মানুষের মধ্যে যত গুণাবলী আছে, বিনয় তার মধ্যে অন্যতম। বিনয়ী মানুষকে সবাই ভালোবাসে। বিনয়ের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ব্যাপার হলো মানুষ বিনয়কে দুর্বলতা ভাবলেও একটা সময় তারাই বিনয়ী মানুষটার প্রতি দুর্বল হয়ে যায়। আমরা সবাই সম্মানিত হতে চাই, কিন্তু বিনয়ী হই না! আমরা সম্মান খুঁজে বেড়াই নিজের বড়ত্ব প্রকাশ করার মধ্যে! অথচ দেখুন, আমাদের প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কী বলেছেন, ‘যে বান্দা আল্লাহর জন্য বিনীত হয়, আল্লাহ তার মর্যাদা বৃদ্ধি করে দেন।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৫৮৮)

বাস্তব জীবনেও আপনি নম্রতা, বিনয় দিয়ে যা অর্জন করতে পারবেন, কঠোরতা ও অহমিকা দিয়ে তা অর্জন করতে পারবেন না। তাইতো আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা কোমল, তিনি কোমলতাকে ভালবাসেন। আর তিনি কোমলতার প্রতি যত অনুগ্রহ করেন, কঠোরতা বা অন্য কোনো আচরণের প্রতি ততটা অনুগ্রহ করেন না।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৫৯৩)

আমাদের অবস্থান একটু মজবুত হলে আমরা তো আমাদের অধীনস্থদের ক্ষেত্রেও যে নম্র, ও বিনয়ী আচরণ করতে হয় তা ভুলেই যাই। আমরা হয়ে যাই অহংকারী। আমরা অনেকেই আমাদের নিম্নশ্রেণী ও দরিদ্র মানুষের সাথে দাম্ভিকতা প্রদর্শন করি। অনেকে এদের সাথে কথাবার্তা, মুসাফাহা, একসাথে বসা- সব বিষয়-ই এড়িয়ে চলেন। অথচ আমাদের প্রিয় নবীর আদর্শ দেখুন। এক হাদিসে হজরত আনাস রা: বলেন, ‘যখন কোনো ব্যক্তি হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে মুলাকাত করে মুসাফাহা করতো, তখন তিনি ততক্ষণ পর্যন্ত নিজের হাত সরিয়ে নিতেন না যতক্ষণ পর্যন্ত সে নিজের হাত সরিয়ে না নিত। তিনি নিজের মুখমণ্ডল ততক্ষণ পর্যন্ত অন্য দিকে ঘুরাতেন না যতক্ষণ পর্যন্ত সাক্ষাতকারী ব্যক্তি নিজের মুখ ঘুরিয়ে না নিত। যখন তিনি মজলিসের মধ্যে বসা থাকতেন তখন তাঁর হাঁটু অন্যদের সম্মুখে অগ্রসর হতো না। অর্থাৎ, বিশেষ অবস্থান নিয়ে বসতেন না।’

নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিজয়ী বেশে মক্কায় প্রবেশ করেছেন। মক্কার পথে পথে, অলিতে-গলিতে হাঁটছেন। এসব পথে তার প্রতি হয়েছে কত নির্যাতন-নিপীড়ন, শুনতে হয়েছে কত কটূক্তি, সইতে হয়েছে কত উৎপীড়ন। কত বার তিনি শুনেছেন, হে পাগলা, হে যাদুকর, হে জ্যোতিষী, হে মিথ্যাবাদী! আরো কত কী! আজ তিনি সেই মক্কায় প্রবেশ করেছেন একজন প্রতাপশালী, কর্তৃত্বধারী নেতা হিসেবে।আল্লাহর ইচ্ছায় আজ তিনি বিজয়ী; আর মক্কাবাসী তারই সামনে পরাস্ত। বিজয়ী বেশে মক্কায় প্রবেশের সময় কেমন ছিলো নবীজীর অনুভূতি? হজরত আবদুল্লাহ বিন আবি বকর রা: বলেন, 'যী-তুওয়া নামক স্থানে পৌঁছে রাসূল সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিনম্র হয়ে নিজ বাহনের ওপর থেমে গেলেন। নবীজী তখন একটি লাই চাদরে আবৃত ছিলেন। মক্কা বিজয়ের মাধ্যমে আল্লাহ তাকে যে মর্যাদা ও সম্মান দান করেছেন। তা অনুভব করে নবীজী বিনম্রচিত্তে মাথা নত করে ফেললেন। অধিক নত হওয়ায় নবীজীর দাড়ি উটের পিঠ স্পর্শ করার উপক্রম হয়েছিলো।

হযরত আনাস রা: বলেন, ‘মক্কাবিজয়ের দিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন মক্কায় প্রবেশ করেন, তার থুতনী নিচু হয়ে বাহনের পিঠের সঙ্গে লেগে ছিলো। হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদ রা: বলেন, এক ব্যক্তি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয় সাল্লামের দরবারে উপস্থিত হয়ে কোনো বিষয়ে কথা বলছিলো। ভয়ে তাকে কাঁপতে দেখে নবীজী বললেন, ‘শান্ত হও। আরে! আমি তো শুকনো গোশত আহারকারিণী এক কোৱাইশ মহিলার অতিসাধারণ এক সন্তান!’ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলতেন, ‘আমি বসি ক্রীতদাসের মতো, আহার করি ক্রীতদাসদের মতো।’ সুবহানাল্লাহ! কী অনুপম আদর্শ রেখে গেছেন আমাদের জন্য! ওয়াল্লাহি তাঁর এই আদর্শ যদি আমরা অবলম্বন করতে পারি, তাহলে এই মাটির পৃথিবীতে তো আমরা সম্মানিত হবোই, ওপারেও সম্মানিত হওয়ার আশা রাখতে পারি। কেননা, রাসুল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘আমি কি তোমাদেরকে জানাব না যে, কারা জাহান্নামের জন্য হারাম বা কার জন্য জাহান্নাম হারাম করা হয়েছে? জাহান্নাম হারাম আল্লাহর নৈকট্য লাভকারী প্রত্যেক বিনয়ী ও নম্র লোকের জন্য।’ (তিরমিযী, হাদিস : ২৪৮৮)

বিনয় ও নম্রতার উপকারিতা সম্পর্কে অন্য বর্ণনায় এসেছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘যাকে নম্রতার কিছু অংশ প্রদান করা হয়েছে, তাকে দুনিয়া ও আখেরাতের বিরাট কল্যাণের অংশ প্রদান করা হয়েছে। আর যাকে সেই নম্রতা থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে, তাকে দুনিয়া ও আখেরাতের বিরাট কল্যাণ হ’তে বঞ্চিত করা হয়েছে।’ (তিরমিযী, হাদিস : ২০১৩) এতো মহা পুরস্কার রয়েছে বিনয়ীদের জন্য, তবুও কি আমরা বিনয়ী হবো না! নম্র হবো না! বিনয়ী ব্যাক্তিকে শুধু মানুষেরা পছন্দ করেন না বরং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ'লাও বিনয়ীদের পছন্দ করেন! আর বিনয়ীদের জন্য রয়েছে কল্যাণ। তাইতো রাসুল সা: আরো বলেন, ‘নিঃসন্দেহে আল্লাহ দয়াশীল; তিনি দয়া ও নম্রতাকে পছন্দ করেন। নম্রতা ও বিনয়ের কারণে আল্লাহ যা দান করেন, কঠোরতা অবলম্বনকারীদের তা দান করেন না।’ (সুনানে আবি দাউদ : ৪৮০৭)

অন্য বর্ণনায় এসেছে, রাসূল সা: বলেন, ‘যাকে নম্রতা ও বিনয়ের গুণে গুণান্বিত করা হয়েছে, কল্যাণ তার জন্য। আর যার মধ্যে নম্রতা নেই, সে কল্যাণ থেকে বঞ্চিত। (তিরমিজি : ২১৪৫)। আমরা সবাইতো কল্যাণ প্রত্যাশী, তবুও কেন নম্রতা ও বিনয়ের গুণ অর্জন করছি না। জীবনে তো আত্মঅহমিকা কম করিনি, এই বড়ত্ব প্রদর্শন করে কী পেয়েছি, ঘৃণা, পরিত্যাজ্য ব্যতীত। বুকে হাত দিয়ে বলুন তো, এই অহংকার কি আপনার হৃদয়ে কখনো প্রশান্তি এনে দিয়েছে! তাহলে কেন নিজেকে এতো বড় করে উপস্থাপন করতে আমরা মরিয়া! কি লাভ অন্যকে ধোঁকা দিয়ে। ওয়াল্লাহি এই অহংকার কখনো আপনাকে শান্তিতে রাখতে পারবে না।আর অহংকারের ভয়াবহতা সম্পর্কে তো আমাদের কম বেশি সবারই জানা আছে।

আর আমরা অহংকার করি কি নিয়ে! সাধারণত ধন-সম্পদ, বাড়ি-গাড়ি, পদ-মর্যাদা, এগুলো নিয়েই তো। আর এগুলো তো আল্লাহরই দান, আমাদের ওপর আল্লাহর করুণা, অন্যের দয়ায়প্রাপ্ত সম্পদ নিয়ে গর্ব করা কী আদৌ কোন বুদ্ধিমানের কাজ হতে পারে? হজরত আলী রা: কতো সুন্দর বলেছেন, যার শুরু (জন্ম) এক ফোঁটা নাপাক পানি দিয়ে, আর শেষ মৃতিকায়, তার আবার অহংকার কিসের! আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতায়ালা আমাদের অহংকার থেকে বাঁচার তাওফিক দান করুন এবং নববী আদর্শ বিনয় অর্জন করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

লেখক : শিক্ষার্থী, জামিয়া ইসলামিয়া দারুল উলূম ঢাকা।