ইসলামী শরিয়ত অনুযায়ী নারীদের জন্য মোহর ধার্য এবং আদায়ের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটা সম্পর্কে নারীদের ধারণা নেই বললেই চলে। ওদিকে স্বামীরাও অতি চাতুর্যের সাথে বাসর রাতেই মোহর মাফ করে নেয়ার আবদার করে বসে। বেচারি নববধূ বাসর রাতেই বিষয়টি নিয়ে ভ্যাবাচ্যাকায় পড়ে যান, কী করবে-কী বলবে ভেবে পায় না। বুঝে হোক আর না বুঝে হোক মাফ করে দেয়। ভেবেও দেখল না যে, এই মাফ করে দেয়াটা তার জন্য কত বড় ক্ষতি হলো।
মোহর পরিশোধ বা আদায় না করে স্বামী যদি স্ত্রীর সাথে দৈহিক মিলন করে তবে কিয়ামতের দিন ওই স্বামীকে জেনাকারদের কাতারে দাঁড় করানো হবে। বিয়ের সময় মোহরের কথা উল্লেখ না করলেও মোহরে মিশাল দিতে হবে। মোহরে মিশাল হলোÑ যে মেয়েকে বিয়ে করা হয়েছে, সে মেয়ের আপন বোন, চাচাত বোন, ফুফু ও ভাতিজিদের বিয়ে যে পরিমাণ মোহর ধার্য করা হয়েছে সে পরিমাণ।
মোহরকে নারীর ইজ্জতের গ্যারান্টি করা হয়েছে। ইসলাম নারীদের মর্যাদা রক্ষায় মোহরের বিধান প্রবর্তন করেছে। তাদেরকে শিক্ষা দিয়েছে যে, মোহর দেয়া আল্লাহর হুকুম ও বিয়ের শর্ত হওয়ায় তা স্বামীর ওপর ফরজরূপে সাব্যস্ত হয়েছে এবং তা স্ত্রীর মালিকানাধীন হয়ে যায়। অর্থাৎ স্বামী যদি স্ত্রীকে মোহর হিসেবে অঢেল সহায়-সম্পত্তি দেয় তবে তা ফেরত নেয়া যাবে না, স্ত্রী এই সম্পত্তির মালিক হয়ে যাবে।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ ইরশাদ করেছেনÑ ‘আর তোমরা স্ত্রীদেরকে তাদের মোহর দিয়ে দাও খুশিমনে’ (সূরা নিসা-৪)।
মোহর ইসলামী শরিয়তের বিধান মোতাবেক অবশ্য পালনীয়। মোহর কোনো হেলাফেলার বিষয় নয়। এটি বিয়ের ক্ষেত্রে একটি বুনিয়াদি হুকুম। অথচ আজকের মুসলিম সমাজে ইসলামী মূল্যবোধের প্রতি অবহেলার কারণে এটি একটি নিছক বা খেলনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের ধারণা, স্ত্রীর মোহর আদায় করা তেমন একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়।
মোহরের পরিমাণ : মোহরের নিম্নতম পরিমাণ হলো ১০ দিরহাম বা পৌনে তিন তোলা রুপার মূল্যের সমপরিমাণ মূল্য। যেসব লোক গরিব, দিনমজুর, কিংবা স্বল্প বেতনে চাকরি করেন বা দৈনিক আয়ের ওপর ভিত্তি করে সংসার পরিচালনা করেন, এমনকি হঠাৎ যদি দু-চারদিন কাজ বন্ধ থাকে তবে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন এই শ্রেণীর লোকদের বিয়েতে সবচেয়ে কম পরিমাণ মোহর ধার্য করা জরুরি। কারণ বেশি মোহর ধার্য করা হলে এরা কখনো স্ত্রীর মোহর আদায় করতে পারবে না। ফলে স্ত্রীর পাওনা হক অনাদায়ের অপরাধে অপরাধী হয়ে মৃত্যুবরণ করতে হবে। স্ত্রীর এই পাওনা যাতে সহজেই পরিশোধ করা যায় সে জন্য হজরত ওমর রা: বলেছেন, ‘সাবধান! তোমরা স্ত্রীদের মোহর বেশি ধার্য করিও না, যা স্বামীদের ওপর বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।’
মোহর সম্পর্কে কিছু মাসয়ালা : ১. স্বামী-স্ত্রীর দৈহিক মিলনের আগেই যদি বিয়ে-বিচ্ছেদ ঘটে তবে ধার্যকৃত মোহরের অর্ধেক স্ত্রীকে দিয়ে দিতে হবে।
২. মোহরের সর্বোচ্চ পরিমাণের কোনো সীমাবদ্ধতা নেই। তবে অতিরিক্ত মোহর ধার্য করা উচিত নয়।
৩. যদি কেউ নির্দিষ্ট পরিমাণ মোহর ধার্য করে কোনো মহিলাকে বিয়ে করে এবং মোহর আদায় করার ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও যদি কোনো কারণবশত আদায় করতে না পারে আবার স্ত্রীও যদি দাবি না করে এমন অবস্থায় স্বামী মৃত্যুবরণ করলে সে ক্ষেত্রে স্বামীর পরিত্যক্ত সম্পদ থেকে মিরাছ বণ্টনের আগেই হিসাব করে স্ত্রীর মোহর আদায় করতে হবে। পক্ষান্তরে যদি স্ত্রীর মৃত্যু হয়, তবে তার মোহর মিরাছি সম্পদের সাথে হিসাব করে তার ওয়ারিশদের মধ্যে বণ্টন করে দিতে হবে।
৪. যদি কারো সামর্থ্য ও যোগ্যতার ভিত্তিতে মোহর ধার্য করা হয়, অতঃপর স্বামী খুশি মনে কিছু পরিমাণ মোহর বাড়িয়ে দেয়, তবে যে পরিমাণ বাড়াবে সে পরিমাণ আদায় করা ওয়াজিব। যদি আদায় না করে তবে সে গুনাহগার হবে। অনুরূপভাবে স্ত্রীও যদি স্বেচ্ছায়-সজ্ঞানে মোহরের কিছু অংশ মাফ করে দেয়, তবে যে পরিমাণ মাফ করেছে, সে পরিমাণ মোহর মাফ হয়ে যাবে। যদি পুরোটাই মাফ করে দেয় তবে পুরোটাই মাফ হয়ে যাবে। এরপর স্ত্রী তার মোহর দাবি করার ব্যাপারে আর কোনো অধিকার থাকবে না।
৫. মোহর জোর করে মাফ করিয়ে নিলে মাফ হবে না। এ ক্ষেত্রে স্ত্রী অনন্যোপায় হয়ে স্বামীর মন রক্ষার্থে মাফ করেছে বলে স্বীকার করল। স্ত্রীর এরূপ মনরক্ষার কথায় মোহর মাফ হবে নাÑ অর্থাৎ স্বামীকে মোহর পরিশোধ করতেই হবে।
৬. মোহর ধার্য করার সময় যদি নগদ অর্থ বা অলঙ্কার কিছুই উল্লেøখ করা না হয়, বরং কিছু জমি বা ঘরবাড়ি ধার্য করা হয় তবে তা বৈধ হবে। এ ক্ষেত্রে যা ধার্য করা হয়েছে, তাই দিতে হবে।
৭. যে দেশে বাসর রাতেই মোহর আদায় করে নেয়ার নিয়ম প্রচলিত রয়েছে, সেখানে স্ত্রী প্রথম রাতেই মোহরের পাওনা আদায় করে নিতে পারবে। যদি প্রথম রাতে স্ত্রী দাবি না করে, তবে যখনই দাবি করবে, স্বামী তখনই তা দিতে বাধ্য থাকবে।
৮. মোহর আদায়ের নিয়তে স্বামী যদি স্ত্রীকে কিছু কিনে দেয় এবং সেই জিনিস যদি এমনিতেই স্ত্রী হিসেবে স্বামীর তা দেয়ার কর্তব্য না হয়, তবে যে পরিমাণ দিয়েছে, সে পরিমাণ মোহর থেকে আদায় হয়ে যাবে। দেয়ার সময় মোহরের কথা উল্লেøখ করা জরুরি নয়। কিন্তু যদি কোনো নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস যা এমনিতেই স্ত্রীকে দেয়া স্বামীর পক্ষে কর্তব্য, এমন জিনিস মোহর হিসেবে গণ্য হবে না।
সুতরাং শরিয়তের বিধান মোতাবেক স্ত্রীর মোহর আদায় করা স্বামীর জিম্মায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অপরিহার্য ঋণ। কাজেই টালবাহানা না করে যত দ্রত সম্ভব সেই ঋণ পরিশোধ করে দেয়া স্বামীর কর্তব্য। তা না হলে পরকালে স্বামীকে এ ঋণের দায় হিসেবে জবাবদিহি করতে হবে।
মোহরানার মাফ নেই
ইসলামী শরিয়ত অনুযায়ী নারীদের জন্য মোহর ধার্য এবং আদায়ের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটা সম্পর্কে নারীদের ধারণা নেই বললেই চলে। ওদিকে স্বামীরাও অতি চাতুর্যের সাথে...



