বাংলাদেশসহ গোটা পৃথিবী আজ নানা সমস্যায় জর্জরিত। এখানে এখন প্রতিদিনই নিত্যনৈমিত্তিক অন্যায় ও অনাচারের ঘটনা সংঘটিত হচ্ছে। অপরাধের মাত্রা দিন দিন বেড়েই চলেছে। সাধারণ মানুষ প্রতিবাদ করতে রাস্তায় আসছে। তারা আজ ক্ষুব্ধ, বিক্ষুব্ধ। অন্য দিকে, দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা সমাধানের পথ খুঁজছেন। সামাজিক সচেতনতা ও আইনি বাধ্যবাধকতা দিয়ে পরিস্থিতি প্রশমনের চেষ্টা করা হচ্ছে। এমতাবস্থায় আমরা যদি ইতিহাসের দিকে লক্ষ করি তাহলে দেখতে পাব যে, প্রায় দেড় হাজার বছর আগে আরবের মক্কার জমিনে এর চেয়েও খারাপ অবস্থা বিরাজমান ছিল। সেই পরিস্থিতিতে একটি ভয়ানক বিশৃঙ্খল পরিবেশে জন্মগ্রহণ করলেন মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ। মানুষ হিসেবে তিনি অন্য বালকদের মতো হলেও বড় হওয়ার সাথে সাথে চরিত্র-মাধুর্য, মেধা-বুদ্ধি ও চিন্তাশীলতার দীপ্তি ছড়াতে লাগলেন। তিনি হয়ে উঠলেন এক অনন্য বালক, একটি উদাহরণ। সবার দৃষ্টি আকৃষ্ট হলো তার প্রতি। জমাট বাঁধা অন্ধকারের মধ্যে তিনি জোনাকির মতো জ্বলে উঠলেন। ‘আল আমীন’, ‘আস সাদীক’ খেতাবে ভূষিত হলেন তিনি। সবার ভালোবাসা ও ¯েœহ-মমতায় সিক্ত মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ যেন একটি মডেল। একটি বর্বর সমাজেও যে ভালোর কদর আছে সেই সত্যটি প্রতিষ্ঠিত হলো। কিন্তু বালক মুহাম্মদের মনে কষ্ট এবং মাথায় চিন্তা।
সমাজের চারদিকে অনাচার, অসঙ্গতি, ক্ষতি আর ক্ষতি। সমাজের এই দুর্গতি দেখে অতি মাত্রায় চিন্তিত তিনি। যদিও তিনি কেবলই ছোট্ট একটি বালক, কিন্তু তার ভাবনা বিশাল, চিন্তা অনেক বিস্তৃত। কেন এমন হয়? মানুষগুলো কেন সভ্য নয়? এ থেকে পরিত্রাণের উপায় কী? এর সমাধান কোথায়? এসব প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে তার মাথায়। চারদিকে যুদ্ধ, লুটতরাজ, হাঙ্গামা, না! এ থেকে পরিত্রাণ পাওয়া একার পক্ষে সম্ভব নয়। প্রয়োজন সঙ্ঘবদ্ধ শক্তি, দরকার একটি দল। তিনি গঠন করলেন একটি শান্তিসঙ্ঘ ‘হিলফুল ফুজুল’। তিনি তার ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা ও ভালোবাসাকে কাজে লাগিয়েও কিছু কিছু সমস্যার সমাধান করলেন। কাবা ঘরে ‘হাজরে আসওয়াদ’ পাথর বসানো নিয়ে আরব গোত্রগুলোর মধ্যে বিরাজমান বিবাদ তিনি তাঁর বুদ্ধিমত্তা দিয়ে সমাধান করে দিলেন। তিনি নিজে হয়ে উঠলেন একজন বিশ্বস্ত আমানতদার, সম্পদ সংরক্ষণের একটি নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান।
বিস্ময়কর বালক মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ একে একে সমাজের সমস্যাগুলোকে চিহ্নিত করতে লাগলেন এবং সমাধানের পথ খুঁজতে লাগলেন। তিনি উপলব্ধি করতে লাগলেন, এত বড় বড় সমস্যা সমাধানের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও সুদুরপ্রসারী চিন্তা প্রয়োজন। এ অবস্থায় আল্লাহ হয়তো অলক্ষ্যে তাঁকে জানিয়ে দিলেন যে, হে মুহাম্মদ! তোমার নিজস্ব মেধা-বুদ্ধি দিয়ে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন ওহির জ্ঞান। তিনি চলে গেলেন নির্জনে, নীরবে-নিভৃতে ভাবার জন্য। দীর্ঘ সময় ধরে চিন্তা করার পর চলে এলো সমাধান। আল্লাহ তায়ালা ওহি পাঠালেন, ‘পড় তোমার প্রভুর নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন.....।’ (সূরা আলাক) মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সা: বুঝে গেলেন যে, সমস্যার সমাধান করতে হলে আগে মানুষগুলোর আত্মীক ও আধ্যাত্মিক পরিশুদ্ধি প্রয়োজন। তিনি মানুষকে ডাকলেন, হে মানবমণ্ডলী! তোমরা বলো, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ তাহলে সফল হবে। নবুয়তের ধারা চালু হয়ে গেল। ওহির বাণীর মাধ্যমে মানুষের মনজগতের পরিবর্তনের কর্মসূচি এগিয়ে চলল। মুহাম্মদ সা: অনেক পরিশ্রম করে আবু বকর, ওমর, উসমান, আলী রা: প্রভৃতি ব্যক্তিবর্গের মনজগতে আল্লাহর ইচ্ছায় ইসলাম প্রতিষ্ঠা করলেন। কিন্তু তারপরও বহু মানুষ মনবৈকল্যের মধ্যে রয়ে গেল।
হিজরতের পর মুহাম্মদ সা: মনিনা সনদ প্রণয়নের মাধ্যমে মদিনাকেন্দ্রিক একটি রাষ্ট্র গঠন করে বিশৃঙ্খল একটি জাতিকে সুশৃঙ্খল জাতিতে পরিণত করে শাসনতান্ত্রিক সমস্যা থেকে মুক্তি দিলেন। আইন ও শাসনতান্ত্রিক ব্যবস্থার মাধ্যমে সমাজে নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠা এবং নিপীড়িত ও বঞ্চিত মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করে মর্যাদাভিত্তিক সহাবস্থান নিশ্চিত করলেন মুহাম্মদ সা:। মানবতার ওপর চেপে থাকা অসভ্যতার জগদ্দল পাথর সরিয়ে নিষ্কৃতি দিলেন মানুষকে। সুতরাং মুহাম্মদ সা: শুধু উপদেশ দেননি। তিনি বাস্তব সমস্যার সমাধান করেছেন। ইসলাম শুধু উপদেশ বা আনুষ্ঠানিকতার নাম নয়। ইসলাম মানবিক সমস্যা, মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা, সামাজিক সমস্যা ও রাষ্ট্রীয় সমস্যাসহ আর্থসামাজিক, রাজনৈতিক ও বৈষয়িক সমস্যার সমাধান দিয়ে থাকে। মুহাম্মদ সা: ইসলামকে সেভাবেই প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তিনি মানবতার ত্রাণকর্তা, সভ্যতার বিনির্মাণকারী এবং রাষ্ট্র ও শাসনব্যবস্থা প্রবর্তনকারী। আজকের যারা ইসলামের ধারক-বাহক তাদেরও একইভাবে একই ধারায় সমস্যা সমাধানের জন্য কাজ করা উচিত। বর্তমান দুনিয়ার সব দুরবস্থা দূর করার জন্য নবী মুহাম্মদ সা:-এর আদর্শ তথা ইসলাম একইভাবে প্রযোজ্য।