আল্লাহ সুবহানাহু ওয়ালা সূরা ইয়াসিনের শুরুতে শপথ করে বলেছেন, ‘বিজ্ঞানময় কুরআনের শপথ।' আল কুরআনে বৈজ্ঞানিক অনেক গূঢ় তথ্য আছে বলে আল্লাহ তায়ালা কুরআনের নাম ‘হাকিম’ রেখেছেন। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে সব কিছুর বর্ণনা দিয়েছেন। এ জন্য আল্লাহ ইরশাদ করেছেন, ‘আমি এই কিতাবে কোনো কিছুই বাদ দেইনি।'
মহাগ্রন্থ আল কুরআনে আল্লাহ তায়ালা অনেক বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব বর্ণনা করেছেন। যেমন আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন, ‘যারা কুফরি করে তারা কী ভেবে দেখে না যে, আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী মিশে ছিল ওতপ্রোতভাবে; অতঃপর আমি উভয়কে পৃথক করে দিলাম এবং প্রাণবান সব কিছু সৃষ্টি করলাম পানি থেকে; তবু কি তারা বিশ্বাস স্থাপন করবে না?’ (সূরা আম্বিয়া-৩০)
বর্তমানকালের আধুনিক বিজ্ঞান অতি সাম্প্রতিককালে যে তত্ত্বকে ‘বিগব্যাং তত্ত্ব’ বলে আবিষ্কার করেছে সেই তথ্য মহান আল্লাহ তায়ালা চৌদ্দ শত বছর আগে পবিত্র কুরআনে বর্ণনা করে দিয়েছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী একসাথে ওতপ্রোতভাবে মিশে ছিল আর এরপর আল্লাহ তা পৃথক করে দিয়েছেন। আধুনিক বিজ্ঞান দাবি করে পৃথিবী, চন্দ্র, সূর্য, গ্রহ, নক্ষত্র সব কিছু একসাথে জমাট বেঁধে ছিল এরপর প্রচণ্ড একটি বিস্ফোরণ হয় আর এই বিস্ফোরণের ফলে পৃথিবী এবং অন্যান্য গ্রহের সৃষ্টি হয়। বস্তুত তারা যদি কুরআনকে গবেষণা করত তাহলে আরো অনেক আগেই এই ‘বিগব্যাং তত্ত্ব’ তারা আবিষ্কার করতে পারত। কুরআনের বর্ণিত আল্লাহর এই সৃষ্টিতত্ত্ব সর্বকালের সব মানুষের জন্য একটি অনন্য উপমা।
আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন, ‘তোমার রব মৌমাছির অন্তরে ইঙ্গিত দ্বারা নির্দেশ দিয়েছেন তুমি গৃহ নির্মাণ করো পাহাড়, বৃক্ষ এবং মানুষ যে গৃহ নির্মাণ করে তাতে। এরপর প্রত্যেক ফল থেকে কিছু কিছু আহার করো, অতঃপর তোমার রবের সহজ পথ অনুসরণ করো। ওর উদর থেকে নির্গত হয় বিবিধ বর্ণের পানীয়, যাতে মানুষের জন্য রয়েছে রোগের প্রতিষেধক। অবশ্যই এতে রয়েছে নিদর্শন চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য।’ (সূরা আন নাহল : ৬৮-৬৯)
মৌমাছির আচরণ ও যোগাযোগের ওপর গবেষণার জন্য ১৯৭৩ সালে নোবেল পান ভন-ফ্রিচ। কোনো নতুন বাগান বা ফুলের সন্ধান পাওয়ার পর একটি মৌমাছি আবার মৌচাকে ফিরে যায় এবং মৌমাছি নৃত্য নামক আচরণের মাধ্যমে তার সহকর্মী মৌমাছিদের সেখানে যাওয়ার সঠিক গতিপথ ও মানচিত্র বলে দেয়। অন্যান্য শ্রমিক মৌমাছিকে তথ্য দেয়ার লক্ষ্যে এ ধরনের আচরণ আলোকচিত্র ও অন্যান্য পদ্ধতির সাহায্যে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে। আগে মানুষ ভাবত কর্মী মৌমাছিরা পুরুষ এবং ঘরে ফিরে এসে তাদেরকে একটি রাজা মৌমাছির কাছে জবাবদিহি করতে হয়। কিন্তু এটা সত্য নয়, কারণ আল্লাহ তায়ালা কুরআনে স্ত্রীবাচক শব্দ ব্যবহার করেছেন যা প্রমাণ করে শ্রমিক মৌমাছিরা স্ত্রী এবং তারা রাজা নয় বরং রাণী মৌমাছির কাছে জবাবদিহি করে। মৌমাছিদের বোধশক্তি ও তীক্ষ্ম বুদ্ধি তাদের শাসনব্যবস্থার মাধ্যমে সুন্দররূপে অনুমান করা যায়। এ দুর্বল প্রাণীর জীবন ব্যবস্থা মানুষের রাজনীতি ও শাসননীতির সাথে চমৎকার মিল রয়েছে। সমগ্র আইনশৃঙ্খলা একটি বড় মৌমাছির হাতে থাকে এবং সেই হয় মৌমাছির শাসক। আল্লাহ তায়ালা এসব বর্ণনা করার পর বলছেন, ‘এগুলোর মধ্যে নিদর্শন রয়েছে চিন্তাশীল ব্যক্তিদের জন্য। সুতরাং মানুষ যদি এ ছোট্ট প্রাণীকে নিয়ে চিন্তা করে তাহলে অনেক শিক্ষা অর্জন করতে পারবে।’ (তাফসিরে ফাতহুল মাজিদ)
বিজ্ঞানী ভন-ফ্রিচ মৌমাছি নিয়ে যে গবেষণা করে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন সে বিষয়ে মহান আল্লাহ তায়ালা চৌদ্দ শত বছর আগে আল কুরআনে বলে দিয়েছেন। কুরআনের এসব বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব বড় বড় বিজ্ঞানীদেরকেও অবাক করে। আল্লাহ তায়ালা আরো ইরশাদ করেছেন, ‘সূর্যের পক্ষে সম্ভব নয় চাঁদের নাগাল পাওয়া এরং রাতের পক্ষে সম্ভব নয় দিনকে অতিক্রম করা এবং প্রত্যেকে নিজ নিজ কক্ষপথে সাঁতার কাটে।’ (সূরা ইয়াসিন-৪০)
সূরা ইয়াসিনের এ আয়াতে আল্লাহ তায়ালা আরেকটি বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব বর্ণনা করেছেন। তা হলোÑ চাঁদ, সূর্য নিজ নিজ কক্ষপথে আবর্তন করে। এমনকি প্রতিটি গ্রহেরই একটি নির্দিষ্ট কক্ষপথ রয়েছে আর তারা সেই কক্ষপথেই আবর্তিত হয়। সুতরাং মহান আল্লাহ তায়ালা বলে দিলেন যে, তিনিই এই ব্যবস্থা প্রবর্তন করেছেন এবং তার নির্দেশেই সৌরজগতের সব কিছু পরিচালিত হয়। যে তত্ত্ব বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছে অল্প কিছুকাল আগে। অথচ এই তত্ত্ব মহান আল্লাহ তায়ালা অনেক আগেই বলে দিয়েছেন।
অতএব, একজন মুমিন মুসলমান কিংবা একজন বিজ্ঞানী যখন রবের দেয়া এই কালাম গভীর মনোযোগ দিয়ে পড়বে তখন রবের প্রতি কৃতজ্ঞতায় তার মাথা রবের সামনে সেজদায় নত করে দেবে।
ছড়াকার ও প্রাবন্ধিক