ভাইবোন মানে সবুজ শ্যামল বাগানের একই গাছের বর্ণিল ফল-ফুল। সম্পর্কে তারা সবচেয়ে নিকটবর্তী ও হৃদ্যতায় সবচেয়ে এগিয়ে। মা-বাবার পর সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ ভাইবোনের সম্পর্ক। শৈশবের জীবনটুকু একই ছাদের নিচে ভাইবোনের সাথে কাটে। আর একসাথে থাকা-খাওয়া, গল্প-আড্ডা, বেড়াতে যাওয়া ও মান-অভিমানসহ পরিবারের সুখ-দুঃখের চিরসঙ্গী হয়ে থাকে এই ভাইবোন। কিন্তু নির্ঘণ্ট এই কম্পিউটারের যুগে যান্ত্রিকতার জাঁতাকলে নিষ্পেষিত অন্য সব কিছুর মতো ভাইবোনের সম্পর্কও! যে সম্পর্ক ছিল মিষ্টিমধুর খুনসুটি ও ভালোবাসায় পূর্ণ। সেখানেও আজ ভাটা পড়েছে যান্ত্রিকতার কল্যাণে, আধুনিকতার ছোঁয়ায় বদলে গেছে ভালোবাসার পরিধিও। নীরব ঘাতক স্মার্টফোন এসে মানুষকে করে দিয়েছে ঘরকোণো। এখন খেলাধুলা, বন্ধুদের সাথে আড্ডা, ভাইবোনের সাথে গল্প করা ও ঘুরতে যাওয়ার চেয়ে ফোন নিয়ে পড়ে থাকতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে বর্তমান প্রজন্ম। ভাইবোন একে অপরকে সময় না দেয়ার ফলে অনেকে জড়িয়ে যায় হারাম রিলেশনশিপে। তাই ভাইবোনদের উচিত একে অপরকে সময় দেয়া, পরস্পরের মধ্যে বন্ধুসুলভ সম্পর্ক তৈরি করা। একে অপরের খেয়াল রাখা।
বর্তমান প্রজন্মের বেশির ভাগ মানুষ জানে না, ভাইয়ের কাছে বোনের কী হক, বোনের কাছে ভাইয়ের কী অধিকার! ফলে দেখা যায় একচেটিয়া বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বোনরাই বঞ্চিত হয়! তা ছাড়া ভাইবোনদের মধ্যে নিরবচ্ছিন্ন সম্পর্ক ও বোনদের মিরাস নেয়া ও দেয়া নিয়ে সমাজে প্রচলিত আছে নানা রকম কুপ্রথা। অথচ ভাইবোনের মধুর সম্পর্ক জীবনকে করে সুন্দর। আল্লাহ চান পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও সৌন্দর্য যেন রক্ষা পায়। তিনি হাদিসে কুদসিতে বলেছেন- ‘যে ব্যক্তি আত্মীয়দের সাথে সৎভাব রক্ষা করবে, আমিও তাঁর সাথে সৎভাব রক্ষা করব’ (বুখারি-৭৫০২)। তার আগে আরেকটি মাসয়ালা স্পষ্ট করা প্রয়োজন মনে করি। তা হলো- প্রাপ্ত বয়স্ক ভাইবোনদের আচরণ কেমন হবে?
১. মাহরামের যেসব অঙ্গ দেখা জায়েজ। তা হলো- চেহারা, হাত-পা, মাথা, চুল, গলা, গর্দান ও হাঁটুর নিচের অংশ। ২. প্রয়োজনে তা স্পর্শ করাও বৈধ। ৩. তবে শাহওয়াত অবস্থায় ধরাছোঁয়া যাবে না। ৪. ভাইবোন একে অপরের হাত ধরে হাঁটা যাবে, এতে সমস্যা নেই। তবে বর্তমান সমাজে দুষ্ট লোকের অভাব নেই। তাদের মনমানসিকতা অনেক নোংরা। তাই ভাইবোন পরস্পর হাত ধরে না হাঁটাই ভালো। হোক সে আপনার অনেক ছোট বা অনেক বড়। এটি অনেকেই ভালো চোখে দেখেন না। আমি আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি। সর্বোপরি, তোহমত থেকে বেঁচে থাকাই সতর্কতা।
বোনের প্রতি ভাইয়ের কর্তব্য; বাবার অপারগতা ও অবর্তমানে বোনের লালন-পালন ও উপযুক্ত পাত্র দেখে বিয়ে দেয়া ভাইয়ের দায়িত্ব। কেননা, রাসূল সা: বলেছেন, ‘যার তিনটি মেয়ে আছে অথবা তিনজন বোন আছে কিংবা দুই বোন বা দুই মেয়ে আছে। অতঃপর সে তাদের শিক্ষাদীক্ষার ব্যবস্থা করে উত্তম পাত্র দেখে বিয়ে দেয় এবং তাদের সাথে সর্বোত্তম ব্যবহার করে। তার জন্য জান্নাত অবধারিত’ (তিরমিজি)। অন্য হাদিসে এসেছে, আয়েশা রা: বলেন, রাসূল সা: বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি তার মেয়ে সন্তানদের জন্য কোনো ধরনের পরীক্ষার সম্মুখীন হয় বা বিপদগ্রস্ত হয়। সে তাদের ব্যাপারে ধৈর্য ধরলে তার জন্য তারা জাহান্নাম হতে আবরণ বা প্রতিবন্ধক হবে’ (বুখারি ও মুসলিম)। হাদিসে মেয়ে সন্তানের কথা বলা হয়েছে, এই ফজিলত বাবার, তবে বাবার অবর্তমানে পরিবারের অভিভাবক হিসেবে এটি ভাইয়ের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে।
বোনের সন্তুষ্টি ছাড়া বিয়ে বা তালাকে বাধ্য করা যাবে না; অনেক ভাই আছেন, স্বামীর অব্যাহত অত্যাচারে অতিষ্ঠ বোনকে ভরণ-পোষণের ভয়ে জোর করে স্বামীর বাড়ি পৌঁছে দেয়। কোনো কোনো পরিবারে মেয়েদের দ্বিতীয় বিয়ে থেকে বিরত রাখে। অনেকে তালাকের পরও বৈবাহিক সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে চায়। ইসলামের সীমার মধ্যে হলে এসব বিষয়ে বোনের ওপর বলপ্রয়োগের অধিকার ভাইকে দেয়া হয়নি। প্রায়ই দেখা যায়, তালাকপ্রাপ্ত বোনেরা ভাইয়ের সংসারে অবজ্ঞা ও নিগ্রহের শিকার হয়। এমন ভাইদের ঈমান নিয়েই প্রশ্ন উঠতে পারে। বলা হয়েছে, তালাক ও ইদ্দতের পর পূর্ব স্বামীদের সাথে পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে নিয়মানুযায়ী বিয়ে করতে তাদের বাধা দান করো না। এ উপদেশ তাকেই দেয়া হচ্ছে, যে আল্লাহ ও কিয়ামতের দিনের ওপর বিশ্বাস রাখে’ (সূরা বাকারা-২৩২)।
বোনের জন্য প্রয়োজনে নিজের স্বার্থ বিসর্জন দেয়া সাহাবিদের সুন্নাহ; হজরত জাবের রা:-এর একটি ঘটনা খুবই স্মরণীয়। রাসূল সা: তাকে বলেছেন, ‘তুমি কুমারী নারী বিয়ে না করে তালাকপ্রাপ্ত নারীকে বিয়ে করেছ কেন?’ তিনি জবাব দেন, আমার বাবা মারা গেছেন। আমার ছোট সাতজন বোন আছে, তাদের লালন-পালন ও শিক্ষাদীক্ষার জন্যই আমি বয়স্ক নারী বিয়ে করেছি। রাসূল সা: বলেন, ‘আল্লাহ তোমাকে বরকত দান করুন’ (বুখারি-৫২৪৭, মুসলিম-৭১৫)। এতে স্পষ্ট বোঝা যায়, বোনের জন্য প্রয়োজনে নিজের স্বার্থ বিসর্জন দিতে হবে। (আগামীকাল সমাপ্য)
লেখক : শিক্ষার্থী, জামিয়া ইসলামিয়া দারুল উলুম আকবর কমপ্লেক্স, মিরপুর, ঢাকা



