মানুষ সব সময় দলবদ্ধ চলতে ভালোবাসে। আর মানুষের সামাজিক ও পারিবারিক জীবনে চলার ক্ষেত্রে হরেক প্রকার দ্রব্যের আদান প্রদানের প্রয়োজন হয় ক্রমান্বয়ে অত্যধিক। তা না হলে জীবন চলার পথে থমকে যাবে মানুষ। সেজন্য কুরআন, সুন্নাহ ও ফিকহের ভাষ্যমতে সামাজিক জীবনে পারস্পরিক লেনদেন করার গুরুত্ব অপরিসীম।
মনে করেন আপনি গম উৎপাদন করলেন আবার পাশের ঘরের ব্যক্তিটি ধান চাষ করল। এখন দু’জন একই বস্তুর ওপর নির্ভরশীল নয়। উভয় ব্যক্তির দিনাতিপাত করার জন্য কেউ বাজারে গম নিয়ে উপস্থিত আবার কেউ ধান নিয়ে উপস্থিত। একজন ধান বিক্রি করে গম কিনবেন আর অপরজন ধান বিক্রি করে গম। তেমনিভাবে প্রাত্যহিক জীবনে হরেক প্রকার দ্রব্য ক্রয় বিক্রি করে জীবনকে টিকিয়ে রাখার জন্য ব্যক্তি ও সমাজ বিভিন্ন বস্তুর ওপর দ্বারস্থ হতেই হয়। তা না হলে সামাজিক জীবনে আমরা সঙ্কটাপন্ন হয়ে যাব। আর এসব লেনদেন করতে হবে কুরআন ও হাদিসের নীতিমালা অনুসরণ ও অনুকরণ করে। যেমন এরশাদ হয়েছে। ‘আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল এবং সুদকে হারাম করেছেন।’ (সূরা বাকারা : ২৭৫)
আল্লাহ তায়ালা ব্যবসাকে হালাল করেছেন ঠিকই এখন যদি আপনি পণ্য বিক্রি করার সময় মিথ্যে কথা বলেন তাহলে কী এ ব্যবসা আপনার জন্য আদৌ হালাল হবে? হবে না। আবার পরকালে মাফ মুক্তির উসিলাও হবে না। যারা সত্য বলে পণ্য বিক্রি করে তাদের সম্পর্কে হাদিসে বলা হয়েছে যে, সত্যবাদী ও আমানতদার (বিশ্বস্ত) ব্যবসায়ী, (আখিরাতে) নবী, সিদ্দিক এবং শহীদগণের সাথে অবস্থান করবে।’(জামে তিরমিজি : ৩/৫১৫ (১২০৯), সহিহ তারগিব-সহিহ লি গাইরিহ ১৭৮২)
সুবহানাল্লাহ! একজন সৎ ও বিশ্বস্ত ব্যবসায়ীর জন্য এর চেয়ে বড় মর্যাদার বিষয় আর কী হতে পারে!
রাসূল সা: বলেছেন, ‘নিশ্চয় সত্যবাদীরা পুণ্যের পথ দেখায়। আর পুণ্য জান্নাতের দিকে পথ নির্দেশনা করে। আর মানুষ সত্য কথা বলতে থাকে। শেষ পর্যন্ত আল্লাহর নিকট তাকে ‘মহাসত্যবাদী’রূপে লিপিবদ্ধ করা হয়। আর নিঃসন্দেহে মিথ্যাবাদিতা নির্লজ্জতা ও পাপাচারের দিকে নিয়ে যায়। আর পাপাচার জাহান্নামের দিকে নিয়ে যায়। আর মানুষ মিথ্যা বলতে থাকে, শেষ পর্যন্ত আল্লাহর নিকট তাকে ‘মহামিথ্যাবাদীরূপে’ লিপিবদ্ধ করা হয়। (বুখারি ও মুসলিম)
মিথ্যা কসম খেয়ে মাল বিক্রয় করা মহাপাপ। মহানবী সা: বলেছেন, ‘তিন ব্যক্তির সাথে আল্লাহ কিয়ামতের দিন কথা বলবেন না, তাদের দিকে (দয়ার দৃষ্টিতে) তাকাবেন না, তাদেরকে পবিত্র করবেন না এবং তাদের জন্য থাকবে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।’ বর্ণনাকারী বলেন, ‘রাসূল সা: উক্ত বাক্যগুলো তিনবার বললেন।’ আবু জার বললেন, ‘তারা ব্যর্থ ও ক্ষতিগ্রস্ত হোক! তারা কারা? হে আল্লাহর রাসূল!’ তিনি বললেন, ‘(লুঙ্গি কাপড়) পায়ের গিঁটের নিচে যে ঝুলিয়ে পরে, দান করে যে লোকের কাছে দানের কথা বলে বেড়ায় এবং মিথ্যা কসম খেয়ে যে পণ্য বিক্রি করে।’ (মুসলিম)
তিনি বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো মুসলমান ব্যক্তির মাল না হক আত্মসাৎ করার জন্য মিথ্যা কসম খাবে, সে আল্লাহর সাথে এমন অবস্থায় সাক্ষাৎ করবে, যখন তিনি তার ওপর ক্রোধান্বিত থাকবেন। অতঃপর এর সমর্থনে আল্লাহ তায়ালার কিতাব থেকে রাসূল সা: এই আয়াত পড়ে শুনালেন-‘যারা আল্লাহর প্রতিশ্রুতি ও নিজের শপথ স্বল্পমূল্যে বিক্রয় করে, পরকালে তাদের কোনো অংশ নেই। কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাদের সাথে কথা বলবেন না, তাদের দিকে (দয়ার দৃষ্টিতে) চেয়ে দেখবেন না, তাদেরকে পরিশুদ্ধ করবেন না এবং তাদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি।’ (আলে ইমরান ৭৭ আয়াত)
তিনি আরো বলেন, ‘ক্রেতা বিক্রেতা উভয়ে পৃথক না হওয়া পর্যন্ত (ক্রয় বিক্রয়ে তাদের) এখতিয়ার থাকে। সুতরাং তারা যদি (ক্রয় বিক্রয়ে) সত্য বলে এবং (পণ্য দ্রব্যের দোষ গুণ) খুলে বলে, তাহলে তাদের ক্রয় বিক্রয়ে বরকত দেয়া হয়। অন্যথা যদি (পণ্যদ্রব্যের দোষগুণ) গোপন করে এবং মিথ্যা বলে তাহলে, বাহ্যত তারা লাভ করলেও তাদের ক্রয় বিক্রয়ের বরকত বিনাশ করে দেয়া হয়।
সুতরাং মিথ্যা বলে বা মিথ্যা কসম খেয়ে ধোঁকা দিয়ে পণ্য বিক্রয় করা অসৎ উপায়ে অন্যের মাল হরণ করার শামিল। আর আল্লাহ বলেছেন- ‘হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা একে অন্যের সম্পত্তি অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না। তবে তোমাদের পরস্পরের সম্মতিক্রমে ব্যবসার মাধ্যমে গ্রহণ করলে তা বৈধ। (সূরা নিসা : ২৯)
যারা লোক ঠকাই এবং নিজের বেলায় পুরোপুরি মেপে নেয় আর অন্যকে দেয়ার সময় কমিয়ে দেয় তাদেরকে উদ্দেশ্য করে এরশাদ হয়েছে- ‘দুর্ভোগ তাদের জন্য যারা মাপে কম দেয়, যারা মানুষের নিকট থেকে যখন মেপে নেয়, পূর্ণমাত্রায় নেয়। আর যখন অন্যকে মেপে বা ওজন করে দেয় তখন কমিয়ে দেয়।’ (সূরা আত মুত্বাফ্ফিফীন-১-৩)
আল্লাহ তায়ালা আমাদের ব্যবসায়ের হক আদায় করে ব্যবসা করার তাওফিক দান করেন। আমিন।
-শিক্ষক, কলামিস্ট, প্রাবন্ধিক



