি এবং তাদের জীবন ও সম্পদ দিয়ে আল্লাহর পথে জিহাদ করেছে, তারাই সত্যবাদী লোক।’ (সূরা হুজুরাত-১৫) একজন মুমিন জীবনের সর্বাবস্থায় সত্যবাদিতার চর্চা করেন। বাস্তব ও প্রকৃত ঘটনাকে মুমিন কোনোরূপ বিকৃত, পরিবর্তন ও পরিবর্ধন ব্যতিরেকে হুবহু উপস্থাপন করে। কথাবার্তা, কাজকর্ম, আচার-আচরণ সর্বক্ষেত্রেই সত্যবাদিতা ও সততা অবলম্বন করে।
সত্যবাদিতা মানুষের জীবনে চিরমুক্তি ও কল্যাণের পথনির্দেশক। সত্যের অনুসরণে জীবন সুন্দর হয়। একজন সত্যবাদী মানুষ সবক্ষেত্রেই প্রশংসিত। সবার কাছেই সমাদৃত। সবাই তাকে বিশ্বাস করে। সত্যবাদিতা পবিত্র জীবনযাপন করার মৌলিক ভিত্তি। সত্যবাদী ব্যক্তি আত্মমর্যাদাশীল হয়। ফলে সে বহু অনৈতিক ও অন্যায় কাজ থেকে অনায়াসেই বেঁচে থাকে। সত্যবাদী মানুষের জীবন হয় ফুলের মতো সৌরভময়। ফুল যেমন তার হৃদয়কাড়া সুরভী দিয়ে চারপাশটা মোহিত করে রাখে, তদ্রƒপ একজন সত্যবাদী মানুষ ও সত্যবাদিতার সৌরভ ছড়িয়ে পরিবার ও সমাজকে মোহিত করে রাখে। সত্যবাদিতার কারণে একজন মুমিন দুনিয়া ও আখিরাতে অশেষ ও অঢেল কল্যাণ লাভ করে। কিয়ামতের দিন মুমিনের সত্যবাদিতা তাকে বিশেষ সহায়তা দান করবে। তাকে এর প্রতিদান হিসেবে জান্নাত দান করা হবে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন- ‘এই সেই দিন, যেদিন সত্যবাদীরা তাদের সততার জন্য পুরষ্কৃৃত হবে। তাদের জন্য রয়েছে জান্নাত, যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত। তারা সেখানে চিরস্থায়ী হবে।’ (সূরা মায়িদা-১১৯)
অনেক সদগুণের সমষ্টি সততা। অসংখ্য হাদিসে সততার গভীরতার বিষয়টি ফুটে উঠেছে। হজরত আবু সাবিত রা: থেকে বর্ণিত- তিনি বলেন, রাসূল সা: ইরশাদ করেছেন, ‘যে ব্যক্তি নিয়তের বিশুদ্ধতা ও সততার সাথে আল্লাহর কাছে শহীদী মৃত্যু কামনা করে, মহান আল্লাহ তাকে শহীদের মর্যাদায় পৌঁছিয়ে দেন- যদিও সে নিজ বিছানায় মৃত্যুবরণ করে।’ (মুসলিম-৫৭) আল্লাহর কাছে সত্যের মর্যাদা কত, তা এ হাদিসে পরিষ্কার হয়ে উঠেছে।
ব্যবসায়-বাণিজ্যসহ যাবতীয় লেনদেনে সততার নীতি অবলম্বনের ফলে বরকত নাজিল হয়। সত্যবাদী ব্যবসায়ী সম্পর্কে রাসূল সা: বলেছেন, ‘যদি ক্রেতা-বিক্রেতা সত্য বলে এবং ভালো-মন্দ প্রকাশ করে দেয়, তাহলে তাদের লেনদেন বরকতময় হবে। আর যদি উভয়ে মিথ্যা বলে এবং দোষত্রুটি (পণ্যের) গোপন করে, তাহলে এ লেনদেন থেকে বরকত উঠিয়ে নেয়া হবে।’ (মুসলিম-১৫৩২)
সৎ লোকের সততার প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে অসৎ ও মন্দলোকও তার জীবনের গতিপথ পরিবর্তন করতে পারে। হজরত আবদুল কাদের জিলানী রহ: বাল্যকাল থেকেই সততা ও সত্যবাদিতার জন্য সবার প্রিয়পাত্র ছিলেন। ডাকাতদলের হাতে ধরা পড়েও তিনি মিথ্যার আশ্রয় নেননি। ফলে বালক আবদুল কাদের জিলানী রহ:-এর সততায় মুগ্ধ হয়ে ডাকাতদল ডাকাতি ছেড়ে দিয়ে ভালো মানুষ হয়ে যায়।
ইসলাম মনে করে, মানুষ প্রকৃতিগতভাবেই সৎ ও সত্যবাদী হবে এবং কখনো মিথ্যাবাদী হবে না। সততার বিপরীত চরিত্র হলো মিথ্যা। আর মিথ্যা মানবজীবনের সবচেয়ে নিকৃষ্টতম বদ অভ্যাস, মানুষের উন্নতির বিনাশক। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে এর ভয়াবহ প্রভাব পড়ে। তিলে তিলে গড়ে তোলা সুন্দর ও সমৃদ্ধ জীবনকে মুহূর্তেই সে ধসিয়ে দেয়। মিশিয়ে দেয় মান-সম্মান। মিথ্যার ভয়াবহতা সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন- ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো সীমালঙ্ঘনকারী ও মিথ্যা বলতে অভ্যস্ত ব্যক্তিকে হেদায়েত দান করেন না।’ (সূরা মুমিন-২৮) আল্লাহ তায়ালা বলেন- ‘মিথ্যাবাদীদের ওপর আল্লাহর অভিশাপ।’ (সূরা আলে ইমরান-৬১) মিথ্যা কথা মানুষকে ধ্বংসের শেষ পর্যায়ে নামিয়ে দেয় এবং ঈমানশূন্য করে দেয়। এ প্রসঙ্গে হাদিসে বর্ণিত হয়েছে- রাসূল সা: বলেছেন, ‘একজন মানুষ যে নিয়মিতভাবে মিথ্যা কথা বলে এবং মিথ্যা ও প্রতারণাকেই নিজের কৌশল হিসেবে গ্রহণ করে, তার হৃদয়ে একটি কালো দাগ স্থায়ীভাবে বসিয়ে দেয়া হয় এবং ক্রমান্বয়ে তাতে গোটা হৃদয়টাই কালো ও অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে যায়। আর সে সময়েই তার নামটি মিথ্যাবাদীদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়।’ (তিরমিজি-১৯৭১, আদাবুল মুফরাদ-৩৮৭)
(চলবে)