সন্তান সন্ততি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার পক্ষ থেকে যেমন নিয়ামত তেমনি পিতা-মাতার জন্য এক কঠিন পরীক্ষা ও দায়িত্বস্বরূপ। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই তোমাদের ধনসম্পদ ও সন্তান-সন্ততি (তোমাদের জন্য) পরীক্ষাস্বরূপ, আর আল্লাহরই নিকট রয়েছে এর মহাপ্রতিদান।’ (সূরা তাগাবুন, আয়াত-১৫)
লক্ষণীয়, অনেক মা-বাবারা তাদের সন্তানদের রোজা রাখার ব্যাপারে তথা এই ফরজ বিধানের অনুশীলনে খুব উদাসীন। আমরা জানি, প্রাপ্তবয়ষ্ক ছেলেমেয়ের ওপর রোজা ফরজ। তাছাড়া একটা মেয়ের যখন মাসিক শুরু হয় তখন থেকেই সে প্রাপ্তবয়স্ক। কিন্তু বালেগ হওয়ার পরও- আমার সন্তান দুর্বল, ঠিকমতো খায় না, প্রাইভেট আছে, পড়ার অনেক চাপ, পরীক্ষা ইত্যাদি অভিযোগে সন্তানকে এই ফরজ বিধান থেকে দূরে রাখা হয়। তাই এমন মা-বাবাদের উদ্দেশে আল্লাহ তায়ালা বলেন- ‘হে মুমিনগণ! তোমাদের ধনসম্পদ ও সন্তান সন্ততি যেন তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণ হতে উদাসীন করে না দেয়। যারা এমন করবে তারাই তো ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে।’ (সূরা মুনাফিকুন-০৯)
দ্বিতীয়ত, আমরা সবাই জানি রমজান কুরআনের মাস। এ মাসে কুরআন নাজিল হয়েছে এবং এ মাসের কদরের রাতের ইবাদত হাজার মাসের ইবাদতের সমান। সুতরাং, মর্যাদাপূর্ণ এই মাসে মা-বাবাদের উচিত সন্তানদের কুরআন পড়তে উদ্বুদ্ধ করা। সন্তান যদি ছোট হয় তাহলে তাদের সামনে কুরআন জোরে জোরে পড়া- যাতে আয়াতের ধ্বনি তারা শুনতে পায়। কুরআনের মর্যাদা ও গুরুত্ব বুঝে। তাছাড়া সম্ভব হলে তাদেরকে নিয়ে ছোট ছোট সূরা অর্থসহ মুখস্থ করা যেতে পারে। আর এই দায়িত্ব শুধু মা নয়, সময় বের করে বাবারাও করতে পারেন।
তৃতীয়ত, এই রমজান মাস আমাদের সময়ানুবর্তিতার শিক্ষা দেয়। দৈনন্দিন যেমন পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের নির্দিষ্ট সময় রয়েছে, তেমনি রোজা রাখা ও ভঙ্গের তথা সাহরি ও ইফতারের রয়েছে নির্দিষ্ট সময়- যার উলটপালট করার ক্ষমতা কারো নেই। এটা আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত। এটা আমাদের সময়ের গুরুত্ব দিতে শেখায়। লাইফ স্টাইল ঠিক করতে শেখায়। আর এই শিক্ষাটা সন্তানদের মধ্যে দিতে হবে। তারা যাতে সময়ের কাজ সময়ে করে। গোছানো জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয় এবং অলসতা ঝেড়ে কর্মঠ হয়।
চতুর্থত, রমজানে আমরা গরিব দুঃখীদের দান করার পাশাপাশি আত্মীয়দের মধ্যে ইফতারও বিনিময় করি। তাই, একে অপরের বাসায় ইফতার দেয়াটা বাচ্চাদের মাধ্যমে প্রদান করুন- যাতে তারা আত্মীয়ের প্রতি ভালোবাসা, সম্পর্ক রক্ষা করা এসবের গুরুত্ব বুঝে। আমরা চাইলেই আত্মীয়দের হক থেকে তাদের বঞ্চিত করতে পারি না অথবা সম্পর্ক নষ্ট করতে পারি না। কারণ আল্লাহর নির্দেশ। ‘আত্মীয়স্বজনকে তার হক আদায় করে দেবে’। (সূরা বনি ইসরাইল, আয়াত-২৬) তাছাড়া আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন, ‘এবং তোমরা ওই আল্লাহকে ভয় করো, যার ওসিলা নিয়ে তোমরা একে অপরের কাছে চাও; আর তোমরা আত্মীয়তার সম্পর্ককেও ভয় করো। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের উপর রক্ষণাবেক্ষণকারী।’ (সূরা নিসা,আয়াত-১) অথচ, আমাদের সন্তানরা মোবাইল হাতে দিন দিন অসামাজিক হয়ে যাচ্ছে- যা নিয়ন্ত্রণে আনার এখনই সময়। আর এটা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে প্রচুর পরিমাণে সন্তানদের সাথে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে, বিভিন্ন ব্যবহারিক কর্মসূচির মাধ্যমে, তাদের অন্তরের বন্ধু হওয়ার মাধ্যমে।
পঞ্চমত, রমজান মাস আমাদের ধৈর্যের শিক্ষা দেয়। আল্লাহর নির্দেশেই নির্দিষ্ট সময়ে আমরা রোজা রাখি আর নির্দিষ্ট সময় না হলে আমরা অকারণে রোজা ভাঙতে পারি না, লুকিয়ে খেতে পারি না, সবর করতে হয়। কারণ আল্লøাহ সব দেখছেন। সুতরাং, যেখানে চাইলেই হবে না, সেখানে সন্তানরা চাওয়া মাত্রই তাদের কাক্সিক্ষত জিনিস এনে দিতে হবে, না হলে ওরা জিদ করবে, হুমকি দেবে- এমন যাতে না হয়। তাদের বুঝ হওয়ার সাথে সাথেই পরমসহিষ্ণুতার শিক্ষা দিতে হবে। পরিস্থিতি বুঝিয়ে তাদেরকে নিয়ন্ত্রণে এনে বাস্তবতার শিক্ষা দিতে হবে। একবার তারা সবরের শিক্ষা পেলে আশা করা যায় ধৈর্যশীল হবে আর বিগড়ে যাবে না। তাছাড়া রবের উদ্দেশে ধৈর্যশীলতার কি মর্যাদা তা তো আমরা জানিই। ‘নিশ্চয়ই ধৈর্যশীলদের তাদের পুরস্কার অপরিমিতভাবে দেয়া হবে।’ (সূরা জুমার, আয়াত-১০)
অবশেষে, সন্তান যেমনই হোক তার প্রতি বদদোয়া না করে ইনশা আল্লাহ দোয়া কবুলের এই মাসে সন্তানদের জন্য উত্তম দোয়া করতে হবে। যেমনটি সূরা ফুরকানের ৭৪ নং আয়াতে বলা হয়েছে, ‘হে আমাদের প্রতিপালক, আমাদের জন্য এমন স্ত্রী ও সন্তান দান করো, যারা আমাদের জন্য চক্ষুশীতলের কারণ হবে। আর আমাদের মুত্তাকিদের ইমাম বানিয়ে দাও।’ এখানে ‘ইমাম’ শব্দটার বিভিন্ন ব্যাখ্যা রয়েছে। সহজভাবে বললে- ইমাম বলতে নামাজের ইমাম বলা হয়নি, বরং আল্লাহর পছন্দনীয় উত্তম চরিত্রের অনুসরণযোগ্য একজনকে বুঝানো হয়েছে। অতএব, আল্লøাহ আমাদের দায়দায়িত্ব সহজ করে দিক এবং আমরা ও সন্তান-সন্ততিরা সঠিক পথপ্রাপ্ত হই, আমিন।



