পাশ্চাত্য এখন আমাদের চর্চা, গবেষণা ও অনুশীলনের কতখানি জায়গা দখল করে নিয়েছে- সেটা দেখে অবাক না হয়ে পারা যায় না। তাদের শিক্ষা-সংস্কৃতি, রাজনীতি, অর্থনীতি, ইতিহাস, দর্শন- সব কিছুই আমাদের গবেষণার আওতাধীন হয়ে পড়েছে। শুধু ব্যক্তিগতভাবে নয়, প্রাতিষ্ঠানিকভাবে চর্চা হচ্ছে। আমাদের সিলেবাসে পশ্চিমা রাজনীতি, অর্থনীতি, ইতিহাস ও দর্শন অন্তর্ভুক্ত। ফলে প্রজন্ম গড়ে উঠছে পাশ্চাত্যের আদলে। রঙে-বর্ণে তারা বাঙালি হয়েও শিক্ষা-সংস্কৃতিতে হচ্ছে পশ্চিমা। মিডিয়া আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর ব্যাপকতার ঢেউয়ে ভেসে আসছে পশ্চিমা সংস্কৃতি। প্রজন্ম সেগুলো গ্রহণ করছে প্রচণ্ড আগ্রহে। অশ্রাব্য শব্দ, অশালীন পোশাক আর অনৈতিক কাজগুলোকে মনে করছে আধুনিকতা। জীবনের প্রতিটি অঙ্গনে পশ্চিমার অনুসরণ করে এখন তারা তৃপ্তি বোধ করে।
শিক্ষার্থীদের পড়ানো হচ্ছে পশ্চিমা উদ্ভাবিত অর্থনীতি। শেখানো হচ্ছে সুদ খাওয়ার যত কৌশল! দেয়া হচ্ছে ভোগবাদ আর বস্তুবাদের শিক্ষা। এভাবে আস্তে আস্তে গড়ে উঠছে গরিবের রক্ত শুষে নেয়া পুঁজিবাদী সমাজ। ক্ষণস্থায়ী এই দুনিয়াই যাদের কাছে সব। তাই দুনিয়া অর্জনে অঘোষিত এক যুদ্ধে নেমেছে তারা- নীতি-নৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে।
চলছে গণতন্ত্রের পাঠ- আদতে যা হলো স্বৈরতন্ত্র ও একনায়কতন্ত্রের প্রথম ধাপ। বইপত্রে গণতন্ত্রের নীতিমালা আর বাস্তবে স্বৈরতন্ত্রের নির্মম খেলা। যাদের বেড়ে উঠার কথা ছিল জনগণের ন্যায্য অধিকার আদায়ের স্লোগান মুখে নিয়ে- দেশের উন্নয়ন-উন্নতির শপথ বুকে ধারণ করে তারাই আজ নিচ্ছে অন্যায়-অবিচার আর ছিনতাই-লুটতরাজের সবক। ছাত্র রাজনীতি হাতে-কলমে শেখাচ্ছে চাঁদাবাজি আর দাদাগিরি।
পশ্চিমা দর্শন ও বিজ্ঞান হাতে তুলে দেয়া হচ্ছে ধর্মগ্রন্থের ন্যায় আস্থাভরে- সফলতার চাবিকাঠি হিসেবে। অথচ এই দর্শন ও বিজ্ঞান নিজ উৎস ও উদ্দেশ্যের দিক থেকে স্রষ্টার বিরুদ্ধে পরোক্ষ চ্যালেঞ্জ। ব্যক্তি আর যুক্তিই যেখানে সত্য-মিথ্যার মাপকাঠি। ঐশীবাণী ও প্রত্যাদেশ যেখানে অযৌক্তিক। এভাবে বপিত হচ্ছে সন্দেহ-সংশয়ের বীজ। কমে যাচ্ছে ধর্মগ্রন্থ ও ধর্মচর্চার সাথে শিক্ষার্থীদের হৃদ্যতা ও আন্তরিক সম্পর্ক। ফলে গজিয়ে উঠছে সংশয়বাদী দল-উপদল।
পশ্চিমার গুণগ্রাহী প্রাচ্যবিদদের হাতে রচিত ইতিহাস পড়ানো হচ্ছে মুসলমানদের সন্তানাদিকে। যার পাতায় পাতায় রয়েছে ইতিহাসবিকৃতি ও মুসলিমবিদ্বেষের বিষাক্ত বিষ। ঢুকিয়ে দেয়া হচ্ছে পরাজয় ও অধোমুখিতার মানসিকতা। যার অনিবার্য পরিণতিতে মুসলিম প্রজন্ম গড়ে উঠছে নিজেদের পূর্বসূরিদের প্রতি বিরূপ মনোভাব নিয়ে। তাদের মাঝে জাগ্রত হচ্ছে হীনম্মন্যতা- নিজেদের দ্বীন-ধর্ম ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে।
আরো বেশি চিন্তা উদ্রেককর বিষয় হলো- পশ্চিমাদের এই শিক্ষা-সংস্কৃৃতির বানে ভেসে যাচ্ছে ইসলামী শিক্ষা-সভ্যতা-সংস্কৃতি। আমরা টেরই পাচ্ছি না কীভাবে আমাদের প্রজন্ম থেকে ইসলামকে আড়াল করে রাখার অপচেষ্টা চলছে! আমাদের জাতীয় শিক্ষা-সিলেবাসে পর্যাপ্ত ইসলামী শিক্ষার অনুপস্থিতিই এর জ্বলন্ত প্রমাণ। পাঠ্যপুস্তকে ধর্মবিষয়ক যে গ্রন্থটি রয়েছে সেটা একেবারেই গতানুগতিক- যেখানে ইসলামকে কেবল ব্যক্তিগত পালনীয় ইবাদতসর্বস্ব করে তুলে ধরা হয়েছে। ইসলামী অর্থনীতির আলোচনা মাধ্যমিক শিক্ষায় অনুপস্থিত। উচ্চ মাধ্যমিকে যতটুকু আছে- তা কেবলই নাম ও প্রাথমিক পরিচিতিমাত্র, নেই পর্যাপ্ত আলোচনা-গবেষণা। ইসলামী রাজনীতির তো নাম-গন্ধই নেই সিলেবাসে- না মাধ্যমিকে, না উচ্চ পর্যায়ে। ইসলামী দর্শন রয়েছে উচ্চ মাধ্যমিকে- কিন্তু জ্ঞানদৈন্যতা ও গবেষণার অগভীরতার দরুন তা পরিপূর্ণ ইসলামের প্রতিনিধিত্ব করে না। ইসলামী ইতিহাসের অবস্থাও আশানুরূপ নয়- বিকৃতি আর মিথ্যায় ভরপুর। এর ফল যা হওয়ার তাই হচ্ছে! ভবিষ্যত প্রজন্ম ইসলামী শিক্ষা থেকে দূরে সরে যাওয়ার কারণে নিজেদের মাঝে ইসলামী সংস্কৃতি ধারণ করতে সক্ষম হচ্ছে না।
মুসলিম উম্মাহ এখন পতনকাল অতিক্রম করছে। অস্ত্রের যুদ্ধ ও বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রাসনের শিকার হয়ে মুসলমানরা আজ কোণঠাসা প্রায়। প্রতিপক্ষের চতুর্মুখী আক্রমণে তারা দিশেহারা। একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠী হওয়া সত্ত্বেও সঙ্কটকালে তারা একে অপরের পাশে দাঁড়াতে পারছে না। সক্ষম হচ্ছে না সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে। এরই মাঝে মুসলিম শাসকদের এমন একটি শ্রেণী আত্মপ্রকাশ করেছে, যারা ইসলামের তুলনায় আপন গদি রক্ষায় অধিক তৎপর। নিজের শাসনক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে তারা সবকিছু বিসর্জন দিতে প্রস্তুত- এমনকি নিজের ধর্মবিশ্বাস ও আত্মমর্যাদাবোধকেও। উম্মাহর এই ক্রান্তিলগ্নে প্রয়োজন সমাধানের পথ খুঁজে তা আঁকড়ে ধরা। কিন্তু আমাদের সবচেয়ে বড় ও মারাত্মক ভুল এখানেই। আমরা সমাধানের পথ খুঁজে ফিরছি পাশ্চাত্যের অনুসরণের মাঝে। পাশ্চাত্য সভ্যতার বাহ্যিক জৌলুস ও দৃশ্যত উন্নতি-অগ্রগতি দেখে আজ আমরা এর পেছনে ছুটে চলছি অন্ধের মতো। অথচ বাস্তবতা হলো- পাশ্চাত্য সভ্যতার বাইরে ফিটফাট হলেও ভেতরে ঠিকই সদরঘাট। পাশ্চাত্য সংস্কৃতির পুরোটাই অন্তঃসারশূন্য, নীতি-নৈতিকতার বালাই নেই সেখানে। তাই অন্তঃসারশূন্য এই সংস্কৃতি-সভ্যতা কখনোই মুসলমানদের প্রকৃত সমাধান দিতে সক্ষম নয়। তাই এই সভ্যতার দারস্থ হওয়াটাই মুসলমানদের প্রথম ভ্রান্তি।
আমরা ভুলে গেছি- আজ যেভাবে আমরা পরাজিত, সূচনালগ্নে ইসলামও ছিল অপরিচিত ও বাহ্যত পরাজিত। হাদিসে এসেছে, হজরত আবু হুরায়রা রা: থেকে বর্ণিত- রাসূলুল্লøাহ সা: ইরশাদ করেছেন, ‘ইসলাম শুরুতে অপরিচিত ছিল, অচিরেই তা আবার শুরুর মতো অপরিচিত হয়ে যাবে। সুতরাং এরূপ অপরিচিত অবস্থায়ও যারা ইসলামের ওপর টিকে থাকবে তাদের জন্য মুবারাকবাদ।’ (মুসলিম-২৭০) আরবের ভূমিতে যখন ইসলাম আত্মপ্রকাশ করে তখন ইসলামের কোনো সহযোগী ও আশ্রয়দাতা ছিল না। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী, আল্লøাহর রাসূল সা:-এর প্রাণান্তকর মেহনত আর সাহাবায়ে কেরাম রা:-এর নজিরবিহীন ত্যাগ ও কোরবানির বিনিময়ে মাত্র দুই যুগেরও কম সময়ে অর্ধজাহানে ইসলাম প্রতিষ্ঠা লাভ করে। ইসলামের বিজয়-কেতন সগৌরবে উড়তে থাকে এসব ভূখণ্ডে। সুতরাং এ যুগেও মুসলমানদের বিজয় ও উন্নতি-অগ্রগতির পথ সেটাই যা ইসলাম বলেছে এবং সাহাবায়ে কেরাম রা: যার বাস্তব প্রতিফলন দেখিয়ে গেছেন। আজো যদি আমরা ইসলামকে পরিপূর্ণরূপে বরণ ও ধারণ করতে পারি তাহলে আমরাও উন্নতি ও অগ্রগতির শীর্ষচূড়ায় পা রাখতে সক্ষম হবো। আল্লøাহ তায়ালা বলেন, ‘তোমরা হীনবল হয়ো না এবং দুঃখও করো না। বিজয়ী তোমরাই হবে- যদি প্রকৃত মুমিন হয়ে থাকো।’ (সূরা আলে-ইমরান-১৩৯) ইসলামের এই ঘোষণা সর্বযুগে সবার জন্য। তাই আমাদের কর্তব্য হলো, পরিপূর্ণ ঈমানদার হওয়া এবং প্রজন্মকে ঈমানের বলে বলীয়ান করে তোলা। ইসলামী শিক্ষার ব্যাপক প্রচার-প্রসার ঘটিয়ে প্রজন্মকে কুরআনের বিধিনিষেধ মেনে চলতে এবং ইসলামী সংস্কৃতি নিজেদের মাঝে ধারণ করতে অভ্যস্ত করে তোলা। আল্লøাহ তায়ালা আমাদের তাওফিক দান করুন।
প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক
উম্মাহর বিজয় কোন পথে
পাশ্চাত্য এখন আমাদের চর্চা, গবেষণা ও অনুশীলনের কতখানি জায়গা দখল করে নিয়েছে- সেটা দেখে অবাক না হয়ে পারা যায় না। তাদের শিক্ষা-সংস্কৃতি, রাজনীতি, অর্থনীতি, ইতিহাস,...



