(শেষাংশ)
সামষ্টিক বিষয় বিশেষ করে শাসক নির্বাচিত হবে অবশ্যই জনগণের মতামতের ভিত্তিতে। রাজতন্ত্র, বন্দুকের নল বা জোর-জুলুম করে শাসক হওয়ার কোনো সুযোগ আল্লাহর বিধানে নেই। রাসূলুল্লাহ সা:-এর ইন্তেকালের পরে কে খলিফা হবে তা স্পষ্ট করতে রাসূলুল্লাহ সা: পারতেন, কিন্তু তিনি তা করেননি। খলিফা নির্বাচন কম গুরুত্বপূর্ণ সেটিও ছিল না। তাই সাহাবায়ে কেরাম প্রিয়তম নবী সা:-এর দাফন-কাফনের চেয়ে তাদের নেতৃত্ব নির্বাচনকে বড় করে দেখেছেন। পরবর্তী খলিফারাও কাউকে মনোনীত না করে উম্মাহর ওপর ছেড়ে দিয়েছেন। বর্তমান গণতন্ত্রের সাথে সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন ছাড়া ইসলামের কোনো বিরোধ নেই। গণতন্ত্রে সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক জনগণ অর্থাৎ বেশির ভাগ মানুষ যেটি পছন্দ করে সেটিই আইন। পক্ষান্তরে ইসলামে সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক আল্লাহ এবং আইনের উৎস কুরআন ও সুন্নাহ। শত ভাগ মানুষের রায় যদি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সা:-এর নিয়মবহির্ভূত হয় তাহলেও সেটি অগ্রাহ্য হবে। কুরআন ও সুন্নাহর অধীনে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের সিদ্ধান্তই কার্যকর হবে। কোনো একক ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নয়, বেশির ভাগের মতোই পালনযোগ্য এবং এ ক্ষেত্রে ইসলাম ও গণতন্ত্রের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই।
রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে পরামর্শভিত্তিক ব্যবস্থা বা গণতন্ত্র সর্বোত্তম। গণতন্ত্র বলতে আমি বোঝাতে চাচ্ছি, জনগণের মতামতের ভিত্তিতে সরকার গঠিত হবে এবং দেশ পরিচালিত হবে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহর দেয়া নির্দেশনার (যারা নিজেদের সব কাজ পরস্পর পরামর্শের ভিত্তিতে সম্পন্ন করে) সাথে আব্রাহাম লিঙ্কনের দেয়া সংজ্ঞার মধ্যে কোনো বিরোধ দেখি না ‘উবসড়পৎধপু রং ধ মড়াবৎহসবহঃ ড়ভ ঃযব ঢ়বড়ঢ়ষব, নু ঃযব ঢ়বড়ঢ়ষব ধহফ ভড়ৎ ঃযব ঢ়বড়ঢ়ষব’ (গণতন্ত্র হলো জনগণের সরকার, জনগণের দ্বারা সরকার, জনগণের জন্য সরকার)। তার আরো উক্তি- ‘ব্যালট বুলেটের চেয়েও শক্তিশালী’ এবং ‘নির্বাচন জনগণের, এটি তাদের সিদ্ধান্ত’। জোর-জুলুম করে শাসন করার সুযোগ গণতন্ত্রে নেই। ইউরোপ-আমেরিকার জনগণ তাদের দেশে শাসনকার্য পরিচালনার ক্ষেত্রে গণতন্ত্রকে বেছে নিয়েছে এবং উন্নয়নের পাশাপাশি সভ্য জাতি হিসেবে বিশ^ দরবারে পরিচিতি লাভ করেছে। সেখানে কাউকে ইরানের শাহ, লিবিয়ার গাদ্দাফি বা ইরাকের সাদ্দামের মতো পরিণতি ভোগ করতে হয় না, আবার আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়ার মতো কোনো দেশ ও জাতিকে চরম মূল্য দিতে হয় না। সেসব দেশে সরকারকে টেনেহিঁচড়ে নামাতে হয় না। ইউরোপ-আমেরিকায় শক্তিশালী সেনাবাহিনী রয়েছে, কখনো শোনা যায় না, জাতির ঐতিহাসিক প্রয়োজনে তাদেরকে রাষ্ট্রের দায়িত্ব গ্রহণ করতে হয়েছে। তাদের শক্তিশালী সেনাবাহিনী রাজনীতিক সরকারের অধীন এবং আনুগত্য করতে বাধ্য। সম্প্রতি একটি বছরে ব্রিটেনে তিনজন প্রধানমন্ত্রী হলেন। সেখানে এসব পরিবর্তন অত্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়েছে। নির্বাচনে অনিয়ম বা কারচুপি বা ভোট ডাকাতি তাদের কল্পনাতেও নেই। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও গুমের ঘটনাও নেই। কোথাও কোনো কিছু ঘটলে তার বিচার আছে। ফলে উন্নয়নশীল বিশ^ থেকে মানুষ ছুটছে সেসব দেশে। ইউরোপ-আমেরিকা কেন? পাশর্^বর্তী ভারতেও স্বাধীনতা লাভের পর থেকে কখনো গণতান্ত্রিক শাসন ব্যাহত হয়নি। বহু ভাষাভাষী ও জাতিগোষ্ঠীর বিশাল দেশ টিকে আছে কেবল গণতন্ত্রের কারণে।
যেসব দেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চালু আছে সেসব দেশে নির্বাচনে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে দাওয়াত প্রদান ও জনমত গঠন সহজ হয়। ইসলাম প্রতিষ্ঠায় প্রচেষ্টারত সংগঠনগুলো মানুষের সামনে দ্বীন কায়েমের কর্মপন্থা নিয়ে হাজির হবে এবং মানুষ যদি তাদেরকে যোগ্য বিবেচনা করে ভোট দিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা দান করে তাহলে সহজেই দ্বীন কায়েম হওয়া সম্ভব। দ্বীন কায়েম হওয়া মূলত নেতৃত্বের পরিবর্তন। প্রাথমিক শর্ত ইসলামের ভিত্তিতে একদল যোগ্য নেতা ও কর্মী গঠন এবং দ্বিতীয় শর্ত যে জনপদে দ্বীন কায়েম করতে চায় তার জনগণ সক্রিয় বিরোধী না হয়ে সমর্থক হবে। এমন পরিবেশ তৈরি হলে আল্লাহপাক তাঁর একান্ত অনুগ্রহে সেই জনপদে ইসলামের বিজয় দান করবেন।
দেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা না থাকলে সেখানে দ্বীনের দাওয়াতের মাধ্যমে একদল যোগ্য নেতা ও কর্মীবাহিনী গঠিত হলে গণবিপ্লব সাধিত হতে পারে- যেমনটি হয়েছিল ইরানে। তারপরও বৈধতা দানের জন্য সেখানে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছিল এবং জনগণ ইরানে ইসলামী বিপ্লবের পক্ষেই রায় দিয়েছিল। এ কথা বলা যায়, মতামতের ভিত্তিতেই ইরানে ইসলামী শাসন কার্যকর রয়েছে। বর্তমানে তুরস্ক, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও বাংলাদেশসহ যেসব দেশে গণতন্ত্র চালু আছে সেসব দেশে ইসলামপন্থীদের উচিত নিয়মতান্ত্রিক পন্থায় নেতৃত্ব পরিবর্তনের জন্য প্রচেষ্টা চালানো। একজন মুসলমান সেই যে মনেপ্রাণে ইসলামকে সর্বোত্তম জীবনব্যবস্থা বিশ^াস করে এবং সেটি প্রতিষ্ঠার জন্য প্রচেষ্টা চালায়। ইসলামের যারা শত্রু তারা কখনোই ইসলামকে রাষ্ট্রীয় জীবনব্যবস্থা হিসেবে মেনে নেবে না এবং তারা বিরোধিতা করবেই। যদি বিরোধিতা করে তাহলে বোঝা যাবে তারা নবী-রাসূলদের মতো সঠিক তরিকায় রয়েছেন। ইকামতে দ্বীনের বৈশিষ্ট্যই হলো কুফরি শক্তির বিরোধিতা (মুশরিকরা যতই অপছন্দ করুক না কেন’ সূরা সফ: ৯) এবং বিরোধিতার মোকাবেলায় দ্বীনের পথে অবিচল থাকতে পারলে সব গুনাহের ক্ষমা এবং জান্নাতের প্রতিশ্রুতি রয়েছে (সূরা সফ: ১২)। অবশ্য খেদমতে দ্বীনের বিনিময়েও জান্নাতের ওয়াদা রয়েছে। কুরআন মাজিদে বিভিন্ন জায়গায় ঈমানের সাথে নেক আমল করলে জান্নাতের ওয়াদা করা হয়েছে। অবশ্য এমন অবস্থায় জান্নাত প্রাপ্তি বড়ই ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ দ্বীন কায়েম না হলে পরিপূর্ণ ইসলাম মানা দুরূহ ব্যাপার। এ জন্য দ্বীন কায়েমে সক্রিয় অংশগ্রহণ না করলেও একটি কামনা-বাসনা থাকতেই হবে। এ প্রসঙ্গে একটি হাদিস উল্লেখ করতে চাই। যে লোক মারা গেল অথচ না জিহাদ করল আর না জিহাদের বাসনা অন্তরে পোষণ করল- তার মৃত্যু হলো মুনাফিকের মৃত্যু।
দ্বীন কায়েমের পন্থা হিসেবে অনেকে কেতাল বা যুদ্ধের কথা বলে। তাদের মুখে উচ্চারিত হয়, গণতন্ত্র হারাম ও কুফরি মতবাদ এবং গণতন্ত্রের মাধ্যমে ইসলাম প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। এরাই মূলত সন্ত্রাসী বা জঙ্গি। এরা বিভ্রান্ত এবং ইসলামের দুশমনদের ক্রীড়নক। শান্তির ধর্ম ইসলামকে কলঙ্কিত করছে। আমার উপলব্ধি, কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা দলের যুদ্ধ ঘোষণার অধিকার নেই। এই অধিকার কেবল রাষ্ট্র বা সরকারের। রাসূলুল্লাহ সা: সুদীর্ঘ ১৩ বছর মক্কায় একতরফা জুলুম-নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। গোপনে বা প্রকাশ্যে কোনো সশস্ত্র আক্রমণ বা কাউকে হত্যা করার কোনো নজির নেই। যুদ্ধবিগ্রহ যা সবই মদিনায় ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরে হয়েছে। কুরআন মাজিদে যত নবী-রাসূলের ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে সেখানেও তাঁদেরকে নির্যাতিত হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। জুলুম-নির্যাতন উপেক্ষা করে দ্বীনের দাওয়াত অব্যাহত রাখা ও পরম ধৈর্য অবলম্বনের তাগিদ দেয়া হয়েছে। এখনো যারা দ্বীন কায়েম করতে চায় সব উসকানি ও জুলুম-নির্যাতন উপেক্ষা করে নবী-রাসূলদের পন্থায় মানুষকে দাওয়াত দিতে হবে এবং নামাজ ও ধৈর্যের মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য চাইতে হবে। দ্বীন প্রতিষ্ঠার কাজ একান্ত আল্লাহর এবং জমিনে যারা এই কাজ করে তারা মূলত আল্লাহর সাহায্যকারী। ইকামতে দ্বীনের কাজের বিনিময়ে আল্লাহপাক তাদেরকে জান্নাত দান করবেন এবং আল্লাহর ভাষায় এটিই সবচেয়ে বড় সাফল্য (সূরা সফ: ১২)। আরো দেবেন, যা আমরা পছন্দ করি, আল্লাহর সাহায্য ও নিকটবর্তী বিজয় (সূরা সফ: ১৩)। তাও আল্লাহ দেবেন এবং এটি অতিরিক্ত।
দ্বীন প্রতিষ্ঠার কাজে মুমিনদের হারানোর কিছু নেই বা কোনো পরাজয় নেই। রয়েছে জান্নাতের গ্যারান্টি। প্রয়োজন শুধু খুলুছিয়াত। সব কর্মতৎপরতার মূলে থাকতে হবে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও তাঁরই ওপর নির্ভরতা। আল্লাহপাক আমাদের মধ্যে নিষ্ঠা ও আন্তরিকতা দান করুন এবং সব প্রতিকূল অবস্থায় অবিচল থাকার তৌফিক দান করুন। আমীন।
লেখক: উপাধ্যক্ষ (অব:), কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ



