(গত দিনের পর)
মিথ্যা কথা বলা মুনাফিকের নিদর্শন। রাসূল সা: বলেছেন, ‘মুনাফিকের আলামত তিনটি। যথা: ১. সে যখন কথা বলে, মিথ্যা বলে; ২. ওয়াদা করলে ভঙ্গ করে এবং ৩. তার কাছে আমানত রাখা হলে, তা খেয়ানত করে।’ (বুখারি-৩৩)
মানুষ আল্লাহর তায়ালার পরম ভালোবাসার সৃষ্টি। তাই মানুষের হিফাজতের জন্য তিনি রহমতের ফেরেশতা নিয়োজিত রাখেন। মানুষ যখন মিথ্যা কথা বলে, রহমতের ফেরেশতারা তখন তার সাথে থাকতে পারে না। এ সম্পর্কে রাসূল সা: বলেন, ‘যখন কোনো বান্দা মিথ্যা কথা বলে, তখন তার মিথ্যা কথনের দুর্গন্ধে ফেরেশতারা তার কাছ থেকে এক মাইল দূরে চলে যায়।’ (তিরমিজি-১৯৭২) মিথ্যাচারিতা ইবাদত কবুলের পথে অন্তরায়। সেজন্য যে মিথ্যা বলে আল্লাহ তার ইবাদত কবুল করেন না।
মিথ্যা যাবতীয় অন্যায়-অপরাধের মূল উৎস। মিথ্যার চর্চা ও প্রচলনের ফলে মুসলিম সমাজে প্রতারণার মতো নৈতিক অধঃপতন ও বিকৃতি দেখা দেয়। দুনিয়ার যত পাপ মিথ্যা থেকেই উদ্ভূত হয়। মিথ্যা মানুষকে মোহমুগ্ধ করে সত্যের আওতা থেকে দূরে নিয়ে যায়। আর সত্য তখন মিথ্যার আড়ালে ঢাকা পড়ে যায়। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন- ‘তোমরা সত্যের সাথে মিথ্যার মিশ্রণ করো না এবং জেনেশুনে সত্য গোপন করো না।’ (সূরা বাকারা-৪২) আল্লাহ তায়ালা তাঁর বান্দাদের নির্দেশ দিয়ে বলেন-‘এবং তোমরা মিথ্যা কথা পরিহার করো’। (সূরা হজ-৩০) মিথ্যা কোনো প্রকৃত মুমিনের স্বভাব হতে পারে না। সুতরাং মুমিন বান্দাকে সদা-সর্বদা কথা ও কাজে সততা ও স্বচ্ছতা রক্ষা করতে হবে এবং মিথ্যার অভিশাপ ও গ্লানি থেকে বাঁচতে হবে। শ্রেষ্ঠ মানুষ হলো সেই, যার অন্তর পরিচ্ছন্ন ও জবান সত্যবাদী।’ (ইবনে মাজাহ-৪২১৬)
রাসূল সা: বলেছেন, ‘সত্য কথা বলো, যদিও তা তিক্ত হয়।’ ( ইবনে হিব্বান : ৩৬১, ৪৪৯) যিনি মুমিন তিনি সত্যবাদী। তাই সত্য কথা বলা ব্যতিরেকে কেউই প্রকৃত মুমিন হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করতে পারে না। সত্য কথা না বললে ইবাদতে স্বাদ ও মজা অনুভূত হয় না। জীবন থেকে ইবাদতের স্বাদ ও মজা হারিয়ে যায়। ইবাদতগুলো প্রাণহীন ও ম্রিয়মান হয়ে পড়ে। রাসূল সা: বলেছেন, ‘সবসময় খারাপ চিন্তা থেকে দূরে থাকবে। কারণ খারাপ বা অশ্লীল চিন্তাই হলো সবচেয়ে বড় প্রতারণা, সবচেয়ে বড় মিথ্যা।’ (মুসনাদে আহমাদ-৭৩৩৭) একজন মুসলমান কখনোই বিপদের আশঙ্কায় সত্য বলতে ভয় পেতে পারে না; বরং তার উচিত সাহসিকতার সাথে সত্য কথা বলা; যেন কখনোই সে মিথ্যা প্রতারণার ফাঁদে পড়ে না যায়। রাসূল সা: বলেছেন, ‘তোমরা সত্যকে আঁকড়ে ধরো। যদি তোমরা তাতে তোমাদের বিপদের আশঙ্কা দেখো তথাপিও সত্য ছেড়ে দিও না। কারণ সত্যের পথে থাকলেই তোমরা কাক্সিক্ষত মুক্তির সন্ধান পাবে।’ পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন- ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সত্য ও সঠিক কথা বলো। তাহলে আল্লাহ তোমাদের কর্মসমূহকে সংশোধন করে দেবেন এবং তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করবেন। যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে, সে অবশ্যই মহাসাফল্য অর্জন করবে।’ (সূরা আহজাব : ৭০-৭১)
হজরত আবু হুরায়রা রা: থেকে বর্ণিত- তিনি বলেন, রাসূল সা: বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো শিশুকে কিছু দেয়ার কথা বলে ডাকল, এদিকে এসো। কিন্তু পরে তা আর দিলো না, তাহলে তা মিথ্যা হিসেবেই গণ্য হবে।’ (মুসনাদে আহমাদ-৯৮৩৬) মূলত এ হাদিসের মাধ্যমে যেমন রাসূল সা: তাঁর উম্মতকে মিথ্যার ভয়াবহতা সম্পর্কে ধারণা দিয়েছেন, ঠিক একই সাথে তিনি সন্তানদের সততার সাথে বড় করার ব্যাপারেও তাগিদ দিয়েছেন; যেন তারা যাপিত জীবনে ও কথাবার্তায় সততাকে ধারণ করতে পারে এবং মিথ্যাকে পরিহার করে চলতে পারে। মিথ্যা ও ধোঁকাপূর্ণ কথায় শিশুর কচি হৃদয়ে রেখাপাত করে এবং মিথ্যা বলাকে স্বাভাবিক মনে করতে থাকে। এর ফলাফল তার ভবিষ্যৎ জীবনে পরিস্ফুটিত হয়।
হজরত আবু হুরায়রা রা: থেকে আরেক হাদিসে বর্ণিত- রাসূল সা: বলেছেন, ‘কিয়ামতের দিন আল্লাহ তায়ালা তিন ব্যক্তির সাথে কথা বলবেন না। তাদের পবিত্র করবেন না এবং তাদের দিকে তাকাবেন না। তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। সেই তিন ব্যক্তি হলো- ১. যেনাকারী বৃদ্ধ ব্যক্তি; ২. মিথ্যুক রাজা এবং ৩. অহঙ্কারী ফকির-মিসকিন।’ (মুসলিম)
হজরত আলী রা: থেকে বর্ণিত- তিনি বলেন, ‘আল্লাহর কাছে মিথ্যা জিহ্বা সবচেয়ে বড় গুনাহ এবং সর্বাধিক নিকৃষ্ট অপমান হচ্ছে কিয়ামতের দিনের অপমান।’
যদি একজন মানুষ সত্যবাদী হয় এবং তার কথা ও লেনদেনে সত্য প্রতিফলিত হয়, তাহলে তার কাজকর্মেও সততা ও একনিষ্ঠতা ফুটে উঠবে। অন্যের সাথে কথোপকথন ও লেনদেনে সৎ থাকলে সেই সত্যের আলোকে ব্যক্তির হৃদয়ও আলোকিত হবে এবং মনের ভেতরে লুকিয়ে থাকা মন্দ জিনিসগুলো ক্রমেই হারিয়ে যাবে। আল্লাহ তায়ালা মুমিনদেরকে সত্যবাদী হওয়ার পাশাপাশি সত্যবাদীদের সাথে সুসম্পর্ক রাখা এবং তাদের সাথি হওয়ার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন। এতে সমাজে সঠিকভাবে সত্য প্রতিষ্ঠিত হবে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন- ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সত্যবাদীদের সঙ্গী হও।’ (সূরা তওবা-১১৯) তাই আদর্শ মানুষকে চরিত্রের হিফাজতের জন্য সবসময় সত্য ও হকের সাথে সম্পৃক্ত হতে হবে।
একটি দেশের শ্রেণিপেশা নির্বিশেষে সবার সত্যবাদী হওয়া অপরিহার্য। জীবনে চলার পথে কারো অসৎ হওয়ার সুযোগ নেই। পৃথিবীর যে দেশ ও সমাজ যত বেশি সততা, নৈতিকতা এবং নীতিজ্ঞানসম্পন্ন মানুষ দিয়ে সমৃদ্ধ হবে, সে দেশ ও সমাজ তত বেশি আদর্শ এবং ন্যায়নিষ্ঠ হিসেবে পরিচিতি লাভ করবে। তাই মুসলিম উম্মাহকে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সত্যবাদিতা অবলম্বন করা উচিত।
লেখক : সম্পাদক, মাসিক সারস, পূর্ব রূপসা, খুলনা
সত্যবাদিতা এক মহৎ গুণ
(গত দিনের পর)মিথ্যা কথা বলা মুনাফিকের নিদর্শন। রাসূল সা: বলেছেন, ‘মুনাফিকের আলামত তিনটি। যথা: ১. সে যখন কথা বলে, মিথ্যা বলে; ২. ওয়াদা করলে ভঙ্গ...



