কুরআনুল কারিমের ভাষা ও প্রকাশভঙ্গি সমসাময়িক আরবি সাহিত্য থেকে আলাদা। এতে একদিকে যেমন রয়েছে কাব্যের মাধুর্যতা, তেমনি অন্য দিকে রয়েছে গদ্যের সহজ-সাবলীল গতি ও গাম্ভীর্যতা। এ ছাড়াও কুরআনের আয়াতগুলোতে সাধারণত অন্তমিল পরিদৃষ্ট হয় এবং এককালীন অবতীর্ণ আয়াতগুলোর অন্তমিল একই প্রকৃতির হয়। কুরআনের রচনাশৈলীসহ এমন কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যে বৈশিষ্ট্যগুলো হচ্ছে এর উপমাসম্ভার। আর এটি সর্বস্বীকৃত ও বাস্তব যে, কোনো লেখা যতই আকর্ষণীয় ও সুন্দর হোক, যতই সুন্দরভাবে পড়া হোক, একবার, দুইবার, তিনবার পড়া হয়ে গেলে আস্তে আস্তে বিরক্তি চলে আসে। তিনবারে না এলেও চারবারে আসে, চারবারে না এলে পাঁচবারে আসে, মোটকথা, বিরক্তি আসবেই। এরপর না পড়তে মন চায়, না শুনতে মন চায়। কিন্তু আল-কুরআন তার সম্পূর্ণ বিপরীত। কুরআনের কোনো অংশে একবার পড়–ন, শতবার পড়–ন, হাজারবার পড়–ন, জীবনভর পড়তে থাকুন কোনো বিতৃষ্ণা ভাব আসবে না। যত পড়া হয় তত ভালো লাগে। মুসলিম দেশের হিফজ বিভাগগুলোতে একটি আয়াত বা সূরা কিংবা কুরমানের এক পৃষ্ঠা দিনে কতবার পড়া হচ্ছে। এরপরও কোনো বিরক্তি নেই। এভাবে কিরাত বিভাগে এক একটি আয়াত কতবার পড়া হচ্ছে কোনো বিরক্তি নেই। নেই ক্লান্তিও; বরং যতবার পড়ে তত ভালো লাগে। তার প্রতি ভালোবাসা আরো বৃদ্ধি পেতে থাকে।
সূরা ফাতিহা প্রত্যেক নামাজে পড়া হয়। প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে প্রায় ১৭ রাকাতে ১৭ বার পড়া হয়। সুন্নাতে মুয়াক্কাদাগুলোতে পড়া হয় ১২ বার। প্রতিটি মুসলিম নামাজি ব্যক্তির পরিবার সূরা ফাতিহা তিলাওয়াত করে। অন্যান্য নফল নামাজের হিসাব করলে তা প্রায় ৭০-৮০ বার হয়ে যাবে। এভাবেই কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার পর থেকে চলে আসছে। কিন্তু কোনো বিতৃষ্ণা বা কোনো বিরক্তি নেই।
ফজিলতের সূরাগুলো সূরা ফালাক, নাস, ইখলাসসহ আরো অনেক সূরা। যা মুসলমানরা প্রতিদিন সকাল-বিকেল তিলাওয়াত করে, নামাজে পড়ে কিন্তু কোনো বিরক্তি নেই। এর বিপরীতে অন্য যেকোনো বই-পুস্তক, প্রেমকাহিনী কিংবা প্রেয়সীর হাতে লেখা কোনো চিঠিই হোক না কেন। প্রথমে দু’-একবার স্থান ভালো লাগলেও পরে সেই বই বা চিঠির প্রতি একটি অনীহা ভাব সৃষ্টি হয়ে যায়। কিন্তু কুরআনের একই আয়াত বা একই সূরা বারবার পড়লে কিংবা শুনলে কোনো ধরনের বিরক্তি, অনীহা বা অস্থিরতা সৃষ্টি হয় না। সুতরাং এটি কি প্রমাণ করে না যে, নিশ্চয়ই কুরআন মহান আল্লাহ তায়ালারই বাণী।
আবার কুরআনুল কারিমের হিফজ! পৃথিবীর ইতিহাসে আসমানি গ্রন্থগুলোসহ মানবরচিত আরো অনেক রয়েছে। যেমন- জাগতিক শিক্ষার বই-পুস্তক এবং বড় বড় বিজ্ঞানী, দার্শনিকদের লিখিত বই। কিন্তু পৃথিবীর সূচনালগ্ন থেকে আজ পর্যন্ত কুরআন ছাড়া এমন কোনো গ্রন্থ বা রচনা পাওয়া যাবে না, যার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত মুখস্থ করার প্রচলন রয়েছে কিংবা মুখস্থ রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। অথবা মুখস্থ করে হৃদয়ে গেঁথে রাখতে পারে। আপনি চার বা পাঁচ পৃষ্ঠার একটি ছোট্ট রচনা মুখস্থ করে দেখুন, কত দিন সেটি আপনার মস্তিষ্কে সংরক্ষিত থাকে। এক সময় দেখবেন, আপনার স্মৃতিশক্তি থেকে আস্তে আস্তে মুছে যাচ্ছে। একদিন এমন একটি সময় আসবে যখন তা একেবারেই উধাও হয়ে যাবে। কয়েক দিন স্মৃতিধারণ করে রাখা সমাজের কাছে তেমন কোনো বিস্ময়কর ব্যাপার নয়। আর জাগতিক বই-পুস্তকের কথা একটু রাখুন, কুরআন ব্যতীত প্রসিদ্ধ কয়েকটি আসমানি গ্রন্থ তথা তাওরাত, জাবুর ও ইঞ্জিল এগুলোর কি কোনো হাফেজ পাওয়া যাবে? কোনো হাফেজ পাওয়া যাবে না। এটি কি প্রমাণ করে না! অবশ্যই প্রমাণ করে এটি আল্লাহ তায়ালার বাণী।
অতএব, আল-কুরআনেরই একমাত্র এমন বৈশিষ্ট্য! আর এ সব বৈশিষ্ট্যে এ কথা প্রমাণিত যে, মহাগ্রন্থ আল-কুরআন আল্লাহ তায়ালা প্রদত্ত একটি মহাগ্রন্থ ও একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান। যার তুলনা বা উদাহরণ কোনো কিছু নেই। তাই যারা একে যথাযথভাবে অনুসরণ করবে, তারা সবাই শান্তিপূর্ণভাবে জীবন যাপন করতে পারবে ও আখিরাতের জন্য পুণ্য সঞ্চয় করতে পারবে। সর্বোপরি দুনিয়া ও আখিরাতে সফল হতে পারবে। চূড়ান্ত ঠিকানা জান্নাতের বাসিন্দা হতে পারবে।

লেখক : শিক্ষার্থী, ইসলামী আইন ও গবেষণা বিভাগ ইফতা (দ্বিতীয় বর্ষ), দারুস-সুন্নাহ মাদরাসা, টাঙ্গাইল