আল্লাহকে পাওয়ার প্রশ্নে অনেকেই বলবেন, আল্লাহকে পাওয়ার সহজ উপায় হলো আজমির শরিফ, শাহজালাল রহ:-এর মাজার, বায়েজিদ বোস্তামি রহ:-এর মাজার বা খান জাহান আলী রহ:-এর মাজারে যাওয়া। সেখানে গেলে আল্লাহকে সহজে পাওয়া যায়। নানাজন নানা কামনা-বাসনা নিয়ে সেসব জায়গায় গিয়ে থাকেন। অনেক রাজনীতিবিদকে দেখা যায়, সিলেটে শাহজালাল রহ:-এর দরগাহ জিয়ারতের মধ্য দিয়ে নির্বাচনী প্রচার শুরু করেন। এসব জায়গায় জিয়ারত বা ধরনা দেয়ায় কোনো কল্যাণ নেই; বরং রয়েছে কবিরা গুনাহ। আল্লাহকে পাওয়ার জন্য কোথাও যাওয়ার প্রয়োজন নেই বা কাউকে ধরারও দরকার নেই।
আল্লাহ বান্দার অতি কাছে। তাঁর নিজের উক্তি- ‘হে নবী! আমার বান্দা যখন আমার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে তখন বলে দাও, আমি তাদের অতি কাছে। যে আমাকে ডাকে আমি তার ডাক শুনি এবং জবাব দিই, কাজেই আমার আহ্বানে সাড়া দেয়া ও আমার ওপর ঈমান আনা তাদের একান্ত কর্তব্য। এ কথা তুমি তাদের শুনিয়ে দাও, হয়তো তারা সত্য-সরল পথের সন্ধান পাবে।’ (সূরা বাকারাহ-১৮৬) দ্ব্যর্থহীন কথা, আল্লাহর সাথে বান্দার সম্পর্ক প্রত্যক্ষ। সব প্রয়োজন তাঁরই কাছে পেশ করতে হবে। তিনি বান্দার ডাক কেবল কেবল শোনেনই না, তার জবাবও দেন অর্থাৎ- সমাধান দেন। আল্লাহরও চাওয়া আছে এবং তা হলো বান্দা কেবল তাঁরই আনুগত্য (ইবাদত) করবে। আল্লাহ পাক তাঁর রাসূল সা:-কে বলে দিয়েছেন, তাঁর এ কথা প্রচার করে দিতে যাতে তারা শিরক থেকে মুক্ত হয়ে সঠিক পথের সন্ধান পায়।
আল্লাহকে পাওয়ার সহজতম উপায় হলো তাঁর বান্দাদের সাথে সদাচরণ করা। মনে রাখতে হবে, মানুষ শুধু আল্লাহর বান্দা নয়, সাথে সাথে তাঁর প্রতিনিধি। আমরা প্রতিনিধির মর্যাদা বুঝি, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী সবাই সরকারের প্রতিনিধি। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর কাজকর্মে বাধা প্রদান সরকারের বিরোধিতা হিসেবেই বিবেচনা করা হয়। পুলিশ প্রায়ই তাদের বিরুদ্ধে মামলা করে থাকে। হাসপাতালে মানুষের অসহায়ত্ব লক্ষ করলাম। এই মানুষগুলো যদি যথাযথ সেবা পায় তাহলে প্রতিনিধির মাধ্যমে মূলত আল্লাহকেই সেবা দান করা হয়। আমরা স্কুলজীবনে পড়েছি, হাশরের দিন বিচারে বসিয়া সুধাবে জগতস্বামী, তুমি মোরে করো নাই সেবা যবে রুগ্ন যে ছিলাম আমি। বেশ বড় কবিতা, আরো ছিল- ক্ষুধার্ত ছিলাম খাদ্য দাওনি, পিপাসার্ত ছিলাম পানি পান করাওনি। আসলে এটি শুধু কবিতা নয়, হাদিসের বাণী- মানুষ বলবে, হে বিশ্বজাহানের মালিক এটি কেমন করে সম্ভব? আল্লাহ বলবেন, আমার বান্দা অসুস্থ ছিল, ক্ষুধার্ত ছিল, পিপাসার্ত ছিল তার প্রয়োজন পূরণ করলে আজ আমাকে পেতে। কত আবেগভরা কথা। যারা মানুষের প্রয়োজন পূরণ করে ও তাদের সাথে সদাচরণ করে তারা মূলত আল্লাহ তায়ালার যথার্থ খলিফা এবং আল্লাহ পাক সাধারণত তাদেরকেই সমাজের নেতৃত্ব দান করেন।
শুধু হাসপাতাল নয় সব সরকারি অফিসে যারা সেবা গ্রহণের জন্য যায় তারা সবাই আল্লাহর প্রতিনিধি।
সরকারি দায়িত্ব পালনের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ সা:-এর কঠোর হুঁশিয়ারি রয়েছে। তাঁর বাণী- ‘আমরা যাদেরকে দায়িত্ব প্রদান করি তারা যদি এক টুকরো সুতা বা তার চেয়েও ক্ষুদ্র জিনিস খেয়ানত করে তাহলে সে খেয়ানতের বোঝা মাথায় করে কিয়ামতের দিন উত্থিত হবে।’ রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, ‘আমরা যখন কাউকে কোনো দায়িত্ব প্রদান করি সে তার নিজের কাজ যত নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সাথে সম্পন্ন করে আমাদের অর্পিত দায়িত্ব যদি সেভাবে পালন না করে তাহলে তাদেরকে উল্টা করে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।’ ঘুষ দাবি করার প্রশ্নই উঠে না, কোনো কাজ যদি ১০ মিনিটে সম্ভব হয় সেই কাজে আধা ঘণ্টা লাগানোও জুলুম এবং দায়িত্বহীনতার কারণে তাকে অবশ্যই জবাবদিহি করতে হবে।
সদাচরণ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, ‘জমিনে যারা আছে তাদের সাথে সদাচরণ করো তাহলে আসমানে যিনি আছেন তিনিও তোমাদের সাথে সদাচরণ করবেন।’ মানুষের সাথে দুর্ব্যবহার বা তাদেরকে কষ্ট দেয়া কত বড় গুনাহ মুসলমান যদি উপলব্ধি করত তাহলে দেশ থেকে জুলুম চিরতরে বন্ধ হয়ে যেত। আল্লাহর বাণী- ‘নিশ্চিত ধ্বংস তাদের জন্য যারা মানুষকে সামনাসামনি গালাগাল করে ও পেছনে দোষ প্রচার করে।’ (সূরা হুমাজা) ঈমানদার বান্দাদের কষ্ট দেয়া আল্লাহর কাছে অসহনীয়। আল্লাহর বাণী- ‘যারা ঈমানদার নর ও নারীকে কষ্ট দেয়, অতঃপর তাওবাহ করে না তাদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের আজাব, আছে ভস্ম হওয়ার শাস্তি।’ (সূরা বুরুজ) ‘অতঃপর তাওবাহ করে না’- এই উক্তির মধ্যে একজন জালেম আল্লাহর ক্ষমা আশা করতেই পারে যদি সে অনুতপ্ত হয়ে ফিরে আসে। আল্লাহ পাক জালেমের পক্ষ থেকে মজলুমকে এত পরিমাণ দেবেন যা পেয়ে মজলুম জালেমকে ক্ষমা করে দেবে।
মুসলিম কর্তৃক কেউ কষ্ট পাবে সেটি অকল্পনীয়; বরং মানবজাতির কল্যাণ সাধনের লক্ষ্যেই মুসলিম জাতির উদ্ভব হয়েছে। আল্লাহর বাণী- ‘তোমরা সর্বোত্তম জাতি, সমগ্র মানবজাতির কল্যাণের জন্য তোমাদের বের করে আনা হয়েছে, তোমরা দুনিয়ার মানুষদের সৎ কাজের আদেশ দেবে, অসৎ কাজ থেকে বিরত রাখবে এবং আল্লাহর ওপর অবিচল আস্থা রাখবে।’ (সূরা আলে ইমরান-১১০) এতে বোঝা যায়, আমাদের শ্রেষ্ঠত্বের মূলে রয়েছে মানুষের কল্যাণ সাধন এবং সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজ থেকে বিরত রাখার নির্দেশ প্রদানের মধ্যে। সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজ থেকে বিরত রাখা তাদের পক্ষেই সম্ভব যারা নেতৃত্বের আসনে থাকে। এই আয়াতের মাধ্যমে উপলব্ধি করা যায়, আল্লাহ পাক তাঁর সর্বোত্তম বান্দাদের (মুসলিম) বিশ্বনেতৃত্বের আসনে দেখতে চান।
লেখক : উপাধ্যক্ষ (অব:), কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ
যেখানে আল্লাহকে পাওয়া যায়
আল্লাহকে পাওয়ার প্রশ্নে অনেকেই বলবেন, আল্লাহকে পাওয়ার সহজ উপায় হলো আজমির শরিফ, শাহজালাল রহ:-এর মাজার, বায়েজিদ বোস্তামি রহ:-এর মাজার বা খান জাহান আলী রহ:-এর মাজারে...



