খাদ্যে ভেজাল মেশানো একটি গুরুতর অপরাধ। ভেজাল খাদ্য মানুষের জন্য কখনো কল্যাণ বয়ে আনতে পারে না। যা একটি দেশ ও জাতির জন্য চরম আশঙ্কাজনক। একটি দেশ বা জাতিকে তিলে তিলে ধ্বংস করার জন্য এই ভেজাল খাদ্যই যথেষ্ট। তাই ভেজাল খাদ্যকে না বলুন।
ফরমালিন অত্যন্ত বিষাক্ত বস্তু বলে নিয়মিত ফরমালিনযুক্ত খাবার খেলে শরীরের বিভিন্ন অংশে ক্যান্সার ও বিভিন্ন রোগ বেঁধে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এ ছাড়া ফরমালিন খাদ্য পরিপাকে বাধা দেয়, পাকস্থলীর ক্ষতি করে, যকৃতের অ্যানজাইম নষ্ট করে এবং কিডনির কোষ ধ্বংস করে। ফলে গ্যাস্ট্রিক আলসার বাড়ে, লিভার ও কিডনির নানা রকম জটিল রোগ দেখা দেয়।
আজকাল যারা খাদ্যে ভেজাল মেশায় এ খাদ্য সরবরাহ ও খাওয়া থেকে তারাও মুক্ত নয়। সুতরাং দুই পয়সার জন্য আমরা যেন নিজেরা নিজেদেরকে ধ্বংসের দিকে নিক্ষেপ করছি।
ক্রেতার সাথে কিভাবে প্রতারণা হয় তা কি আমরা জানি? ক্রেতা যখন নিরেট কোনো খাঁটি পণ্য চায়। ঠিক সেই সময় তাকে ভালোটি না দিয়ে ভেজাল মিশ্রিত পণ্য দিয়ে খাঁটি বলে তাকে ধরিয়ে দেয়া। এটাই হচ্ছে ক্রেতার সাথে ধোঁকাবাজি।
এ প্রসঙ্গে আবু হুরায়রাহ রা: বর্ণনা করেন, একবার রাসূল সা: বাজারে এক খাদ্যস্তূপের নিকট দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি খাদ্যস্তূপের ভেতরে হাত প্রবেশ করিয়ে দেখলেন ভেতরের খাদ্যগুলো আর্দ্র-ভেজা। তিনি খাদ্য বিক্রেতার কাছে জানতে চাইলেন, এটি কেমন কথা? সে বলল, বৃষ্টিতে ভিজে গেছে হে আল্লাহর রাসূল! রাসূল সা: বললেন, তাহলে তুমি খাদ্যগুলো উপরে রাখনি কেন, যাতে মানুষ দেখতে পেত। অতঃপর নবী সা: বললেন, ‘যে ব্যক্তি প্রতারণা করবে, সে আমার উম্মত নয়।’ (মুসলিম-১০২)
প্রতারণা ও ধোঁকাবাজি এটা শুধু এ যুগের নয় বরং এই প্রতারণা ও ধোঁকাবাজির সয়লাব যুগের পর যুগ ধরে চলছে। আমাদের এ থেকে মুক্তির পথ খুঁজে বের করতে হবে। তা না হলে মানুষের ভোগান্তির শেষ নেই।
অন্যায় পন্থায় যেই অর্থ উপার্জন করা হয় তা হারাম ও চরম পর্যায়ের অন্যায় কাজ। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, ‘তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভোগ করো না’। (সূরা বাকারা-১৮৮) সুতরাং যারা খাদ্যে ভেজাল মেশায় তাদের আল্লাহর নির্দেশের ব্যাপারে সাবধান হওয়া উচিত।
আপনি ব্যবসা করছেন হালাল পণ্য দিয়ে কিন্তু পণ্যে ভেজাল মেশানোর কারণে আপনার ব্যবসাটি হারামে রূপ নিচ্ছে; তা কি কখনো বিবেককে প্রশ্নবিদ্ধ করেনি? এটি কিছু সময়ের জন্যও কি আপনাকে ভাবায় না? যদি এমনটি না হয় তাহলে নতুন করে আপনাকে ভাবতে হবে। আপনি যে কাজটি করছেন সেটি করার জন্য শরিয়ত আপনাকে অনুমতি দেয় কি না। যদি দেয় তাহলে কাজটি করুন। আর যদি না দেয় তাহলে সেই কাজটি বর্জন করাটাই মুমিন হিসেবে আপনার কর্তব্য।
যারা খাদ্যে ভেজাল মেশায় তাদের ইবাদত কবুল হয় না। কারণ আমরা জেনে থাকব ইবাদত কবুলের পূর্বশর্ত হচ্ছে হালাল খাদ্য উপার্জন ও ভক্ষণ করা। হারাম বস্তুর দ্বারা শরীরে যেই মাংসপেশি সৃষ্টি হয় সেই শরীর ও জবানের ইবাদত আল্লাহ তায়ালার দরবারে পৌঁছায় না। এ প্রসঙ্গে আবু হুরায়রা রা: থেকে বর্ণিত এক হাদিসে নবী সা: বলেন, ‘এক ব্যক্তি দীর্ঘ সফরে থাকাবস্থায় এলোমেলো চুল ও ধুলোমলিন দেহ নিয়ে আকাশের দিকে দুই হাত তুলে হে আমার রব বলে দোয়া করে। অথচ সে যা খায় তা হারাম। যা পান করে, তা হারাম। যা পরিধান করে, তা হারাম এবং হারামের দ্বারাই সে পুষ্টি অর্জন করে। তবে তার মুনাজাত কিভাবে কবুল হতে পারে!’ (মুসলিম-১০১৫)
যারা খাদ্যে ভেজাল মিশিয়ে মানুষকে বিপাকে ফেলে তারা মহাপাপী। তাদের সম্পর্কে নবী সা: বলেন, ‘নিশ্চয় কিয়ামতের দিন ব্যবসায়ীদের মহাপাপীরূপে ওঠানো হবে, তবে যারা সততার সাথে ব্যবসায় পরিচালনা করেছে তারা ছাড়া। ’ (তিরমিজি-১২১০)
খাদ্যে ভেজাল মেশানোর সহজ অর্থ। ভালোর সাথে মিথ্যের সংমিশ্রণ এবং মন্দের সাথে ভালোর সংমিশ্রণ। এ প্রসঙ্গে ইরশাদ হয়েছেÑ ‘তোমরা সত্যের সাথে অসত্যের মিশ্রণ ঘটাবে না। জেনে শোনে সত্য গোপন করো না। ’ (সূরা বাকারা-৪২)
মিথ্যা কসমকারীর সাথে আল্লাহ তায়ালা কথা বলবেন না। প্রায় হাট-বাজারে দেখা যায় বিক্রেতা ভেজাল খাদ্যকেই খাঁটি বলে মিথ্যা কসম করে চালিয়ে দেয়। কিয়ামতের দিন আল্লাহ তিন ব্যক্তির সাথে কোনো ধরনের কথা বলবেন না। তাদের প্রতি ভ্রুক্ষেপ করবেন না, তাদের পবিত্র করবেন না এবং তাদের জন্য রয়েছে বেদনাদায়ক শাস্তি। তাদের একজন হলো, যে তার ব্যবসায়িক পণ্য মিথ্যা কসম খেয়ে বিক্রয় করে।’ (মুসলিম-১০৬)
শুধুমাত্র আইন প্রণয়ন বা শাস্তির মাধ্যমে ভেজাল খাদ্য নিয়ন্ত্রণে আনা যায় না। এর জন্য প্রয়োজন নৈতিকতাবোধ ও পরকালীন শাস্তির ভয় অন্তরে জাগিয়ে তোলা। তা হলে সম্ভব নির্ভেজাল খাদ্য মানুষকে উপহার দেয়া। আর সত্যিকার অর্থে খাঁটি মুমিন কাউকে ধোঁকা দিতে পারে না।