জন্ম মানেই মৃত্যুর অপেক্ষা। অর্থাৎ জন্ম হয়েছে যার মৃত্যু তার অবধারিত। এটাই দুনিয়ার নিয়ম। ‘প্রত্যেক প্রাণীই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে’ (সূরা আলে ইমরান-১৮৫)। মুমিনের মৃত্যু আর অন্যদের মৃত্যু একরকম নয়। আল্লাহ তায়ালা হজরত মুহাম্মদ সা:কে বলেছেন, ‘আপনি বলুন, আমার সালাত, আমার কোরবানি, আমার জীবন ও আমার মরণ বিশ্ব প্রতিপালক আল্লাহরই জন্য’ (সূরা আনআম-১৬২)।
একজন মুমিনের স্বীকৃতি এটিই যে, আমার সব কাজ এবং জীবন-মরণ আল্লাহর জন্য নিবেদিত। আল্লাহ তায়ালা আরো ইরশাদ করেন, ‘তিনি জান্নাতের বিনিময়ে মুমিনদের জীবন ও সম্পদ ক্রয় করে নিয়েছেন’ (সূরা তাওবা-১১১)। মুমিনের কামনা-বাসনা হলো শহীদি মৃত্যু। কেননা, মহানবী সা: বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করল অথচ জিহাদ করেনি এমনকি মনে জিহাদের তথা শহীদি মৃত্যুর চিন্তাও করেনি, সে যেন মুনাফেকির অবস্থায় মৃত্যুবরণ করল’ (সহিহ মুসলিম)। মৃত্যুর মধ্যে সর্বোত্তম ও সম্মানজনক মৃত্যু হলো শহীদি মৃত্যু। স্বয়ং নবীজী সা: বারবার শাহাদত কামনা করেছেন। রাসূল সা: সর্বদায় মহান আল্লাহর কাছে শহীদি মৃত্যু কামনা করে বলতেন, ‘আল্লাহুম্মার যুকনি শাহাদাতান ফি সাবিলিক’। অর্থাৎ : হে আল্লাহ! তুমি আমাকে তোমার পথে শাহাদাত নসিব করো (আমি তোমার পথে শহীদ হতে চাই)। সব সাহাবায়ে কেরাম রা: সর্বদায় শাহাদাতের মৃত্যু কামনা করেছেন।
শহীদদের মর্যাদা বর্ণনা করতে গিয়ে পবিত্র কুরআনে কারিমের অন্য এক জায়গায় বর্ণিত রয়েছেÑ ‘আর যারা আল্লাহর রাস্তায় নিহত হয়, তাদের তোমরা মৃত বলো না, তারা জীবিত এবং তারা তাদের রবের কাছ থেকে রিজিকপ্রাপ্ত’ (সূরা আল ইমরান)। শহীদের মর্যাদা এত বেশি যা রাসূলের হাদিসে প্রমাণ পাওয়া যায়। হজরত আনাস রা: বর্ণনা করেন, রাসূল সা: বলেছেন, ‘কোনো ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করার পর আর দুনিয়ায় ফিরে যেতে চাইবে না। যদি সে দুনিয়ার তামাম জিনিস পেয়ে যায়, তবুও না। অবশ্য শহীদের কথা আলাদা। সে চাইবে যে, তাকে দুনিয়ায় ফিরিয়ে আনা হোক এবং দশবার তাকে আল্লাহর পথে শহীদ করা হোক। এই কারণে যে, সে তার ইজ্জত ও সম্ভ্রম দেখতে পাবে। অন্য রেওয়ায়েতে এসেছেÑ সে এটা চাইবে এ কারণে যে, এভাবে সে শাহাদাতের ফজিলত দেখতে পাবে’ (বুখারি ও মুসলিম)। অন্য এক হাদিসে হজরত আমর ইবনুল আস রা: বলেন, রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, ‘ঋণ ছাড়া শহীদের সব গুনাহ শাহাদতপ্রাপ্তির কারণে ক্ষমা হয়ে যায়’ (সহিহ মুসলিম)। এগুলো ছাড়াও মহানবী সা: অন্য এক জায়গায় বলেছেন, শহীদ ব্যক্তির শুধু জানাজা দিয়ে পরনের জামাকাপড়সহ দাফন করে দেয়া হবে এবং কিয়ামতের দিন তারা রক্তমাখা জামাকাপড়সহ আল্লাহর কাছে উপস্থিত হবেন। তখন আল্লাহ তায়ালা শহীদ ব্যক্তিকে দেখে খুশি হয়ে যাবেন।
শহীদের প্রাপ্তি ও মর্যাদা সম্পর্কে আল্লাহর রাসূল সা: আরো বলেন, ‘একজন শহীদ আল্লাহর কাছ থেকে আরো ছয়টি পুরস্কার পাবেন আর সেগুলো হলোÑ ১. প্রথম রক্তের ফোঁটা বের হওয়ার সাথে সাথেই তাকে ক্ষমা করে দেয়া হয় এবং শহীদ ব্যক্তি জান্নাতে তার স্থান দেখে নেয়; ২. কবরের আজাব থেকে তাকে দূরে রাখা হয়; ৩. বড় ভীতি অর্থাৎ কিয়ামতের কঠিন অবস্থা থেকে নিরাপদ থাকবে; ৪. তাকে ঈমানের একজোড়া অলঙ্কার পরানো হবে; ৫. হুরদের সাথে বিয়ে দেয়া হবে; ৬. নিকটাত্মীয়দের থেকে ৭০ জন ব্যক্তিকে সুপারিশ করতে পারবে।
একজন অন্ধ সাহাবির শাহীদি মৃত্যুর তামান্নাÑ হজরত আবদুুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুব একজন অন্ধ সাহাবি। তিনি হজরত উমর রা:-এর খিলাফতকালে যখন শুনতে পেলেন মুসলমানরা এবার কাদিসিয়ার যুদ্ধে অংশগ্রহণ করবে। তখন এই অন্ধ সাহাবি হজরত আবদুুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুব রা: হজরত উমর রা:-এর কাছে গিয়ে আরজ করলেন, হে আমিরুল মুমিনিন! আমি আজ একটি আবদার নিয়ে আপনার কাছে এসেছি। দয়া করে এবার আর ফিরিয়ে দেবেন না আমায়। হজরত উমর রা: তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী তোমার আবদার বলো?’ তিনি বললেন, আমার অনেক মুসলিম ভাইয়েরা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করছে, তারা কেউ কেউ গাজী হয়ে অসংখ্য সওয়াব নিয়ে বাড়িতে ফিরছে। আবার কেউ কেউ আল্লাহর রাস্তায় শহীদ হয়ে বিনা হিসাবে জান্নাতে চলে যাচ্ছে। কিন্তু আমি আজ অন্ধ বলে আমাকে এত বিশাল সওয়াবের কাজ থেকে বারবার ফিরিয়ে দেয়া হচ্ছে। কিন্তু আজ আমি নিয়ত করে এসেছি, এবারের যুদ্ধে আমি অংশগ্রহণ করব এবং আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করে শহীদ হয়ে বিনা হিসাবে জান্নাতে চলে যাবো। তখন হজরত উমর রা: তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘হে আবদুুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুব! তুমি কী করবে সেখানে গিয়ে?’ তখন এই অন্ধ সাহাবি দৃঢ় কণ্ঠে জবাব দিলেন, ‘আমি জানি আমি কোনো শত্রুর মোকাবেলা করতে পারব না। তবে ইসলামের পতাকাটি আমার হাতে দেবেন আমার জীবন চলে যাবে কিন্তু ইসলামের পবিত্র পতাকাটি আমি মাটিতে পড়তে দেবো না ইনশা আল্লাহ। যুদ্ধ শেষে দেখা গেল। অন্ধ সাহাবি হজরত আবদুুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুব রা: শহীদ হয়ে গেলেন। তার শরীরটি অসংখ্য তীরের আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে আছে। কিন্তু তার হাত থেকে ইসলামের পতাকাটি মাটিতে পড়েনি।
লেখক : খতিব মসজিদে বায়তুন নূর, মাওনা গাজীপুর
শহীদি মৃত্যু ও জান্নাত
জন্ম মানেই মৃত্যুর অপেক্ষা। অর্থাৎ জন্ম হয়েছে যার মৃত্যু তার অবধারিত। এটাই দুনিয়ার নিয়ম। ‘প্রত্যেক প্রাণীই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে’ (সূরা আলে ইমরান-১৮৫)। মুমিনের মৃত্যু...



